বিজিএমইএ ভবন ভাঙা উচিত যে কারণে

আদালতের নির্দেশনা

জমির স্বত্ব না থাকা, জলাধার আইন লঙ্ঘন করা তথা নকশা অনুমোদন ব্যতিরেকে নির্মিত ১৬ তলাবিশিষ্ট বিজিএমইএ ভবনটি ভাঙতে গত ৮ নভেম্বর ২০১৬ তারিখে সুপ্রিম কোর্টের দেওয়া নির্দেশের পূর্ণাঙ্গ রায় প্রকাশিত হয়েছে। রায়ে বিজিএমইএকে অনতিবিলম্বে অবৈধ ভবনটি নিজ খরচে ভেঙে ফেলার জন্য নির্দেশ দেওয়া হয়, অন্যথায় রাজউককে পূর্ণাঙ্গ রায়ের কপি হাতে পাওয়ার ৯০ দিনের মধ্যে ভবনটি ভাঙা শুরুর নির্দেশ দেন এবং এ ক্ষেত্রেও বিজিএমইএকে ভবনটির ভাঙার সমুদয় খরচ বহন করতে হবে। তা ছাড়া ভবনটিতে যাঁরা স্পেস তথা ফ্লোর কিনেছেন, তাঁদেরও ক্ষতিপূরণ প্রদানের জন্য বিজিএমইএকে নির্দেশ প্রদান করা হয়। এর আগে গত ২ জুন ২০১৬ তারিখে সুপ্রিম কোর্ট ২০১১ সালে হাইকোর্টের দেওয়া রায় বহাল রেখে ৯০ দিনের মধ্যে বিজিএমইএকে নিজ খরচে ভবনটি ভেঙে ফেলার নির্দেশ দেন। হাইকোটের ওই রায়ের বিরুদ্ধে বিজিএমইএর দাখিলকৃত লিভ টু আপিল খারিজ করে সুপ্রিম কোর্ট ভবনটির নির্মাণে বিভিন্ন অনিয়ম তুলে ধরে এটিকে ‘হাতিরঝিলের ক্যানসার’ হিসেবে আখ্যায়িত করেন এবং বিশেষ কিছু নির্দেশনাও প্রদান করেন। যেমন-

      ক) জলাধার সংরক্ষণ আইন লঙ্ঘনের জন্য পরিবেশ অধিদপ্তরকে তদন্ত করে দায়ী ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণ করা;

      খ) কীভাবে রাজউক নথিতে ভবনটির নকশা অনুমোদনের জন্য প্রক্রিয়া করেছে এবং কারা এর জন্য দায়ী তা পূর্ত মন্ত্রণালয়কে তদন্তকরত সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণ করা;

      গ) ভবনটি ভাঙার সময় শ্রমিকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা, যাতে র‌্যাংগস ভবনের মতো পরিস্থিতির সৃষ্টি না হয়।

জানামতে, আজ অবধি এই নির্দেশনার কোনোটি প্রতিপালন করা হয়নি। আশ্চর্যের বিষয় হলো, জমির মালিকানা ও নকশা অনুমোদনের বিষয়টি ধামাচাপা দিয়ে ১৯৯৮ সালে এক জাঁকজমকপূর্ণ অনুষ্ঠানের মাধ্যমে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে দিয়ে ভবনটির ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করা হয়। অতঃপর ২০০৬ সালে আরেকটি জাঁকজমকপূর্ণ অনুষ্ঠানের মাধ্যমে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়াকে দিয়ে ভবনটির উদ্বোধন করা হয়। কীভাবে নকশা অনুমোদন ব্যতিরেকে এক প্রধানমন্ত্রীকে দিয়ে ভবনটির নির্মাণকাজ শুরু ও আরেক প্রধানমন্ত্রীকে দিয়ে এই অবৈধ ভবনটির উদ্বোধন করা হলো, তা নিয়ে বরাবর কথা হচ্ছে।

