বাংলাদেশ সামরিক জাদুঘর, বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর ইতিহাস, ঐতিহ্য, সাফল্যসংক্রান্ত নিদর্শন ও বিভিন্ন অস্ত্রশস্ত্রের সংগ্রহে সজ্জিত জাদুঘরটি। জাদুঘরটি বাংলাদেশ সেনাবাহিনী কর্তৃক নিয়ন্ত্রিত। এটির অবস্থান ঢাকার বিজয় সরণিতে। ১৯৮৭ সালে প্রথম প্রতিষ্ঠিত হয় সামরিক জাদুঘরটি। ১৯৯৯ সালে জাদুঘরটি স্থায়ীভাবে বিজয় সরণিতে স্থানান্তর করা হয়। ১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধের সময় সেনাবাহিনীর কমান্ডারদের ব্যাজ, পোশাক, অস্ত্র, গোলাবারুদ, ক্যানন, এন্টি-এয়ারক্রাফ্ট গান এবং যোগাযোগের জন্য ব্যবহৃত বিভিন্ন যানবাহন জাদুঘরটিতে রক্ষিত আছে। মুক্তিযুদ্ধের পর তৎকালীন পাকিস্তান সেনাবাহিনীর কাছ থেকে উদ্ধার হওয়া বিভিন্ন যানবাহন এবং অস্ত্রও সংরক্ষিত রয়েছে এখানে।
জাদুঘরে যা দেখবেন
মুক্তিযুদ্ধের পর তৎকালীন পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর কাছ থেকে উদ্ধার হওয়া বিভিন্ন যানবাহন এবং অস্ত্র এখানে সংরক্ষিত আছে। পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর আত্মসমর্পণের দলিল, সেক্টর কমান্ডারদের পোর্ট্রেট, ব্যবহার্য সামগ্রী, সশস্ত্র বাহিনীর যেসব ব্যাক্তি মহান মুক্তিযুদ্ধে জীবন দিয়েছেন সেসব বীরশ্রেষ্ঠের পোর্ট্রটে ও সংক্ষিপ্ত জীবনী প্রদর্শনের ব্যবস্থা করা হয়েছে। রয়েছে সাবেক সব সেনাপ্রধানের তৈলচিত্র, বীরশ্রেষ্ঠ-বীর প্রতীকদের নামের তালিকা। দেখতে পাবেন পিলখানা শহীদ কর্নারে নিহত ৫৭ সেনা কর্মকর্তার জীবনবৃত্তান্ত। সশস্ত্র বাহিনীর সর্বাধিনায়ক জেনারেল এমএজি ওসমানী যে জিপটি ব্যবহার করে বিভিন্ন যুদ্ধ এলাকা পরিদর্শন করতেন, পাকিস্তান সেনাবাহিনীর কাছ থেকে উদ্ধারের পর ব্যবহৃত সাবেক রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের গাড়িটিও দেখা যাবে এ জাদুঘরে।
জাদুঘর প্রাঙ্গনে বিশাল মাঠ। প্রধান ফটক দিয়ে ঢোকার আগে চোখে পড়বে বাংলাদেশ সশস্ত্র বাহিনীর কৃতিত্বময় ও মহড়ার কিছু ছবি। মাঠের এক কোণে রয়েছে মুক্তিযুদ্ধে ব্যবহৃত দুটি জাহাজ এমএল সূর্যোদয় ও টি-৮২২৪। মাঠ পেরিয়ে জাদুঘরেরর মূল ভবনে প্রবেশের আগে দেখা মিলবে যুদ্ধক্ষেত্রে ব্যবহৃত বিশাল বিশাল যুদ্ধযান ও ট্যাংক। আর নজরকাড়ে রাস্তার পাশে ফুল গাছে ধরা রাশি রাশি ফুল। মূল ভবনের এলেই হাতের বাঁয়ে ইতিহাস দর্পণ কক্ষ। এখানে আকর্ষণীয় টাচ স্কিন কম্পিউটারের মাধ্যমে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস, মুক্তিযুদ্ধ সম্পর্কিত চলচ্চিত্র ও দুর্যোগপূর্ণ মুহূর্তে কী কী করণীয় তা সচক্ষে প্রত্যক্ষ করা যায়। ঢুকতেই হাতের ডান পাশে রয়েছে মুজিব ব্যাটারি কর্নার। সেখানেও প্রদর্শিত