কোলাহলময় শহুরে এ জীবনে আপন অন্দরটিই হয়ে ওঠে একান্ত নিজের মতো করে সময় কাটানোর প্রিয় পরিসর। টিভি দেখা, বই পড়া, হালকা নাশতা বা প্রিয়জনদের সঙ্গে আড্ডায় মেতে উঠতে প্রয়োজন ভিন্ন ভিন্ন পরিসর আর বসার আয়োজনের। ঘরের বারান্দায় বৃষ্টি, আলতো রোদ উপভোগ করতে একটি বেতের মোড়া, প্রিয় শিল্পীর গান উপভোগ অথবা বইয়ের জগতে হারিয়ে যেতে একটি রকিং চেয়ার, লিভিং রুমে কাঁথা, কুশন বা শতরঞ্জি পেতে প্রিয়জনদের সঙ্গে আড্ডায় মাতা, ছাদে পাটি বা শতরঞ্জি পেড়ে পরিবারের সদস্যদের নিয়ে জ্যোৎস্না উপভোগ কিংবা বারান্দার এক চিলতে জায়গায় ছোট দোলনা ঝুলিয়ে তাতে দোল খাওয়ার মতো ছোট ছোট বিষয় আপনার মুহূর্তগুলোকে করে তুলবে অত্যন্ত আনন্দময়। আর এসব মুহূর্তকে বর্ণিল করে তুলতে চাই নান্দনিক, বৈচিত্র্যময় ও আরামদায়ক বসার সাজ-সরঞ্জাম।
বারান্দা হোক ছোট কিংবা বড় বসার ব্যবস্থা হওয়া চাই মানানসই। গল্প, আড্ডা বা নিজের একান্ত সময় কাটাতে অন্দরের অন্যতম পরিসর বারান্দা। বারান্দা বড় হলে রাখতে পারেন ডিভান, রড আয়রন, বেত বা বাঁশের সোফা। বারান্দায় রাখা সোফা বা ডিভানে করে নিন অ্যানামেল পেইন্ট। এতে পানিতে ভিজে নষ্ট হওয়ার ভয় থাকে না। তবে এমন স্থানে আসবাবগুলো রাখুন, যেখানে বৃষ্টি পড়ার আশঙ্কা কম। বারান্দা ছোট হলে কম উচ্চতার ডিভান, ছোট ছোট বেত বা বাঁশের মোড়া, গদি ও টুল দিয়ে বসার ব্যবস্থা করতে পারেন। অবসরে বই পড়ার জন্য একটা রকিং চেয়ারও রাখতে পারেন। বারান্দায় ময়লা হওয়ার আশঙ্কা খুব বেশি, তাই ছিমছাম ডিজাইনের ফার্নিচার বেছে নিন। সোফার কভার নিন গাঢ় একরঙা। তবে কুশনগুলো কালারফুল হলেই ভালো। সোফা ও কুশন কভারে একটু সিনথেটিক কাপড় দিন। এতে বেশি ধুলেও কভার নষ্ট হবে না। এ ছাড়া বেত বা প্লাস্টিকের চেয়ার বা মোড়া রাখতে পারেন। এতে ময়লার আশঙ্কা কম থাকে।
চিরচেনা আসবাবের বদলেও শুধু মেঝেতেই করা যেতে পারে বসার সুন্দর ব্যবস্থা। সে ক্ষেত্রে সোফার বদলে মেঝেতে ফোম বসিয়ে বা শীতল পাটি, মাদুর, শতরঞ্জি পেতে এর ওপর বিভিন্ন আকৃতির রঙিন ও বড় আকৃতির কুশন দিয়েও বসার আয়োজন করা যেতে পারে। এর জন্য লম্বা আকৃতির একটা ফোম বসিয়ে তার ওপর নকশা করা একটা রঙিন চাদর বিছিয়ে ওপরে কিছু রংবেরঙের কুশন ছড়িয়ে দিতে হবে। আর তার সামনেই পেতে দিতে হবে একটা রঙিন শতরঞ্জি। এ শতরঞ্জির ওপর থাকবে খুব ফ্ল্যাট আকৃতির কাঠের টেবিল বা পিঁড়ি।
