সামাজিক স্থাপত্য চর্চা নিয়ে ভাবতে হবে এখনই

প্রযুক্তির উৎকর্ষতার আধুনিক এ যুগে আমরা কি সমাজে শান্তিপূর্ণভাবে বসবাস করতে পারছি? শহরের অনেক পরিবারের সন্তানদের নিয়েই তাদের অভিাববক চিন্তায় থাকেন, এই বুঝি তারা কোনো অপরাধে জড়িয়ে পড়ছে! আর এর জন্য আমরা সাধারণত দায়ী করি সমাজের আইনকানুনকে। কিন্তু ভুলে গেলে চলবে না আমাদের বর্তমান শহরের গঠন কাঠামোও এর জন্য দায়ী!

আমরা আসলেই শহর নিয়ে চিন্তিত। সমাজে ঘটছে একের পর এক দুর্ঘটনা! প্রতিটি সেকেন্ডে দেশের কোথাও না কোথাও চলছে কোনো না কোনো ছোট-বড় অপরাধ। খবরের কাগজ খুললেই খুন, ধর্ষণ, ছিনতাই থেকে শুরু করে চোখের সামনে ধরা দেয় হাজারো রকমের অপরাধের চিত্র। যুবসমাজের অবক্ষয় আজকের আর নতুন কোনো বিষয় নয়। দিন দিন বাড়ছে এর প্রকোপ। এসব অপরাধ আমাদের ঠেলে দিচ্ছে বড় কোনো সহিংসতার দিকে। ব্রিটিশ ক্রাইম সার্ভের তথ্য অনুযায়ী, প্রতিবছর পৃথিবীতে প্রায় ১০ দশমিক ৭ মিলিয়ন অপরাধ সংঘটিত হচ্ছে এবং এর প্রকোপ দিন দিন জ্যামিতিক হারে বাড়ছে। এর পেছনে অনেক কারণ থাকলেও একটি কারণকে কখনো আলোচনার সামনে সঠিকভাবে আনা হচ্ছে না, সেটি হচ্ছে নগরের অপরিকল্পিত ব্যবস্থাপনা ও সঠিক নকশা প্রণয়নের পাশাপাশি সমন্বয়ের অভাব।

সাধারণত পর্যবেক্ষণ থেকে দেখা যায়, অন্ধকারাচ্ছন্ন ও জনসমাগম কম, অপ্রশস্ত রাস্তা, যার সঙ্গে প্রধান কোনো সড়কের সরাসরি যোগসূত্র রয়েছে, এমন জায়গাগুলোতে ছিনতাইসহ অন্যান্য অপরাধের প্রবণতা বেশি থাকে। সামাজিক ব্যবস্থাগুলোকে, একজন ‘সামাজিক স্থপতি’ সাবধানে পরিকল্পিত প্রোগ্রাম বা কর্মশালার মাধ্যমে মানুষের আচরণ (আচরণ পরিবর্তনের) পর্যালোচনা করে পরিবর্তন করতে চায় সু-উন্নত নকশা প্রণয়নের মাধ্যমে, যেমন উদাহরণস্বরূপ, বাসযোগ্যতা এবং নিরাপত্তা বা নিজের সম্প্রদায়ের পরিবেশগত প্রভাব এবং জলবায়ুর ভূমিকা।

সামাজিক স্থাপত্য হচ্ছে একটি পরিবেশের সচেতন নকশা, যা টেকসই উন্নয়নের জন্য কিছু লক্ষ্য বা লক্ষ্যের দিকে অগ্রসর হয় এবং মানুষের সামাজিক আচরণের একটি পরিসরকে উৎসাহিত করে। পরিবেশগত সামাজিক স্থাপত্যের প্রভাবগুলো সামাজিক ব্যবস্থার ওপর নির্ভর করে। তাই আমরা স্থাপত্য যা কিছুই চর্চা করি না কেন, সব ক্ষেত্রে মাথায় রাখতে হবে সামাজিক বিষয়সমূহকে। মানুষের প্রয়োজনকে আগে উপলব্ধি করতে হবে। অনেক সময় দেখা যায়, অপরিকল্পিতভাবে বিভিন্ন জায়গায় প্রয়োজনকে উপেক্ষা করে স্থাপিত হচ্ছে একাধিক প্রকল্প। পরে তার আশপাশে সুন্দর এবং নিয়মতান্ত্রিকভাবে কোনো স্থাপনাই করা যাচ্ছে না। তাই আমাদের এদিকে সব সময় খেয়াল রাখতে হবে।