হয় স্বাধিকার আন্দোলন, মুক্তিযুদ্ধ ও বঙ্গবন্ধুর স্মৃতিবিজড়িত আলোকচিত্র ও একুশে ফেব্রুয়ারির ১৪৪ ধারা ভঙ্গের পূর্বে আমতলায় ঐতিহাসিক ছাত্র সমাজের চিত্র। ১৯৬৯ এর ছাত্র-জনতার রুদ্ররোষের মুখে পলায়নরত পাকিস্তানি সেনা, ২ মার্চ বাংলাদেশের প্রথম পতাকা উত্তোলন, মুক্তিযুদ্ধের প্রস্তুতির ছবি, পাকিস্তানি বাহিনীর প্রধানের আত্মসমর্পণ দলিলে স্বাক্ষরের ছবিসহ মুক্তিযুদ্ধ সময়কার নানা দুলর্ভ ছবি। সিঁড়ি মাড়িয়ে দোতলায় যেতে চোখে পড়ে ১৫ ফুট দৈর্ঘ্য ও ১০ ফুট প্রস্থবিশিষ্ট বিজয়ী বীর মুক্তিযোদ্ধাদের বিজয় আনন্দে মাতোয়ারার পোড়ামাটির তৈরি স্মৃতিফলক। মূল জাদুঘর ভবনের দোতলায় রয়েছে ৮টি গ্যালারি।
আলোচিত যত গ্যালারি
অস্ত্রশস্ত্র গ্যালারি: সামরিক জাদুঘর ভবনের দোতলায় প্রথম গ্যালারিটি অস্ত্রশস্ত্র গ্যালারি। এখানে রয়েছে হাতকুঠার তির, ধনুক, ঢাল, বর্শা, রামদা, খড়গ, ছোরা, পিস্তল, তরবারি, বিভিন্ন আকৃতির বর্শা, গজ, ছুরি, কুবরিসহ বিভিন্ন ধরনের অস্ত্র। এখানে আরও রয়েছে যুদ্ধের সময়ে ব্যবহৃত বিভিন্ন মেশিনগান, অরলিকন, মেশিনগান হিসপানো, ব্রাউনিং মেশিনগান, সিমি হ্যান্ড ল্যান্সার, গানপাউডার, ৭ হন্দর গান, কার্তুজ, গ্রেনেড হ্যান্ড ৩৬, গান কার্তন, ব্রান্ডিসাইরকেট, মর্টারবম, শেলসহ বিভিন্ন রকম পিস্তলসহ আরও অনেক রকম অস্ত্র। এ ছাড়া রয়েছে নৌবাহিনীর দুটি টর্পেডো বোট।
পোশাক ও পদক গ্যালারি: এ গ্যালারিতে স্থান পেয়েছে ব্রিটিশ আমল এবং এখনকার ব্যবহৃত তিন বাহিনীর শীত ও গ্রীষ্মকালীন পোশাক-পরিচ্ছদের বিভিন্ন প্রদর্শনী, র্যাংক ব্যাজ, ফিতা ইত্যাদি। পোশাকের বিবর্তন, পদবি অনুযায়ী বিভিন্ন পোশাকের ব্যবহার এবং মহড়া চলাকালীন যেসব পোশাক ব্যবহার করা হয়, সেগুলো এখানে প্রদর্শনের জন্য রাখা হয়েছে।
বিজয় গ্যালারি: এখানে রয়েছে মুক্তিযুদ্ধের সর্বাধিনায়ক জেনারেল এম এ জি ওসমানীর ব্যবহৃত বিভিন্ন অস্ত্র, জেনারেল নিয়াজীর আত্মসমর্পণের চিত্র ও বীরশ্রেষ্ঠদের তৈলচিত্রসহ দুর্লভ আরও কিছু।
মুক্তিযুদ্ধ গ্যালারি: মুক্তিযুদ্ধ গ্যালারিতে রয়েছে আমাদের মুক্তিযুদ্ধের দুর্লভ সব চিত্র। রয়েছে জেনারেল এম এ জি ওসমানীর দেওয়া বিভিন্ন সেক্টর কমান্ডারদের নির্দেশনার চিত্র, মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণকারী বিভিন্ন সেনাসদস্যের ব্যবহৃত অস্ত্র। মুক্তিযুদ্ধে ব্যবহৃত বিভিন্ন সামরিক যানসহ আরও অনেক কিছু।
সেনাবাহিনী গ্যালারি: এখানে রয়েছে সাবেক সেনাপ্রধানদের স্থিরচিত্র, বিভিন্ন ক্রেস্ট। মহান মুক্তিযুদ্ধে খেতাবপ্রাপ্ত মুক্তিযোদ্ধাদের নামের তালিকা, যেখানে বীরশ্রেষ্ঠ পদক, বীর উত্তম পদক, বীর বিক্রম পদক এবং বীর প্রতীক পদক দেখার অপূর্ব সুযোগ।
