সমকালীন জাপানি স্থাপত্যচর্চায় IGArchitects একটি স্বতন্ত্র নাম। যারা স্থাপত্যকে সময়, আলো, বায়ু এবং মানব অভিজ্ঞতার সঙ্গে ক্রমাগত পরিবর্তিত একটি ‘জীবন্ত মাধ্যম’ হিসেবে বিবেচনা করে থাকে।
২০২০ সাল থেকে স্থপতি মাসাতো ইগারাশির প্রতিষ্ঠিত এই স্টুডিওটি টোকিও ও সাইতামাকে কেন্দ্র করে কাজ করছে। ArchDaily 2025 Next Practices Awards-এর বিজয়ী এই প্রতিষ্ঠানটি কাঠামো, স্কেল এবং উপাদান ব্যবহারের মধ্য দিয়ে দীর্ঘস্থায়ী ও অভিযোজনক্ষম স্থাপত্য নির্মাণের সম্ভাবনা অনুসন্ধান করে আসছে।
উপাদান ও কাঠামোর ভাষা
প্রকাশ্য কংক্রিট IGArchitects-এর স্থাপত্যভাষার অন্যতম প্রধান উপাদান। তবে এটি কেবল নান্দনিক উপকরণেই সীমাবদ্ধ নয়। কাঠামোগত ও পরিবেশগত অভিজ্ঞতা নির্মাণের অন্যতম মাধ্যম। কংক্রিটের বুনন, রং, ওজন এবং উপস্থিতিকে প্রকল্পভেদে এমনভাবে ব্যবহার করা হয় যাতে স্থাপত্য স্থানীয় আবহাওয়া ও পরিবেশের প্রতিক্রিয়া ধারণ করতে পারে। স্টুডিওর ভাষায়, তাদের লক্ষ্য হলো, “কাঠামো, উপাদান ও স্কেলের মাধ্যমে সার্বজনীন এবং উদার স্থাপত্য” নির্মাণ করা। যা সময়ের পরিবর্তনের সঙ্গেও প্রাসঙ্গিক থাকে।

Café in Ujina: কাঠামোর ভেতর মুক্ততার অনুসন্ধান
স্টুডিওর প্রাথমিক কাজগুলোর মধ্যে ২০২২ সালের Café in Ujina বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। হিরোশিমার উপকূলে অবস্থিত এই ক্যাফেটি কাচঘেরা উন্মুক্ত পরিসর, কলাম এবং বিভিন্ন উচ্চতার চারটি স্ল্যাবের সমন্বয়ে গঠিত। স্তূপাকৃতির এই কাঠামোগত বিন্যাস অভ্যন্তর ও বহিরাংশকে পরস্পরের সঙ্গে যুক্ত করে। স্থপতি এই প্রকল্পকে ‘জঙ্গল জিম’-এর সঙ্গে তুলনা করেছেন। একটি কাঠামো যা একই সঙ্গে দৃঢ় এবং বহুবিধ ব্যাখ্যার জন্য উন্মুক্ত।
Building Frame of the House: ঘর ও কর্মস্থলের নতুন সম্পর্ক
২০২৩ সালে নির্মিত Building Frame of the House প্রকল্পটি মাসাতো ইগারাশির নিজস্ব বাসভবন, যা টোমোকো মিনামিনোর সঙ্গে যৌথভাবে নকশা করা হয়েছে। টোকিওর ঘনবসতিপূর্ণ অঞ্চলের মাত্র ৪০ বর্গমিটারের একটি জমিতে নির্মিত এই বাড়িটি সাতটি স্কিপ-ফ্লোর স্তর নিয়ে গঠিত একটি বৃহৎ একক কক্ষ হিসেবে পরিকল্পিত।
বিভিন্ন উচ্চতা ও গভীরতায় বিন্যস্ত দেয়াল ও স্ল্যাব আলো, বায়ু এবং চলাচলের অবাধ প্রবাহ নিশ্চিত করে। এখানে মেঝে কখনো বসার স্থান, কখনো কাজের টেবিলে রূপান্তরিত হতে পারে। ফলে বসবাস ও কাজের মধ্যকার প্রচলিত সীমারেখা অস্পষ্ট হয়ে যায়।

