আবাসনসংকট এখনকার বাস্তবতায় বৈশ্বিক সমস্যা। তৃতীয় বিশ্বের দেশগুলোর বিপুলসংখ্যক জনগোষ্ঠী, বিশেষত গ্রাম ও শহরের বস্তিতে বসবাসরত জনগোষ্ঠীর বিশাল এক অংশ ভুগছে আবাসন সংকটে। নিজ দেশ থেকে বিতাড়িত হয়ে সহায়-সম্পদহীন জনগোষ্ঠী বিশ্বের বিভিন্ন দেশে শরণার্থী হিসেবে আশ্রয় নিতে বাধ্য হচ্ছে। মানবিক কারণে সাময়িকভাবে হলেও এদের আশ্রয়দানের বিষয়টি সংশ্লিষ্ট দেশের জন্য হয়ে দাডাঁছে বিরাট চ্যালেঞ্জ। সম্প্রতি মিয়ানমার থেকে রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীর উচ্ছেদ ও বিতাড়নের ঘটনা ঘটেছে। অসহায় এসব শরণার্থীদের বাংলাদেশের মতো জনবহুল ও উন্নয়নে সংগ্রামরত দেশে চরম দুর্দশাগ্রস্ত ও বিত্তহীনভাবে বিপুল সংখ্যায় আগমন সরকার ও স্থানীয় জনগোষ্ঠীর জন্য বিপর্যয়কর পরিস্থিতির সৃষ্টি করেছে। এ পরিস্থিতিতে দেশি এবং আশ্রয়প্রার্থী রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীর জন্য সন্তোষজনক আবাসনের ব্যবস্থা করা অতীব জরুরি। অন্যথায় নানা ধরনের অনাকাক্সিক্ষত পরিস্থিতির উদ্ভব হতে পারে; দানা বাঁধতে পারে সামাজিক অসন্তোষ, যা ক্রমেই প্রকট হয়ে সরকার, দেশ ও জাতির জন্য বড় এক সমস্যায় রূপ নিতে পারে।
আবাসন মানুষের অন্যতম মৌলিক চাহিদা। বাংলাদেশসহ অনেক উন্নয়নশীল দেশ তাদের হতদরিদ্র জনগোষ্ঠীর জন্য মৌলিক এই প্রয়োজন মেটানোর ক্ষেত্রে একটি সম্ভাব্য সমাধান প্রক্রিয়ার অনুসন্ধানে রত। প্রচলিত গ্রাম্য বাড়িঘরের সঙ্গে সংগতিপূর্ণ, সহজে, কম খরচে ও কম সময়ে অধিক সংখ্যায় নির্মাণযোগ্য বাসগৃহ ডিজাইন ও নির্মাণ করতে পারলেই কেবল এই লক্ষ্য অর্জন সম্ভব। তবে এ ধরনের একটি সম্ভাবনাকে স্থায়ী সম্ভাবনা রূপে ভাবার কোনো অবকাশ নেই, কেননা এগুলো একক পরিবারের আবাস হিসেবে নির্মিত হওয়ায় এর অবস্থান হবে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে। ফলে বসবাসের জন্য প্রয়োজন হবে অনেক জায়গার সেইসাথে কৃষিকাজ, খোলা জায়গা ও বনাঞ্চলের ক্ষেত্রে জায়গা ক্রমেই কমে গিয়ে সামগ্রিক পরিবেশকে করে তুলবে বসবাসের অযোগ্য। সে কারণে বর্তমান ও ভবিষ্যতের দিকে দৃষ্টি রেখে আমাদের চিন্তা-ভাবনাকে যুক্তিযুক্ত করতে হবে। বর্তমানের প্রয়োজন মেটানোর জন্য আমরা দুই ধরনের উদ্যোগ নিতে পারি। যেমন-
