বায়তুর রউফ জামে মসজিদ
স্থপতি মেরিনার অনন্য স্থাপত্যকর্ম

শুধু দৃশ্যত নান্দনিকতাই নয়, স্থাপত্যের শিখরে রয়েছে ইতিহাস, সংস্কৃতি ও জলবায়ুর সম্পৃক্ততা। আর এসবের পরিপূর্ণ সংমিশ্রণেই সম্ভব স্বতন্ত্র স্থাপত্যশৈলীর উদ্ভব। স্বাধীন বাংলা সালতানাত বা তার আগের গৌড় ও সোনারগাঁ সালতানাতের সময় এ দেশে যে স্থাপত্যকলা বিকশিত হয়, প্রাথমিকভাবে তাতে মধ্য এশীয় স্থাপত্যের ব্যাপক প্রভাব থাকলেও পরে এ দেশের কিছু উপাদান মিশে এটিও একটি মৌলিক বা স্বতন্ত্র স্থাপত্যের রূপ নেয়। সে সময়ের মসজিদগুলো (ষাটগম্বুজ মসজিদ, গৌড়ের বিখ্যাত আদিনা মসজিদ) ছিল স্থাপত্যশৈলীর দিক থেকে স্বতন্ত্র। মুসলিম স্থাপত্যের ক্রমবিকাশে সুলতানি স্থাপত্যরীতির নির্মাণশৈলীতে অনুপ্রাণিত হয়ে স্থপতি মেরিনা তাবাসসুম ডিজাইন করেছেন ‘বায়তুর রউফ’ জামে মসজিদের।

সম্প্রতি এই মসজিদটি বৈশ্বিক স্থাপত্য অঙ্গনের সবচেয়ে সম্মানজনক পুরস্কার ‘আগা খান ডেভেলপমেন্ট নেটওয়ার্ক পুরস্কার’-এর জন্য বিশ্বের ৩৮৪টি স্থাপনাকে পেছনে ফেলে সেরা ১৯ স্থাপনার চূড়ান্ত তালিকায় মনোনীত হয়েছে। তরুণ স্থপতিদের উদ্ভাবনী ধারণাকে স্বীকৃতি দিতে আগা খান ডেভেলপমেন্ট নেটওয়ার্ক (একেডিএন) প্রতি তিন বছর পরপর এ পুরস্কার দেয়। এই পুরস্কার বিবেচনায় স্থাপত্য ক্ষেত্রে শ্রেষ্ঠত্ব, পরিকল্পনা, ঐতিহাসিক সংরক্ষণকে গুরুত্ব দেওয়া হয়। পাশাপাশি স্থাপত্যকলার মাধ্যমে সামাজিক প্রত্যাশা পূরণের বিষয়টিও বিচারকদের বিবেচনায় থাকে। চলতি বছরের সেপ্টেম্বর বা অক্টোবরে বিজয়ীর নাম ঘোষণা করবে আগা খান ডেভেলপমেন্ট নেটওয়ার্ক।

স্থাপত্যের ইতিহাসের বিরাট এক অংশজুড়ে রয়েছে মুসলিম স্থাপত্য। আর মুসলিম স্থাপত্যের প্রাণকেন্দ্র মসজিদ। মসজিদ মুসলমানদের উপাসনালয়, স্রষ্টার প্রতি আনুগত্য প্রকাশের উপযুক্ত স্থান। এ ব্যাপারে স্থপতি মেরিনা তাবাসসুম জানান, ‘মসজিদ হতে হবে আলোকপ্রদ এবং যথেষ্ট আধ্যাত্মিক ও ঐশ্বরিক অনুভূতিসম্পন্ন; অন্যথায় মসজিদ তার নির্মাণের যথাযথ উদ্দেশ্য পূরণে ব্যর্থ হয়। ‘বায়তুর রউফ’ জামে মসজিদে ওপরে উল্লিখিত সব দিকই স্পষ্ট হয় স্থাপত্যিক উপাদানে, বিশেষত্ব পূর্ণ ডিজাইনে ও আলো-ছায়ার অপূর্ব বিচরণে।

প্রাকৃতিক আলোককে ডিজাইনের অন্যতম উপাদান হিসেবে বিবেচনা করা হয়েছে প্রকল্পটিতে। স্থপতি মেরিনা তাবাসসুম তাঁর নকশায় প্রাকৃতিক আলোর প্রাধান্য দেন সব সময়। তিনি ‘বায়তুর রউফ’ জামে মসজিদের নকশার মাধ্যমে আলোর চমৎকার বিচ্ছুরণ ঘটান, যা মসজিদের অভ্যন্তরীণ পরিবেশকে ঐশ্বরিক এক অনুভূতি এনে দেয়। ছাদ থেকে আসা এলোপাতাড়ি ও বৃত্তাকার দিনের আলো; প্রবেশপথ আর মেঝেতে অসাধারণ ও সুসজ্জিত প্যাটার্ন তৈরি করে। মসজিদের পাশ থেকে আসা আলোকচ্ছটা অদৃশ্যের সঙ্গে স্থাপন করেছে সম্পর্ক, সৃষ্টি করেছে মসজিদের স্থাপত্যে ভিন্ন এক নৈসর্গিক ধারণার। 

