ফুটপাত মানে পায়ে হাঁটার পথ (Walkways)। স্থান ও ক্ষেত্রমতো এর বিকাশ ও পরিচিতি ঘটে বিভিন্নভাবে। যেমন- Sidewalks, Lane-Bylane, Byways, Townpaths, Green lanes, Bridleways ইত্যাদি। Bridleways হলো জীবজন্তুদের, বিশেষ করে ঘোড়ার হাঁটার পথ। অনুরূপ অনেক জায়গায় অন্যান্য পোষ্য জন্তুরও (গরু, মহিষ, গাধা ইত্যাদির) রয়েছে ভিন্ন চলার পথ। বন-জঙ্গলের অভ্যন্তরেও জীবজন্তুদের রয়েছে আলাদা আলাদা হাঁটাচলার পথ। জমির আইলও একধরনের ফুটপাত। আদিম যুগে তো মানুষ আর জীবজন্তুরা অনেক জায়গায় একই পথ দিয়ে হাঁটত, করত চলাচল। বাস্তবে সভ্যতা ও নগরায়ণের বিকাশধারায় রাস্তা-সড়ক, লেক-খাল-নদী, খোলা জায়গা বা পার্কের ধারে ও জনপদে চলাচলের জন্য পরিকল্পিতভাবে ফুটপাত নির্মাণের সংস্কৃতি চালু হয় সময়ের সঙ্গে সঙ্গে উত্তরোত্তর পরিসর উন্নত ও বিকশিত হতে থাকে। এভাবে একপর্যায়ে মানুষের নিরবচ্ছিন্নভাবে চলাচলে ফুটপাত সঠিক চলার মাধ্যমে (Rights of Way) পরিণত হয়। অতঃপর প্রযুক্তির বিকাশে তথা মানুষের স্বাচ্ছন্দ্যে চলাচলের সুবিধার্থে আরও বিভিন্ন রকমের ফুটপাতের বিস্তৃতি ঘটতে থাকে, এমনকি ওপর ও নিচেও। ফুটওভারব্রিজ, এস্কালেটর, র্যাম্প, এলিভেটেড ফুটপাত, আন্ডারগ্রাউন্ড ওয়াকওয়েজ ইত্যাদি তার নব সংস্করণ। তবে অনেক জায়গায় যেমন মরুভূমি, বরফাচ্ছন্ন জায়গা, পাহাড়, জলাশয় বা অসমভূমিতে প্রবেশ ও চলাচলের জন্য বিভিন্ন ধরনের এলিভেটেড ফুটপাত বা উড়ালপথ নির্মাণ করা হয়। আমাদের গ্রামবাংলায় খাল-নদী পারাপারের জন্য স্থানীয়ভাবে নির্মিত পুল, সাঁকো ইত্যাদিও কিন্তু একধরনের উড়ালপথ বা ফুটপাত। অনেক জায়গায় সিঁড়ি আকারেও এ ধরনের ফুটপাত দেখা যায়। সচরাচর পাহাড়ি এলাকায় বিভিন্ন প্রক্রিয়ায় সিঁড়ি আকারে এসব পথ নির্মিত হয়।
বস্তুতপক্ষে যেকোনো ধরনের রাস্তা-সড়ক-সেতু নির্মাণের ক্ষেত্রে পথচারীদের নিরাপদ ও স্বাচ্ছন্দ্যে চলার জন্য মসৃণভাবে ফুটপাত নির্মাণ এবং নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণ করার বিষয়টি সব দেশের আইনে অন্তর্ভুক্ত। যেকোনো অবকাঠামো নির্মাণে সর্বজনীন প্রবেশগম্যতা বা ‘Design for All’ অনুসৃত হয়। আমাদের দেশের সড়ক-সেতুর আইনেও অনুরূপ বিধিবিধান রয়েছে, যদিও সর্র্বক্ষেত্রে তা তেমনভাবে অনুসৃত হয় না। শহর-নগর ও পরিকল্পিত এলাকা ব্যতীত অন্যত্র কোথাও ফুটপাত দেখা যায় না এবং আবার যেখানে ফুটপাত আছে তাও খুব কম ক্ষেত্রেই যথাযথভাবে নির্মিত কিংবা রক্ষণাবেক্ষণ করা হয়। বলতে গেলে, গুরুত্বপূর্ণ রাষ্ট্রীয় স্থাপনা প্রাঙ্গণ ও নিয়ন্ত্রিত এলাকা (ক্যান্টনমেন্ট, সরকারি দপ্তর বা আবাসন কমপ্লেক্স ইত্যাদি) ব্যতীত দেশের কোথাও ফুটপাতের অবস্থা ভালো নয়, যা নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণ করা হয় না। প্রায় সর্বত্রই ফুটপাত এবড়োখেবড়ো, ভাঙাচোরা, উঁচু-নিচু এবং অনেক জায়গায় তো পুরো ফুটপাতই বেদখলে। অথচ সংশ্লিষ্ট আইনে দখলকারদের বিরুদ্ধে জরিমানা ও শাস্তির বিধান রয়েছে। কিন্তু বাস্তবে কোথাও এসবের প্রয়োগ নেই। আবার সার্বিকভাবে বিষয়টি দেখা ও মনিটরিং করার জন্যও কেউ নেই, ফলে দেশজুড়ে ফুটপাতের অবস্থা তথৈবচ।
ফুটপাত এ নগরে