- বন্যামুক্ত এলাকায় কম খরচে ও কম সময়ে নির্মাণ উপযোগী বাসগৃহের ডিজাইন উদ্ভাবন;
- বন্যা আক্রান্ত এলাকায় বন্যার সঙ্গে বসবাসের উপযোগী সাশ্রয়ী বাসগৃহের ডিজাইন উদ্ভাবন।
সেই সঙ্গে ভবিষ্যতের আলোকে আমরা স্বল্পবিত্তের জন্য ব্যয়সাশ্রয়ী সুষ্ঠু ও সুন্দর বহুতল ভবনের ডিজাইন ও নির্মাণকৌশল উদ্ভাবনে আমাদের চিন্তা-ভাবনাকে কাজে লাগাতে পারি। তবে এই পর্যায়ে আমাদের আলোচ্য বিষয় উল্লিখিত দুই ধরনের বাসগৃহের সহজ নির্মাণপদ্ধতি।
বন্যামুক্ত এলাকায় সাশ্রয়ী ও সহজে নির্মাণযোগ্য বাসগৃহের ডিজাইন
বন্যামুক্ত এলাকায় স্বল্পবিত্তদের জন্য বাসগৃহ ডিজাইনের চিন্তা-ভাবনার প্রধান প্রধান দিক-
- এ ধরনের বাসগৃহ সহজে, কম খরচে ও দ্রুততার সঙ্গে নির্মাণযোগ্য;
- এ ধরনের বহুসংখ্যক বাসগৃহ স্বল্পসময়ের মধ্যে নির্মাণ উপযোগী;
- এই প্রক্রিয়ায় দেশের প্রাকৃতিক সম্পদের ব্যবহার যথাসম্ভব সীমিত রাখতে হবে, যাতে দেশের প্রাকৃতিক সম্পদ ও পরিবেশ অনাকাক্সিক্ষত ক্ষতির শিকার না হয়;
- বাসগৃহ যুক্তিযুক্তরূপে হবে স্থায়িত্বশীল;
- নির্মিত বাসগৃহ বিদ্যমান বাসগৃহের সঙ্গে আকার-আকৃতিতে সংগতিপূর্ণ, যাতে সার্বিক পরিবেশ সাংঘর্ষিক না হয়।
উল্লিখিত চিন্তা-ভাবনার বাস্তবায়ন করতে হলে বাসগৃহ তৈরির মালামাল ও নির্মাণকৌশলে আনতে হবে অভূতপূর্ব পরিবর্তন। নানা সম্ভাবনা যাচাই-বাচাই করে এ ধরনের বাসগৃহ ডিজাইন ও নির্মাণের জন্য সম্ভাব্য উপকরণের একটি তালিকা তৈরি করা হয়েছে। এই তালিকার উপকরণগুলো দেশেই উৎপাদিত হয় কিংবা সহজেই দেশে পাওয়া যায় বা তৈরি করা যায়। যেমন-
- ঘরের ভিত্তির দেয়াল স্থানীয়ভাবে প্রাপ্ত ইটের তৈরি হবে, যা ঘরের ভিত্তিমূল থেকে ঘরের মেঝের তল পর্যন্ত উঠে আসবে;
- ঘরের ভিটা দুর্মুজ করা মাটির ওপর এক প্রস্থ ইট চওড়া করে বিছিয়ে তদুপরি কংক্রিটের প্রলেপ দিয়ে তৈরি করা হবে;
- ঘরের খুঁটিগুলো কংক্রিটে ভর্তি পিভিসি পাইপের হবে, যার প্রতিটি ১২ সে.মি. ব্যাসের এবং ফুটিংয়ের ওপর থেকে ভিটার প্রায় ১৩ সে.মি. চওড়া ইটের দেয়ালের মধ্য দিয়ে ২.৭৫ মিটার উচ্চতায় খাড়াভাবে উঠে আসবে। এই পাইপগুলোর গায়ে থাকবে ছিদ্র করা, যাতে বাতাসের সংস্পর্শে কংক্রিট জমতে পারে;