মেরিনা তাবাসসুম নিঃসন্দেহে সমসাময়িক স্থাপত্য অঙ্গনে স্ব-স্বীকৃত স্থপতি, যেটা তিনি তাঁর চিন্তাশীল কর্মকাণ্ডের মাধ্যমে প্রমাণ করেছেন বারবার। পারিবারিক সূত্রে ভূমি মালিকানা থাকায় ‘বায়তুর রউফ’ জামে মসজিদ প্রকল্পের দায়িত্ব বর্তায় তাঁরই ওপর। রাজধানীর দক্ষিণখান থানার ফায়েদাবাদে অবস্থান ‘বায়তুর রউফ’ জামে মসজিদের। আবদুল্লাহপুর বাসস্ট্যান্ড থেকে পূর্ব দিকে রেললাইন পেরিয়েই ৭৫’ x ৭৫’ আকারের লাল ইটে নির্মিত বিশ্বের সাড়া জাগানো স্থাপত্য এটি। এ প্রকল্পে বাজেট সীমিত হওয়ায় স্থপতিকে বহুদিক বিবেচনা করে ডিজাইন করতে হয়েছে। স্থানীয় ও আত্মীয়স্বজনের সহযোগিতায় স্থপতি মেরিনা তাবাসসুম প্রকল্পটির নির্মাণকাজ শেষ করেন। মোট ১১ কাঠা জমির ওপর গড়ে ওঠা এ প্রকল্পের নির্মাণ ব্যয় ১ কোটি টাকা।

মসজিদ মানেই ডোম আর মিনারের সংমিশ্রণে তৈরি স্থাপনাÑ এমন তথাকথিত ধারণা থেকে সরে এসে ‘বায়তুর রউফ’ জামে মসজিদের ডিজাইন করেছেন স্থপতি মেরিনা তাবাসসুম। মসজিদের ডিজাইনের অন্যতম লক্ষণীয় দিক কিবলার ওরিয়েন্টেশন। সারা বিশ্বের মুসলমানেরা কিবলামুখী হয়ে সালাত আদায় করে, যার অবস্থান সৌদি আরবের মক্কায়। তাই গোটা বিশ্বের সব মসজিদ কিংবা প্রার্থনার স্থানগুলো কিবলার দিকে ফেরানো। মেরিনা তাবাসসুমও এ ক্ষেত্রে তাঁর ডিজাইনে ব্যতিক্রম কিছু করেননি। তিনি ‘বায়তুর রউফ’ জামে মসজিদের ডিজাইনে কিবলার দিকে ১৩ ডিগ্রি কোনাকুনি করা একটি থাম স্থাপন করে কিবলার দিক নির্ধারণ করেছেন।

৭৫৪ বর্গমিটারের এই মসজিদটির ডিজাইনে ৭৫’ x ৭৫’-এর চতুষ্কোণীয় প্লেন দৃশ্যমান। এই চতুষ্কোণীয় ডিজাইনে অনুপ্রেরণা হিসেবে ছিল প্রাচীন বাংলার বৌদ্ধবিহার সোমপুর মহাবিহার, বাগেরহাটের নয় গম্বুজ মসজিদ আর স্থপতি লুই আই কানের করা জাতীয় সংসদ ভবন। প্রতিটি ডিজাইনই এসেছে চতুষ্কোণীয় গঠন থেকে। ‘বায়তুর রউফ’ জামে মসজিদের চতুর্দিকে রয়েছে লাল ইটের দেয়াল। আর এই দেয়ালগুলো সম্পূর্ণ লোড বিয়ারিং। সবচেয়ে মজার ব্যাপার হলো দেয়ালগুলো শ্বাস-প্রশ্বাসক্ষম। দেয়ালগুলোতে রয়েছে বায়ু চলাচলের জন্য বিশেষ ব্যবস্থা, যা মসজিদের অভ্যন্তরের তাপমাত্রাকে পূর্ণ নিয়ন্ত্রণে রাখতে সক্ষম। যেহেতু এই প্রকল্পটি স্বল্প বাজেটের, তাই স্থপতি মেরিনা তাবাসসুম এই বিষয়টি মাথায় রেখেই দেয়ালগুলোর ডিজাইন করেছেন। তিনি এই দেয়ালকে বলছেন ব্রিদিং ওয়াল (Breathing Wall)। এই দেয়ালের দরুন মসজিদের অভ্যন্তরে শীত বা গরমে আবহাওয়ার বিরূপ প্রভাব বোঝা যায় না।

এমটিএ

৮টি পেরিফেরাল কলামের ওপর মসজিদটি দাঁড়িয়ে। মাঝের প্রেয়ার হলটির ডিজাইন করা হয়েছে প্যাভিলিয়নের মতো করে। এতে কোনো কাচ নেই। মসজিদের নির্মাণ উপকরণ স্থানীয় উৎস থেকে নেওয়া। মসজিদের মেঝে তৈরি করা হয়েছে কুড়ানো পাথরে। পাথর কাটার পর যে অবশিষ্টাংশ থাকে তার সঙ্গে হোয়াইট সিমেন্ট যোগ করে নির্মিত মসজিদের মেঝে।

মসজিদটির নির্মাণশৈলী জটিলতামুক্ত ও সরল। স্থাপত্যটি পরিবেশবান্ধব। নির্মাণব্যয়ও অল্প। নির্মাণ উপকরণও খুব সাদামাটা। লাল ইটে দাঁড়ানো এই সরল, নিরাভরণ স্থাপত্য বাংলার জাতীয় চরিত্রের পরিপূরক। মসজিদে যেমন ঝকঝকে রোদের দেখা মেলে, তেমনি ঝুমবৃষ্টিতে এখানে তৈরি হয় বর্ষার দারুণ আবহ। স্থাপনার অভ্যন্তরে আলো-আঁধারির খেলা আবহমান বাংলার রূপের প্রতিনিধিত্ব করে, সত্যিই স্বদেশীয় আধুনিক স্থাপত্যের অপূর্ব এক স্মারক ‘বায়তুর রউফ’ জামে মসজিদ।

প্রকাশকাল: বন্ধন, ৭৭তম সংখ্যা, সেপ্টেম্বর ২০১৬।

আঞ্জুমান আফসারী নিসা
+ posts

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Scroll to Top