যখন নগরের কোথাও একটি সুউচ্চ স্থাপনা তৈরি করা হয় তখন স্থাপনার পেছনে পাশে খালি জায়গার সঠিক নকশা ও সমন্বয়ের অভাবে তৈরি হতে পারে ‘নেগেটিভ স্পেস’, যা ভবিষ্যতে বিভিন্ন শ্র্রেণির বয়সের মানুষের জন্য সামাজিক অপরাধ সংঘটনের নিরাপদ স্থান হিসেবে বিবেচিত হয়। ঢাকা কিংবা চট্টগ্রাম নগরীতে স্থাপনার পাশে এমন স্থানের উদাহরণ কম নয়। সামাজিক গতিশীলতা বৃদ্ধির লক্ষ্যে পায়ে হাঁটা ফুটপাত, রাস্তা থেকে শুরু করে, এমনকি পার্কের রাস্তায়ও নির্দিষ্ট দূরত্ব পরপর সামাজিক গতিশীলতা বাড়ায় এমন কোনো উপাদান প্রদান করতে হবে। যেমন ছোট ছোট কফিশপ, গিফট কর্নার, বুক কর্নার ইত্যাদি।

যে ছোট্ট শিশুটি আমাদের সমাজে ইট-পাথরের জঞ্জালে ভরা ঘরের বন্ধ চার দেয়ালের মাঝে বেড়ে উঠছে, যাকে আজ আমরা সৃষ্টিশীল কোনো স্থানের সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দিতে পারছি না। বাস্তবতার পরিপ্রেক্ষিতে সেই ছেলেটিই একদিন খুঁজে নেবে অপরিকল্পিত অন্ধকার কোনো জায়গা। নগরের পরিকল্পনা এমনভাবে করতে হবে, যেখানে বসবাসরত প্রতিটি মানুষ তার চারপাশের সবকিছুকেই নিজেদের বলে ভাবতে শেখে। যার ফলে একে অপরের মধ্যে একটি শক্তিশালী কমিউনিটি বন্ডিং বিদ্যমান থাকবে। আমাদের সমাজের প্রতিটা উপাদানের সঙ্গে অন্য উপাদানগুলো কোনো না কোনোভাবে জড়িত। যদিও সামাজিক অপরাধ শুধু কোনো একটি নির্দিষ্ট বিষয়ের ওপর নির্ভর করে না, তথাপি একটি সুষ্ঠু পরিকল্পিত নগরী এনে দিতে পারে সুন্দর সামাজিক সম্পর্ক, যার অভাব এখন আমরা প্রতিদিনই উপলব্ধি করছি। কারণ, সামাজিক অপরাধের প্রবণতা কমাতে পারলে অর্থনীতি ও সাংস্কৃতিক বিকাশে দেশ লাভ করবে স্বয়ংসম্পূর্ণতা। আর এর জন্য চাই সমাজের সর্বস্তরের সচেতনতা এবং ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা।