মুজিব ব্যাটারি কর্নার: বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর প্রথম গোলন্দাজ ইউনিট ‘মুজিব ব্যাটারি’। এ ইউনিটকে ভারতীয় সেনাবাহিনীর দেওয়া দুটি কামান ও বঙ্গবন্ধুর স্মৃতিবিজড়িত আলোকচিত্রগুলো নিয়ে এই কর্নার সাজানো হয়েছে।
পিস কিপার্স কর্নার: এখানে রয়েছে জাতিসংঘ শান্তি মিশনের বাংলাদেশি সেনাসদস্যদের অবদান তুলে ধরে গুরুত্বপূর্ণ সব তথ্য।
ভারী যেসব অস্ত্রসম্ভার
- মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের তৈরি ২৫ পাউন্ডার গান (পাকিস্তান সেনাপ্রধানের সৌজন্যে প্রাপ্ত)
- মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের তৈরি ১৭ পাউন্ডার ট্যাংকবিধ্বংসী গান (পাকিস্তান সেনাপ্রধানের সৌজন্যে প্রাপ্ত)
- মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের তৈরি ৪০মিমি মোটর ক্যারেজ (পাকিস্তান সেনাপ্রধানের সৌজন্যে প্রাপ্ত)
- ট্যাংক পি টি ৭৬ রাশিয়ার তৈরি এই ট্যাংকটি পানিতেও ভেসে চলতে সক্ষম। এই ট্যাংকটি ১৯৭১ সালের স্বাধীনতাযুদ্ধ চলাকালে ব্রাহ্মণবাড়িয়া এলাকা থেকে বাংলাদেশের দামাল মুক্তিযোদ্ধা কর্তৃক পাকিস্তান দখলদার বাহিনী থেকে উদ্ধার করা হয়। (সৌজন্য: এরিয়া সদর দপ্তর, কুমিল্লা)। এই ট্যাংকটির গায়েই খোদাই করে লেখা হয়েছে ব্রাহ্মণবাড়িয়ার মানুষেদর বিজয়কাহিনি।
- মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের তৈরি ৭৬ মিমি ট্যাংক ক্রইজার গান মার্ক (পাকিস্তান সেনাপ্রধানের সৌজন্যে প্রাপ্ত)
- মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের তৈরি জঅগ এচঙ ঝবীঃড়হ ট্যাংক ক্রইজার (পাকিস্তান সেনাপ্রধানের সৌজন্যে প্রাপ্ত)
- মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের তৈরি ঞক অজঠ গক ও শেরমেন (পাকিস্তান সেনাপ্রধানের সৌজন্যে প্রাপ্ত)
- মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের তৈরি ৭৫ মিমি প্যাক হাউগান (পাকিস্তান সেনাপ্রধানের সৌজন্যে প্রাপ্ত)
- ৩৭ মিমি এ এ গান ব্যারেল। পাকিস্তান সেনাবাহিনীর ব্যবহৃত এই ব্যারেলটি ১৯৭১ সালের স্বাধীনতাযুদ্ধের পর বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর ২ ফিল্ড রেজিমেন্ট আর্টিলারি কর্তৃক উদ্ধার করা হয়। (সৌজন্যে: ১২ ফিল্ড রেজিমেন্ট আর্টিলারি)।
- অষ্টাদশ শতাব্দীর কামান (সৌজন্যে: এরিয়া সদর দপ্তর, চট্টগ্রাম)।
- ব্যারেল ১০০ মিমি ট্যাংক গান। কামানের এই ব্যারেলটি রাশিয়ার তৈরি ট্যাংক টি-৫৪-এর সঙ্গে ব্যবহৃত হয়। এই ১৯৭৩ সালে মিসর কর্তৃক আরব-ইসরায়েল যুদ্ধে ব্যবহৃত হয়েছিল। (সৌজন্যে: বেস ওয়ার্কশপ, ইএমই)।
