একটি দেশের অর্থনৈতিক সক্ষমতার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ উপাদান অবকাঠামোগত উন্নয়ন। যে দেশের অবকাঠামো যত মজবুত, সে দেশের অর্থনীতি তত শক্তিশালী। উন্নত বিশ্বের দেশগুলোর সঙ্গে উন্নয়নশীল ও স্বল্পোন্নত দেশগুলোর (LDC’s) অর্থনৈতিক পার্থক্যের কারণও এই অবকাঠামো। আর উন্নয়নের জন্য প্রয়োজন নেতৃত্বের দূরদর্শিতা, সরকারি-বেসরকারি যৌথ উদ্যোগ, টেকসই উন্নয়ন ও বাস্তবায়নের ধারাবাহিকতা। কিন্তু স্বাধীনতার পর থেকে বাংলাদেশে ধারাবাহিক রাজনৈতিক অস্থি’রতা তথা আমলাতান্ত্রিক জটিলতায় কোনো সরকারের আমলেই কাঙ্খিত উন্নয়ন হয়নি। কোনো একটি পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনা বা বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচির (Annual Development Programme-ADP) পূর্ণাঙ্গ বাস্তবায়ন ঘটেনি। যথাযথভাবে সমীক্ষা ব্যতিরেকে প্রকল্প গ্রহণ, প্রকল্প অনুমোদনে দীর্ঘ সময়ক্ষেপণ, অপ্রতুল বরাদ্দ এবং দুর্বল ব্যবস্থাপনাও এর জন্য সমভাবে দায়ী। এটাও লক্ষণীয়, সরকার পরিবর্তনের পর প্রায়ই প্রকল্পের অগ্রাধিকার পরিবর্তন হয়ে যায় এবং অনেক ক্ষেত্রে গৃহীত প্রকল্পের ভালো-মন্দ বিচার না করেই তা স্থগিত বা বাতিল করে দেওয়া হয়। বিভিন্ন অসংগতিতে বারবার প্রকল্প সংশোধন ও বরাদ্দ কাটছাঁটের কারণে উন্নয়নে ধীরগতির সৃষ্টি হয়। সংবাদে প্রকাশ, কিছু প্রকল্পের বরাদ্দ এতটাই নামমাত্র যে সেগুলোর বাস্তবায়ন শেষ হতে কয়েক যুগ লেগে যাবে। বিশ্বব্যাংক পরিচালিত এক সমীক্ষায় বলা হয়, উল্লেখিত বিভিন্ন অসংগতিতে ৮০ শতাংশ প্রকল্পই সময়মতো শেষ হয় না এবং কিছু প্রকল্পের কাজ শেষ হতে তো ১১ থেকে ১০০ বছর পর্যন্ত লেগে যাবে।
প্রসঙ্গক্রমে, বাংলাদেশের উন্নয়নপ্রক্রিয়ায় আরও বিভিন্ন ধরনের অসংগতি ও অসামঞ্জস্যতা লক্ষ করা যায়। যেমন ‘বিভক্তির উন্নয়ন’ অর্থাৎ ক্ষমতাসীন দলের সাংসদদের এলাকায় উন্নয়ন হয়, বিরোধী দলের সাংসদদের এলাকায় উন্নয়ন হয় না। আবার যে এলাকা থেকে সরকারপ্রধান হন বা বড় বড় পদের মন্ত্রিত্ব মেলে, সে অঞ্চলের উন্নয়ন বেশি অগ্রাধিকার পায়, অনেক ক্ষেত্রে অপ্রয়োজনীয় উন্নয়নও হয়। অর্থাৎ ক্ষমতাসীন ব্যক্তিদের প্রভাব বা দাপটে অনেক ক্ষেত্রে যা দরকার না, তা-ই হয়। দ্বিতীয়ত, ‘আত্মঘাতী উন্নয়ন’। এ ক্ষেত্রে কৃষিজমি নষ্ট বা খাল-নালা ও নিচু জমি ভরাট করে অন্য কাজ করা, সড়ক নেই অথচ বিলের মধ্যে ব্রিজ নির্মাণ ইত্যাদি বিষয় উল্লেখযোগ্য। এসব অনাহূত উন্নয়নের কারণে রাষ্ট্রের অর্থের অপচয়ের পাশাপাশি প্রকৃতি ও পরিবেশের ওপর বড় ধরনের প্রভাব পড়ে। যেমন- সুনামগঞ্জ, হবিগঞ্জ, কিশোরগঞ্জ ইত্যাদি