ভবনটি নির্মাণের কথকতা

জানামতে, বিজিএমইএ ভবনটির জমির অংশবিশেষের মালিক বাংলাদেশ রেলওয়ে এবং অবশিষ্ট জমি বেগুনবাড়ী খালের আওতাভুক্ত। অথচ একটা চক্র খালের এই জমির মালিক বনে তা বিজিএমইএর কাছে বিক্রি করে বসে। অন্যদিকে আইন অনুযায়ী যে উদ্দেশ্যে জমি অধিগ্রহণ করা হয়, তা অন্য উদ্দেশ্যে ব্যবহার বা প্রদানের অবকাশ নেই। ১৯১০ সালে ঢাকায় রেল সার্ভিস প্রতিষ্ঠাকালে সে সময় ভবিষ্যতে রেল সার্ভিসের অধিকতর সম্প্রসারণের কথা বিবেচনা করে রেল লাইনের উভয় পাশে প্রয়োজনীয় জমি হুকুমদখল করা হয়। কিন্তু রেলওয়ের অব্যবস্থাপনায় এসব অনেক জমি বিভিন্ন সময়ে বেদখল হয়ে যায়। একইভাবে অনাদিকাল থেকে খাল-নালা-নদীর জমি লিজযোগ্য না হলেও বিভিন্ন সময়ে ভূমি মন্ত্রণালয় বা জেলা প্রশাসন থেকে অনেকে বিভিন্ন কায়দা-কানুন করে বা প্রভাব-প্রতিপত্তির মাধ্যমে বিভিন্ন সময়ে এসব অনেক জমির মালিক বনে যায়। স্বাধীনতার পর সমস্যাটি প্রকট রূপ নেয়, যখন শুধু খাল-নালা নয়, বন্যাপ্লাবিত জমিসহ সরকারের খাসজমিও অনেক বেদখল হতে থাকে।

ওই অবস্থায়, ১৯৮৮ সালের ভয়াবহ বন্যার পর ঢাকার হারিয়ে যাওয়া ও অপ্রবহমান খাল-নালাগুলো পুনরুদ্ধার করে তা খনন ও প্রবাহযোগ্য করার চেষ্টা চলে। তখন কয়েকটি খালের অংশবিশেষ উদ্ধার করা গেলেও নগরীর কেন্দ্রবিন্দুতে হারিয়ে যাওয়া কোনো খাল উদ্ধার করা যায়নি। বরং তখন যেসব খালের অবশিষ্টাংশ ছিল তা ভরাট করে বক্সকালভার্ট ড্রেনেজ নির্মাণ করে বড় ধরনের সর্বনাশ ঘটানো হয়। অতঃপর ১৯৯৮ সালের ভয়াবহ বন্যায় পুরো নগরী আবারও তলিয়ে যায় এবং অনেক জায়গায় নগরবাসীর জীবন হয়ে পড়ে করুণ ও মানবেতর। সোনারগাঁও হোটেলের পেছনে ও পূর্বদিকে বিস্তীর্ণ জমিতে গড়ে তোলা বস্তিগুলো ডুবে গিয়ে ভয়াবহ অবস্থার সৃষ্টি হলে সরকারের সর্বোচ্চ পর্যায়ের নির্দেশে রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (রাজউক) ও জেলা প্রশাসন কর্তৃক সংশ্লিষ্টদের সমন্বয়ে বস্তিবাসী মানুষগুলোকে মিরপুরে সরকারের খাসজমিতে অপসারণের ব্যবস্থা করা হয়। সরকারের আহ্বানে তৎকালীন বিজিএমইএ নেতৃত্ব রাজউককে এ কাজে বিভিন্নভাবে সহায়তা করেছিল। কে জানে, তখন হয়তো-বা ওই সহায়তার বিনিময়ে বিজিএমইএর মধ্যে সময়মতো সরকারের কাছ থেকে কিছু একটা আদায় করে নেওয়ার সিদ্ধান্ত হয়েছিল কি না!

