(রিহ্যাব)-এর ভাইস প্রেসিডেন্ট লিয়াকত আলী ভূঁইয়া
আবাসন শিল্পে রিহ্যাবের গৃহঋণ নাগরিকদের স্বস্তি দেবে

লিয়াকত আলী ভূঁইয়া। রিয়েল এস্টেট হাউজিং অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (রিহ্যাব)-এর ভাইস প্রেসিডেন্ট। সফল ব্যবসায়ী। ব্রিক ওয়ার্ক ডেভেলপমেন্ট লিমিটেডের চেয়ারম্যান। পরিচালক, ঢাকা টেক্সটাইল সিস্টেম প্রাইভেট লিমিটেড। এ ছাড়া এফবিসিসিআইয়ের ক্যাপাসিটি বিল্ডিংয়ের স্ট্যান্ডিং কমিটির চেয়ারম্যান। বাংলাদেশ চেম্বার অব কর্মাস ইন্ডাস্ট্রিজের সাবেক সভাপতি। বাংলাদেশ রেশমশিল্প মালিক সমিতির সহসভাপতি। দীর্ঘদিন ব্যবসার সঙ্গে জড়িত থাকায় জড়িয়ে আছেন বেশকিছু ব্যবসায়ী সংগঠনের সঙ্গে। সামাজিক অনেক কাজেও রয়েছে সমান অংশগ্রহণ। যুক্ত আছেন নিরাপদ সড়ক চাই আন্দোলনে, সদস্য হিসেবে কাজ করছেন বনানী ক্লাবে। খেলাধুলা-বিষয়ক পত্রিকা ক্রীড়াজগৎ-এর নিয়মিত লেখক। রিহ্যাবের বর্তমান পরিস্থিতি, হরতাল-অবরোধে আবাসনশিল্পের এখনকার অবস্থা জানাতে কথা বলেছেন বন্ধন-এর সঙ্গে। সাক্ষাৎকার নিয়েছেন আনিস রহমান

হরতাল-অবরোধের কারণে আবাসনশিল্পের বর্তমান পরিস্থতি সম্পর্কে জানতে চাই?

হরতালের কারণে শুধু এ শিল্প নয়, সব ধরনের শিল্প, শ্রেণি ও পেশার মানুষই ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন। আর প্রচণ্ডভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে আবাসনশিল্প। কতিপয় রাজনৈতিক দলের ডাকা টানা অবরোধ-হরতালের ৪৬ দিনে আবাসন খাতের ক্ষতি এক হাজার ৬৫৬ কোটি টাকা। রাজনৈতিক অস্থিরতায় এ খাতের প্রায় ২৫ হাজার কোটি টাকার অধিক বিনিয়োগ আজ হুমকির মুখে। এ অবস্থা চলতে থাকলে আবাসনসংশ্লিষ্ট প্রায় ২০০-র বেশি সহযোগী শিল্পপ্রতিষ্ঠানের ব্যবসায়ীরা নিঃস্ব হয়ে যাবেন। হরতাল-অবরোধের কারণে শ্রমিকদের জীবন-জীবিকার পাশাপাশি বিনিয়োগ এখন মারাত্মক ঝুঁকিতে।

ইতিমধ্যে বেশ কিছু নির্মাণপণ্যের দাম বেড়েছে। আপনাদের ব্যবসায় এই মূল্যবৃদ্ধির প্রভাব সম্পর্কে বলবেন?

অন্য সব ব্যবসায়ীর মতো রাজনৈতিক অস্থিরতায় আবাসন খাত ও আবাসন খাতের সঙ্গে সম্পর্কিত দুই শতাধিক সহযোগী খাত পড়েছে চরম সংকটে। ইতিমধ্যে প্রতি টন রডের দাম বেড়েছে । এভাবে সব ধরনের নির্মাণপণ্যের দাম কমবেশি বেড়েছে। জ্বালানির অভাবে পুড়ছে না ইট। অন্যদিকে আশঙ্কাভাবে ব্যাহত হচ্ছে বালু, পাথর, সিমেন্টসহ নির্মাণসামগ্রীর সরবরাহ। যার ফলে আবাসনশিল্পের নির্মাণকাজের গতি কমছে আশঙ্কাজনক হারে। ইট, বালু, পাথর, সিমেন্ট, রড, রং, বৈদ্যুতিক তার, টাইলস ইত্যাদি ব্যবসায় পড়ছে নেতিবাচক প্রভাব। ব্যবসায়ীদের পিঠ এখন দেয়ালে ঠেকে গেছে। চলমান সংকটের সমাধান না হলে শুধু আবাসনশিল্পই নয়, এর নেতিবাচক প্রভাব থেকে রেহাই পাবে না অন্য সহযোগী শিল্পও। এ কারণে অনেক ডেভেলপার প্রতিষ্ঠানসহ লিঙ্কেজ প্রতিষ্ঠান বন্ধ হওয়ার উপক্রম।