হাওর এলাকার ওপর দিয়ে রাস্তা নির্মাণের কারণে মৎস্য সম্পদের ব্যাপক ক্ষতিসহ জলাবদ্ধতার সৃষ্টি করেছে। আরেক ধরনের উন্নয়ন হলো Conspicuous Development বা ‘লোক দেখানো উন্নয়ন’। দেশের বিভিন্ন স্থানে এ ধরনের অনেক ‘হুজুগে প্রকল্প’ বাস্তবায়ন-উত্তর তা রক্ষণাবেক্ষণের অভাবে বোঝায় (Liability)পরিণত হয়ে আছে। জনমানবহীন বা অনুন্নত জায়গায় এ ধরনের অনেক প্রকল্প দেখা যায়, যা শুধু নেতা-নেত্রীর আবেগে নির্মিত হয়েছে এবং কারও উপকারে আসছে না। আবার বাংলাদেশে প্রতিশোধ বা ‘জেদাজেদির উন্নয়ন’ও হয়। যেমন, সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে বঙ্গবন্ধুর ৭ মার্চের ঐতিহাসিক ভাষণ দেওয়ার জায়গায় শিশু পার্ক নির্মাণ বা ঢাকা ক্যান্টনমেন্টে সাবেক রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের বাসস্থান ধ্বংস করে কোয়ার্টার নির্মাণকে এ ধরনের অপ-উন্নয়ন হিসেবে আখ্যায়িত করা যায়।
অথচ যেখানে প্রকৃত উন্নয়ন দরকার, সেখানে হচ্ছে না। যেমন চট্টগ্রাম বাংলাদেশের গেটওয়ে এবং চট্টগ্রাম সমুদ্রবন্দর দিয়েই দেশের বেশির ভাগ রাজস্ব আসে। এ জন্য পাকিস্তান আমলে ঢাকার চেয়ে চট্টগ্রামের গুরুত্ব ছিল বেশি এবং সে সময় দেশ-বিদেশের গুরুত্বপূর্ণ দপ্তরগুলোও চট্টগ্রামে স্থাপিত হয়েছিল। কিন্তু স্বাধীন বাংলাদেশে চট্টগ্রাম সব দিক থেকে বঞ্চিত। বিগত ৪৪ বছরে চট্টগ্রামে দেখার মতো বা জনমুখী কোনো প্রকল্প বাস্তবায়িত হয়নি এবং যা কিছু হয়েছে তার পরিচালনা ও রক্ষণাবেক্ষণে দলাদলির কারণে পর্যুদস্ত। ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়ক এবং রেল যোগাযোগেও খুবই দুরবস্থা। এই মহাসড়কটি চার লেনে উন্নীতকরণের কাজের ইতিমধ্যে সাত-আট বছর হয়ে গেছে, কিন্তু কখন যে এই কাজ শেষ হবে, তা কেউই জানে না। অনুরূপ, নব্বইয়ের দশক থেকে চট্টগ্রামকে বারবার ‘বাণিজ্যিক রাজধানী’ হিসেবে বিনির্মাণের ঘোষণা দিয়েও কোনো সরকার তা বাস্তবায়ন করেনি। চট্টগ্রাম বিমানবন্দর থেকে শহরে (৮-১০ কিলোমিটার) পৌঁছাতেই দুই-তিন ঘণ্টা লেগে যায়। শহরে যানজট ও জলজটে নাকাল অবস্থা। অপরিকল্পিত উন্নয়নের কারণে বিশেষ করে পাহাড় কেটে উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়ন করে পরিবেশকে অতিমাত্রায় কলুষিত করা হয়েছে।