১৯৯৮ সালের বন্যা-উত্তর সোনারগাঁও হোটেলের পেছনের ও পূর্বদিকের জায়গাটির পরিকল্পিত উন্নয়নের প্রচেষ্টা শুরু হয়। রাজউকের পক্ষ থেকে আমি প্রকল্প পরিচালক হিসেবে কাজ করি। তখন জায়গাটির পরিকল্পিত উন্নয়নে বিভিন্ন ধরনের প্রস্তাব উত্থাপিত হতে থাকে। অনেকে সেখানে বহুতলবিশিষ্ট টুইন টাওয়ার ও আন্তর্জাতিক মানের  শপিং কমপ্লেক্স নির্মাণের প্রস্তাব করে। কিন্তু পরিবেশবিদ ও সুশীল সমাজের প্রস্তাব ছিল, জায়গাটি উন্মুক্ত রাখা হোক এবং এটি পূর্বদিকে হাতিরঝিল এলাকা পর্যন্ত সম্প্রসারিত করে একটা সমন্বিত লেক ও সবুজ বলয় গড়ে তোলা হোক। তবে এর মধ্যে সোনারগাঁও হোটেলসংলগ্ন জায়গাটি যাতে পুনরায় আবারও বেহাত না হয়ে যায়, সেজন্য রাজউকের পক্ষ থেকে সেখানে জমি হুকুমদখলের প্রস্তাব দেওয়া হয়। সে অনুসারে একটা প্রকল্প ছক (ডিপিপি) তৈরি করে সরকারের বিবেচনা ও অনুমোদনের জন্য পেশ করা হয়। ভাগ্য ভালো, প্রস্তাবটি অনুমোদিত হয়। কিন্তু জমি অধিগ্রহণের বিষয়টি মন্ত্রণালয়ে প্রক্রিয়াকালে বিজিএমইএ নেতৃত্বের লম্বা হাতের প্রভাবে শুধু সোনারগাঁও হোটেলের দক্ষিণাংশের জমি অধিগ্রহণ করা সম্ভবপর হয়। অর্থাৎ পূর্বদিকের জমি হুকুমদখলের জন্য বিবেচিত হয়নি, যা আমরা আগে থেকেই কিছুটা ধারণা করছিলাম! বিষয়টি স্পষ্ট হয়ে যায়, যখন তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে দিয়ে পান্থপথের ধারঘেঁষে বিজিএমইএ ভবনের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপনের ব্যবস্থা করা হয়। আর পরের দিন কয়েকটি পত্রিকায় হেডলাইন হয়, নকশা অনুমোদনের পূর্বে কীভাবে প্রধানমন্ত্রী বিজিএমইএ ভবনটির ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করলেন?

তবে আগে থেকে ওই স্থানে সোনারগাঁও হোটেলের এক্সটেনশন করা এবং ওয়ার্ল্ড ট্রেড সেন্টার নির্মাণের জন্য জমি বরাদ্দ চেয়ে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানসমূহের পক্ষ থেকে চেষ্টা চলতে থাকে। ২০০৬ সালে প্রস্তাবিত ওয়ার্ল্ড ট্রেড সেন্টার নির্মাণের জন্য রেলওয়ের কিছু জমি রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরোকে দেওয়া হয়। পরে বিজিএমইএর প্রভাব-প্রতিপত্তিতে ওই জায়গাটি রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরো (ইপিবি) থেকে নিজেদের দখলে নিয়ে বিজিএমইএ নেতৃত্ব সেখানে তাদের ভবন নির্মাণের পরিকল্পনা করে। হাইকোর্টের রায়ে প্রকাশ, বিজিএমইএ এ ক্ষেত্রে মিথ্যার আশ্রয় নিয়েছে এবং তারা ২০০১ সালে জমিটি ইপিবি থেকে ক্রয় করেছে মর্মে দলিল তৈরি করে। হাইকোর্টের রায়ে, ইপিবি ও বিজিএমইএ কেউই এই জমির মালিক নয় বলে স্পষ্টভাবে উল্লেখ করা হয়।

হাইকোর্ট এও মন্তব্য করে যে বিজিএমইএ দেশের সব আইন লঙ্ঘন করে ভবনটি নির্মাণ করেছে। মিথ্যা তথ্য দিয়ে কিছু দপ্তরের ছাড়পত্র গ্রহণ করে এবং পাশাপাশি নকশা অনুমোদন ব্যতিরেকে ভবনের নির্মাণকাজও শুরু করে বসে, যা ছিল দেশের আইনকানুনের প্রতি বৃদ্ধাঙ্গুলি প্রদর্শনের শামিল। আসলে তখনকার বিজিএমইএ নেতৃত্বের মধ্যে এত বেশি আত্মপ্রত্যয় এসে গিয়েছিল যে তারা নকশা অনুমোদন করে ইমারত নির্মাণ করাকে প্রয়োজনই মনে করেনি! এ ব্যাপারে রাজউকের পক্ষ থেকে বিজিএমইএর বিরুদ্ধে জলাধার আইন লঙ্ঘন ও ইমারত নির্মাণ আইনে মামলা করা হলে বিজিএমইএ নেতৃত্ব এসব বিষয় গোপন রেখে তড়িঘড়ি করে ভবনটির নির্মাণ শেষে তা তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়াকে দিয়ে উদ্বোধনের ব্যবস্থা করেন। অন্যদিকে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বরাবর খাল, নদী ও জলাধার দখল ও ভরাটের বিরুদ্ধে সোচ্চার এবং তাঁর ব্যক্তিগত আগ্রহে ২০০০ সালে জলাধার সংরক্ষণ আইনটি অনুমোদিত হয়। অতঃপর ২০০৯ সালে দ্বিতীয় মেয়াদে ক্ষমতায় আসার পর তিনি বিজিএমইএ কর্তৃক আয়োজিত এক অনুষ্ঠানে বেগুনবাড়ী খালের ওপর এই ভবনটির নির্মাণে সমালোচনা করে এটিকে হাতিরঝিল প্রকল্পে ‘বিষফোঁড়া’ বলে মন্তব্য করেন।