নির্দিষ্ট সময়ে প্লট বা ফ্ল্যাট বুঝিয়ে দেওয়ার একটি বিষয় থাকে আবাসন ব্যবসায়। এটাকে এখন  কীভাবে মোকাবিলা করছেন আপনারা?

কিছুই বলতে পারছি না। নানা সংকটের মাঝেও আমরা কাজ করাচ্ছি। নির্দিষ্ট সময়ে হস্তান্তরের চেষ্টা করছি। এখনই এর প্রভাব পড়বে না। এটা বোঝা যাবে আরও পরে। তবে সংকট আছে কিছুটা, যা বাড়ছে আরও। আমাদের বিষয়টা অনুধাবন করার মতো কাউকে পাচ্ছি না। সময়মতো যদি ক্রেতাদের ফ্ল্যাট না বুঝিয়ে দিতে পারি, তার দায় কে নেবে? এখানে ব্যাপারটা অর্থনৈতিক। হরতাল-অবরোধের কারণে ক্রয়-বিক্রয়, মূল্য আদায় বা আর্থিক লেনদেন এখন সর্বনিম্ন পর্যায়ে পৌঁছেছে। এই অবস্থায় লাখ লাখ শ্রমিকের ভাগ্য অনিশ্চিত। কেবল শ্রমিকই নয়, এ খাতে কর্মরত বিশাল জনগোষ্ঠী। হরতাল-অবরোধ বন্ধ করা না হলে আমাদের সংকট আরও বাড়বে। এর বিরূপ প্রভাবে একদিকে ঋণের বোঝা বাড়বে, অন্যদিকে উল্লেখযোগ্যসংখ্যক শ্রমিক হয়ে পড়বেন বেকার।

আবাসনশিল্পের সঙ্গে কিছু সহযোগী প্রতিষ্ঠান যুক্ত। এতে তারাও সমভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। এ বিষয়ে জানতে চাই?

উৎপাদনশীল খাতে মোট ৪২ হাজার ৫৯২টি শিল্প-কারখানা এবং গৃহনির্মাণ খাতের স্থবিরতার কারণে বিপাকে পড়েছে ১২ হাজারের মধ্যে ২৮ শতাংশ শিল্প-কারখানা। অর্থনীতিবিধ্বংসী এই রাজনৈতিক সহিংসতা বিদ্যমান থাকলে তা আরও বাড়বে। এই সমস্যার সমাধান এখনই প্রয়োজন। দেশ-বিদেশের নানা মহল, বিশেষ করে ব্যবসায়ীরা এতে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন সবচেয়ে বেশি।

আবাসনশিল্পের এই মুহূর্তের ক্ষতি কী কী?

ইট, বালু, সিমেন্ট, পাথর ও রড আবাসনশিল্পের সঙ্গে সরাসরি জড়িত। এ ছাড়া বেশ কিছু শিল্প  এ খাতের সঙ্গে যুক্ত। আমরা জানি, বিশ্বব্যাপী নির্মাণশিল্পে চলছে স্থবিরতা। বড় বড় দেশ বর্তমান নগরায়নের বদলে নিজেদের ব্যাংকগুলোকে অর্থ দিয়ে টিকিয়ে রাখার প্রচেষ্টা নিচ্ছে। এ সময়ে বাংলাদেশ থেকে যেসব শ্রমিক নগরায়নের সহায়ক শক্তি হিসেবে কাজ করতেন, এখন কিন্তু এ চিত্রটা সম্পূর্ণ বিপরীত। যেসব শ্রমিক ঢাকায় থাকতেন, তাঁদের অধিকাংশ গ্রামে গিয়ে অন্য কাজ করছেন। আমরা কাজ করতে পারছি না প্রয়োজনীয় নির্মাণসামগ্রীর অভাবে। যার ফলে আশঙ্কা করছি বড় একধরনের ক্ষতির। আমাদের হিসাবে হরতাল-অবরোধে নির্মাণশিল্পে প্রতিদিন ক্ষতি হচ্ছে ৩৬ কোটি টাকা। ফলে টানা অবরোধে এ পর্যন্ত এ খাতে ক্ষতির পরিমাণ দাঁড়িয়েছে এক হাজার ৮০ কোটি টাকা। এদিকে জিডিপিতে আবাসন খাতের অবদান ৬ দশমিক ৯৫ শতাংশ। টাকার হিসাবে এ অবদান ৯১ হাজার ৬৮ কোটি টাকা।