বসার মোড়ার ব্যবহার দিন দিন বাড়ছে। বাজারে বেত ও বাঁশের তৈরি মোড়া যেমন আছে, তেমনি পাবেন চেয়ার, গদি, বা সোফা রয়েছে তেমনি রয়েছে, নাইলন, স্টেইনলেস স্টিল ও প্লাস্টিকের মতো কৃত্রিম উপকরণে তৈরি মোড়া বা বসার বিভিন্ন সামগ্রী।
বেতের আসবাব
নান্দনিক ডিজাইন ও দীর্ঘস্থায়িত্বের কারণে বেতের মোড়া, সোফা বা গদি বেশ জনপ্রিয়। এর বসার জায়গায় থাকে পুরু গদি। মোড়া বা সোফার মূল নকশা থাকে নিচের দিকে। বেতের মোড়ার ডিজাইনে আছে পেঁচানো সিঁড়ি, জিগজ্যাগ, ফুল-পাতা, বেড়া, ক্রস নকশা ইত্যাদি। আরও আছে ব্যতিক্রমী ডিজাইন, যা দেখতে অনেকটা কদমার মতো। আকারও অন্য মোড়ার চেয়ে একটু বড়। স্টিম করা বেত ঘুণ পোকায় ধরে না বলে এ মোড়া বা সোফা বেশ টেকসই।
বাঁশের আসবাব
বাজারে বাঁশের তৈরি মোড়া, সোফা বা বসার বিভিন্ন সামগ্রী পাওয়া যাচ্ছে। বাঁশের চিকন ফালি কেটে সর্পিলাকারে সাজিয়ে তৈরি করা মোড়া বেশ দৃষ্টিনন্দন। এটা দেখতে অনেকটা ডুগডুগির মতো। এর বসার জায়গা বেতি দিয়ে তৈরি।
বেতি
বেতি দিয়ে তৈরি মোড়া বা বসারসামগ্রীর ডিজাইনে রযেছে অনেক বৈচিত্র্য। নানা নকশা ফুটিয়ে তোলা হচ্ছে শুধু চিকন বেতি, মোটা বেতি ব্যবহার করে। ছোট, বড় ও মাঝারি তিন আকারে পাওয়া যায়। এসব মোড়া বা সোফার পাশে হাতল থাকে, যা দিয়ে সহজেই বহন করা যায়। আর বেতির মসৃণতার কারণে পরিষ্কার করাও সহজ। প্লাস্টিকের তৈরি এসব বেতি সহজে ছিঁড়ে না, তাই টেকেও দীর্ঘদিন।
নাইলন
নাইলনের মোড়া বা সোফা বা গদি পুরোটা নাইলনের নয়। এর ওপরটা নাইলনের এবং নিচের দিকটা চ্যাপ্টা বেতির। ইচ্ছা করলে ওপরে গদি ব্যবহার করা যায়। নকশা বলতে নাইলন ও বেতির কৌশলী বুনন। সাধারণত ছোট ও মাঝারি আকারে এ ধরনের মোড়া বা সোফা পাওয়া যায়।
স্টেইনলেস স্টিল
স্টিলের মোড়া বা সোফা চারকোনা ও গোলাকার এ দুই আকারের পাওয়া যায়। নকশাবিহীন এসব মোড়াও দেখতে বেশ সুন্দর।
প্লাস্টিক টুল