সবচেয়ে করুণ অবস্থায় রাজধানী ঢাকার ফুটপাত। এক সমীক্ষা বলছে, ঢাকার ৯০ শতাংশের বেশি মানুষ ফুটপাতের ওপর নির্ভরশীল, অথচ নগরীর শতকরা ৮২ শতাংশ ফুটপাতের অবস্থা খারাপ, যেখানে স্বাচ্ছন্দ্যে ও নির্বিঘ্নে হাঁটার পরিবেশ নেই। সীমিত কিছু জায়গা ব্যতীত নগরীর সব ফুটপাতই ভাঙাচোরা, উঁচু-নিচু তথা অমসৃণ এবং অনেক ক্ষেত্রে তো পুরোটাই নানাভাবে বেদখলে। অবশ্য এর পেছনে রয়েছে অনেক ধরনের প্রাতিষ্ঠানিক সমস্যাও। ঢাকা দেশের রাজধানী হওয়া সত্ত্বেও এর পরিকল্পনা ও উন্নয়নে সমন্বয় নেই, সবকিছু চলছে নিজ নিজ ছকে। রাজউক, সিটি করপোরেশন, গণপূর্ত, সড়ক ও জনপথ, স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তরসহ আরও অনেক সংস্থা নগরীর বিভিন্ন অবকাঠামো উন্নয়নের সঙ্গে জড়িত। আবার এসব একেকটি সংস্থার পরিকল্পনা, ডিজাইন, স্পেশিফিকেশন ও ব্যয় প্রাক্কলন একেক রকম। ফলে নগরীর অন্যান্য উন্নয়নকাজের মতো ফুটপাত নির্মাণেও অসামঞ্জস্যতা রয়েছে। অন্যদিকে রাজধানীতে প্রচলিত নিয়মে যেকোনো সংস্থা কর্তৃক সড়ক ও ফুটপাত নির্মাণের পর তার রক্ষণাবেক্ষণের জন্য ঢাকা সিটি করপোরেশনের কাছে হস্তান্তর করা হয়।
অতঃপর সিটি করপোরেশন কর্তৃক এর রক্ষণাবেক্ষণকালে অনেক সময় তা ভেঙে নিজস্ব পরিকল্পনা ও ডিজাইনে পুনর্নির্মাণ করা হয়। এই প্রক্রিয়ায় প্রথমে কোনো সংস্থা কর্তৃক একই সমতলে ও নিরবচ্ছিন্নভাবে ফুটপাত নির্মাণ করা হলেও ভাঙা-গড়ার খেলায় তা প্রায়ই ওলট-পালট হয়ে যায়, উচু-নিচু হয়ে যায়। বিশেষ করে সড়কসংলগ্ন ইমারতের প্রবেশপথে ফুটপাত থাকে খুবই অসামঞ্জস্য অবস্থায়। আবার অনেক জায়গায় বিভিন্ন ধরনের নির্মাণত্রুটিতেও ফুটপাত দেবে যায়, এবড়োখেবড়ো হয়ে অসমতল হয়ে পড়ে। ফলে নগরীর প্রায় ফুটপাত দিয়েই স্বাচ্ছন্দ্যে হাঁটা যায় না, পথচারীরা হোঁচট খায় এবং অনেক সময় জীবন ঝুঁকিতেও পড়ে। অনেক জায়গায় ইমারতের মালিক বা ব্যবহারকারীরা নিজেদের স্থাপনার সম্মুখে ফুটপাতে স্থাপিত Non-Abrasive Bricks/Tiles তুলে নিজেদের স্থাপনার সঙ্গে মিলিয়ে মসৃণ টাইলস, মার্বেল পাথর লাগিয়ে দেয়, যা পথচারী চলায় আরও বড় ধরনের ঝুঁকি সৃষ্টি করে। অথচ এসব দেখার কেউ নেই।
বস্তুতপক্ষে ঢাকার ফুটপাতের ওপর এমন কিছু কাজ নেই, যা হয় না। বস্তি, হাটবাজার, ময়লা-আবর্জনার ভাগাড়, টিকিট ঘর, বিডি-সিগারেট ও খাওয়াদাওয়ার দোকান, দলীয় অফিস, আড়ত, বিভিন্ন ধরনের মেরামতের দোকান, গাড়ি পার্কিং ইত্যাদির পাশাপাশি অপরিকল্পিতভাবে গাছ লাগানোসহ বিদ্যুৎ ও টেলিফোনের খুঁটি ও ডিস্ট্রিবিউশন বোর্ড, ডিশ-ইন্টারনেটের তারের জট, সাইনবোর্ড ইত্যাদিও সমভাবে স্থাপিত হচ্ছে। অনেক জায়গায় ফুটপাতের ওপর এমনভাবে ফুটওভারব্রিজ নির্মাণ করা হয়েছে যে ফুটপাত হারিয়ে গেছে এবং পথচারীদের ওসব স্থানে জীবনের ঝুঁকি নিয়ে রাস্তা পার হতে হচ্ছে। সদরঘাট থেকে টঙ্গী সর্বত্র ফুটপাতের ওপর একই অবস্থা এবং ভিআইপি রোড ও পরিকল্পিত আবাসিক এলাকাসমূহের কিছু সড়ক ব্যতীত নগরীর সব ফুটপাতের দশাও এক। ফুটওভারব্রিজের ওপরও বিস্তার ঘটেছে এই ব্যবসার। আর আশ্চর্যের বিষয় হলো, এসব স্থাপনা কোনো ব্যবসা-বাণিজ্য ছাড়া বিনা পয়সায় হয়নি। অদ্ভুতভাবে কোনো কোনো জায়গায় সিটি করপোরেশন বা পুলিশ কর্তৃপক্ষ স্থ’ানীয় প্রভাবশালী বা দলীয় লোকদের ফুটপাতে একধরনের অঘোষিত লিজ দিয়ে রেখেছে। সব মিলিয়ে বোঝা যাচ্ছে যে পুলিশ বা এলাকার স্থানীয় নেতা (যখন যাঁরা ক্ষমতায় থাকেন), টাউট-বাটপারকে মাসোহারা ছাড়া কোনো জায়গায় কিছুই করার সুযোগ নেই। অবশ্য কিছু জায়গায় সিটি করপোরেশনের মাঠপর্যায়ের লোকজনও এসব অপকর্মের সঙ্গে জড়িত। নগর গবেষকদের মতে, ঢাকার ফুটপাত থেকে মাসে কয়েক শ কোটি টাকা মাসোহারা বা চাঁদা আদায় হয়! কতিপয় লোকজন তো ফুটপাতকে পুঁজি করে কোটিপতি বনে যাওয়ার কথাও শোনা যায়। অথচ ফুটপাত থেকে এতকিছু প্রাপ্তির পরও সার্বিকভাবে নগরীর প্রায় জায়গায় ফুটপাতের চরম দুরবস্থা।
