শহর-নগরীর পার্ক, খেলার মাঠ ও খোলা জায়গা ‘ফুসফুস’ হিসেবে বিবেচিত। খোলা জায়গার সংজ্ঞা ও পরিধি ব্যাপক, যার আওতায় আন-বির্ল্ড ল্যান্ডস (Un-Built Lands) হিসেবে যেকোনো ধরনের উন্মুক্ত স্থান; যেমন, খাল-বিল-জলাশয়, ক্ষেত-খামার-বাগান, টিলা-উপত্যকা-পাহাড়, মরুভূমি ইত্যাদিকে বোঝায়। যেহেতু ভূ-পৃষ্ঠের শতকরা তিন ভাগ পানি ও এক ভাগ মাটি। তাই স্বাভাবিকভাবে মরু অঞ্চল ছাড়া সর্বত্র নগর পরিকল্পনায় জল-সবুজের প্রাধান্য। আগে পরিকল্পিত শহরকে ‘গার্ডেন সিটি’ও বলা হতো। অবশ্য বর্তমানে মরুভূমিতেও জল-সবুজের শহর-নগর গড়ে উঠছে, যা এখন মধ্যপ্রাচ্যের অনেক দেশে দৃশ্যমান। এভাবে নগরজীবনে খোলা জায়গা জনসাধারণের বিনোদন, অবসর, ভ্রমণ, খেলাধুলা ও অন্যান্য শারীরিক কার্যক্রমের অংশ ও অধিকার হয়ে দাঁড়িয়েছে। উন্নত বিশ্বের নগর পরিকল্পনায় এখনো এই ধারণাটি কমবেশি চলমান, কিন্তু উন্নয়নশীল এবং অনুন্নত বিশ্বে অপরিকল্পিত নগরায়ণের দাপটে বিশেষ করে নগর এলাকায় অত্যাধিক জনস্ফীতি ও নিয়ন্ত্রণহীনতায় এতে ছন্দপতন ঘটছে। অনেক শহর-নগরে তো পরিকল্পিত পার্ক-মাঠ ও খোলা জায়গা ধ্বংস করে বিভিন্ন ধরনের স্থাপনা ও অবকাঠামো নির্মাণ করা হচ্ছে, যার কারণে নগরজীবনের আজকের কলুষিত এ পরিবেশ।
বাংলাদেশের রাজধানী ঢাকা একদিকে আয়তনে ছোট, অন্যদিকে জনসংখ্যায় বিশাল। স্বাধীনতার পর যুদ্ধবিধ্বস্ত অর্থনীতি ও অনিয়ন্ত্রিত পরিস্থিতিতে ঢাকায় অস্বাভাবিক জনস্ফীতিতে একদিকে বাড়ন্ত মানুষের ঘরবাড়ি নির্মাণের চাপ ও অন্যদিকে নতুন রাষ্ট্রের প্রয়োজনে বিভিন্ন ধরনের স্থাপনা প্রতিষ্ঠার কারণে অনুমোদিত মহাপরিকল্পনায় ভূমি ব্যবহারে ব্যাপক পরিবর্তন ঘটে। স্থানে স্থানে উন্মুক্তস্থান দখল-বেদখল হয়ে তথা অযত্ন-অবহেলায় বেহাত হয়ে যায়। এভাবে বর্তমানে নগরীর অনেক জায়গায় পার্ক, মাঠ ও খোলা পরিসর প্রায় শূন্যের কোটায় চলে এসেছে। আদর্শিক দৃষ্টিকোণ থেকে নগর ব্যবস্থাপনায় কমপক্ষে ২৫ শতাংশ জায়গা খোলা বা উন্মুক্ত স্থান হিসেবে সংরক্ষণ করা হলেও ঢাকায় এর পরিমাণ এখন ৭-৮ শতাংশের বেশি নয়। ফলে অপরিকল্পিত নগরায়ণের দাপটে জনজট-জলজট-যানজটের সঙ্গে পরিবেশদূষণসহ সার্বিকভাবে ঢাকাকে বসবাসের অযোগ্য নগরী হিসেবে আখ্যা দেওয়া হয়েছে।
ফেলে আসা ঢাকা
চারপাশে নদী পরিবেষ্টিত ও অনেক খাল-নালা, পুকুর-দিঘি ও বিল-ঝিল-জলাশয়ের সমন্বয়ে ঢাকা আগে জল-সবুজে পূর্ণ ছিল। ঘরবাড়ি ও বসতিতে ছিল উঠোন-বাগান এবং অনেক বসতবাটিতে পুকুর-দিঘিও ছিল। খেলার মাঠ ছাড়া কোনো ধরনের স্থাপনা-প্রতিষ্ঠান হতোই না। প্রতিটা পাড়া-মহল্লা ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান এমনকি সব হল প্রাঙ্গণেও ছিল মাঠের সংস্থান। ছোট-বড় সব আবাসিক কমপ্লেক্স বা এলাকার অভ্যন্তরেও পার্ক বা মাঠের সংস্থান করা ছিল। আর পরিকল্পিত আবাসিক এলাকার প্রতিটা ব্লক বা Neighbourhood-এ জনসংখ্যার বিবেচনায় ছিল পার্ক, মাঠে ছিল খোলা জায়গা। কিন্তু কালচক্রে নগরীতে বাড়তি জনগণের আবাসনের জন্য প্লট