- ঘরের চালার কাঠামো ১ সে.মি. ব্যাসের লোহার রডের নির্দিষ্ট মাপের অংশাবলি ওয়েল্ডিং করে তৈরি করা হবে এবং খুঁটিগুলোর মাথায় খুঁটিগুলোর সঙ্গে কানেকটারের মাধ্যমে দৃঢ়ভাবে যুক্ত থাকবে;
- ঘরের চালাসহ ভিটি পর্যন্ত আচ্ছাদনী তাঁবুসদৃশ মোটা ও পানি নিরোধক তেরপলিনে তৈরি হবে। এই আচ্ছাদনী প্রয়োজনীয় মাপে সেলাই করে তৈরি করা হবে এবং দরজা ও জানালার জন্য নির্দিষ্ট স্থান কেটে ও মুড়ি মেরে খোলা রাখা হবে। এসব খোলা জায়গার বাইরের দিকে একই উপাদানের তৈরি ঢাকনা থাকবে, যা বিশেষ ধরনের বোতামের ব্যবহারে প্রয়োজনে খোলা কিংবা বন্ধ করা যাবে;
- মূল ঘরের সামনে ও পেছনে থাকবে দুটি বর্ধিতাংশ। সামনের বর্ধিতাংশটি ‘এনট্রিপোর্চ’ হিসেবে এবং রান্নাবান্নার কাজে ব্যবহৃত হবে। পেছনের অংশটি ব্যবহৃত হবে টয়লেট হিসেবে।
গ্রাম্য পরিবেশে কম খরচে ও দ্রুততার সঙ্গে দরিদ্র গ্রামবাসী ও উদ্বাস্তুদের জন্য নতুন বাসগৃহ তৈরির ক্ষেত্রে উল্লিখিত নির্মাণসামগ্রী ও নির্মাণপদ্ধতি সবিশেষ ভূমিকা রাখতে পারে। এই নির্মাণসামগ্রীগুলো শিল্পকারখানায় উৎপাদন করা যাবে এবং বহুল উৎপাদন ও মান নিয়ন্ত্রণের মাধ্যমে বাসগৃহগুলোর তৈরির সময় কমিয়ে সুনিশ্চিত করা যাবে এর গুণগতমানও। তা ছাড়া বহুল উৎপাদনের মাধ্যমে নির্মাণসামগ্রীর দামও অনেকটা কমে আসবে। প্রস্তাবিত ডিজাইন উপকরণ ও নির্মাণপদ্ধতির ব্যয়ের আনুমানিক হিসাব করে এ রকম একটি বাসগৃহের নির্মাণ ব্যয় এক লাখ টাকার মধ্যে সীমিত রাখা সম্ভব হবে। এ রকম একটি বাসগৃহের নমুনাচিত্র-
বন্যা আক্রান্ত এলাকায় সাশ্রয়ী ও সহজে নির্মাণযোগ্য বাসগৃহের ডিজাইন
বাংলাদেশের নিম্নাঞ্চলে বন্যায় প্রায়শ আক্রান্ত হয়ে বহু মানুষ বন্যার পানি থেকে বাঁচতে ও ত্রাণসামগ্রী পাওয়ার আশায় নিজের বাস্তুভিটা ছেড়ে আশ্রয়কেন্দ্রের দিকে ছুটে আসে। বন্যার পানি নেমে গেলে নিজ ঠিকানায় ফিরে বিধ্বস্ত বাসগৃহের পুনর্নির্মাণ তাদের জন্য কঠিন হয়ে পড়ে। তদুপরি বন্যাপীড়িত অবস্থায় নানা অসুখবিসুখে ভুগে ভোগান্তি আর চরম দুর্দশাগ্রস্ত