ঢাকার ফুটপাতের দুরবস্থার আরেকটা বড় কারণ হলো এলোপাতাড়িভাবে সার্ভিস লাইন স্থাপন ও যখন তখন খোঁড়াখুঁড়ি। ব্রিটিশ তথা পাকিস্তান আামলে যেসব সড়ক নির্মিত হয়েছে, সেসব সড়কের ধারে চওড়া ফুটপাতসহ বিভিন্ন সার্ভিস লাইন স্থাপনে সমন্বয় ছিল, যে দৃশ্য এখনো রমনা এলাকায় দৃশ্যমান। এসব জায়গায় অনেক ফুটপাতের নিচ দিয়ে এখনো সমন্বিতভাবে সার্ভিস লাইন রয়েছে, তাই সেখানে তেমন একটা খোঁড়াখুঁড়ি হয় না। সমস্যার বিস্তৃতি ঘটেছে স্বাধীনতার পর, যখন ঢাকায় বিশাল জনসংখ্যার চাপে সর্বত্র এলোপাতাড়িভাবে ঘরবাড়ি নির্মিত হতে থাকে। অন্যদিকে ঢাকার উন্নয়নে বরাবর মহাপরিকল্পনা ও এলাকাভিত্তিক উন্নয়ন পরিকল্পনা থাকা সত্ত্বেও পরিকল্পিতভাবে গড়ে ওঠা এলাকার সড়কসমূহেও বিভিন্ন সেবা প্রবাহে আলাদা কোনো স্পেস বা Duct স্থাপিত হয়নি। যার কারণে বিভিন্ন সেবা সংস্থার সার্ভিস লাইনসমূহ কোনো জায়গায় ফুটপাতের নিচ দিয়ে বা ধার দিয়ে, আবার কোনো জায়গায় সড়কের মাঝ দিয়ে চলে গেছে। আর যেহেতু সারা বছর এসব বিভিন্ন সংস্থার সার্ভিস লাইনে সংস্কার চলে ও সড়ক-ফুটপাত খনন করতে হয়, সেহেতু প্রায় ক্ষেত্রে সংস্কারকৃত ফুটপাত উঁচু-নিচু হয়। তা ছাড়া সময়মতো পিট নির্মাণ ও ম্যানহোলের ঢাকনা স্থাপন না করায় সৃষ্টি হয় আরও দুরবস্থার। অনেক জায়গায় তো ম্যানহোলের ঢাকনাও চুরি হয়ে যায়। সব মিলিয়ে অসমন্বিত পরিস্থিতিতে ফুটপাতের নিচে স্যুয়ারেজ ও স্ট্রম ড্রেনেজে ময়লা-আবর্জনা পড়ে ড্রেনেজ প্রবাহে প্রতিবন্ধকতা তথা নিয়মিত পরিচর্যার অভাবে প্রায় ক্ষেত্রে বৃষ্টির পানি সরার ড্রেন ও গ্রেটিং দিয়ে স্ট্রম ডেনেজে গড়িয়ে পড়তে না পেরে সড়কের ওপর জমে জলাবদ্ধতার সৃষ্টি করে।
এভাবে উল্লিখিত বিভিন্ন প্রেক্ষাপটে, নগরীর কিছু ফুটপাত তো সর্বক্ষণ পথচারীদের প্রস্রাবে স্যাঁতসেঁতে হয়ে থাকে। অনেক জায়গায় বিভিন্ন ধরনের তারের জঞ্জাল এমনভাবে ঝুলে থাকে যে সোজা হয়ে হাঁটাও যায় না। ফলে অনেক ফুটপাতে পথচারীদের বিশ্রী অবস্থার মধ্যে নাকে রুমাল দিয়ে বা শরীর নুইয়ে চলতে হয়। অনেক জায়গায় তো পুরো ফুটপাতই হকার্স ও ফেরিওয়ালাদের দখলে। সদরঘাট, বাংলাবাজার, গুলিস্তান, শাহবাগ মোড়, কাওরান বাজার, নিউমার্কেট, ফার্মগেট ইত্যাদি এলাকায় তো ফুটপাত আছে বলে মনেই হয় না। এসব ফুটপাতে আরেক সমস্যা হলোÑ বিভিন্ন ধরনের ‘ঝাপটা বাহিনী’ ও ‘মলমপার্টি’র আক্রমণ। প্রতিদিন কত মানুষই এদের ফাঁদে পড়ে সর্বস্বান্ত হচ্ছেন তার কোনো ইয়ত্তা নেই। ঢাকার ফুটপাতে আরেকটা অদ্ভুত বিষয় হলো সড়কে গাড়ির ভিড় বা যানজটের সৃষ্টি হলে অনেক মোটরসাইকেল আরোহী ফুটপাতের ওপর দিয়ে চলাচল করেন, যাতে প্রায়ই পথচারীদের বিভিন্ন ধরনের দুর্ঘটনায় পড়তে হয়। এই অবস্থায় একপর্যায়ে হাইকোর্ট সংশ্লিষ্ট সবার ওপর রুল জারি করে ফুটপাতের ওপর মোটরসাইকেল চালানোতে নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেন, কিন্তু কে শোনে কার কথা?