সৃষ্টিসহ অন্যান্য সুবিধার সংযোজন করতে গিয়ে বর্তমানে কোনো Neihbourhood-এ আর পার্ক, মাঠ বা খোলা জায়গা নেই বললেই চলে। যেভাবে বিলীন হয়ে গেছে সরকারিভাবে নির্মিত অনেক পার্ক ও খেলার মাঠও। আর বর্তমানে তো ঢাকায় খাল-বিলের অস্তিত্বই নেই। অথচ একদা এই নগরীর ওপর দিয়ে Criss-Cross Pattern-এ ৪০-৫০টি খাল-নদী প্রবাহমান ছিল। প্রায় প্রতিবছর বন্যা হতো এবং এসব খাল-নদীপথে নগরী প্রাকৃতিকভাবে বিধৌত হতো অর্থাৎ সার্বিকভাবে ঢাকা ছিল জল-সবুজের সমন্বয়ে প্রাকৃতিক এক শহর।
প্রাক্-যুগে ঢাকার এসব প্রাকৃতিক সৌন্দর্য ও প্রাচুর্য্যে আকৃষ্ট হয়ে এখানে বহির্বিশ্ব থেকে অনেকে এসে শাসন করেছে এ দেশকে। মোগল আমলে ঢাকার খাল-নদী ও বিল-ঝিল-জলাশয়কে ভিত্তি করে নগরীর বিভিন্ন স্থানে অনেক বাগ-বাগিচা, দুর্গ ও অন্যান্য স্থাপনা (ময়দান, ঈদগাহ ইত্যাদি) গড়ে ওঠে। গুলিস্তান থেকে উত্তর দিকে বিস্তীর্ণ জায়গাটি তো ‘বাগ-ই-বাদশাহী’ নামে পরিচিত ছিল। কিন্তু কোম্পানি শাসনামলে ঢাকার প্রতি শাসকগোষ্ঠীর অবহেলা ও রক্ষণাবেক্ষণের অভাবে এসব বাগ-বাগান ও বাগিচা নষ্ট হয়ে যায়। শহরের প্রায় খাল-নালা এবং ঝিল-জলাশয়গুলোও মজে যায়। তবে ব্রিটিশ শাসনামলে ১৯০০ শতাব্দীর শুরুতে ঢাকাকে পুনরায় রাজধানী করার পর নতুন করে পরিকল্পিত আকারে কিছু উন্মুক্ত স্থ’’ান গড়ে তোলা হয়। সে সময় রমনা এলাকাকে ‘গার্ডেন টাউন’ হিসেবে প্রতিষ্ঠা করা হয়। তখন নগরীর বিভিন্ন স্থানে ব্যক্তিগত উদ্যোগেও কিছু পার্ক, বাগান, মাঠ ইত্যাদি প্রতিষ্ঠা করা হয় (যেমন: বলধা গার্ডেন)।
১৯১৭ সালে প্যাট্রিক গেডেসের পরিকল্পনা প্রতিবেদনে নগরীর এসব পার্ক-বাগান-বাগিচা, মাঠ-ময়দান, ক্রীড়াক্ষেত্র, দিঘি, খাল-নালাগুলোকে পুনঃউন্নয়ন ও সংরক্ষণের জন্য বলা হয়। কিন্তু স্বল্পতম সময়ের মধ্যে বঙ্গভঙ্গ রদ করে ঢাকা থেকে রাজধানী আবারও কলকাতায় স্থানান্তর তথা পরপর দুটি বিশ্বযুদ্ধের ডামাডোল ও ভারতবর্ষের স্বাধীনতা আন্দোলনের মধ্যে গেডেসের সুপারিশমালার কিছুই বাস্তবায়ন করা যায়নি। আসলে সে সময় ঢাকার উন্নয়ন কর্মকাণ্ড পরিচালনার জন্য কোনো প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামোও ছিল না। পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার পর ১৯৫৬ সালে ডিআইটি প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে প্রথম ঢাকায় পরিকল্পিত ও সমন্বিত উন্নয়নের উদ্যোগ গৃহীত হয়। প্রণীত হয় একটি মহাপরিকল্পনা, যাতে নগরীর প্রাকৃতিক পরিবেশকে সবচেয়ে বেশি অগ্রাধিকার দেওয়া হয়। পরিকল্পনাবিদদের সুপারিশ ছিলÑঢাকার চতুর্দিকের নদীকে পরিবহন প্রণালিরূপে গড়ে তোলা, বিদ্যমান খাল-নালা ও জলাশয়সমূহকে যথাযথভাবে সংরক্ষণ এবং নগরীর পূর্ব ও পশ্চিমে বিস্তীর্ণ বন্যাপ্লাবিত ভূমিকে ভরাট না করা এবং নতুন পরিকল্পনায় পর্যাপ্ত উন্মুুক্ত স্থানের সংস্থান করা। প্রতি এক হাজার জনের জন্য তিন-চার একর জমি উন্মুুক্ত স্থান হিসেবে সংরক্ষণ ও উন্নয়নের জন্য সুপারিশ করা হয়। কিন্তু সেভাবে ঢাকার উন্নয়ন ও বিকাশ ঘটেনি। বরং একটি মহাপরিকল্পনা থাকা সত্ত্বে প্রায় ক্ষেত্রে এর থেকে বিচ্যুতির উন্নয়ন হয়েছে বা ঘটানো হয়েছেও বলা যায়। অর্থাৎ যেখানে যা হওয়ার কথা ছিল, সেখানে তা করা হয়নি। ফলে সার্বিকভাবে ঢাকা একটি অপরিকল্পিত নগরী (Megalpolis) হিসেবে গড়ে ওঠে।
