পরিবেশবান্ধব স্থাপত্যকে কেন্দ্র করে গঠিত আর্ক-এশিয়া কমিটি একটি আন্তর্জাতিক আইডিয়া প্রতিযোগিতার আয়োজন করে, যার নাম ‘কোভিড-১৯ মহামারি মোকাবিলায় পরিবেশবান্ধব স্থাপনার ভূমিকা’(The Contribution of Green Building in the Fight Against COVID-19)। এ প্রতিযোগিতার মূল বিষয় ছিল পরিবেশবান্ধব স্থাপনা কীভাবে কোভিড-১৯ মোকাবিলা করতে সক্ষম। এই আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতায় আর্ক-এশিয়া কমিটির সদস্য স্থপতিগণ অংশ নেন। এই প্রতিযোগিতায় দ্বিতীয় স্থান অর্জন করেন বাংলাদেশের স্থপতি, শফিক রাহ্মান। এই প্রবন্ধটিতে স্থপতি শফিক রাহ্মান কোভিড-১৯ মহামারি মোকাবিলায় পরিবেশবান্ধব স্থাপনার ভূমিকা বিস্তারিতভাবে উপস্থাপন করেছেন।
একবিংশ শতাব্দীর পরিবেশবান্ধব স্থাপনা তাকেই বলা যায়, যা সর্বনিম্ন প্রাকৃতিক সম্পদ ব্যবহার করে, সর্বনিম্ন বর্জ্য নিঃসরণ করে এবং নবায়নযোগ্য শক্তি ব্যবহার করতে পারে। এই ধরনের স্থাপত্য স্বাস্থ্যকর বসবাসযোগ্য পরিবেশ নিশ্চিত করে, যা মানুষের শারীরিক ও মানসিক উন্নতি সাধন করে সাহায্য করে রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়াতে, পাশাপাশি কোভিড-১৯ মহামারি মোকাবিলায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।
অন্যদিকে এই ধরনের সাসটেইনেবল বিল্ডিং পরিবেশবান্ধব নবায়নযোগ্য শক্তি উৎপন্ন করে, সম্পদের পুনর্ব্যবহার নিশ্চিত করে। উদাহরণস্বরূপ, বৃষ্টির পানির পুনর্ব্যবহার, বর্জ্য পানির পুনর্ব্যবহার, একদিকে যেমন খরচ কমায় অন্যদিকে তা অর্থনৈতিক ক্রান্তিকালে একটি সমাজকে সার্বিক অর্থনৈতিক মন্দা থেকে মুক্তি দিতে পারে। সর্বোৎকৃষ্ট সম্পদ ব্যবহারের পাশাপাশি পরিবেশবান্ধব স্থাপনা বাসিন্দাদের নাগরিক পরিবেশে খাদ্য উৎপাদনের সুযোগ দেয়, যা তাদের কোনো প্রকার খাদ্য ঘাটতি ছাড়াই দীর্ঘ সময় বাড়িতে অবস্থানের সুযোগ তৈরি করে, যেটি বর্তমান সময়ে কোভিড-১৯ মোকাবিলায় কার্যকরী একটি পদক্ষেপ হিসেবে সারা বিশ্বে সমাদৃত।
ন্যূনতম সম্পদ ব্যবহার এবং পরিবেশবান্ধব পরিকল্পনা
কোভিড-১৯ আক্রান্ত রোগীদের প্রায়ই বাসায় আইসোলেশনে থাকার পরামর্শ দেওয়া হয়, যেখানে রোগীর রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতার উন্নতির মাধ্যমে রোগমুক্তি সম্ভব। চিকিৎসকের পরামর্শমতো অন্যান্য কার্যক্রমের পাশাপাশি ভবনের অভ্যন্তরীণ পরিবেশও রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা উন্নয়নে ভূমিকা রাখে। উপযুক্ত বায়ু চলাচলের ব্যবস্থা ঘরের অভ্যন্তরীণ আবহাওয়াকে বিশুদ্ধ ও রোগমুক্ত রাখে। সূর্যরশ্মি ভিটামিন ডি দেয়, যা মানসিক স্বাস্থ্য উন্নয়নে সাহায্য করে। যাঁরা কোভিড-১৯-এ সংক্রমিত নন, তাঁদের জন্যও প্রাকৃতিক প্রাচুর্যে ভরপুর অভ্যন্তরীণ পরিবেশ সৃষ্টি করে, যা রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা পাশাপাশি মানসিক স্বাস্থ্য উন্নয়নে এই মহামারি মোকাবিলায় কার্যকর।
পুনর্ব্যবহারস্বরূপ ও নবায়নযোগ্য শক্তি