অবস্থায় জীবন হয়ে ওঠে দুর্বিষহ। এ অবস্থায় বন্যা সহনীয় ঘরের ডিজাইন ও নির্মাণ সম্ভব হলে বন্যাপীড়িত মানুষের জীবনে আনতে পারে প্রশান্তি। আহ্্ছানউল্লাহ বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের স্থাপত্য বিভাগে আমাদের দীর্ঘদিনের চিন্তাভাবনা ও গবেষণার মাধ্যমে এমন একটি বাসগৃহের ডিজাইন ও নির্মাণপদ্ধতি উদ্ভাবন করা সম্ভব হয়েছে, যা দেড় থেকে দুই মিটার গভীরতার বন্যার পানিতেও নিজ স্থানে অক্ষত অবস্থায় রেখে গৃহবাসীকে শুল্ক ও নিশ্চিন্ত রাখবে।
আমাদের উদ্ভাবিত বন্যা সহনীয় বাসগৃহটি বন্যার পানি বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে নিজ স্থানে ক্রমেই ওপরে উঠবে, যাতে বন্যার পানিতে ঘরের মেঝে প্লাবিত হবে না। বন্যার পানি যত দিন থাকবে ঘরটিও তত দিন স্বস্থানে ভাসমান অবস্থায় থাকবে। অবশেষে বন্যার পানি নেমে যাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে ঘরটিও ধীরে ধীরে নেমে গিয়ে ভূমিসংলগ্ন নিজের আগের অবস্থানে ফিরবে। এ রকম একটি বাসগৃহের চেহারা হুবহু বন্যামুক্ত এলাকার জন্য ডিজাইনকৃত বাসগৃহের অনুরূপ হবে। তবে বন্যার পানিতে ভাসমান হয়ে ওঠার জন্য এই বাসগৃহের মেঝে এবং কলামের ডিজাইনে বিশেষ ধরনের ব্যবস্থার সংযোজন করা হয়েছে। ঘরের মেঝে ৩ থেকে ৪ সেন্টিমিটার পুরু পিভিসি প্লেটের হবে, যার নিচে বাড়তি গভীরতাসহ বর্গাকৃতির প্যাটার্নে অনেকগুলো ‘খোপ’ থাকবে। প্রতিটি বর্গাকৃতির খোপে একটি করে প্লাস্টিক বাকেট সংযোজিত হবে। প্রস্তাবিত ঘরটির মেঝের নিচে এ ধরনের ৪৮টি বাকেট থাকবে, যেগুলো বন্যা পরিস্থিতিতে সহজেই ঘরটির ‘ডেডলোড’ ও ‘লাইভলোড’ বহন করে নিরাপদে ঘরটিকে পানির ওপর ভেসে থাকতে সাহায্য করবে।
বন্যার পানি বাড়া-কমার সঙ্গে সঙ্গে ঘরটি যাতে নিজ স্থানে ওপরে-নিচে ওঠানামা করতে পারে সে জন্য ঘরটির কলামগুলো নির্মিত হবে ‘টিউব ইন টিউব’ পদ্ধতিতে। অর্থাৎ প্রতিটি কলাম একটি পিভিসি পাইপের ভেতরে আরেকটি পিভিসি পাইপের অবস্থান নিয়ে নির্মিত হবে। ভেতরের পাইপগুলো ঘরটির ভিত্তিমূলের সঙ্গে যুক্ত থেকে মেঝের নির্দিষ্ট বৃত্তাকার ছিদ্র পথগুলো দিয়ে ওপরে উঠবে। এই পাইপগুলোর গায়ে