ঢাকার পার্ক-ময়দানের ‘রাজনীতি’ ও পরিবেশগত বিপর্যয়
স্বাধীনতার পরও ঢাকায় অনেক পার্ক, বাগিচা, খেলার মাঠ, ময়দান ও অন্যান্য খোলা জায়গা ছিল। পল্টন ময়দান, রমনা ও রেসকোর্সে (সোহরাওয়ার্দী উদ্যান) ছিল বিস্তীর্ণ সবুজ বলয়। পল্টন ময়দান ছিল রাজনীতির কেন্দ্রস্থল, যেখানে প্রায়ই জনসভা হতো। অথচ দেশের নষ্ট রাজনীতিতে এখন পল্টন ময়দান বলে আর কিছু নেই। সেখানে গড়ে তোলা হয়েছে বিভিন্ন ধরনের স্থাপনা। প্রেসিডেন্ট এরশাদের শাসনামলে এই অপকর্মটি ঘটে। পল্টন ময়দানে রাজনৈতিক দলের জনসভা বন্ধ করার জন্য সেখানে হকি স্টেডিয়াম ও বিভিন্ন স্পোর্টস ফেডারেশনের অফিস স্থাপনের ব্যবস্থা করে এই ঐতিহাসিক ময়দানটি নষ্ট করে ফেলা হয়। অবশ্য এর আগে প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানের শাসনামলে সোহরাওয়ার্দী উদ্যানের যে স্থানে ভারতের প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধীর নামে ‘ইন্দিরা মঞ্চ’ তৈরি করা হয়েছিল, তা ভেঙে সেখানে একটি শিশুপার্ক নির্মাণ করা হয়। অতঃপর আরেক জেদাজেদির রাজনীতিতে সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে ‘স্বাধীনতা স্তম্ভ’ নির্মাণ করে এই ময়দানটির পরিবেশ নষ্ট করা হয়।
প্রেসিডেন্ট এরশাদের শাসনামলে এভাবে নগরীর আরও অনেক সবুজ বলয় ও লেক-পার্ককে ধ্বংস করে প্লট সৃষ্টি ও দলীয় লোকজনকে তা বরাদ্দ করে অপরাজনীতির সূচনা করা হয়। গুলশান-বনানী এলাকায় এই অপকর্মটি বেশি হয়। ধারণা করা হয়েছিল, ১৯৯১ সালে দেশে গণতান্ত্রিক সরকারব্যবস্থা প্রতিষ্ঠার পর এই অপকর্মটি বন্ধ হবে। না, তা হয়নি, বরং ১৯৯২-৯৬ সালে বিএনপি সরকারের আমলে গুলশান-বনানীতে প্লট সৃষ্টি করতে গিয়ে লেকগুলোকে একেবারে সংকুচিত করে ফেলা হয়। সে সময় ‘অতি গোপনে’ এই লেকগুলোর অবশিষ্টাংশের ওপর বিবিধ বাণিজ্যিক স্থাপনা নির্মাণে একটি প্রভাবশালী চক্রকে বরাদ্দ দেওয়ার ব্যবস্থা করা হয়েছিল, কিন্তু বিষয়টি ফাঁস হয়ে যাওয়ায় তা আটকে যায়। এভাবে দেশের সামরিক ও গণতান্ত্রিক উভয় সরকারের আমলে ‘বহুমুখী খেলায়’ ঢাকার আরও অনেক পার্ক-মাঠ-ময়দান ও লেক-ঝিল-জলাশয় হারিয়ে গেছে।
যেমন: ১৯৮৮ সালের বন্যার পর ঢাকার পূর্ব ও পশ্চিমে যে বিস্তীর্ণ জলাভূমি ও সবুজ বলয় ছিল, তার আজ কিছুই অবশিষ্ট নেই। ওই বন্যা-উত্তর আন্তর্জাতিক সাহায্যে প্রণীত ঢাকার Flood Action Plan (FAP-8)-এর শুধু অপমৃত্যু নয়, এতে প্রস্তাবিত সব Retention Ponds-এর প্রায় জায়গা এখন কতিপয় প্রভাবশালী ভূমিদস্যুর নিয়ন্ত্রণে। ১৯৯২-৯৫ সালে প্রণীত DMDP (1995-2015) পরিকল্পনা প্যাকেজেও এসব জায়গাকে বিভিন্ন আকারে Open Space হিসেবে সংরক্ষণের