- ৬ পাউন্ডার ট্যাংকবিধ্বংসী কামান। ১৯৭১ সালের স্বাধীনতাযুদ্ধের সময় সিলেট জেলার বানুগাছা রণাঙ্গনে পাকিস্তান বাহিনীর সঙ্গে ৮ ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্টের প্রচণ্ড সংঘর্ষে পাকিস্তানী বাহিনী পর্যুদস্ত হলে পলায়নকালে কামানটি ফেলে যেতে বাধ্য হয়। (সৌজন্যে: ৮ ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্ট)
- ১০৫/৫৪ সিএম ক্রুপ গান। ১৯৩৭ সালে জার্মানিতে তৈরি কামান। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে এই অস্ত্রটি ব্যবহৃত হয়েছিল।
আরও কিছু অস্ত্রসম্ভার
- ১৪.৫ মিমি কোয়াড বিমানবিধ্বংসী কামান। চীনের তৈরি এই বিমান বিধ্বংসী কামান গোলন্দাজ বাহিনী কর্তৃক ব্যবহৃত হয়। এর কার্যকরী দূরত্ব ২০০০ মিটার।
- এসপি আর্টিলারি ২৫, পাউন্ডার সেক্সটন এম-৫, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের তৈরি।
- ৩৭ মিমি কামানসহ ট্যাংক, হালকা স্টুয়ার্ড মার্ক-৪
- এ ছাড়া আর এ এম জিপিও সেক্সটন, ট্যাংক এ আর ভি মার্ক-টু, শেরমান এম-৩২ বি-১, মোটর গ্যারেজ ৪০ মি. মি. সাপোর্ট ক্রুইন এম ১৯ এ১, ১৭ পাউন্ডার ট্যাংকবিধ্বংসী গান, ২৫ পাউন্ডার গান, এসপি আর্টিলারি ২৫ পাউন্ডার সেক্সটন এম-৫ এবং ৩৭ মিমি কামানসহ ট্যাংক হালকা স্টুয়ার্ড মার্ক-৪ উল্লেখযোগ্য। এ ছাড়া রয়েছে মুক্তিযুদ্ধে ব্যবহৃত জাপানের অনুদানকৃত মোটর লঞ্জ ‘এম এল সূর্যোদয়’। এ ছাড়া জাদুঘরের সামনে মাঠে ২৬টি বিভিন্ন মডেলের ট্যাংকসহ বিভিন্ন ধরনের সাঁজোয়া যান দেখা যাবে।
মুক্তিযুদ্ধে ব্যবহৃত সেই গাড়িগুলো
১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধের সময় যে গাড়িগুলো ব্যস্ত সময় কাটাত এখন সে গাড়িগুলো জাদুঘরের লোহার মোটা শিকলের ভেতরে নিশ্চুপ হয়ে আছে। যুদ্ধে বিশেষ ভূমিকা রাখা ওই গাড়িগুলোর পেছনে লুকিয়ে আছে নানা অজানা কাহিনি। ১০৬ মিমি রিকয়েললেস রাইডেলসহ জিপ জি উইলিস। রিকয়েললেস রাইফেল ট্যাংকবিধ্বংসী অস্ত্র হিসেবে ব্যবহৃত হয়। এর গোলা একটি ট্যাংকের লোহার পাতের ভেতর ১৬.২০ ইঞ্চি পর্যন্ত ভেদ করতে পারে। জিপটি দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধোত্তর কালে যুক্তরাষ্ট্রে তৈরি। ১৯৭১ সালের স্বাধীনতাযুদ্ধের পর এই জিপটি পাকিস্তান সেনাবাহিনীর কাছ থেকে উদ্ধার করা হয় এবং ১৯৮৫ সাল পর্যন্ত বাংলাদেশ সেনাবাহিনী কর্তৃক ব্যবহৃত হয়। ১৭৯৯ সালে যুক্তরাজ্যে তৈরি এই কামানটি ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি কর্তৃক ভারতবর্ষে ব্যবহৃত হয়েছিল। (সৌজন্যে: রংপুর সেনানিবাস)।