ছিদ্র থাকবে এবং পাইপগুলো থাকবে কংক্রিটে পূর্ণ, যাতে কংক্রিট জমতে পারে এবং ঘরটিকে ধরে রাখতে পারে। এই পাইপগুলোকে ঘিরে থাকা বাইরের পাইপগুলো মেঝের ওপর থেকে ছাদের কাঠামো পর্যন্ত থাকে এবং কাঠামোর সঙ্গে উপযুক্ত সংযুক্তির মাধ্যমে ছাদের কাঠামোটিকে ধরে রাখবে। এই বাইরের পাইপগুলো এবং ছাদের কাঠামো ঘিরে থাকবে ঘরটির আচ্ছাদনী। বন্যার পানি বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে কলামের ভেতরের সুদৃঢ় পাইপ বেয়ে ঘরের মেঝে ওপরে উঠে আসার সঙ্গে সঙ্গে বাইরের পাইপগুলোও ঘরের আবরণীসহ ওপরে উঠে আসবে। ফলে ঘরের মেঝে সব সময় পানির ওপরে শুষ্ক অবস্থায় থাকবে। পানি নামার সঙ্গে সঙ্গে ঘরটিও ধীরে ধীরে স্বস্থানে মাটিতে নেমে আসবে।
বন্যা সহনীয় ঘরের মেঝে এবং খুঁটির পাইপগুলো নির্দিষ্ট আকার-আকৃতিতে সহজেই তৈরি করা যাবে শিল্পকারখানায়। তবে পরিবহনের সুবিধার জন্য ঘরের মেঝেকে সমমাপের কয়েকটি ছোট ছোট অংশে বিভক্ত করে নির্মাণ করা হবে। এই অংশগুলো নির্মাণ স্থানে সংযোজনের মাধ্যমে ঘরের মেঝের আকৃতিতে নিয়ে আসা যাবে এবং মেঝের নিচের প্রতিটি বর্গাকৃতি খোপে একটি করে প্লাস্টিক বাকেট সংযুক্ত থাকবে।
ঘরের খুঁটি ও মেঝেসংক্রান্ত আনুষঙ্গিক তথ্যাবলি:
- ঘরের খুঁটির ভেতরের পিভিসি পাইপটি ১১.৫ সে.মি. ব্যাসের হবে এবং ফুটিং থেকে ১৩ সে.মি. চওড়া ইটের ফাউন্ডেশন দেয়ালের মধ্য দিয়ে খাড়া ও সুদৃঢ়ভাবে ওপরে উঠে আসবে;
- প্রতিটি খুঁটির স্থানে ফ্লোর প্লেটটিতে ১২.৫ সে.মি. ব্যাসের একটি করে বৃত্তাকার ছিদ্র থাকবে, যার মধ্য দিয়ে ঘরের খুঁটির ভেতরের পিভিসি পাইপটি ঘরের মেঝে থেকে ১.৭৫ মিটার উচ্চতায় উঠে আসবে। ঘরের ফাউন্ডেশন থেকে এই পাইপটির মোট উচ্চতা হবে (০.৮৫+১.৭৫) মি. বা ২.৬০ মিটার।
- ঘরের প্রতিটি খুঁটির ভেতরের পিভিসি পাইপটিকে ঘিরে ১২ সে.মি. ব্যাসের একটি পিভিসি পাইপ মেঝের ওপর বসবে। মেঝে থেকে এই পাইপটির উচ্চতা হবে ২.০ মিটার। এই পাইপের নিচের অংশ ‘রিং’ আকৃতির হবে, যার ব্যাস হবে ১৪ সে.মি. যাতে পাইপটি মেঝের ১২.৫ সে.মি. ব্যাসের ছিদ্রটিকে পুরাপুরি ঢেকে মেঝের ওপর বসতে পারে।