সুপারিশ ছিল, কিন্তু ভূমিদস্যুদের প্রভাব ও দাপট এবং নিয়ন্ত্রণহীনতায় এসব জায়গায় Free-Style উন্নয়ন অব্যাহত রয়েছে। অন্যদিকে প্রেসিডেন্ট এরশাদের শাসনামলে পুরান ঢাকা থেকে কেন্দ্রীয় জেলখানা অন্যত্র অপসারণের পর এই জায়গাটি একটি উন্মুক্ত স্থান হিসেবে এবং কুর্মিটোলা বিমানবন্দর চালু হওয়ার পর তেজগাঁও বিমানবন্দরের জায়গাটির Redevelopment করার সিদ্ধান্ত হয়েছিল। এ জন্য বিভিন্ন পেশাজীবী মহল স্বপ্রণোদিত হয়ে কিছু পরিকল্পনা বা প্রস্তাবনাও পেশ করে। তন্মধ্যে একটি সমন্বিত গ্রিন নেটওয়ার্কের আওতায় তেজগাঁও বিমানবন্দরের পরিত্যক্ত জায়গায় Urban Oasis-এর পরিকল্পনাটি ছিল খুবই সময়োযোগী, কিন্তু আজ অবধি অজ্ঞাত কারণে এটি আলোর মুখ দেখেনি। আর এভাবে বর্তমানে ঢাকা মহানগরী ভয়াবহ পরিবেশগত বিপর্যয়ের মুখোমুখি দাঁড়িয়ে।
রক্ষণাবেক্ষণে ঢাকার পার্ক-মাঠ, লেক, খোলা জায়গা
ঢাকার পার্ক-মাঠ তথা অন্যান্য উন্মুক্ত স্থানের পরিচর্যা ও রক্ষণাবেক্ষণের জন্য সুনির্দিষ্ট বা আলাদাভাবে কোনো সংস্থা বা কর্তৃপক্ষ নেই। ঢাকার প্রথমদিককার পরিকল্পিত পার্ক-মাঠ-ময়দানসমূহ সাবেক সিঅ্যান্ডবি বিভাগ অতঃপর গণপূর্ত অধিদপ্তরের অধীনে উন্নয়নকৃত। তন্মধ্যে অনেক পার্ক-মাঠ রক্ষণাবেক্ষণের জন্য পৌর কর্তৃপক্ষের কাছে হস্তান্তর করা হয়, তবে নগরীতে বড় আকারের ও গুরুত্বপূর্ণ কিছু পার্ক-মাঠ এখনো গণপূর্ত অধিদপ্তরের অধীনে। যেমন: রমনা পার্ক, সোহরাওয়ার্দী উদ্যান, চন্দ্রিমা উদ্যান ইত্যাদি। অন্যদিকে ঢাকার বিভিন্ন এলাকায় কিছু পার্ক-মাঠ বিভিন্ন সময়ে ঢাকা পৌর কর্তৃপক্ষের অধীনে বা স্থানীয় জনসাধারণের সংশ্লিষ্টতায় উন্নয়নকৃত, যার সবই বর্তমানে ঢাকা সিটি করপোরেশনের তত্ত্বাবধানে। কিন্তু পূর্বেকার অবিভক্ত বা বর্তমানে দ্বিধাবিভক্ত সিটি করপোরেশন তাদের তত্ত্বাবধানে প্রায় পার্ক-মাঠে যথাযথভাবে সংরক্ষণ ও রক্ষণাবেক্ষণে ব্যর্থতার পরিচয় দেয়। মাঝেমধ্যে সিটি করপোরেশন কর্তৃক কিছু পার্ক-মাঠের সংস্কার করা হলেও নিয়মিত পরিচর্যা ও তত্ত্বাবধানের অভাবে অল্প কিছু দিনের মধ্যে এসব পার্ক-মাঠ আগের অবস্থায় ফিরে আসে।
লক্ষ করলে দেখা যায়, বর্তমানে ঢাকা সিটি করপোরেশনের আওতায় যেসব পার্ক-খেলার মাঠ ও লেক রয়েছে, তার সবগুলোর অবস্থা খুবই সংঙ্গীন। কিছু পার্ক-মাঠ তো শুধু নামেই। সীমানা দেয়াল নেই, ঘাস নেই, টয়লেট ও পানির ব্যবস্থা নেই, প্রতিবন্ধী ও শারীরিকভাবে অক্ষমদের প্রবেশ ও চলাচলের সুবিধা নেই, অসমতল ভূমি ও কাদা, ডাস্টবিন রাখা, আবার কিছু পার্কে বেঞ্চ থাকলেও বেশির ভাগ ভাঙা, অনেক জায়গায় বিভিন্ন ধরনের ময়লা-আবজর্নার স্তূপ ও নির্মাণসামগ্রী মজুদ করা, রিকশার গ্যারেজ, অনেক জায়গায় জুয়ার আসর ও মাদকের ব্যবসা চলে এবং কিছু পার্ক তো সম্পূর্ণভাবে ব্যক্তিগত দখলেও। আর কিছু পার্ক-মাঠ তো অপরাধীদের স্বর্গরাজ্য হিসেবে পরিণত হয়েছে। অর্থাৎ এমন কিছু নেই, যা সেখানে হয় না। দিনদুপুরে অসামাজিক কাজও চলে। নগরীর কেন্দ্রবিন্দুতে অর্থাৎ জিপিওর