যেকোনো স্থাপনার মৌলিক অংশ দেয়াল। চার দেয়ালের মিলনেই তৈরি হয় ঘর। ঘর শুধু আশ্রয়ই নয়, মানসিক প্রশান্তির নীড়। সেই ঘরকে নান্দনিক সাজে সাজিয়ে তোলে দেয়ালচিত্র। আদিম কাল থেকে আজ অবধি মানুষ তার শৈল্পিক মনের বহিঃপ্রকাশ ঘটিয়েছে দেয়ালচিত্রের মাধ্যমেই। বিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে আবিষ্কৃৃত হয়েছে ক্যামেরা ও ছবির ক্যানভাস। প্রকৃতি ও জীবনের নানা অভিব্যক্তি স্থির হয় আলোকচিত্রে আর রং-তুলির স্পর্শের মায়া জড়িয়ে থাকে ক্যানভাসের চিত্রকর্মে। এসব আলোকচিত্র বা চিত্রকর্ম সাদামাটা দেয়ালের সৌন্দর্য বাড়িয়ে দেয় বহুগুণ। তাই শুধু আবাসনেই নয়, অফিসের দেয়ালেও টাঙানো হচ্ছে নানা ধরনের ছবির ফ্রেম।
আটপৌরে জীবনের খোলস ছাড়িয়ে ক্রমেই ব্যক্তিত্ব, রুচিবোধ ও পছন্দের পরিচায়ক হিসেবে জীবনযাপনের অনুষঙ্গ হয়ে দাঁড়িয়েছে ফ্রেমে বাঁধানো এসব ছবি। তবে স্থাপনাভেদে ছবির বাছাইয়ের ধরন কিন্তু এক নয়। যদি আবাসিক স্থাপনার দেয়াল সাজাতে হয়, সেখানে ঘরের সংখ্যা নির্ধারণ করতে হবে প্রথমেই। সব ফ্ল্যাটে একই সংখ্যার ঘর থাকে না। তবে সব আবাসিক স্থাপনাতেই ড্রয়িং, ডাইনিং, কিচেন, বেডরুম থাকে। এর সঙ্গে গেস্টরুম, স্টাডিরুম, কিডসরুম ফ্ল্যাটের পরিধি বাড়িয়ে দেয়। যেকোনো ঘরের যেকোনো একটি দেয়াল বেছে নিতে হবে সাজানোর জন্য। দেয়ালের গঠন, দর্শকের দৃষ্টিসীমার দূরত্ব হিসাব করে ছবি টাঙানোর জায়গাটি নির্বাচন করতে হবে। খুব উঁচু কিংবা খুব নিচু থাকলে দর্শক অস্বস্তিতে পড়বে। সে জন্য মাঝামাঝি জায়গায় ছবি টানানোই ভালো।
দেয়ালের রং, ফার্নিচারের রং, পর্দা, কুশনসহ ঘরের সব আসবাবের সঙ্গে মিলিয়ে ছবি টাঙানোর পালা। ঘরটি যদি অভিজাত্যপূর্ণ হয় তাহলে ক্যানভাসে আঁকা নামী শিল্পীর চিত্রকর্ম বেশ মানাবে। যদি প্রাচীন ধাঁচের হয় এন্টিক কিংবা কারুকাজময় কাঠের ফ্রেমে স্মৃতিময় কোনো আলোকচিত্র রাখা যায়। তবে রুমভেদে ছবির ধরন নির্বাচন করা ভালো। অর্থাৎ ছবি, ছবির ফ্রেম এবং পরিবেশ লক্ষ রাখতে হবে। শুরুতেই সিঁড়ির রেলিং ছুঁয়ে অন্দরে প্রবেশ অবধি পার্শ্ববর্তী দেয়ালটি সাজানো যায় প্রকৃতির একাধিক ছবি গ্যালারি দিয়ে। আকারের জলরং বা তেলরঙের একটি ক্যানভাসই যথেষ্ট। আর অনেকগুলো রাখতে চাইলে কয়েকটি ছবি আলাদা আলাদা ফ্রেমে গ্যালারির মতো সাজানো যায়। সেক্ষেত্রে জ্যামিতিক নানা ফর্মে সাজানোই আদর্শ পন্থা। তারপর অন্দরের অন্তরে প্রবেশ। ড্রয়িংরুমই প্রথমে চোখে পড়বে। অতিথি এ ঘরের সাজসজ্জা থেকেই পুরো অন্দরের ধারণা পাবে। সেখানে গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তি কিংবা পূর্বপুরুষের কোনো পোর্ট্রেট থাকতে পারে। প্রয়াত মানুষটির উপস্থিতি অনুভূত হবে। এ ছাড়া বিশেষ অর্জন বা পুরস্কারের আলোকচিত্র রাখা যায় আর ফ্রেমটি হবে কারুকাজহীন ক্লিয়ার কালার বা উডেন কালারের। পুরোনো ছবি বেশির ভাগই সাদা-কালো থাকে, সে অনুযায়ী ফ্রেমটি হবে বার্ন কালারের।