উইকিপিডিয়া

হাতিরঝিল প্রকল্প ও বিজিএমইএ ভবন

বাস্তবে বেগুনবাড়ী খালের ওপর বিজিএমইএ ভবনটির নির্মাণের কারণে সেখানে পানিপ্রবাহ বাধাগ্রস্ত হয়, যা নিয়ে বরাবর সর্বমহলে আলোচনা-সমালোচনা চলে আসছিল। পাশাপাশি বিএনপি জোট সরকারের আমলে আর কিছু প্রভাবশালী লোকজন (যাঁদের ‘ভূমিদস্যু’ বলা হয়) কর্তৃক রামপুরা খালের ওপরের অংশে (হাতিরঝিলে) ও নিচের জমিতে কয়েকটি আবাসন প্রকল্পও গ্রহণ করে বসেন এবং কেউ কেউ তো পত্রিকায় বিজ্ঞাপন দিয়ে প্লট বিক্রিও শুরু করে দেন। দৃশ্যত, বিএনপি জোট সরকারের কিছু নীতিনির্ধারককে এসব লোকজনের প্রতি দুর্বল প্রতীয়মান হয়! তবে রাজউকের পক্ষ থেকে সংশ্লিষ্ট সবার বিরুদ্ধে জলাধার সংরক্ষণ আইনে মামলা রুজু করে রাখা হয়। অন্যদিকে সে সময় নগরীর পূর্ব-পশ্চিম যোগাযোগব্যবস্থা সহজীকরণের নামে ঢাকা সিটি করপোরেশন কর্তৃক পান্থপথ সড়কটি পূর্বদিকে সম্প্রসারণের নামে হাতিরঝিলের জলাশয়ের ওপর দিয়ে একটি ফ্লাইওভার নির্মাণেরও প্রস্তাব করা হয়। বিষয়টির ওপর প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে ‘ঢাকা শহরে সুশাসন ও উন্নয়ন’ শীর্ষক সভায় আলোচনাকালে রাজউকের পক্ষ থেকে আপত্তি করা হয়, যখন সোনারগাঁও হোটেলের পেছন থেকে শুরু করে রামপুরা খাল পর্যন্ত বিস্তীর্ণ জমির সমন্বিত উন্নয়নে বুয়েটকে দিয়ে একটি বিস্তারিত সমীক্ষা পরিচালনার জন্য রাজউককে নির্দেশ দেওয়া হয়।

সে সময় নকশা অনুমোদন ব্যতিরেকে বিজিএমইএ ভবনটির নির্মাণ নিয়ে প্রচণ্ড সমালোচনার মুখে বিজিএমইএর পক্ষ থেকেও যেকোনো শর্তে ভবনটির নকশা অনুমোদনের জন্য সর্বাত্মক চেষ্টা চলছিল। এর মধ্যে হাতিরঝিল প্রকল্পের প্রকল্প পরিচালক হিসেবে আমি বিজিএমইএ ভবনটির অবস্থান চিহ্নিতকরণ ও মতামত প্রদানের জন্য বিষয়টি বুয়েটের দৃষ্টিতে নেই। প্রতিউত্তরে বুয়েট কর্তৃপক্ষ তাদের সমীক্ষা শেষ না হওয়া পর্যন্ত সেখানে কোনো নকশা অনুমোদন না করার জন্য রাজউককে অনুরোধ করে, ফলে বিজিএমইএ ভবনটির নকশা অনুমোদনের বিষয়টি ঝুলে যায়। ওই অবস্থায় ২০০৭ সালে সেনা-সমর্থিত তত্ত্বাবধায়ক সরকার দায়িত্ব গ্রহণের পর রাজধানীর বুকে বিভিন্ন সময়ে প্রভাব কাটিয়ে বা অবৈধভাবে যেসব বহুতল ইমারত নির্মিত হয়েছে ও হচ্ছিল তার তালিকা প্রণয়ন ও সুপারিশ প্রদানের জন্য একটি বিশেষ টাক্সফোর্স গঠন করা হয়। তখন র‌্যাংগস ভবন নিয়ে সর্বোচ্চ আদালতে থাকা মামলাটির ত্বরিত নিষ্পত্তির মাধ্যমে ভবনটি ভাঙার সিদ্ধান্ত হয়। কিন্তু তড়িঘড়ি করে ভবনটি ভাঙতে গিয়ে অনেক শ্রমিক নিহত ও আহত হলে দেশজুড়ে আলোচনা-সমালোচনার মুখে অপরাপর অবৈধ ভবন ও স্থাপনা ভাঙার কার্যক্রম স্থগিত হয়ে যায়।