ট্রাক ১/৪ টন x ৪ x ৪ কাইজার উইলিজ জিপ ওয়াগনার: মুক্তিযুদ্ধের সর্বাধিনায়ক জেনারেল এম এ জি ওসমানী যুদ্ধের সময় একটি জিপ গাড়ি ব্যবহার করতেন। ৪ xx ৪ এবং ১/৪ টনের এই গাড়ির নাম ‘কাইজার উইলিজ জিপ ওয়াগনার’। যশোর ব-১৪৬ নম্বরের নিল রঙের এই বিশাল জিপ গাড়িটি নিয়ে যুদ্ধ সময়ে বিভিন্ন এলাকা পরিদর্শন করতেন। শুধু পরিদর্শনের কাজেই নয়, যুদ্ধ ব্যবহƒত অনেক কিছুই তিনি এই গাড়িটিতে বহন করতেন। দেখলেই বোঝা যায় এই গাড়িতে পাঁচ-ছয়জন অনায়াসে চড়া যেত। যশোর শিক্ষা বোর্ডের সৌজন্য পাওয়া এই গাড়িটি এখন রয়েছে বাংলাদেশ সামরিক জাদুঘরে।
স্টাফ কার মার্সিডিজ বেঞ্জ ৪ সিলিন্ডার, ২০০০ সিসি। বাংলাদেশ সামরিক জাদুঘরে জেনারেল এম এ জি ওসমানীর গাড়ির পাশে কালো রঙের একটি মার্সিডিজ রয়েছে। দেখতে চমৎকার এই গাড়িটি পশ্চিম জার্মানির তৈরি। গাড়িটি ব্যবহার করতেন পাকিস্থান সেনাবাহিনীর ১৪ ডিভিশনের জিওসি। ১৯৭১ সালের স্বাধীনতাযুদ্ধের পর পাকিস্তান সেনাবাহিনীর কাছ থেকে উদ্ধার করা হয় এই গাড়িটি। পরবর্তী সময়ে সেনাবাহিনীর সেই সময়ের সেনাপ্রধান লে. জেনারেল জিয়াউর রহমান, বীর উত্তম, পিএসসি এটি ব্যবহার করতেন। ৪ সিলিন্ডার ২০০০ সিসি গাড়িটি ‘স্টাফ কার মার্সিডিজ বেঞ্জ’। আর নম্বর ০০০০০৫।
লাল জিপ গাড়িটি হবিগঞ্জের তৎকালীন এসডিও বা মহকুমা প্রশাসকের ছিল। ১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধ শুরু হওয়ার সময় হবিগঞ্জের এসডিওর দায়িত্বে ছিলেন আকবর আলি খান (যিনি তত্ত্বাবধায়ক সরকারের উপদেষ্টা ছিলেন)। জনাব খান মুক্তিযুদ্ধের শুরুতেই স্থানীয় নেতৃবৃন্দের হাতে ট্রেজারির চাবি তুলে দিয়েছিলেন। সেখান থেকে মুক্তিযোদ্ধারা পেয়ে যান বেশ কিছু অস্ত্র। সেই সঙ্গে এই জিপ গাড়িটিও মুক্তিযোদ্ধারা ব্যবহার শুরু করেন। এই গাড়ি দিয়ে মুক্তিযোদ্ধাদের বিভিন্ন জায়গায় আনা-নেওয়াসহ তাঁদের খাদ্য, অস্ত্র পরিবহনের কাজে ব্যবহƒত হতো।
আরেকটি গাড়ির কথা না বললেই নয়, যেই গাড়িতে ১৯৭১ সালে বহন করা হতো মর্টার ও মেশিন গান হিসেবে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের তৈরি এই গাড়িটি মুক্তিযুদ্ধের যুদ্ধ ক্ষেত্রে মর্টার ও মেশিনগান বহন করার জন্য ব্যবহƒত হতো। ১৯৭১ সালের স্বাধীনতাযুদ্ধের পর বাংলাদেশ বাহিনী কর্তৃক পাকিস্তানিদের কাছ থেকে উদ্ধার করা হয় এই গাড়িটি।
রিকয়েললেস রাইফেল (আরআর) ট্যাংকবিধ্বংসী অস্ত্র হিসেবে ব্যবহƒত হতো। এর গোলা একটি ট্যাংকের লৌহপাতের ভেতর ১৬.২০ ইঞ্চি পর্যন্ত প্রবেশ করতে পারে। জিপটি দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের তৈরি। ১৯৭১ সালের স্বাধীনতাযুদ্ধের পর এই আরআর জিপটি পাকিস্তান সেনাবাহিনীর কাছ থেকে উদ্ধার করা হয় এবং ১৯৮৫ সালে পর্যন্ত বাংলাদেশ সেনাবাহিনী ব্যবহার করত। এই গাড়িটি ১০৬ মিমি রিকয়েললেস রাইফেল, জিপ জি এস ইউলিস ৪ x ৪ মডেল এম ৩৮ এ-১ এবং আর আর ক্যালিবার ১০৬ মিমি এবং সর্বোচ্চ দূরত্ব ২০০০ মিটার।