- ঘরের চালার কাঠামোটি ১ সে.মি. ব্যাসের নির্দিষ্ট মাপের লোহার রডের অংশাবলি সাইটে ওয়েল্ডিং করে তৈরি করা হবে। এই কাঠামোটি ঘরের প্রতিটি খুঁটির বহির্পাইপের মাথায় লোহার পাতের ‘কানেকটারের’ মাধ্যমে দৃঢ়ভাবে সংযুক্ত থাকবে।
- ঘরের চালাসহ ভিটা পর্যন্ত আচ্ছাদনীটি অবিকল বন্যামুক্ত এলাকার জন্য ডিজাইনকৃত বাসগৃহের আচ্ছাদনীর অনুরূপ হবে। তবে এই আচ্ছাদনীটি ঘরের প্রতিটি খুঁটির বাইরের পাইপের সঙ্গে বাঁধা থাকবে, যাতে ঘরের মেঝের ওঠানামার সঙ্গে সঙ্গে বাইরের পাইপগুলোসহ পুরো ঘরটিও ওঠানামা করতে পারে।
উল্লিখিত বন্যা সহনীয় বাসগৃহের বিভিন্ন অংশবিশেষের সংযোজন পদ্ধতির সচিত্র বিবরণ:
আমাদের ডিজাইনকৃত বন্যা সহনীয় একটি কুঁড়েঘরের বন্যার সময়ে ভেসে থাকার সম্ভাবনাসংক্রান্ত হিসাবনিকাশ:
| ছাদের কাঠামোর ওজন | ||
| ১ | ১ সে.মি. ব্যাসের লোহার রড ৫০ মিটার (প্রতি মিটার ১ কেজি হিসাবে মোট ওজন) | ৫০ কেজি |
| ২ | কলামের বাইরের টিউবগুলোর ওজন | ১৮০ কেজি |
| ১২ সে.মি. ব্যাসের এবং ২ মিটার উচ্চতার ১৮টি (প্রতি মিটার ৫ কেজি হিসেবে মোট ওজন) | ||
| ৩ | পিভিসি ফ্লোর প্লেটের ওজন | ১৮০ কেজি |
| ৪ সে.মি. পুরু পিভিসি ফ্লোর প্লেট নিচের বর্গাকার খোপগুলোসহ প্রতি বর্গমিটারে ২০ কেজি হিসাবে মোট ওজন | ||
| ৪ | প্লাস্টিক বাকেটের ওজন | ৬৪ কেজি |
| ৬৪টি প্লাস্টিক বাকেট ১ কেজি প্রতি বাকেট হিসাবে মোট ওজন | ||
| ৫ | কুঁড়েঘরটির তেরপলিন কভারের ওজন | ৪০ কেজি |
| ৪০ ব.মি. তেরপলিন ১ কেজি প্রতি বর্গমিটার হিসাবে মোট ওজন | ||
| ৬ | গৃহবাসীদের ‘লাইভ লোড’ | ৫০০ কেজি |
| ৭ | ঘরের ওপর বাতাসের বেগজনিত ওজন: ১০০ কেজি ঘরের মোট ওজন | ১১১৪ কেজি |
| ৮ | উচ্চতার ৯০ শতাংশ ডুবে থাকলে ফ্লোর প্লেটের বাকেটগুলোর ঊর্ধ্বমুখী চাপ বাকেটপ্রতি ৪০ কেজি হিসাবে | ২৫৬০ কেজি |
| বন্যাজনিত পরিস্থিতিতে কুঁড়েঘরটি ভেসে থাকবে। কুঁড়েঘরটির ভাসমান থাকার ‘ফ্যাক্টর অব সেইফটি’ হচ্ছে ২৫৬০স্ট১১১৪ = ২.৩ | ||