আতিথেয়তা প্রকাশের অন্যতম মাধ্যম ডাইনিং রুম। সে রুমটিতে তাজা ফলের আলোকচিত্র কিংবা ক্যানভাসে আঁকা চিত্রকর্ম রাখা যায়। ফ্রেম সবুজ বা হলুদ রঙের হলে স্নিগ্ধতা প্রকাশ পাবে। অনেক নিকটাত্মীয় বেডরুমেও যেতে পারে। তাই বেডরুমের দেয়ালটিতেও চাই সৃজনশীল মনের প্রকাশ। হানিমুনে ঘুরতে যাওয়া কোনো ছবি কিংবা সন্তানের প্রথম দিনের ছবি রাখা যায়। সেখানে জামদানি ফ্রেম কিংবা সোজা চোরি ফ্রেম বেশ মানাবে। স্টাডিরুমের দেয়ালে বিখ্যাত লেখক, বিজ্ঞানী, আবিষ্কারকের পোর্ট্রেট, প্রাচীন লাইব্রেরির দুর্লভ আলোকচিত্র কিংবা প্রিয় বইয়ের প্রচ্ছদের ফটোগ্রাফ থাকতে পারে। সবচেয়ে ভালো হয় কাঠের ফ্রেম দিয়ে সাজালে। ডার্ক কালারের ফ্রেম নির্বাচন করা যেতে পারে। অতিথিদের বিশ্রামের কক্ষ হিসেবেই পরিচিত গেস্ট রুম। এ কক্ষটির দেয়ালে ভিনদেশের দর্শনীয় স্থানের ফটোগ্রাফ বেশ মানাবে।
শিশুদের মনের রঙের সঙ্গে মিলিয়ে কিডস রুমের দেয়ালে উজ্জ্বল রঙের ছবি পূর্ণতা পাবে। স্কুলের প্রথম দিনের ছবি, বাবা-মায়ের সঙ্গে ভ্রমণের আনন্দঘন মুহূর্ত এবং প্রিয় কার্টুন চরিত্র তো থাকতেই পারে। সে ক্ষেত্রে কোলাজ ফ্রেম বেছে নেওয়াই উত্তম।
অফিস কিংবা প্রতিষ্ঠানের দেয়াল পারিবারিক দেয়াল থেকে বেশ আলাদা। সেখানে নানা ব্যক্তিত্বের ও রুচির সংমিশ্রণ থাকে। তাই ওই প্রতিষ্ঠানের গুরুত্বপূর্ণ কোনো দিনের ছবি এখানে প্রাধান্য পেতে পারে। অর্জন কিংবা প্রতিযোগীতার ছবি মানায়। ক্যানভাসে আঁকা ছবিতেও বেশ আভিজাত্য প্রকাশ পাবে।
নিউমার্কেটের ছবি বাঁধাইয়ের দোকান ‘চিত্রভূষণ’-এর স্বত্বাধিকারী হারুণ-অর-রশিদ জানান, দেয়ালের রং সাদা, নীল, গোলাপি হলে সব ধরনের ছবির সঙ্গে মানিয়ে যায়। যদি ফ্রেমে আভিজাত্য আনতে চান তবে নিজস্ব পছন্দের স্টাইল মেনে ছবি বাঁধাই করতে পারেন। বিভিন্ন রকম স্পট লাইট ব্যবহারেও ছবিতে ফোকাস করা যায়। ফ্রেমের ক্ষেত্রে কাঠের ফ্রেমকেই মূল্যবান মনে করেন। চায়না কিংবা এন্টিক কয়েক বছর পর নষ্ট হয়ে যাওয়ার আশঙ্কা থাকে।
মাপ ও প্রিন্টিং
ঘরের দেয়ালে ছবির জন্য মাপ অনুযায়ী স্টুডিও কিংবা ল্যাবে প্রিন্ট করা যায়। পছন্দের মাপ জানালেই হবে। সাধারণত ১০ A কিংবা ১০ L থেকে শুরু করে ৩০ x ৩৬ ইঞ্চি সাইজের ছবি তৈরি করে দেন। প্রিন্ট করতে ২০ থকে ২০০ টাকা পর্যন্ত খরচ হতে পারে। তবে ঘরে টানানোর জন্য ৬ ইঞ্চি x ৯ ইঞ্চি মাপের থেকে শুরু হয়। ৬ x ৯ ইঞ্চির দাম পড়বে ২৫ টাকা, ৮ x ১০ ইঞ্চির দাম ৮০ টাকা, ১২ x ১৮ ইঞ্চির দাম ১৫০ টাকা, ২০ x ৩০ ইঞ্চির দাম ৭০০ টাকা, ১৮ x ৩৬ ইঞ্চির দাম পড়বে ১ হাজার টাকা। তা ছাড়া প্রফেশনাল ছবি সম্পাদনাকারীকে (ফটো এডিটর) দিয়ে ছবিগুলো ভালোভাবে সম্পাদনা (এডিট) করে নেওয়া যেতে পারে।