রাজধানী ঢাকার অবস্থাও অবর্ণনীয়। দেশের সবকিছুকে রাজধানীমুখী করে ফেলে এখন ঢাকা ধারণক্ষমতার চেয়ে অনেক বেশি মানুষের চাপে হাজারো সমস্যায় জর্জরিত একটি অচল নগরী। অপরিকল্পিত নগরায়ণ ও সমন্বয়হীন উন্নয়ন এর জন্য মূলত দায়ী। ১৪-১৫টি মন্ত্রণালয় ও ৪৫-৫০টি মতো সরকারি সংস্থা ঢাকার উন্নয়নপ্রক্রিয়ার সঙ্গে জড়িত। কিন্তু নেই কোনো সমন্বয়ক বা সমন্বয়কারী প্রতিষ্ঠান। যে যার মতো প্রকল্প গ্রহণ ও বাস্তবায়ন করে চলেছে। রাজধানীর একটা সড়কের অবস্থাও ভালো নয়। আবার বিচ্ছিন্নভাবে যেসব অবকাঠামো (ফ্লাইওভার, ওভারপাশ, ফুটওভারব্রিজ ইত্যাদি) নির্মাণ করা হয়েছে ও হচ্ছে, সেগুলো যানজট পরিস্থিতির উন্নয়নে কতটুকু অবদান রাখবে তা ইতিমধ্যে প্রশ্নবিদ্ধ হয়ে পড়েছে। নগরীর প্রায় সব ফুটপাত বেদখল। পার্ক-মাঠগুলো ব্যবহারের উপযোগিতায় নেই। খাল ও নিম্নাঞ্চল ভরাট হয়ে বৃষ্টি না হতেই জলাবদ্ধতা। বর্জ্য অব্যবস্থাপনায় নগর পরিবেশ দারুণভাবে কলুষিত। কেউ জানে না রাজধানী ঢাকায় কত জনসংখ্যা, ঘরবাড়ি বা যানবাহন আছে। সব মিলে অসমন্বিত উন্নয়নের কারণে আজ নগরীতে যানজট ভয়াবহ রূপ নিয়েছে। তার মধ্যে সিটি করপোরেশনকে দ্বিখণ্ডিত করে রাজধানীর উন্নয়নে সমস্যার আরও ব্যাপ্তি ঘটানো হয়েছে। বহুল আলোচিত মহাপরিকল্পনা (DMDP), অঞ্চলভিত্তিক উন্নয়ন পরিকল্পনা (DAP) ও কৌশলগত পরিবহন পরিকল্পনা (STP) অনুমোদন হয়ে পড়ে আছে, বাস্তবায়নের তেমন কোনো তাগিদ নেই। এই অবস্থায় কার্যকর হতে যাচ্ছে আরেকটি নতুন মহাপরিকল্পনা (RDP 2016-2035)।
আর অসমন্বিত উন্নয়ন তো সারা দেশে। আগে জেলা পর্যায়ে জেলা প্রশাসকেরা উন্নয়ন সমন্বয় করতেন। কিন্তু অনির্বাচিত তথা অযোগ্য লোকজন দিয়ে জেলা পরিষদ গঠনের কারণে সেই ব্যবস্থ’াটিতে ছেদ ধরেছে। পেশাদারির চেয়ে দলীয় বিবেচনায় সবকিছু চলছে। উপজেলা ও পৌরসভা পর্যায়ে অবস্থা তো আরও শোচনীয়Ñ সাংসদ ও উপজেলা চেয়ারম্যানের মধ্যে ক্ষমতার দ্বন্দ্ব, এলাকার নেতৃত্বে কোন্দল এবং মাস্তান ও চাঁদাবাজদের দাপটে হালে কোনো উন্নয়নমূলক কাজই সুষ্ঠুভাবে বাস্তবায়ন হয় না। টেন্ডারবাজি তো সর্বত্র। অনেক জায়গায় উন্নয়নকাজ তদারকিতেও স্থানীয় নেতৃত্ব ও টেন্ডারবাজদের বাধা, ফলে যেনতেনভাবে প্রকল্প বাস্তবায়িত হচ্ছে। প্রতিবাদ করলে অপমান-মারধর, বদলি-ওএসডি করা হয়। প্রকৃত অর্থে, দেশজুড়ে হাতেগোনা কয়েকটি ‘বিশেষ প্রকল্প’ ব্যতীত দেশের কোনো জায়গায় উন্নয়মূলক কাজে তেমন গতি নেই।
আবার দেশের সামষ্টিক উন্নয়নের জন্য এককভাবে (Unified) কোনো নীতিমালাও নেই। একেক মন্ত্রণালয় ও সংস্থার একেক ধরনের নিয়ম। একটা সর্বজনীন জাতীয় বিল্ডিং কোড থাকলেও সবাই তা অনুসরণ করে না। ফলে বিভিন্ন সংস্থার উন্নয়নমূলক কাজের আলাদা আলাদা Schedule of Specifications and Rates এবং বাস্তবায়নপ্রক্রিয়া। ফলে একই ধরনের কাজের দর হ্রাস-বৃদ্ধিসহ বাস্তবায়নকালে গুণগতমানেও ভিন্নতার সৃষ্টি হয়। এ ছাড়া দেশের প্রচলিত ক্রয় বিধিমালা (Public Procurement Rules) অনুসারে দরপত্রে সর্বনিম্ন দরদাতাকে