আসলে ঢাকার নগরায়ণের শুরুটাও ছিল অগোছালো, অপরিকল্পিত ও অসমন্বিতভাবে। প্রাক্-ঐতিহাসিক আমলে বুড়িগঙ্গা নদীর ধারে স্বতঃস্ফূর্তভাবে গড়ে ওঠা ঢাকার নগরায়ণ-প্রক্রিয়ায় রয়েছে অনেক অসামঞ্জস্য। সে সময় বিভিন্ন ধরনের কর্মজীবী মানুষের সমন্বয়ে অলিগলি, সরু ও আঁকাবাঁকা রাস্তা নিয়ে পত্তন হয় ঢাকার। সব রাস্তাঘাটই ছিল কাঁচা এবং প্রথম দিকে তো ফুটপাত ছিলই না। ঢাকায় পাকা রাস্তা নির্মাণের সংস্কৃতি চালু হয় ইউরোপীয়দের ঢাকায় বসবাসের পর থেকে। অতঃপর ইঞ্জিনচালিত গাড়ির আগমনের পর পথচারীদের চলাচলের জন্য সড়কে ফুটপাতের সংযোজন হতে থাকে। তৎকালীন পুরান ও নতুন ঢাকার দিলকুশা-গুলিস্তান-পলাশী-আজিমপুর-নীলক্ষেত-শাহবাগ-ইস্কাটনের মাঝখানে পরিকল্পিত ‘রমনা নিউ টাউন’ এলাকার ফুটপাতের দিকে তাকালে বিষয়টি চোখে পড়ে। এসব এলাকার ফুটপাত এখনো অনেকটা চওড়া। এভাবে আধুনিক নগর পরিকল্পনায় ঢাকায় Primary, Secondary & Tertiary সড়ক নেটওয়ার্ক গড়ে তোলা হলেও কালক্রমে অসমন্বিত উন্নয়ন ও রক্ষণাবেক্ষণের অভাবে বর্তমানে নগরীর প্রায় সড়ক ও ফুটপাতের বেহাল দশা। অনেক জায়গায় তো সড়ক চওড়া করতে গিয়ে ফুটপাতও হারিয়ে গেছে।
ফুটপাতে নেই সর্বজনীন প্রবেশগম্যতা!
ফুটপাত সবার জন্য হলেও দেশের খুব কম ক্ষেত্রেই Physically Challenged বা বিভিন্ন ধরনের প্রতিবন্ধী মানুষজনের নির্বিঘ্নে হাঁটাচলার ভাগ্য হয়! কারণ আগেই উল্লেখ করেছি, সীমিত কিছু এলাকা ব্যতীত দেশের কোনো সড়ক-ফুটপাতে সর্বজনীন প্রবেশগম্যতা (Universal Accessibility) নেই। অর্থাৎ অবকাঠামোর ডিজাইনের ক্ষেত্রে ‘Design for All’ এর বিষয়টি কাজের চেয়ে কথায় বেশি স্থান পায়। বাস্তবে দেশে প্রতিবন্ধী মানুষের সংখ্যা কত তার কোন সঠিক পরিসংখ্যান নেই। তবে অতিসম্প্রতি এতদ্সংক্রান্ত এক সমীক্ষায় বলা হয়েছে, বর্তমানে দেশে রয়েছে প্রায় দেড় কোটি প্রতিবন্ধী মানুষ। অবশ্য এক বৈশ্বিক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বাংলাদেশে ১০ থেকে ১৬ শতাংশ মানুষ নানাভাবে প্রতিবন্ধী। অপর দিকে প্রতিবন্ধীদের অধিকারের বিষয়টিকে আন্তর্জাতিক স্বীকৃত হওয়ার প্রেক্ষাপটে তাঁদের সর্বজনীন অধিকার, যাতায়াতব্যবস্থা, সুরক্ষা ও উন্নয়নের জন্য বিভিন্ন ধরনের অনেক জাতীয় ও আন্তর্জাতিক আইন, নীতিমালা ও অনুসমর্থন থাকলেও দেশে সার্বিকভাবে এখনো প্রতিবন্ধীরা নিগৃহীত ও বিভিন্নভাবে উপেক্ষিত। কারণ, দেশের কোনো সড়ক-ফুটপাতে তো প্রতিবন্ধীদের নির্বিঘ্নে চলাচলের জন্য বিশেষ ব্যবস্থা বা সুরক্ষা নেই। ফুটপাতে ওঠা-নামার জন্য ঢালু পথ (Ramp/Slope) না থাকায় প্রায় ক্ষেত্রে ফুটপাতে হুইলচেয়ার ওঠানো ও নামানো যায় না। আবার ফুটপাত উঁচু-নিচু, এবড়োখেবড়ো ও ভাঙাচোরার কারণে কোনো রকমে হুইলচেয়ার তোলা হলেও তা চলে না বা চালানো যায় না। যার কারণে, ঢাকা তথা দেশের কোথাও সহজে ফুটপাতে হুইলচেয়ারে কাউকে চলাফেরা করতে দেখা যায় না। আর সাদাছড়ি হাতে গরিব ও অসহায় অন্ধ মানুষজনকে ফুটপাতে ওঠা-নামা ও চলার সময় প্রায়ই বিভিন্ন দুর্ঘটনায় পড়তে হয়।