পশ্চিমে ‘মুক্তাঙ্গন’ নামে যে জায়গাটি আছে, বর্তমানে সেটি ভবঘুরেদের আড্ডাস্থল ও প্রাইভেট মাইক্রোবাস স্ট্যান্ডে পরিণত হয়েছে। আর কোরবানির সময় পশুর হাটের জন্য যেসব মাঠ লিজ দেওয়া হয়, তার কোনোটিই পশুর হাট শেষে যথাযথভাবে পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন করে পূর্বাবস্থায় ফেরত নেওয়া হয় না। আরও আশ্চর্যজনক বিষয় হলো, নগরীর কোনো পার্ক-মাঠের উন্নয়ন ও সংস্কারের জন্য সরকারের পক্ষ থেকে বাজেট বরাদ্দ থাকে না এবং রক্ষণাবেক্ষণের জন্য যা বরাদ্দ দেওয়া হয়, তাও নামমাত্র।
কিছুদিন আগে ‘ওয়ার্ক ফর বেটার বাংলাদেশ’ ও ‘হেলথব্রিজের’ যৌথ উদ্যোগে ঢাকার পার্ক ও খেলার মাঠের ওপর পরিচালিত এক সমীক্ষায় এসব তথ্য উঠে আসে। আরও আশ্চর্যজনক বিষয় হলো, ঢাকায় বর্তমানে কতগুলো পার্ক-মাঠ আছে, তারও সঠিক তালিকা কারও কাছেই নেই। দক্ষিণ ঢাকা সিটি করপোরেশনের ওয়েবসাইটে ১০-১২টি মাঠের তালিকা আছে, যদিও বাস্তবে এর সংখ্যা অনেক বেশি। আর উত্তর ঢাকার ওয়েবসাইটে তো পার্ক-মাঠের কোনো তথ্য বা তালিকা নেই! তবে তথ্যমতে জানা যায়, উত্তর ঢাকার অধীনে ২৮টি পার্ক ও খেলার মাঠ আছে।
অপর দিকে ডিআইটি পরবর্তীতে রাজউক থেকে বিভিন্ন সময়ে যেসব পার্ক-মাঠের উন্নয়ন শেষে বা মহাপরিকল্পনায় চিহ্নিত খোলা জায়গা বা উন্মুক্ত স্থানসমূহ পরিকল্পনা মোতাবেক উন্নয়নের জন্য সময় সময় সিটি করপোরেশনকে হস্তান্তর করা হয়েছে, তার অনেকগুলোতে সিটি করপোরেশন দোকান-মার্কেট বা অন্যান্য স্থাপনা বানিয়ে বসেছে এবং কিছু পার্ক-মাঠ তো ব্যক্তিবিশেষকে লিজও দেওয়া হয়। যেমন: গুলশান কেন্দ্রীয় পার্ক কাম মাঠটির যথাযথভাবে উন্নয়ন শেষে এটি সিটি করপোরেশনকে হস্তান্তর করা হলে সেখানে সিটি করপোরেশন একটি ব্যক্তিগত প্রতিষ্ঠানকে শিশুপার্ক (ওয়ান্ডারল্যান্ড) স্থাপনের জন্য লিজ দিয়ে বসে। সিটি করপোরেশনের এই অনৈতিক কাজের বিরুদ্ধে রাজউক তথা স্থানীয় বিভিন্ন জনকল্যাণ সমিতির পক্ষ থেকে বারবার আপত্তি করার পরও পার্কটি পূর্বাবস্থায় ফেরত নিতে ব্যর্থ হলে সংশ্লিষ্ট সবার বিরুদ্ধে মামলা দায়ের করা হয়। অতঃপর দীর্ঘ আইনি লড়াই শেষে রাজউক পুনরায় এই পার্কটি উদ্ধার করে সম্প্রতি এটি নতুন করে উন্নয়নের ব্যবস্থা করে। এতদ্প্রেক্ষিতে পরবর্তী সময়ে রাজউক থেকে পার্ক-মাঠগুলো আর সিটি করপোরেশনকে না দিয়ে স্থানীয় এলাকার জনকল্যাণ সমিতিকে রক্ষণাবেক্ষণের জন্য হস্তান্তর করা হচ্ছে।
অনুরূপ ঢাকার লেক, ঝিল, জলাধার ইত্যাদি রক্ষণাবেক্ষণের জন্য কোনো সুনির্দিষ্ট সংস্থা নেই। নগরীর চতুর্দিকের নদী রক্ষণাবেক্ষণের দায়িত্ব বিআইডব্লিউটিএর ওপর; খালসমূহের রক্ষণাবেক্ষণের দায়িত্ব নগর অভ্যন্তরে ওয়াসা ও বাইরের দিকে জেলা প্রশাসনের ওপর; বন্যা নিয়ন্ত্রণ বাঁধের অভ্যন্তরে জলাধার ও বিল-জলাশয়ের দায়িত্ব পানি উন্নয়ন বোর্ডের ওপর; আর লেক, ঝিল ইত্যাদির রক্ষণাবেক্ষণ ও তত্ত্বাবধানের দায়িত্ব কোনো জায়গায় রাজউক বা গণপূর্ত অধিদপ্তরের ওপর, আবার কোনো জায়গায় সিটি