One Legged House: একক কাঠামো, বহুমাত্রিক অভিজ্ঞতা
ওকিনাওয়ায় নির্মিত One Legged House-ও একটি বৃহৎ একক কক্ষের ধারণার উপর ভিত্তি করে নির্মিত। পুরো ভবনটি একটি কেন্দ্রীয় স্তম্ভকে ঘিরে সংগঠিত হয়েছে। যেখান থেকে ছাদ ও দেয়াল বিস্তৃত হয়েছে। চারপাশে স্লাইডিং কাচের দরজা এবং উপরে ভাসমান কংক্রিট কাঠামো উপক্রান্তীয় জলবায়ুর জন্য উপযোগী বায়ুপ্রবাহ নিশ্চিত করে। প্রকল্পটি দেখায় কীভাবে একটি মাত্র কাঠামোগত উপাদান পুরো স্থানের সংগঠন ও অভিজ্ঞতাকে নির্ধারণ করতে পারে।

Pyramid Hut: স্থায়িত্ব ও সাংস্কৃতিক স্মৃতির সংযোগ
২০২৪ সালের Pyramid Hut প্রকল্পটি প্রথম দৃষ্টিতে স্টুডিওর পূর্ববর্তী কাজের তুলনায় বেশি স্মারকধর্মী মনে হলেও এর ভিত্তি একই দর্শনে নির্মিত। ওকিনাওয়ার একটি দীর্ঘ ও সংকীর্ণ জমিতে অবস্থিত এই বাড়িটি তিনটি ধাপযুক্ত স্তরে বিন্যস্ত। যার ওপর রয়েছে পিরামিড-আকৃতির ছাদ। প্রবেশপথ, রান্নাঘর এবং বসার অংশ একটি ধারাবাহিক স্থানিক ক্রম তৈরি করে।
স্কাইলাইটের মাধ্যমে প্রবেশ করা প্রাকৃতিক আলো কংক্রিটের ভারী উপস্থিতিকে কোমল করে তোলে। স্থপতির মতে, এর সম্মুখভাগ ওকিনাওয়ার ঐতিহ্যবাহী সমাধিসৌধের স্থায়িত্ববোধকে স্মরণ করিয়ে দেয়। ভবিষ্যতে ব্যবহার বা মালিকানা পরিবর্তিত হলেও ভবনটি যেন তার স্থাপত্যিক মূল্য ধরে রাখতে পারে এ ধারণাই প্রকল্পটির মূল শক্তি।
অন্যান্য আবাসিক প্রকল্পে ধারাবাহিক অনুসন্ধান
2700 House, Check Patterned House, Forest of Pillars House, Grand Room House এবং The House Apart প্রকল্পগুলোতেও একই দর্শনের প্রতিফলন দেখা যায়। কখনো স্তরবিন্যাস ও পরিবর্তনশীল মেঝের মাধ্যমে, কখনো কংক্রিট ও কাচের ছকবদ্ধ বিন্যাসে, আবার কখনো কাঠের স্তম্ভের পুনরাবৃত্তির মাধ্যমে তারা উন্মুক্ততা, পারস্পরিক সংযোগ এবং স্থানিক গভীরতার নতুন ব্যাখ্যা হাজির করেছে।

IGArchitects-এর কাজ সমকালীন স্থাপত্যে একটি গুরুত্বপূর্ণ দৃষ্টিভঙ্গি উপস্থাপন করে, যেখানে স্থাপত্যকে স্থির ও চূড়ান্ত বস্তু হিসেবে নয়, বরং পরিবর্তনশীল মানবজীবনের সক্রিয় অংশগ্রহণকারী হিসেবে দেখা হয়।
কাঠামোগত স্বচ্ছতা, উপাদানের সততা এবং সময়ের সঙ্গে অভিযোজনক্ষম স্থানিক বিন্যাসের মাধ্যমে প্রতিষ্ঠানটি এমন স্থাপত্য নির্মাণ করছে, যা ব্যবহারকারীদের সঙ্গে একসঙ্গে বিকশিত হতে পারে। তাদের প্রকল্পগুলো দেখায় যে স্থাপত্য তখনই সত্যিকার অর্থে জীবন্ত হয়ে ওঠে, যখন তা আলো, বায়ু, সময় এবং মানুষের অভিজ্ঞতার সঙ্গে অবিরাম সংলাপে অংশ নেয়।
তথ্যসূত্র
আর্কডেইলি, প্রকাশকাল: ১৬ জানুয়ারি ২০২৬
