অথচ আমাদের ন্যাশনাল বিল্ডিং কোড ও ইমারত নির্মাণ বিধিমালায় যেকোনো ধরনের ইমারত নির্মাণসহ উন্নয়ন কর্মযজ্ঞের প্রতিটা ক্ষেত্রে প্রতিবন্ধী মানুষের প্রবেশগম্যতা ও ব্যবহার নিশ্চিতকরণে বিশেষ বিধিবিধান সন্নিবেশিত রয়েছে। এসব মানা না হলে শাস্তির বিধানও আছে। প্রায়ই এ নিয়ে সুশীল সমাজ ও নীতিনির্ধারকেরা বড় বড় কথা বলেন, বিভিন্ন ধরনের সেমিনার-সিম্পোজিয়াম ও ওয়ার্কশপ হয়, কিন্তু কার্যক্ষেত্রে তা দেখা বা মনিটরিংয়ের জন্য সুনির্দিষ্ট কোনো প্রতিষ্ঠান নেই। সম্প্রতি ‘Walk For A Better Bangladesh Trust’ নামক একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের সমীক্ষা বলছে, ঢাকার ৪৪ শতাংশ সড়কে ফুটপাত নেই এবং যেখানে ফুটপাত আছে সেখানেও সাধারণ মানুষ সেটি ব্যবহারে আগ্রহী নয়। আর উপায়হীন না হলে মধ্য ও উচ্চবিত্তরা তো ফুটপাত ব্যবহার করেই না। যার কারণে সড়কে গাড়ির সংখ্যা ও চাপ বেড়ে বাড়ছে যানজটের প্রকোপ। বস্তুতপক্ষে রাজধানীতে অস্বাভাবিক জনস্ফীতি ও গাড়ির সংখ্যা বাড়ায় সড়কের Carrige way সম্প্রসারণ করার জন্য বিদ্যমান ফুটপাত ছোট করে ফেলা হচ্ছে এবং অনেক জায়গায় বাদও দেওয়া হচ্ছে। একদা নগরীর প্রধান সড়কগুলোতে যেখানে ১০-১২ ফুট চওড়ায় ফুটপাত ছিল, তদস্থলে বর্তমানে মাত্র ৩-৪ ফুটের ফুটপাত এবং তাও উল্লিখিত বর্ণনামতে বিভিন্ন সমস্যাসঙ্কুল অবস্থায়। যার কারণে এখন ঢাকার ফুটপাতে প্রতিবন্ধীদের হাঁটাচলা উপেক্ষিত। ইদানীং বিভিন্ন কারণে দেশে প্রতিবন্ধী ও অটিস্টিক মানুষের সংখ্যা বাড়লেও তাদের রাস্তায় বা বাইরে দেখা যায় না।
আশার বিষয় হলো, নগরীর বর্তমান মেয়রদ্বয় বিষয়টি গভীরভাবে উপলব্ধি করেছেন। ইতিমধ্যে নগরীর বিভিন্ন স্থানে কিছু সড়ক ও ফুটপাত দখলমুক্ত করেছেন এবং স্থানে স্থানে গিয়ে মানুষকে উদ্বুদ্ধ করার চেষ্টা চালাচ্ছেন। সম্প্রতি উত্তর ঢাকার মেয়র আনিসুল হক তো তাঁর দপ্তরের লোকজনকে নির্দেশ দিয়েছেনÑ যারা ফুটপাত দখল করে রেখেছে তাদের প্রথমে অনুরোধ করা হোক, পথচারীদের দুর্ভোগের কথা বলা হোক, যাতে দখলকারীরা আপনাতেই ফুটপাত থেকে সরে যায়, অন্যথায় বুলডোজার চালানো হোক। অন্যদিকে দক্ষিণ ঢাকার মেয়র বারবার চেষ্টা করেও নগরীর সদরঘাট, গুলিস্তানসহ অপরাপর কিছু এলাকা থেকে অবৈধ দখলদারকে সরাতে না পেরে তিনি কিছু স্থানে Elevated Walkways বা ‘উড়াল ফুটপাত’ নির্মাণের ঘোষণা দিয়েছেন।
উড়াল ফুটপাত!