বেশ কিছু দিন ধরে আবাসন শিল্পে মন্দাভাব ছিল, আবাসনশিল্পের বর্তমান অবস্থা কী?

দুই বছর ধরে আবাসন খাতে চলছে বিরাট মন্দা। ব্যবসা যখন একটু ভালো হচ্ছিল, ঠিক তখনই এ বছরের রাজনৈতিক অস্থিরতার প্রভাবে সেই চাঙাভাব আবারও হারাচ্ছে। আমরা অনেকটাই ঘুরে দাঁড়িয়ে ছিলাম। আবারও একটা চরম অনিশ্চয়তার ভেতর দিয়ে যাচ্ছি। যার প্রভাব আবাসনশিল্পে পড়ছে সরাসরি। এ রকম চলতে থাকলে আবাসনশিল্প আবার আগের অবস্থায় ফিরে যাবে। আমাদের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট শিল্পগুলোও মুখ থুবড়ে পড়বে। আমরা সবাই জানি, যুক্তরাষ্ট্রের ৯/১১-তে অর্থনীতিতে যে ধস নেমেছিল, তার প্রধান থাবা ছিল রিয়েল এস্টেট ব্যবসায়। আর আবাসনশিল্পের ওপর ধস নামলে দেশের অর্থনীতির ওপর বেশ চাপ পড়ে।

সারা দেশে পরিকল্পিত আবাসনের একটি প্রজেক্টের কথা শোনা যায়। সে সম্পর্কে কিছু বলুন?

আপনারা জানেন, বর্তমান সরকার দেশের সব নাগরিকের জন্য মানসম্মত আবাসন এবং আগামী প্রজন্মের জন্য বসবাসযোগ্য নগর ও গ্রাম গড়ে তুলতে বদ্ধপরিকর। দেশের একটি মানুষও গৃহহীন থাকবে না। প্রতিটি গ্রামে পরিকল্পিত আবাসন গড়ে তোলার পরিকল্পনা বাস্তবায়নের কাজ চলছে জোরের সঙ্গে। সব শ্রেণির মানুষের জন্য আবাসনসুবিধা নিশ্চিত করতে সব ধরনের প্রচেষ্টা অব্যাহত রেখেছে সরকার। ভূমির সুষ্ঠু ব্যবহার ও উন্নয়নের মাধ্যমে সুপরিকল্পিত গৃহায়ণ এবং নগরায়নের সেবাকে এগিয়ে নিতে সরকার নিচ্ছে নানা পরিকল্পনা। গ্রামের মাঠ আর বাড়ির পরিকল্পনাও আমরা করে দেওয়ার চিন্তা করছি। এতে কমবে যত্রতত্র ভূমির ব্যবহার।

সরকারের পক্ষ থেকে আবাসনশিল্পের উন্নয়নে কী ব্যবস্থা নেওয়া যেতে পারে বলে আপনি মনে করেন?

দেশের গৃহায়ণ সমস্যার সমাধানের জন্য সরকারি পর্যায়ে গৃহায়ণ ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয় এবং জাতীয় গৃহায়ণ কর্তৃপক্ষের রয়েছে বিভিন্ন প্রকল্প। আপনারা জানেন, গৃহায়ণে ঋণ প্রদান করে সরকারি ও বেসরকারি প্রতিষ্ঠান। তবে আমরা এ মুহূর্তে সরকারের কাছে অনেক প্যাকেজ চেয়েছি। ২০০৯ সালে সরকার আবাসনের জন্য একটি সহজ ঋণপদ্ধতি চালু করেছিল। এ ধরনের ঋণ কিন্তু পৃিথবীর সব জায়গাতেই আছে। যার ফলে সবাই সাধ্যমতো ঋণ নিয়ে বাড়ি কিংবা গাড়ি কিনতে পারেন। আমাদের দেশে এ ধরনের ঋণ আবার চালু রাখার জন্য সরকারের কাছে অনুরোধ করেছি। এ লক্ষ্যে পূর্তমন্ত্রী কাজ করে যাচ্ছেন। খুব কম সময়ের মধ্যেই আমরা এ ধরনের ঋণসুবিধা পাব বলে আশা করছি।