করপোরেশনের ওপর। যেমন রমনা লেক গণপূর্ত অধিদপ্তরের অধীনে, ধানমন্ডি লেক সিটি করপোরেশনের অধীনে এবং গুলশান-বনানী ও উত্তরা লেক রাজউকের আওতাধীন। অন্যদিকে রাজউক ও সেনাবাহিনীর অধীনে হাতিরঝিল প্রকল্পের উন্নয়ন সম্পন্ন হলেও অদ্যাবধি নগরীর কোনো সংস্থাকে এর রক্ষণাবেক্ষণের দায়িত্ব প্রদান করা হয়নি। এভাবে বিচ্ছিন্নভাবে নগরীর বিভিন্ন জলাধারগুলোর অসমন্বিত রক্ষণাবেক্ষণ চলছে। বস্তুতপক্ষে এসব কোনো সংস্থার অধীনে অর্পিত নয় এমনকি কাজগুলোর জন্য প্রয়োজনীয় জনবল ও যন্ত্রপাতিও নেই। একটি যথোপযুক্ত সংস্থা বা কর্তৃপক্ষের ওপর হাতিরঝিলের রক্ষণাবেক্ষণের দায়িত্ব প্রদান করা না হলে এটির সংরক্ষণ হবে কি না, নগরবোদ্ধাদের অনেকে ইতিমধ্যে এ নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন।
‘জল-সবুজে ঢাকা’ গঠনে নব উদ্যোগ
ঢাকার পার্ক ও খেলার মাঠের এহেন চরম দুরবস্থায় বিশেষ করে বিভিন্ন পরিবেশবাদী সংগঠনের চাপ ও সর্বোচ্চ আদালতের নির্দেশনার পরিপ্রেক্ষিতে উপায়হীন অবস্থায় অতি সম্প্রতি উত্তর ও দক্ষিণ ঢাকা সিটি করপোরেশন তাদের স্ব-স্ব কার্য এলাকায় যেসব পার্ক ও খেলার মাঠ আছে, সেগুলোর সংস্কার ও উন্নয়নে বিবিধ পদক্ষেপ গ্রহণ করতে শুরু করেছে। দক্ষিণ ঢাকার মেয়র সাঈদ খোকন তাঁর কার্য এলাকায় ১৯টি পার্ক ও ১২টি খেলার মাঠ চিহ্নিত করে সেগুলোর পরিকল্পিত উন্নয়নে নতুন করে একটা উদ্যোগ নিয়েছেন। ‘জলে-সবুজে ঢাকা’ নামে এই প্রকল্পটির আওতায় এই ৩১টি পার্ক-খেলার মাঠের বাস্তব অবস্থা নিরূপণ, বিভিন্ন উন্নয়ন নকশা প্রণয়ন ও ব্যবহারের উপযোগীকরণে করণীয় বিষয়ে সুপারিশ প্রদানে ১৩টি স্থাপত্য প্রতিষ্ঠানকে নিয়োজিত করা হয়েছে। পার্ক হিসেবে যথাক্রমে ১. কারওয়ান বাজারের পান্থকুঞ্জ, ২. গুলিস্তানের ওসমানী উদ্যান, ৩. যাত্রাবাড়ী পার্ক, ৪. শরাফতগঞ্জ পার্ক, ৫. গুলিস্তান পার্ক, ৬. জিন্দাবাহারের সিরাজউদ্দৌলা পার্ক, ৭. জগন্নাথ সাহা রোড পার্ক, ৮. হাজারীবাগ পার্ক, ৯. নবাবগঞ্জ পার্ক, ১০. বংশালের সিক্কাটুলী পার্ক, ১১. বংশাল পার্ক, ১২. মালিটোলা পার্ক, ১৩. ওয়াটার ওয়ার্কস রোডের বশিরউদ্দিন পার্ক, ১৪. সায়েদাবাদ আউটফল স্টাফ কোয়ার্টার শিশুপার্ক, ১৫. মতিঝিল পার্ক, ১৬. ধানমন্ডি ৩ নম্বর রোড পার্ক, ১৭. হাজারীবাগের গজমহল পার্ক, ১৮. বকশীবাজার পার্ক ও ১৯. রসুলবাগ শিশুপার্ক এবং খেলার মাঠ হিসেবে যথাক্রমে ১. কলাবাগান মাঠ, ২. বাসাবো মাঠ, ৩. লালবাগের দেলোয়ার হোসেন মাঠ, ৪. আমলিগোলা মাঠ, ৫. শহিদনগর মিনি স্টেডিয়াম, ৬. বালুরঘাট মাঠ, ৭. শহীদ আবদুল হালিম মাঠ, ৮. বাবুবাজারের রহমতগঞ্জ মাঠ, ৯. বংশালের সামসাবাদ মাঠ, ১০. বাংলাদেশ মাঠ, ১১. গোলাপবাগ খেলার মাঠ ও ১২. ধোলাইখাল সাদেক হোসেন খোকা খেলার মাঠ।