এছাড়া বাজারে আছে প্লাস্টিকের বিভিন্ন টুল, চেয়ার বা সোফা। ছোট, মাঝারি ও বড় এ তিন আকারের টুলই পাবেন। এসব টুল বেশ হালকা। নকশার খুব একটা বৈচিত্র্য না থাকলেও রঙের বাহার আছে। ফেন্সি টুল, ম্যাজিক টুল, ম্যাগি টুল, পাওয়ার টুল ইত্যাদি নামে এসব টুল পাবেন বাহারি রঙে।
শীতল পাটি বা মাদুর
গ্রীষ্মের তীব্র গরমে কদর বাড়ে শীতল পাটির। গ্রামের পাশাপাশি এটির কদর এখন শহুরে জীবনকেও ছুঁয়ে গেছে। বাহারি রং দিয়ে পাটিতে গাছপালা, লতাপাতা, পশুপাখি, মসজিদ, মিনারসহ বিভিন্ন নকশার ও ভিন্ন ভিন্ন সাইজের পাটি দিয়ে সহজেই বারান্দায় বসার ব্যবস্থা বেশ দৃষ্টিনন্দন। বাহারি রং দিয়ে পাটিতে গাছপালা, লতাপাতা, পশুপাখি, মসজিদ, মিনারসহ বিভিন্ন নকশার ও ভিন্ন ভিন্ন সাইজের পাটি বিক্রি করছেন তাঁরা। এই শীতল পাটিরও রয়েছে নানা নাম আর জাত। এর মধ্যে ‘পয়সা’, ‘সিকি’, ‘শাপলা’, ‘সোনামুড়ি’, ‘টিক্কা’ নামের পাটির ব্যবহার গ্রামের গৃহস্থ পরিবারে বেশি।
কোথায় পাবেন, কেমন দাম
ব্যাপক চাহিদা থাকায় রাজধানীর বিভিন্ন মার্কেটে বিক্রি হচ্ছে শীতল পাটি ও মাদুর। নিউমার্কেট, ফার্মগেট, এলিফ্যান্ট রোড, আজিমপুরের ফুটপাতসহ বিভিন্ন কুটির শিল্প ও দেশীয় ফ্যাশন হাউসগুলোতে শীতল পাটির পসরা সাজিয়ে বসেছেন বিক্রেতারা। সাধারণ একটি পাটি সাইজভেদে ৩০০ থেকে ২ হাজার টাকায় বিক্রি হয়। কিন্তু শীতল পাটি সাইজভেদে ৯০০ থেকে ৬ হাজার টাকায় বিক্রি করছেন পাটি বিক্রেতারা। এ ছাড়া অভিজাত পাটি হিসেবে ‘লালগালিচা’, ‘আধুলি’, ‘মিহি’ চাহিদা অনুযায়ী তৈরি করা হয়। বিক্রি হয় ৩০০ থেকে ৬ হাজার টাকায়।
রাজধানীর পান্থপথ, গ্রিন রোড, মোহাম্মদপুর টাউন হল, উত্তর যাত্রাবাড়ী, উত্তরা ও গুলশান মার্কেটে বাঁশ ও বেতের তৈরি ফার্নিচারের দোকান রয়েছে। আসবাবপত্রের ভিন্নতার ওপর নির্ভর করে এর দরদাম। ঢাকার নিউমার্কেট, ফার্মগেট, পান্থপথ ও মিরপুরের মার্কেটগুলোতে এসব মোড়া ও টুল পাবেন। বেতের ছোট আকারের মোড়া একেকটি ৪০০ থেকে ৫৫০ টাকা। বড়টা ৫৫০ থেকে ৭০০ টাকা। কদমা আকৃতির মোড়া ৮০০ থেকে ৯৫০ টাকা। বাঁশের মোড়া সব সাইজের পাওয়া যাবে ২০০ থেকে ৫৫০ টাকার মধ্যে। বিভিন্ন সাইজের বেতির মোড়া মিলবে ১৫০ থেকে ৬০০ টাকায়। গদি ছাড়া শুধু