শুরুতেই বলেছি, উড়ালপথ বা ফুটপাতের রূপ ও আকার বহুবিধ। মরুভূমি থেকে জলাশয় পর্যন্ত বিভিন্ন স্থানে বিভিন্ন আকার-প্রকৃতিতে এসব উড়ালপথের বিস্তৃতি। তবে প্রযুক্তির বিকাশে বিভিন্ন ধরনের আধুনিক Elevated Walkways বা ‘উড়াল ফুটপাত’ নির্মাণের সংস্কৃতি চালু রয়েছে। অনেক বিমানবন্দরে Moving Walkways স্থাপিত হয়েছে, যার মাধ্যমে বিমানবন্দরে যাত্রীরা ক্লান্ত শরীরে না হেঁটে স্বয়ংক্রিয়ভাবে পথ পার হন। অনুরূপ কিছু জনাকীর্ণ নগরীতে বিশেষ করে ব্যস্ততম জায়গায়ও Moving Elevated Walkways স্থাপিত হয়েছে, যার মাধ্যমে মানুষ সহজে এক ভবন বা কমপেক্স থেকে আরেক ভবন বা কমপ্লেক্সে যাওয়া-আসা করতে পারেন। আশির দশকে প্রথম যখন প্যারিস সফর করি তখন নগরীর কেন্দ্রবিন্দুতে এ ধরনের একটি দীর্ঘ যান্ত্রিক উড়াল ফুটপাতে চড়ে হাঁটার সৌভাগ্য হয়েছিল। বর্তমানে বিশ্বের অনেক জায়গায় এ ধরনের অনেক অত্যাধুনিক প্রযুক্তির উড়ালসেতু স্থাপিত হয়েছে। মালয়েশিয়ার কুয়ালালামপুরে পেট্রোনাস টুইন টাওয়ারের ৫০তলা উচ্চতায় দুটি ভবনের মধ্যে সংযোগকারী Elevated Walkways বা Air Corridorটি এর অন্যতম উদাহরণ। ইতিমধ্যে ঢাকার কিছু ভবনের মধ্যেও সংযোজক হিসেবে এবং সড়কের উভয় পাশে একই প্রতিষ্ঠানের নির্মিত ভবন বা কমপ্লেক্সে যাওয়া-আসার সুবিধার্থে এ ধরনের উড়ালসেতু বা ফুটপাতের সংযোজন করা হয়েছে। পান্থপথের ওপর স্কয়ার হাসপাতালের সম্মুখে স্থাপিত উড়াল ফুটপাতটি যার অন্যতম নমুনা। তবে দেশে বহু আগে থেকে ঢাকার অনেক প্রাক্-ঐতিহাসিক ও কিছু জনগুরুত্বপূর্ণ ভবন বা কমপ্লেক্সে এ ধরনের প্যাসেজ বা ফুটপাত শোভা পাচ্ছে, যা হাইকোট-সুপ্রিম কোর্ট ভবন, সচিবালয় কমপ্লেক্স বা অনেক পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয় ও হাসপাতালে দেখা যায়।
সম্ভবত দেশ-বিদেশে এ ধরনের স্থাপনায় অনুপ্রাণিত হয়ে দক্ষিণ ঢাকার মেয়র সাঈদ খোকন নগরীর কেন্দ্রস্থলে অর্থাৎ গুলিস্তান এলাকার ফুটপাত থেকে বারবার চেষ্টা করেও অবৈধ দখলদারদের সরাতে না পেরে সেখানেই তিনি উড়ালপথ নির্মাণের চিন্তাভাবনা করছেন। প্রথম পর্যায়ে সচিবালয়ের সামনে থেকে জিরো পয়েন্ট, বায়তুল মোকাররম, গুলিস্তানের গোলাপশাহ মাজার হয়ে বঙ্গবন্ধু অ্যাভেনিউজুড়ে এক কিলোমিটার দৈর্ঘ্যরে পথচারীদের জন্য উড়াল ফুটপাত নির্মাণের একটি প্রকল্প সরকারের বিবেচনার জন্য পেশ করেছেন, যার প্রাক্কলিত ব্যয় ধরা হয়েছে প্রায় ১১৫ কোটি টাকা। অতঃপর সদরঘাট, মতিঝিল, নিউমার্কেট ইত্যাদি এলাকায়ও অনুরূপ উড়াল ফুটপাত নির্মাণের আগ্রহ প্রকাশ করেছেন। অচিরেই হয়তো উত্তর ঢাকার মেয়রও তাঁর এলাকায় এ ধরনের আরও কিছু উড়াল ফুটপাত নির্মাণের ঘোষণা দেবেন। কিন্তু বিভিন্ন কারণে শঙ্কা জাগে এ ধরনের প্রকল্প বাস্তবায়ন নিয়ে। কারণ, ঢাকা মহানগরীর বর্তমান অবস্থায় বিশেষ করে পথচারী মানুষগুলোর জীবনযাত্রা, বিদ্যুৎ সরবরাহ ও নিয়ন্ত্রণব্যবস্থা উন্নত না হলে এ ধরনের আধুনিক অবকাঠামো উপকারের চেয়ে দায়ে (Liability) বা বোঝায় পরিণত হবে!