ট্রাক ৬ x ৪ ডায়মন্ড টি মডেল ৯৮১: মার্কিন যুদ্ধরাষ্ট্রের তৈরি ট্রাক ৬ x ৪ ডায়মন্ড টি মডেল ৯৮১ গাড়িটি দ্রব্যসামগ্রী ও সৈনিক বোঝাই একটি ট্রেইলার টানার কাছে অন্যতম একটি যান। এই গাড়িটি ১৯১৭ সালের স্বাধীনতাযুদ্ধের পর পাকিস্তান সেনাবাহিনীর কাছ থেকে উদ্ধার করা হয়। গাড়িটি নম্বর ১৮৬৯৯০।
ট্রাক কারগো ৬ x ৬ শপ ভ্যান মডেল এম ১০৯ এই গাড়িটি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের তৈরি। যুদ্ধক্ষেত্রে যানবাহন, অস্ত্র, বেতার সামগ্রী ইত্যাদি মেরামত করা সব যন্ত্রপাতি এই গাড়িটির ভেতরে সংযুক্ত থাকত। ১৯৭১ সালের স্বাধীনতা যুদ্ধের পর পাকিস্তান সেনাবাহিনীর কাছ থেকে উদ্ধার করা হয় এটি এবং ১৯৮৫ সাল পর্যন্ত বাংলাদেশ সেনাবাহিনীতে গাড়িটি ব্যবহার হয়। গাড়িটির নম্বর ০৭২০১২।
ট্র্যাংক পিটি ৭৬ রাশিয়ার তৈরি। এই ট্যাংকটি পানিতেও ভেসে চলতে পারে। ১৯৭১ সালের স্বাধীনতাযুদ্ধের সময় ব্রাহ্মণবাড়িয়া থেকে বাংলাদেশ সেনাবাহিনী পাকিস্তান বাহিনীর কাছ থেকে এই যানটি উদ্ধার করে।
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পরে যুক্তরাষ্ট্র জিপ অ্যাম্বুলেন্স ৪ x ৪ ও সি জে-৪ মডেলের এই জিপটি তৈরি করে। যুদ্ধক্ষেত্র থেকে আহত সৈনিকদের নিরাপদ স্থানে নিয়ে যাওয়ার কাজেই মূলত এই গাড়ি ব্যবহার হতো। ১৯৭১ সালে স্বাধীনতাযুদ্ধের পর এই গাড়িটি পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর কাছ থেকে উদ্ধার করা হয় এবং ১৯৮৪ সাল পর্যন্ত বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর বিভিন্ন ইউনিটে ব্যবহার হতো।
মিডিয়াম উদ্ধার যান ৬ x ৬ মডেল এম ৫৪৩। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের তৈরি শক্তিশালী এই গাড়িটি যুদ্ধক্ষেত্র থেকে ৫.০৮ মেট্রিক টন ওজনের যেকোনো গাড়ি উদ্ধার করতে সক্ষম। এই গাড়িটি ১৯৭১ সালে স্বাধীনতাযুদ্ধের পর পাকিস্তান সেনাবাহিনীর কাছ থেকে উদ্ধার করা হয় এবং ১৯৮৬ সাল পর্যন্ত বাংলাদেশ সেনাবাহিনীতে এটি ব্যবহার করত।
সামরিক জাদুঘরে প্রবেশ তথ্য
মুক্তিযুদ্ধে সশস্ত্র বাহিনীর গৌরবোজ্জ্বল ইতিহাস জানতে সামরিক জাদুঘরে প্রতিদিনই ভিড় করছে উল্লেখযোগ্যসংখ্যক দর্শনার্থী। বিশেষ করে বিজয় বা স্বাধীনতা দিবসে থাকে মানুষের উপচে পড়া ভিড়। সবার জন্য উন্মুক্ত এই জাদুঘরটিতে প্রবেশে লাগে না কোনো প্রবেশমূল্য। সপ্তাহের বুধবার ছাড়া শনিবার থেকে বৃহস্পতিবার সকাল ১০টা থেকে সন্ধ্যা ৬টা এবং শুক্রবার বেলা ৩টা থেকে সন্ধ্যা ৬টা পর্যন্ত এই জাদুঘরটি উন্মুক্ত থাকে। তবে ১৬ ডিসেম্বর এবং ২৬ মার্চ ছাড়া অন্যান্য সরকারি ছুটির দিনে বন্ধ থাকে সামরিক এ জাদুঘরটি।
প্রকাশকাল: বন্ধন, ৮৩তম সংখ্যা, মার্চ ২০১৭।