নাইলনের ছোট মোড়ার দাম ১৮০ থেকে ৪০০ টাকা। স্টেইনলেস স্টিলের মোড়া ৫০০ থেকে ৮০০ টাকা। বিভিন্ন আকারে প্লাস্টিকের টুল পাবেন ১৫০ থেকে ৭৫০ টাকার মধ্যে। চেয়ার-টেবিলের সেট ১৪ হাজার থেকে ৩৫ হাজার টাকা। সোফা সেটের দাম ১৩ হাজার থেকে ৭০ হাজার টাকা। বাচ্চাদের দোলনা ৩ হাজার ৫০০ থেকে ৫ হাজার টাকা। মোড়া ৮০০ থেকে আড়াই হাজার টাকা। খাট এবং ডিভান ৬ হাজার ৫০০ থেকে ২২ হাজার টাকা। ঝুড়ি কিনতে গুনতে হবে ১ হাজার ৩০০ থেকে আড়াই হাজার টাকা।
সারা দেশেই রয়েছে প্রাণ-আরএফএল, অটবি, হাতিল ইত্যাদি আসবাবের শোরুম। এ ছাড়া রাজধানীতে কাজীপাড়া, শেওড়াপাড়া, পান্থপথ, গ্রিন রোড, নিউমার্কেট, মিরপুর, মতিঝিল, উত্তরাসহ বিভিন্ন প্লাস্টিক বা কাঠের আসবাবের দোকান রয়েছে। বাজার ঘুরে দেখা গেল বিভিন্ন ব্র্যান্ডের ছাড়াও সাধারণ চেয়ার-টেবিল নানা দামে পাওয়া যাচ্ছে। সাধারণ প্লাস্টিকের চেয়ার কিনতে পারবেন ৩০০ থেকে ৫০০ টাকায়। প্লাস্টিকের হাতলযুক্ত চেয়ার পাবেন ৪০০ থেকে ৬৫০ টাকার মধ্যে। প্লাস্টিক টুল কেনা যাবে ৩০০ টাকার মধ্যে। পিঁড়ি পাবেন ২০০ টাকার মধ্যে। মোড়া কিনতে পারবেন ১২০ থেকে ৩০০ টাকায়, বেতের চেয়ার ৫০০ টাকার মধ্যে, টি-টেবিল ৭০০ থেকে ১২০০ টাকা, টেবিল ২৫০০ টাকার মধ্যে। ভাঁজ করা যায় এমন স্টিলের সঙ্গে ফোম দেওয়া চেয়ার পাবেন ৮০০ টাকার মধ্যে। হালকা কাঠের বা মেলামাইন বোর্ডের চেয়ার পাবেন ৫০০ টাকায়।
সোফার ফোম ও কুশনগুলো বিক্রি করা হয় মূলত সেট হিসেবে। বিভিন্ন ব্র্যান্ডের ফোমের মধ্যে কারমো, অ্যাপেক্স, সোয়ান, আখতার ইত্যাদির চাহিদা বেশি, মানও ভালো। ১০টি বা ১৩টি ফোম অথবা ৫ সিটের সোফার সেট হিসেবে ফোম ও কুশন সেটগুলোর দাম নির্ধারণ করা হয়। এর সঙ্গে থাকে সোফার রুমাল বা ম্যাট, ছোট টেবিলের কভার ও কুশন কভার। তবে চাইলে এর কম বা বেশিও কেনা যায়। কারমো ফোমের এক সেট ফোমের দাম পড়বে ৩ হাজার ৫০০ থেকে ৫ হাজার ৫০০ টাকা। অ্যাপেক্স ফোমের দাম ৩ হাজার থেকে ৫ হাজার টাকা। আখতার ফোমের সেট পাওয়া যাবে ২ হাজার ৮০০ থেকে ৪ হাজার ৮০০ টাকায়। কভার সেটের দাম পড়বে ২ হাজার থেকে ১২ হাজার টাকা।
প্রকাশকাল: বন্ধন, ৮৯তম সংখ্যা, সেপ্টেম্বর ২০১৭।