বন্যা সহনীয় কুঁড়েঘরটি বাংলাদেশের নিম্নাঞ্চলের জন্য অভূতপূর্ব এক আশীর্বাদ হিসেবে আবির্ভূত হতে পারে। এ ধরনের কুঁড়েঘরের কল্যাণে লাখ লাখ দরিদ্র পরিবার বন্যার প্রকোপে গৃহহীন হয়ে নিরাপদ আশ্রয়ের সন্ধানে ঘুরে বেড়ানো থেকে রেহাই পাবে। শুধু তা-ই নয়, অধিকন্তু বন্যার দুশ্চিন্তা থেকে মুক্তি তাদেরকে দেবে অভাবনীয় এক প্রাণশক্তি। ঘরে খাদ্যের সংস্থান থাকলে বন্যাকবলিত সময়ে তারা নিজ ঘরে নিরাপদে থাকতে পারবে নিশ্চিন্তে। তা ছাড়া মাছ ধরা কিংবা প্রয়োজনীয় কাজে যাতায়াতের ক্ষেত্রে তারা ব্যবহার করতে পারবে নৌকাও। সর্বোপরি বন্যার আগমনজনিত দুশ্চিন্তা থেকে মুক্তি পেয়ে তারা জীবনের অন্যান্য প্রয়োজনের দিকে হতে পারবে মনোযোগী।
বন্যা সহনীয় একটি কুঁড়েঘরের নির্মাণ ব্যয় দুই লাখ টাকার মধ্যে সীমিত থাকবে বলে প্রাথমিক হিসাবে অনুমিত। এ ধরনের একটি কুঁড়েঘর নির্মাণের পর ঘরটির রক্ষণাবেক্ষণের জন্য নিয়মিত কোনো খরচ ছাড়াই ঘরটি থাকবে পাঁচ-সাত বছর ব্যবহারোপযোগী। পাঁচ-সাত বছর পর প্রয়োজনে ঘরটির আবরণী পাল্টে ফেললে এটি আবার নতুন হয়ে উঠবে। এভাবে এ ধরনের একটি কুঁড়েঘর দীর্ঘদিন থাকবে ব্যবহারোপযোগী। ফলে দীর্ঘ সময়ের প্রেক্ষাপটে ঘরটি মূল্য সাশ্রয়ী রূপেই বিবেচিত হবে। তা ছাড়া কোনো কারণে ঘরটি স্থানান্তরিত হলে ঘরের অধিকাংশ উপকরণই পুনরায় ব্যবহার করা যাবে।
বাংলাদেশের দরিদ্র গ্রামীন মানুষের আবাসনের জন্য এখানে আলোচ্য আমাদের গবেষণায় প্রাপ্ত ধ্যানধারণা এখনো আছে বাস্তবে পরীক্ষিত হবার অপেক্ষায়। এই উদ্যোগের পরবর্তী পদক্ষেপ হিসাবে বাস্তবে পদ্ধতিগুলোর ‘ফিল্ডটেস্টিং’ অত্যন্ত জরুরি, যা আমাদের পক্ষে অসম্ভব। তবে সরকারের ‘হাউজ বিল্ডিং এন্ড রিসার্চ ইনস্টিটিউট’ আলোচ্য ডিজাইনগুলো বাস্তবতার আলোকে তৈরি করে পরীক্ষা-নিরীক্ষা পর এর কার্যকারিতা যাচাই করতে পারে। তা ছাড়া উৎসাহী কোনো শিল্পোদ্যোক্তাও ব্যবসায়িক দৃষ্টিকোণ থেকে আলোচ্য ডিজাইনের প্রতি হতে পারেন উদ্যোগী। আমরা সবার সঙ্গে আমাদের চিন্তাভাবনা ও ডিজাইন ডিটেইলস নিয়ে আলোচনায় আগ্রহী। ইতিমধ্যে আমরা আমাদের ডিজাইনের পেটেন্ট করিয়েছি। তবে ডিজাইনের সম্ভাব্য উন্নয়ন ও বাস্তব প্রয়োগের লক্ষ্যে যেকোনো উদ্যোগক্তার সঙ্গে কাজ করতে আমরা প্রস্তুত। আমাদের প্রচেষ্টা সফল হলে আন্তর্জাতিকভাবেও দেশ উপকৃত ও লাভবান হবে বলেই আমাদের বিশ^াস।
প্রকাশকাল: বন্ধন, ৯৫তম সংখ্যা, মার্চ ২০১৮।