আমরা যখন কোনো বাড়ি তৈরি করি কিংবা নকশা প্রণয়ন করি, তখন সাধারণত বাড়ির সামনে অনেক অংশজুড়ে খোলা সবুজ জায়গা রেখে দিই। সেখানে প্রায়ই দেখা যায় অধিক ডালপালাযুক্ত উঁচু বিভিন্ন প্রকার গাছ বপন করা হয়ে থাকে। আর পরে সুরক্ষার জন্য সাত থেকে দশ ফুট উচ্চতার সীমানাপ্রাচীর দিয়ে স্থাপনাটিকে ঘিরে রাখা হয়। যার কারণে স্থাপনাটির সামনে ফুটপাতের সঙ্গে বসবাসরত জনসাধারণের আই কন্টাক্ট হয় না। এ ধরনের ফুটপাতে যেকোনো ধরনের অপরাধ নিমেষেই যে কেউ খুব সহজে পালিয়ে যেতে সক্ষম হয়। আর এগুলোই সামাজিক স্থাপত্যের অংশ। বর্তমানে ফ্ল্যাটনির্ভর যান্ত্রিক জীবনে এককেন্দ্রিকতা এমনভাবে জায়গা বিস্তার করেছে যে একই ভবনের পাশাপাশি দুটি ফ্ল্যাটের বাসিন্দাদের মধ্যে কোনো সম্পর্ক গড়ে উঠছে না। এতে করে অপরাধের প্রবণতা দিন দিন বাড়ছে। এ কারণেই প্রায়ই দেখা যায় পাশের ফ্ল্যাটে বড় কোনো দুর্ঘটনা ঘটলেও অন্য কেউ জানতেই পারছে না দেয়ালের ওপাশে কী ঘটছে?

শুধু শহরকেন্দ্রিক আবাসন সমস্যা সমাধান কিংবা সৌন্দর্যবর্ধনের কথা চিন্তা করলে সেখানে অপরাধ সংঘটিত হওয়ার প্রবণতা বৃদ্ধি পাবে এটাই বাস্তবতা। যার দরুন বিশেষ করে আমাদের যুবসমাজ খুব সহজেই যেকোনো অপরাধে লিপ্ত হতে পারে। এ ক্ষেত্রে আমাদের মনে রাখতে হবে ‘সামাজিক স্থাপত্য’ ইন্টার-অ্যাকশন ডিজাইন এবং ইনফরমেশন আর্কিটেকচার থেকে ভিন্ন। এটিকে দুটির সঙ্গে সংযুক্ত করা যেতে পারে। বিশেষভাবে, ধারণাটি হলো ডিজাইনারের প্রয়োজনীয়তা ও দিকনির্দেশনা উপলব্ধি করার জন্য একটি সামাজিক-প্রযুক্তিগত অবকাঠামো নির্মাণ করা, যার মাধ্যমে সমাজের বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে প্রয়োজনীয় উন্নয়ন সম্ভব হবে। যেকোনো স্থাপনার নকশাকে সোশ্যাল আর্কিটেকচারের আওতায় আনার সব থেকে সেরা মাধ্যম হচ্ছে প্রকল্প এবং প্রোগ্রামগুলোর সমন্বয়ে সামাজিক বিষয়াদি মাথায় রাখা। আমাদের বড় বাধা হলো প্রযুক্তিতে আমাদের পর্যাপ্ত সময় না দেওয়া এবং খুব সহজে যেকোনো কাজ অতি অল্প সময়ে যেনতেন ভাবে করে ফেলা। যার মাশুল দিতে হয় পরে বছরের পর বছর ধরে। এ থেকে আমাদের বের হতে হবে। সময়ের কাজ সময়ে করে ফেলতে হবে আর স্থানীয় প্রযুক্তির ব্যবহার শিখতে হবে স্থাপনা তৈরির সময়। শ্রমিকদের টেকসই উন্নয়নের ওপর প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করতে হবে। তাদের বোঝাতে হবে, তাদের ওপরও অনেক কিছু নির্ভর করে। এ ক্ষেত্রে স্থাপনা তৈরিতে শ্রমিক নিরাপত্তার বিষয় গুরুত্বের সঙ্গে দেখতে হবে।

প্রকাশকাল: বন্ধন, ৯০তম সংখ্যা, অক্টোবর ২০১৭।

স্থপতি সজল চৌধুরী
+ posts

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Scroll to Top