ঋণ গ্রহণ করে যাঁরা বাড়ি করার পরিকল্পনা করছেন, তাঁদের জন্য সরকারের পক্ষ থেকে কী ধরনের সহায়তা দেওয়া প্রয়োজন বলে আপনি মনে করেন?

বাড়ি করার জন্য যেসব প্রতিষ্ঠান ঋণ প্রদান করে থাকে, আমি মনে করি সেগুলো উপযুক্ত পরিমাণে নেই। আবার যে পরিমাণ সুদ নেওয়া হয় তা একজনের জন্য খুবই কঠিন। এ জন্য অমি এ ধরনের ঋণ নেওয়া থেকে বিরত থাকতে বলি। সরকার যদি আরও শক্তভাবে এই কাজটি এগিয়ে নিতে পারে, তবে ভালো হয়। বিশেষ করে সুদের হার কমাতে হবে। আমাদের পক্ষ থেকে সরকারের কাছে আবাসনের ক্ষেত্রে ঋণের জন্য একটি প্যাকেজ পরিকল্পনা দেওয়া আছে। আবাসনের ক্ষেত্রে সরকার রিহ্যাবের গৃহঋণের প্যাকেজ প্রস্তাবটি বাস্তবায়ন করলে নাগরিকরা বেশ কিছু সুবিধা পাবে।  

নতুন উদ্যোক্তাদের উদ্দেশ্য ও আবাসনশিল্পের সম্ভাবনা সম্পর্কে কিছু বলুন?

আমি মনে করি, আবাসনশিল্পে নতুন উদ্যোক্তাদের জন্য রয়েছে অনেক সম্ভাবনা। অনেক তরুণ উদ্যোক্তা এগিয়ে আসছেন এবং অনেকে অনেক ভালো করছেন। অনেক উদ্যোক্তা ব্যবসা শুরু করেই শ্রমিকদের নানা ধরনের প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করছেন। তাঁরা ভালো করছেন। আবার এই শ্রমিকেরাও দেশের বাইরে কাজের সুযোগ পাচ্ছেন। আমরা যে শ্রমিক দিয়ে কাজ করি, তার অধিকাংশই অদক্ষ। তাঁরা আমাদের সঙ্গে কাজ করতে করতে দক্ষতা অর্জন করেন। দক্ষতা অর্জন করায় দেশে ও দেশের বাইরে গিয়ে অনেকে সুনাম অর্জন করছেন। আমি বলব, আবাসনশিল্প দক্ষ জনশক্তি রপ্তানি করতে অনেক ভূমিকা রাখে। নতুন কর্মীদের জন্য রিহ্যাবের রয়েছে অনেক পরিকল্পনা।

আবাসনশিল্পের অসাধু ব্যবসায়ীদের বিরুদ্ধে অনেক অভিযোগ, তাঁদের বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে কি?

হ্যাঁ, ভালো-মন্দ সব জায়গাতেই থাকে। অনেকের বাড়ির জায়গাটা ডেভেলপাররা নিয়ে সময়মতো ফ্ল্যাট ও পাওনা বায়নাটা বুঝিয়ে দেন না। অন্য দিকে সময়মতো ফ্ল্যাট হস্তান্তর না করায় ক্রেতা অসন্তুষ্ট হন। অনেকে এক ধরনের ফ্ল্যাট দিতে চেয়ে অন্য ধরনের ফ্ল্যাট দেন। এ ধরনের ব্যবসায়ীদের আমরা জরুরি ভিত্তিতে আইনের আওতায় এনে বিচার করে থাকি। এই বিচারের জন্য কোনো প্রকার টাকা-পয়সা লাগে না। সেই সঙ্গে নিষ্পত্তি করতে সময়ও লাগে কম।

প্রকাশকাল: বন্ধন ৫৯তম সংখ্যা, মার্চ ২০১৫

লিয়াকত আলী ভূঁইয়া
+ posts

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Scroll to Top