আকারভেদে ছবি বাঁধাই ও দরদাম
ছবি বাঁধাই করার জন্য ম্যাট কাগজে প্রিন্ট করে নিলে ভালো। বাঁধাইয়ের পর আলোর প্রতিফলনে ছবির ভিজ্যুয়াল ইফেক্ট নষ্ট না হওয়ার সুবিধা থাকে। দাম হিসেবে চকচকে আর ম্যাট কাগজের দাম একই। সুন্দর এবং ভালোভাবে যাতে আটকে থাকে তাই ছবির সাইডে মাউন্টিং করা হয়। মাউন্ড বোর্ডের ব্যবহারের কারণ ছবির প্রধান দিকটি স্পষ্টভাবে প্রতিফলিত করা। এন্টিক বা কারুকাজময় কাজের ভিড়ে মূল ছবিটি নিজস্বতা বজায় রাখে। ছবি বাঁধাই সাধারণত বক্স, চায়না ও কোরিয়ান ফ্রেম এ তিন ধরনের হয়ে থাকে। এর মধ্যে কোরিয়ান ফ্রেমের বাঁধাই সবচেয়ে সুন্দর ও মূল্যবান। দাম পড়বে ১ হাজার থেকে ৫ হাজার টাকা পর্যন্ত। বক্স ফ্রেম ৮-১০ ইঞ্চির জন্য ৬০ টাকা এবং ১০-১২ ইঞ্চির জন্য ৭০ টাকা। চায়না ফ্রেম বাঁধাতে ১৩০ থেকে ৩০০ টাকা। এ ছাড়া রয়েছে পলিস্টোন, রাউন্ড ফ্রেম, উল্টা চোরি, সোজা চোরি, প্রজাপতি ফ্রেম, সনদ ফ্রেম, প্যাঁচানো ফ্রেম ইত্যাদি। এ ফ্রেমগুলোর জন্য রানিং ফিট ১২ ইঞ্চিতে ১৫০ থেকে ৬৫০ টাকা হবে। কাঠ, কার্ডবোর্ড, আয়রন স্টিল, টেরাকোটা অথবা হ্যান্ড মেইড অনেক ধরনের উপকরণেই হতে পারে। দাম ৫০ থেকে ৫ হাজার টাকাও হয়ে থাকে।
যেখানে পাবেন
নিউমার্কেটের চিত্রভূষণ, এলিফ্যান্ট রোডের ছবিঘর, মোহাম্মদপুরের হাসান অ্যাড, মালিবাগে গোল্ডেন মিরর, চন্দ্রিমা মার্কেট, মৌচাক মার্কেট ছাড়াও দেশের বিভিন্ন গিফট শপে ছবি পাওয়া যায়। হ্যান্ডমেড ফ্রেম পাওয়া যাবে যাত্রা, আইডিয়াস, সোর্স কিংবা আড়ংয়ে। রেডিমেট ক্যানভাস পাওয়া যায় নিউমার্কেটের চিত্রভূষণ, মর্ডান প্রভৃতিতে। ক্যানভাসে আকা চিত্রকর্মগুলো দৃক, বেঙ্গল, চিত্রক, জয়নুল গ্যালারির প্রদর্শনীতে জলরং, তেলরং, অ্যাক্রেলিক কিংবা মিশ্র মাধ্যমের ছবিগুলো পেতে পারেন। সে ক্ষেত্রে দাম ৫ হাজার থেকে ৫০ হাজার টাকা বা ততোধিক হতে পারে। তবে বিখ্যাত কোনো শিল্পীর হাতে আঁকা ছবির দাম বেশিই পড়বে।
যত্নআত্তি
নিয়মিত ছবি এবং ফ্রেমের যত্ন নেওয়া প্রয়োজন। ফ্রেমের ভেতর পিঁপড়া, টিকটিকি কিংবা মাকড়সা বাসা বাঁধতে পারে। তাই মাসে অন্তত একবার মুছতে হবে। কখানো নোনার কারণে দেয়ালের রং ও ফ্রেমের রং এমনকি ছবিও নষ্ট হতে পারে। এমন নোনা ধরা দেয়ালে ছবি না লাগানোই ভালো। যদি খুব ইচ্ছে হয় নতুন করে রং করে লাগানো উচিত। ছবির অবশ্যই ব্যাকআপ থাকা দরকার। কোনো কারণে ফাঙ্গাসের আক্রমণে ছবি নষ্ট হয়ে গেলেও ছবিটি যেন নতুনভাবে ফিরতে পারে।
প্রকাশকাল: বন্ধন, ৭৮তম সংখ্যা, অক্টোবর ২০১৬।