কিন্তু অজ্ঞাত কারণে এই তালিকায় আরও অনেক পার্ক-মাঠ যেমন: বাহাদুর শাহ পার্ক, বলধা গার্ডেন, ধূপখোলা মাঠ, গোলাপবাগ মাঠ, লালবাগ মাঠ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়-আজিমপুর ও বুয়েট মাঠ, রাজারবাগ ও পিলখানার মাঠ, তেজগাঁও মাঠ, ধানমন্ডি মাঠ ইত্যাদি অন্তর্ভুক্ত হয়নি। অচিরেই হয়তো উত্তর ঢাকার মেয়রও তাঁর আওতাভুক্ত এলাকায় পার্ক-মাঠ ও খোলা জায়গার উন্নয়নে অনুরূপ কোনো প্রকল্প গ্রহণ করবেন। মনে হচ্ছে, দক্ষিণ ঢাকার মেয়র হাতিরঝিল, ধানমন্ডি, গুলশান-বনানী লেক ইত্যাদি প্রত্যক্ষ করে পুরান ঢাকার পার্ক-মাঠগুলোকে কমবেশি সেভাবে সাজানোর লক্ষ্যে এই প্রকল্পটি গ্রহণে উদ্বুদ্ধ হয়েছেন। কিন্তু প্রশ্ন হলো, ঢাকা উত্তর ও দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের বর্তমান সাংগঠনিক কাঠামোতে নগরীর এতসংখ্যক পার্ক-মাঠ ও অন্যান্য খোলা জায়গার পরিচর্যা ও রক্ষণাবেক্ষণ কতটুকু সম্ভব? কয়েক বছর আগে নগর ভবনের সম্মুখে ওসমানী উদ্যানে লেক খননের মাধ্যমে জলে-সবুজের (লেক খনন করে) সমন্বয়ে উন্নয়ন সাধন করার পর যথাযথভাবে রক্ষণাবেক্ষণের অভাবে অল্প কিছুদিনের মধ্যে এটি আবার পূর্বাবস্থায় ফিরে আসে। বর্তমানে এই উদ্যানটিতে প্রায় সর্বক্ষণ ভবঘুরেদের আড্ডা এবং কোনো কিছুরই নিয়মিত পরিচর্যা হয় না। অনুরূপ, নগরীতে বিভিন্ন সংস্থার অধীনে উন্নয়ন ও সংস্কারকৃত লেক-ঝিলসমূহের অবস্থাও তেমন ভালো নয়। হাতিরঝিলের রক্ষণাবেক্ষণের জন্য রাজউকের অধীনে কোনো জনবল বা সেট-আপ নেই। একই অবস্থা অপরাপর সব দপ্তর ও অধিদপ্তরে। কাজেই সার্বিক বিবেচনায় নগরীর পার্ক-মাঠ, লেক-জলাশয় ও অন্যান্য খোলা জায়গার রক্ষণাবেক্ষণের জন্য একটি সমন্বিত ও সুচিন্তিত পদক্ষেপ গ্রহণ প্রয়োজন।
ব্যক্তি বা যৌথ উদ্যোগে জল-সবুজের প্রকল্প
হালে বিশ্বায়নের প্রভাব তথা মুক্তবাজার অর্থনীতিতে দেশের বিভিন্ন স্থানে ব্যক্তি বা যৌথ উদ্যোগে প্রকল্প গ্রহণ ও বাস্তবায়নের প্রবণতা বেড়েছে। কিছু কিছু ক্ষেত্রে সরকারি-বেসরকারি তথা পিপিপি (Public-Private Partnership-PPP) উদ্যোগেও প্রকল্প বাস্তবায়িত হচ্ছে। অনেক প্রকল্প বাস্তবায়িত হচ্ছে Recreational পার্ক ও রিসোর্ট হিসেবে। ঢাকার আশপাশে বিশেষ করে গাজীপুরে ইতিমধ্যে অসংখ্য রিসোর্ট গড়ে উঠেছে এবং নির্মিত হয়েছে আধুনিক কিছু পার্কও। সিলেট-চট্টগ্রামসহ দেশের অন্যান্য কিছু জেলায়ও অনুরূপ অনেক মোটেল-রিসোর্ট গড়ে উঠেছে। লক্ষণীয় বিষয় হলো, এসব প্রকল্পের প্রায় সবই বিভিন্নভাবে জলে-সবুজের প্রকল্প। কিছু প্রকল্পদৃষ্টে তো বাংলাদেশেই আছি বলে মনে হয় না। অথচ আগে সরকারিভাবে বা সরকারি নিয়ন্ত্রণে এ ধরনের যেসব প্রকল্প গ্রহণ করা হয়েছে, তার কোনোটিই Sustainable হয়নি।
সম্প্রতি সরকার দেশের বিভিন্ন স্থানে যৌথ উদ্যোগে অনেক অর্থনৈতিক অঞ্চল প্রতিষ্ঠার উদ্যোগ নিয়েছে, যেগুলো ইচ্ছে করলে জলে-সবুজের পরিকল্পনায় গড়ে তোলা যায়। নির্মাণাধীন পদ্মা সেতুর দুই পাশে তো জলে-সবুজের নতুন শহরও প্রতিষ্ঠিত হতে যাচ্ছে। আর কক্সবাজারসহ দেশের দক্ষিণাঞ্চলে সমুদ্রপারে নতুন যেসব হোটেল-মোটেল নির্মিত হচ্ছে, তার সবগুলোই তো জলে-সবুজে পরিকল্পিত। অনুরূপভাবে বর্তমানে দেশের বিভিন্ন জায়গায় যেসব সৌরবিদ্যুৎ প্রকল্প বাস্তবায়িত হতে যাচ্ছে, তার সবই জলে-সবুজে পরিকল্পিত।