লক্ষ করলে দেখা যায়, নগরীর বিভিন্ন স্থানে সাম্প্রতিক কালে স্থাপিত কিছু দৃষ্টিনন্দন ফুটওভারব্রিজ ঢাকঢোল পিটিয়ে চালু করার অল্প কিছুদিনের মধ্যে তা অকার্যকর হয়ে পড়েছে, অনেক জায়গায় এসব ফুটওভারব্রিজগুলোর পুরোটাই হকারদের দখলে। যেমন রমনা পার্ক ও সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে ইঞ্জিনিয়ারিং ইনস্টিটিউশনের (আইইবি) সম্মুখে দৃষ্টিনন্দন ফুটওভারব্রিজটি তো নির্মাণের পর থেকে প্রায় অব্যবহৃত বা অকেজো অবস্থায় পড়ে আছে। নগরীর বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ ট্রাফিক পয়েন্টে এ ধরনের কিছু ফুটওভারব্রিজ কাঙ্খিতভাবে ব্যবহার হয় না, অনেক ক্ষেত্রে এগুলো বেদখলেও চলে গেছে। বিমানবন্দর সড়কের ওপর বনানীর ১১ নম্বর সড়কের ধারে ব্যস্ততম সড়ক দিয়ে পার না হওয়ার জন্য সেখানে নির্মিত ফুটওভারব্রিজে ওঠা ও চলাচলে উৎসাহিত করার জন্য ব্রিজটির দুই প্রান্তে Escalator বা চলন্ত সিঁড়ি স্থাপন করা হয়, কিন্তু তা রাজধানীর বনেদী এলাকার পথচারীদেরও আকৃষ্ট করতে পারেনি। মানুষজনকে Escalator দিয়ে ফুটওভারব্রিজে না উঠে জীবনের ঝুঁকি নিয়ে হেঁটে বা দৌড়ে রাস্তার পার হতে বেশি স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করতে দেখা যায়! এভাবে অনাগ্রহে ও যথাযথভাবে রক্ষণাবেক্ষণের সমস্যায় পড়ে অল্প কিছুদিন যেতে না-যেতেই এই আধুনিক উড়ালসেতুটি বর্তমানে অব্যবহৃত অবস্থায় পড়ে আছে।
কাজেই দক্ষিণ ঢাকার মেয়রের স্বাপ্নিক (Gimmick) উড়াল ফুটপাত নির্মাণের আগে সার্বিক অবস্থা পর্যবেক্ষণ ও বিশ্লেষণ করে এগোনো উচিত, যদিও প্রস্তাবিত উড়াল ফুটপাতটি কী ধরনের হবে অর্থাৎ Moving বা Automatic কি না, নাকি গতানুগতিক (স্থির)) নিয়মে তা এখনো প্রকাশ করা হয়নি। তবে অনেক নগরবিদের মতে, এ ধরনের উচ্চাভিলাষী প্রকল্প গ্রহণের চেয়ে ফুটপাতের দখলদারদের বিভিন্নভাবে উদ্বুদ্ধ করে ও পরিকল্পিতভাবে অন্যত্র অপসারণ করে বা সুনিয়ন্ত্রিতভাবে বুলডোজর্ড করে হলেও ফুটপাত দখলমুক্তপূর্বক যথাযথ উন্নয়ন ও সংস্কারের মাধ্যমে তা চিরায়িত নিয়মে পথচারীদের ব্যবহারে ফিরিয়ে আনাই হবে সর্বোত্তম কাজ। অবশ্য বিষয়টি নির্ভর করছে সরকারের রাজনৈতিক সদিচ্ছার ওপর। কারণ, সরকার আন্তরিকভাবে চাইলে যেকোনো ধরনের প্রকল্প বাস্তবায়ন করা সম্ভব। এ জন্য মানুষের জীবনযাত্রা, নগরজীবনের ব্যবস্থাপনায় পরিবর্তন সাধন ও সংস্কারের প্রয়োজন। যেমন নগরীর অভ্যন্তর থেকে অপ্রয়োজনীয় অনেক কিছু বাইরে নিয়ে যাওয়া বা স্থানান্তরের প্রয়োজন, জনসংখ্যার চাপ কমাতে, যা সম্পূর্ণভাবে নির্ভর করছে সরকারের সদিচ্ছা ও আগ্রহের ওপর।
বিকল্প নেই পথচারীবান্ধব ফুটপাত নির্মাণের
বিদেশে গেলে আমরা সবাই স্বাচ্ছন্দ্যে ফুটপাত ব্যবহার করি। কারণ, সেখানকার শহর-নগরের মতো কান্ট্রি সাইডেও ফুটপাত যথাযথভাবে নির্মিত, সুন্দর, মসৃণ, ঝকঝকে, পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন, এক কথায় পথচারীবান্ধব। তবে একদা ঢাকার ও দেশের অপরাপর বড় শহরের বেশির ভাগ ফুটপাত অনেকটাই এ রকম ছিল। সর্বস্তরের মানুষ ফুটপাত ধরে হাঁটত; পাড়া-মহল্লার ছেলেরা ফুটপাতের পাশে বসে আড্ডা দিত। সত্তর-আশির দশকে আমাদের ছাত্র ও কর্মজীবনের শুরুতে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ও বুয়েট ক্যাম্পাসের ফুটপাতে আড্ডা দেওয়া এবং চটপটি ও ফুসকা খাওয়ার স্মৃতিগুলো বরাবর নস্টালজিক করে তোলে। নগর জীবনে এত বিবর্তনের পরও এখনো ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ও বুয়েট ক্যাম্পাসে ছাত্রছাত্রীদের ফুটপাতভিত্তিক আড্ডা ও বিচরণ কমবেশি চালু রয়েছে। অনুরূপ ঢাকার অপরাপর পাবলিক স্কুল-কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয় প্রাঙ্গণে এখনো কমবেশি ছাত্রছাত্রীদের ফুটপাতে বসা ও আড্ডা দেওয়ার