তবে সে সময় একটা যুগান্তকারী সিদ্ধান্ত হয়েছিল যে সেনাবাহিনীর সহায়তায় হাতিরঝিল প্রকল্পটির বাস্তবায়ন করা। আর স্থানীয় অনেক বাধা-বিপত্তির মধ্যেও সেনাবাহিনীর ইঞ্জিনিয়ারিং কোর যথাত্বরিত প্রকল্পটির কাজ হাতে নিয়ে বসে। সত্যিকার অর্থে, সেনাবাহিনীর সম্পৃক্ততা ছাড়া হাতিরঝিল প্রকল্পটির বাস্তবায়ন ছিল অসম্ভব। সেনাবাহিনী প্রকল্পটির পূর্বদিক থেকে অর্থাৎ রামপুরা এলাকা থেকে শুরু করে পর্যায়ক্রমে পশ্চিম দিকে এগোতে থাকে, আর তখন প্রকল্পস্থিত বেগুনবাড়ী খালের মধ্যে নির্মিত বিজিএমইএ ভবনটি নিয়ে বিভিন্ন পর্যায়ে নতুন করে আলোচনা-সমালোচনা শুরু হয়। ২০১০ সালে একটি দৈনিক পত্রিকায় প্রকাশিত প্রতিবেদনের প্রতি জনৈক আইনজীবী কর্তৃক বিষয়টি হাইকোর্টের নজরে আনার পর হাইকোর্ট স্বতঃপ্রণোদিত হয়ে রুল জারি করেন। বিষয়টির বিস্তারিত পর্যালোচনা ও মতামত প্রদানের জন্য কয়েকজন অ্যামিকাস কিউরি নিয়োগ দেওয়া হয়। এতদ্বিষয়ে বিজিএমইএ ও সরকার পক্ষের বক্তব্য এবং অ্যামিকাস কিউরিদের মতামত শোনার পর ২০১১ সালের ৩ এপ্রিল তারিখে হাইকোর্ট বিজিএমইএ ভবনটিকে সম্পূর্ণ অবৈধভাবে নির্মিত ঘোষণা করে এটি নিজ ব্যয়ে বিজিএমইএকে ভেঙে ফেলার নির্দেশ দেন।

হাইকোর্টের ওই আদেশের বিরুদ্ধে বিজিএমইএ সুপ্রিম কোর্টে আপিল করলে গত ২ জুন ২০১৬ তারিখে প্রধান বিচারপতির নেতৃত্বে সর্বোচ্চ আদালত হাইকোর্টের পূর্বেকার রায় বহাল রেখে জায়গাটি পূর্বাবস্থায় ফেরত আনার জন্য পুনর্নির্দেশ প্রদান করেন। এই অবস্থায় এখন ভবনটি ভেঙে ফেলা ছাড়া কোনো গত্যন্তর নেই, যদিও শোনা যাচ্ছে যে বিজিএমইএর পক্ষ থেকে রিভিউ পিটিশন করে শেষ চেষ্টা চালানো হবে। এও প্রকাশ, প্রভাবশালী বিজিএমইএ নেতৃত্ব ভবনটি না ভাঙার জন্য রাষ্ট্রপতির অনুকম্পা লাভেও চেষ্টা চালাচ্ছেন এবং দুই-তিন বছর সময় প্রার্থনা করবেন। বাস্তবে হাতিরঝিল প্রকল্প এলাকায় বেগুনবাড়ী খালের প্রবাহ বন্ধ করে দাঁড়িয়ে থাকা এই ভবনটি কোনো বিবেচনায় রেখে দেওয়ার যুক্তি নেই। এতে একদিকে যেমন বেগুনবাড়ী খালে পানিপ্রবাহে জটিলতা তৈরি হবে, অন্যদিতে তেমনি নগরীর বিভিন্ন স্থানে অপরাপর অবৈধ দখলদার ও ইমারত নির্মাণকারীরাও সুযোগ খুঁজবেন।