পরিবেশবান্ধব স্থাপনা একদিকে যেমন পানি, শক্তি ইত্যাদি সম্পদ ক্ষয়রোধ করে, অন্যদিকে তেমনি বিভিন্ন নবায়নযোগ্য শক্তি উৎপন্ন করে, উদাহরণস্বরূপ বলা যায়, ফটোভলটিক ইলেকট্রিসিটি, বায়ুশক্তিকে কাজে লাগিয়ে শক্তি উৎপাদন করে, যার মাধ্যমে শক্তির চাহিদা একটি গ্রহণযোগ্য সাম্যবস্থায় অবস্থান করতে পারে। কোভিড-১৯ মহামারি চলাকালীন অন্যান্য দেশ যেখানে আর্থিক ও অন্যান্য সম্পদ ঘাটতির সম্মুখীন হচ্ছে, সেখানে পরিবেশবান্ধব স্থাপনা এই সম্পদ ঘাটতির চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় কার্যকর সমাধান হতে পারে।
দ্বিতীয়ত, বিশ্বব্যাপী মহামারি চলাকালীন ব্যক্তিগত ও সামাজিক স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলার কারণে পানির ব্যবহার বেড়েছে। পরিবেশবান্ধব স্থাপনারীতি বৃষ্টির এবং বর্জ্যরে পানি পরিশোধন ও পুনর্ব্যবহারে গুরুত্ব আরোপ করার মাধ্যমে বিশ্বব্যাপী এই অতিরিক্ত পানির চাহিদার ভারসাম্য রক্ষা সম্ভব।
একটি সেকশন ড্রইংয়ে কোভিড-১৯ মহামারি মোকাবিলায় পরিবেশবান্ধব স্থাপনার ভূমিকার বিভিন্ন কৌশলগত দিক তুলে ধরা হয়েছে। সেকশন ড্রইংটি, স্থপতির আর্ক-এশিয়া আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতার মূল উপস্থাপনা থেকে সংগৃহীত।
খাদ্য নিশ্চয়তা এবং নগর বৃক্ষায়ন (Urban Vegetation)
বিশ্বব্যাপী কোভিড-১৯ মোকাবিলায় যে পদক্ষেপটি কার্যকরী ভূমিকা পালন করেছে তা হলো দীর্ঘমেয়াদি হোম কোয়ারেন্টাইন। কিন্তু এই লকডাউন পরিস্থিতিতে বাসিন্দাদের নিয়মিত সতেজ শাকসবজি ও ফলমূল জোগাড় করা কঠিন হয়ে পড়ে। পরিবেশবান্ধব স্থাপনাতে নগর বৃক্ষায়ন, ভার্টিকেল গার্ডেনিং, চাষাবাদ ইত্যাদির ব্যাপক সুযোগ তৈরি হয়। কোয়ারেন্টাইন চলাকালীন পরিকল্পিত স্থাপনা ঘরে থেকেই এর বাসিন্দাদের তাজা শাকসবজি ও ফলমূলের সরবরাহ নিশ্চিত করতে পারে।
পরিশেষে বলা যায়, অপ্রত্যাশিত এই মহামারিতে মানবজাতি এখনো ভবিষ্যৎ সম্পর্কে অনিশ্চিত। কার্যকরী ভ্যাকসিন আবিষ্কারের আগপর্যন্ত সামাজিক দূরত্ব বজায় রেখে চলা এবং রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতার উন্নতি সাধনই বর্তমানে একমাত্র গ্রহণযোগ্য পন্থা। তা ছাড়া দীর্ঘসময় বাসায় অবস্থানের কারণে আগের তুলনায় সম্পদের ব্যবহার বেশি হচ্ছে, যা অর্থনৈতিক মন্দার দরুন সৃষ্ট পরিস্থিতির অন্তরায়। পরিবেশবান্ধব স্থাপনা অতিরিক্ত জ্বালানি সম্পদের ব্যবহার কমায়, যা এই মহামারি পরিস্থিতি মোকাবিলায় পালন করে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা।
পরিবেশবান্ধব ও টেকসই স্থাপনা গৃহাভ্যন্তরীণ পরিবেশের সঙ্গে প্রকৃতির সংযোগস্থাপন করে, যা দেহের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়াতে খুবই কার্যকর ভূমিকা রাখে। নিজস্ব রোগ প্রতিরোধব্যবস্থার উন্নয়নই বর্তমানে আমাদের এই ভয়াবহ মহামারির বিরুদ্ধে যুদ্ধ করার একমাত্র অবলম্বন।
লেখাটি আর্ক-এশিয়ার আয়োজিত ‘কোভিড-১৯ মহামারি মোকাবিলায় পরিবেশবান্ধব স্থাপনার ভূমিকা’, ‘The Contribution of Green Building in the Fight against COVID-19’ নামক কম্পিটিশনে দ্বিতীয় পুরস্কারপ্রাপ্ত প্রজেক্টের মূল উপস্থাপনা থেকে সংগৃহীত ও অনুবাদিত।
অ্যাওয়ার্ডপ্রাপ্ত স্থপতির পরিচিতি
স্থপতি শফিক রাহ্মান
প্রধান স্থপতি, ত্রিকোণ আর্কিটেক্টস
সহকারী অধ্যাপক, স্থাপত্য বিভাগ
আহছানউল্লাহ বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়, (AUST)
প্রকাশকাল: বন্ধন, ১২০তম সংখ্যা, এপ্রিল-আগস্ট ২০২০।