সুযোগ থাকলেও প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রছাত্রীদের এই সুযোগ নেই একদমই। দু-চারটা প্রাইভেট স্কুল-কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয় ছাড়া কারোরই নিজস্ব ক্যাম্পাস নেই। ছোট্ট একটা প্লটের ওপরও হাজারো ছাত্রছাত্রীর শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান গড়ে উঠেছে। নেই কোনো খোলা জায়গা। সংলগ্ন ফুটপাত মিশে গেছে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের আঙিনায়। ফলে এসব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের ছাত্রছাত্রীদের সংলগ্ন রাস্তায় দাঁড়িয়ে বা ময়লা-আবর্জনায় পরিপূর্ণ ফুটপাতে দাঁড়িয়ে আড্ডা দিতে হয়।
অন্যদিকে নগরীর ফুটপাতের এত দুরবস্থার মধ্যেও নগরীর অনেক পাড়া-মহল্লার ফুটপাতে এখনো যুবক-যুবতীদের আড্ডা দেওয়া ও চা খাওয়ার সংস্কৃতি চালু রয়েছে। তন্মধ্যে বনানীর ১১ নম্বর সড়ক, বেইলি রোড অন্যতম। অনুরূপ, নগরীর প্রায় নার্সারি ও জুনিয়র প্রাইভেট স্কুলে পড়ুয়া ছাত্রছাত্রীদের মা-বোনদের উপায়হীন অবস্থায় বসার ও বিশ্রাম নেওয়ার স্থান হলো এসব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানসংলগ্ন ফুটপাত। কাজেই এতসব অবক্ষয়ের মধ্যেও ফুটপাতের উন্নয়নের কোনো বিকল্প নেই। যানজটের ভয়াবহতা থেকে পরিত্রাণ পেতে হলে অবশ্যই ফুটপাত থেকে অবৈধ ব্যবসা-বাণিজ্য ও বিভিন্ন স্থাপনা, ইমারতের মালামালের মজুত ইত্যাদি উচ্ছেদ বা অপসারণ করতেই হবে। সর্বোপরি অবশ্যই বিষয়টি সমন্বয় করে করতে হবে, যাতে উচ্ছেদ-উত্তর আবার পূর্বাবস্থায় ফেরত না আসে।
মোদ্দা কথা, ঘরের আঙিনাকে যেভাবে সবাই নিজ নিজ সামর্থ্যে সবকিছু সুন্দর রাখার প্রয়াস চালায়, সেভাবে সবাইকে স্বেচ্ছায় ও স্বতঃস্ফূর্তভাবে স্ব-স্ব এলাকার সড়কের আঙিনায় বিদ্যমান ফুটপাতকে পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন ও সুন্দর রাখার চেষ্টা করতে হবে। ফুটপাত Public Property তাই কোনো ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠান নিজেদের ইচ্ছেমতো ফুটপাতের দখল ও পরিবর্তন করতে পারে না। ফুটপাত অবশ্যই সর্বস্তরের পথচারীদের স্বার্থ ও নিরাপত্তার বিবেচনায় (সর্বজন প্রবেশগম্যতা) নির্মিত হতে হবে। লক্ষ করলে দেখা যায়, উন্নত ও উন্নয়নশীল দেশে ফুটপাত স্ব-স্ব জাতির দর্পণ হিসেবে বিবেচিত অর্থাৎ যে দেশের ফুটপাত যত পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন ও মসৃণ, সেখানকার জীবনযাত্রা তত সুন্দর। মালয়েশিয়া, সিঙ্গাপুরের ফুটপাত তো এখন ইউরোপ-আমেরিকার ফুটপাত থেকেও সুন্দর ও উন্নত। একসময় কলকাতার ফুটপাতেরও খুব দুরবস্থা ছিল, যা এখন আর নেই বললেই চলে। দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পিত ছকে ও ধারাবাহিক উন্নয়নপ্রক্রিয়ায় ভারতের অন্যান্য শহর-নগরীর ফুটপাতগুলো এখন অনেক সুন্দর ও জনবান্ধব। আর অর্থনৈতিকভাবে দুর্বল হয়েও আমাদের পাশের নেপাল-ভুটান বা মিয়ানমারে সবকিছুর সুন্দর ব্যবস্থাপনার কারণে এসব দেশ পর্যটকদের বেশি আকৃষ্ট করে। কিন্তু আমাদের দেশের অপরাজনীতি, সুশাসনের অভাব ও উন্নয়নপ্রক্রিয়ায় ধারাবাহিকতার অভাবে আমরা ক্রমেই পিছিয়ে পড়ছি। দেশকে সমৃদ্ধির পথে এগিয়ে নিতে আমাদেরও সেভাবে সবকিছু পরিকল্পনা করতে হবে বা পারতে হবে। অর্থাৎ যেকোনো মূল্যে সব ধরনের ফুটপাতে স্বাচ্ছন্দ্যে ও নির্বিঘ্নে হাঁটার পরিবেশ সৃষ্টি করতে হবে। সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন অবকাঠামো এবং সেবার উন্নয়ন ও সংস্কার সাধন করতে হবে। আর এই প্রক্রিয়ায় নির্দ্বিধায় বলা যায়, যেদিন দেশের সব ফুটপাত সুন্দর ও পরিপাটি হবে, সেদিন অবশ্যই রাজধানী ঢাকা তথা বাংলাদেশ বিশ্বের মানচিত্রে এমনিতেই ওপরের দিকে স্থান করে নেবে।
প্রকাশকাল: বন্ধন, নভেম্বর ২০১৬।