আরও প্রকাশ, বিষয়টি হাইকোর্টে বিচারাধীন থাকাকালে এবং অতঃপর সর্বোচ্চ আদালতে আপিল শুনানিকালেও বিজিএমইএর আইনজীবীরা রাজউক কর্তৃক ভবনটির নকশা অনুমোদন করা হয়েছে বলে দাবি করলে রাজউকসহ সরকারপক্ষ ও বিজিএমইএর আইনজীবীদের মধ্যে তুমুল বাগ্বিতণ্ডা হয়। রাজউকের পক্ষ থেকে বলা হয়, বিজিএমইএ ও তাদের শুভাকাঙ্খীদের প্রচণ্ড চাপের মুখে রাজউকের নথিতে বিভিন্ন শর্তাধীনে সংশ্লিষ্ট বিল্ডিং কনস্ট্রাকশন কমিটি নকশাটি অনুমোদনের জন্য প্রক্রিয়া করলেও বিজিএমইএকে অনুমোদিত কোনো নকশার কপি সরবরাহ করা হয়নি। বরং হাতিরঝিল প্রকল্পের সুষ্ঠু বাস্তবায়নের স্বার্থে রাজউক থেকে দফায় দফায় অবৈধ ভবনটি ভেঙে ফেলার জন্য বিভিন্ন ধরনের অনুরোধপত্র ও নোটিশ প্রদান করা হয়। কিন্তু বিজিএমইএ রাজউকের অনুরোধ ও নির্দেশে সাড়া না দিয়ে অনড় অবস্থানে থাকে। এ জন্য সম্ভবত (!) হাইকোর্ট সার্বিক অনিয়মের বিষয়টি প্রত্যক্ষ করে রায়ে উল্লিখিত কিছু কঠিন নির্দেশনা প্রদান করে বসেন, যা নিয়ে বর্তমানে বিভিন্ন পর্যায়ে বেশ কানাঘুষা চলছে। কারণ এতে অনেকের ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।

কীভাবে ভবনটি ভাঙা উচিত

খবর বলছে, সর্বোচ্চ আদালতের নির্দেশনার পর রাজউক বিজিএমইএ ভবনটি ভাঙার লক্ষ্যে কিছুটা আগাম প্রস্তুতি নিতে শুরু করেছে। কীভাবে ভাঙা হবে তার পরিকল্পনা ও সম্ভাব্য ব্যয় প্রাক্কলনের কাজ চলছে। আগে উল্লেখ করেছি, ২০০৭ সালে সর্বোচ্চ আদালত কর্তৃক র‌্যাংগস ভবনটি অবৈধ ঘোষণার পর রাজউক তড়িঘড়ি করে গতানুগতিক পদ্ধতিতে (Conventionl System) একজন অনভিজ্ঞ ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানকে দিয়ে ভবনটি ভাঙতে গিয়ে অনেক শ্রমিক মারা যান। সেই বিবেচনায় হয়তো-বা এবার বিজিএমইএ কর্তৃক নির্মিত এই অবৈধ ভবনটি ভাঙার দায়িত্ব তাদের ওপর অর্পণ করা হয়েছে। বিজিএমইএ ব্যর্থ হলে রাজউক কীভাবে ভবনটি ভাঙবে তাও এখনো সিদ্ধান্ত হয়নি। তবে যেহেতু ভবনটি নগরীর অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ জায়গায় অবস্থিত, সেহেতু এটি Conventional System-এ ভাঙতে গেলে একই ধরনের ভুলের পুনরাবৃত্তিসহ জানমালের ক্ষয়ক্ষতির আশঙ্কা রয়েছে। কাজেই এটি আধুনিক পদ্ধতিতে অর্থাৎ Controlled Demolition করা নিরাপদ ও সঠিক হবে। এই প্রক্রিয়ায় স্বল্পতম সময়ের মধ্যে ভবনটি ভাঙার কৌশল ও পরিকল্পনা দেশের প্রকৌশল সমাজের জানা ও অভিজ্ঞতা অর্জনের সুযোগ সৃষ্টিসহ আধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহারে উৎসাহিত করবে।

প্রকাশকাল: বন্ধন, ৮০তম সংখ্যা, ডিসেম্বর ২০১৬।

প্রকৌশলী মো. এমদাদুল ইসলাম
+ posts

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Scroll to Top