প্রয়োজন পার্ক-খেলার মাঠ ও জলাধার সংরক্ষণ আইনের সংশোধন
দেশের পৌর ও নগর উন্নয়ন আইনে বিভিন্ন উন্নয়ন পরিকল্পনায় জনসংখ্যার বিবেচনায় পর্যাপ্ত পার্ক, খেলার মাঠ ও অন্যান্য প্রয়োজনীয় উন্মুক্ত স্থান সংরক্ষণের জন্য বলা হলেও খুব কমক্ষেত্রে তা অনুসৃত হচ্ছে। তাই ২০০০ সালে মহানগরী, বিভাগীয় শহর ও জেলা শহরের পৌর এলাকাসহ দেশের সব পৌর এলাকায় খেলার মাঠ, উদ্যান, উন্মুক্ত স্থান এবং প্রাকৃতিক জলাধার সংরক্ষণের জন্য ভিন্নভাবে একটি বিশেষ আইন প্রণীত হয়। আসলে উল্লেখিত বিভিন্ন প্রেক্ষাপটে বিশেষ করে রাজধানী ঢাকায় পার্ক, মাঠ ইত্যাদি ধ্বংস এবং একটি স্বার্থান্বেষী মহল কর্তৃক দেদারসে নগরীর আশপাশে খাল-বিল-ঝিল ও জলাশয়সমূহ ভরাট করার পরিপ্রেক্ষিতে ১৯৯৬-২০০১ মেয়াদের আওয়ামী লীগ সরকারের শেষ পর্যায়ে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার একান্ত আগ্রহে তখন অনেকটা তড়িঘড়ি করে এই আইনটি প্রণীত হয়। সংক্ষিপ্ত এই আইনটিতে অনেক কিছুই অস্পষ্ট এবং দেশজুড়ে কীভাবে এই আইনটি কার্যকর ও প্রয়োগ করা হবে তা পরিষ্কারভাবে উল্লেখ নেই। ফলে দেশের কোথাও যথাযথভাবে এই আইনটির প্রয়োগ হচ্ছে না এবং গঠিত হয়নি কোনো বাস্তবায়ন কর্তৃপক্ষও। স্বাভাবিকভাবে প্রণীত হয়নি আইনটির প্রয়োজনীয় বিধিবিধানও।
ঢাকার মহাপরিকল্পাভুক্ত এলাকায় আইনটি প্রয়োগের দায়িত্ব রাজউকের ওপর অর্পণ করা হয়, কিন্তু রাজউকের বিভিন্ন সীমাবদ্ধতার কারণে আইনটির কার্যকর প্রয়োগ হচ্ছে না। আবার এটি একটি সর্বজনীন আইন হলেও সরকারের অন্যান্য দপ্তর, অধিদপ্তর, সংস্থা ও স্থানীয় কর্তৃপক্ষ তা অনুসরণ করে না। এর পেছনে বড় ধরনের অস্পষ্টতার কারণ হলো, আইনটিতে উন্মুক্ত স্থান ও প্রাকৃতিক জলাধারের সংজ্ঞা নিয়ে। ‘উন্মুক্ত স্থান’ বলতে মাস্টারপ্ল্যানে চিহ্নিত বা সরকার কর্তৃক গেজেটে প্রজ্ঞাপন দ্বারা ঘোষিত এমন কোনো স্থান, যা দীর্ঘদিন ধরে কোনো না কোনোভাবে জনসাধারণ কর্তৃক ব্যবহার হয়ে আসছে, সেসব জায়গাকে বোঝাবে। অথচ ঢাকাসহ দেশের কোনো স্থানে এভাবে মহাপরিকল্পনা বা স্থানীয় পরিকল্পনায় সুস্পষ্টভাবে ও গেজেটের মাধ্যমে পার্ক, মাঠ ইত্যাদি চিহ্নিত করা নেই। আর দেশের প্রায় জায়গার তো আজ অবধি উন্নয়ন বা ভূমি ব্যবহার পরিকল্পনা প্রণয়ন ও অনুমোদন হয়নি, যার কারণে কোথাও উন্মুক্ত স্থানের কাক্সিক্ষত সংরক্ষণ ও রক্ষণাবেক্ষণ হচ্ছে না। অনুরূপভাবে অস্পষ্টতা বিরাজ করছে ‘প্রাকৃতিক জলাধার’ এর সংজ্ঞা নিয়ে, যার কারণে দেশের কোথাও আইনটির কার্যকর প্রয়োগ নেই। উদ্ভূত অবস্থায় এই আইনটিতে যথাযথ সংশোধনী এনে রাজধানী ঢাকাসহ দেশের সর্বত্র পার্ক-মাঠ, লেক-জলাধার ও অন্যান্য খোলা জায়গার যথাযথভাবে সংরক্ষণ ও রক্ষণাবেক্ষণের নিমিত্তে আলাদাভাবে একটি কর্তৃপক্ষ গঠনের প্রয়োজন, যার আওতায় দক্ষিণ ঢাকার ‘জল-সবুজের ঢাকা’ প্রকল্পটিকে পাইলট প্রকল্প হিসেবে গ্রহণ করা যেতে পারে।
প্রকাশকাল: বন্ধন, ৮১তম সংখ্যা, জানুয়ারি ২০১৭।