কার্যাদেশ প্রদানের কারণেও উন্নয়নকাজের গুণগতমান সঠিক থাকে না। আবার প্রায়ই কিছু উন্নয়নকাজে অত্যধিক ব্যয় ও দুর্নীতির অভিযোগ ওঠে। সম্প্রতি প্রকাশিত তুলনামূলক এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বাংলাদেশের সড়ক-মহাসড়ক নির্মাণে বিশ্বের অন্যান্য দেশের চেয়ে অনেক বেশি ব্যয় হয়। দেশে চার লেনবিশিষ্ট সড়ক নির্মাণে প্রতি কিলোমিটারে ৫৯ কোটি টাকা বা ততোধিক বেশিও ব্যয় হয়, অথচ ভারত ও এশিয়ার অনেক দেশে এই ব্যয় অনেক কম। এসব বিভিন্ন অসংগতির কারণে দেশের কিছু মেগা প্রকল্পের (Fast Track Project) বাস্তবায়ন প্রশ্নবিদ্ধ হয়ে পড়েছে।
এ কথা সত্য যে মুক্তবাজার অর্থনীতিতে বিগত বছরগুলোতে দেশের উন্নয়নে একটা ভালো গতির সঞ্চারিত হয়েছিল। একপর্যায়ে বাংলাদেশ দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় Emerging Country বা Paradox হিসেবেও পরিচিতি লাভ করেছিল। রাজনৈতিক স্থি’তিশীলতা ও উন্নয়নের ধারাবাহিকতা থাকলে বাংলাদেশ এত দিন হয়তো বা থাইল্যান্ড, মালয়েশিয়া ও সিঙ্গাপুরের মতো অনেক দূর এগিয়ে যেত। সময়ের প্রেক্ষাপটে দেশে একদিকে যেমন নতুন নতুন উদ্যোক্তার সৃষ্টি হচ্ছিল, তেমনি কিছু সুবিধাভোগী শ্রেণিরও উদ্ভব হচ্ছিল, আবার কেউ কেউ মধ্যবর্তী ভূমিকায় আবির্ভূত হয়ে প্রচুর ধন-সম্পদের মালিকও হয়ে বসেন। যেভাবেই হোক এসব নব্য পুঁজিপতিরা তাঁদের বৈধ-অবৈধ আয় বা সম্পদ দেশের বাইরে প্রাচারের চেয়ে দেশের অভ্যন্তরে বিভিন্ন খাতে বিনিয়োগের প্রেক্ষিতে রিয়েল এস্টেট থেকে বিভিন্ন শিল্প খাতের উন্নয়নে বেশ অগ্রগতি সাধিত হয়। কিন্তু এতে প্রথম ছন্দপতন ঘটে ১/১১-এর সরকারের শাসনামলে, যখন দুর্নীতি দমন অভিযানের নামে অসংখ্য ব্যবসায়ী-শিল্পপতি-আমলা-রাজনৈতিক নেতা ও উদ্যোক্তাকে ‘মহা দুর্নীতিবাজ’ বানিয়ে তাঁদের বিরুদ্ধে মামলা দায়ের ও আটক-নির্যাতনের মাধ্যমে গোটা অর্থনীতিতে স্থবিরতার সৃষ্টি করা হয়। সে থেকে অনেকে তাঁদের অর্জিত ধন-সম্পদ বিদেশে নিয়ে যেতে শুরু করেছেন। কেউ কেউ তো তাঁদের সবকিছু গুটিয়ে বিদেশে ‘সেকেন্ড হোম’ বানিয়ে চলে যান। যার পরিপ্রেক্ষিতে এক অদৃশ্য আতঙ্কে শহর-নগরে বেসরকারি উদ্যোগে নির্মিত হাজার-হাজার ফ্ল্যাট অবিক্রীত অবস্থায় পড়ে আছে, অনেক শিল্প-কারখানা বন্ধ হয়ে গেছে এবং নতুন উন্নয়নে প্রতিবন্ধকতা ও শ্লথগতির সৃষ্টি হয়েছে।
১/১১-এর সরকারের আমলে ভীষণভাবে ক্ষতিগ্রস্ত দুটি বড় রাজনৈতিক দলের মধ্যে এই মর্মে ঐক্য হয়েছিল, যে দল বা যারাই ক্ষমতায় যাক না কেন, ভবিষ্যতে তারা সমন্বিতভাবে কাজ করবে, দেশের উন্নয়নকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দেবে। কিন্তু ক্ষমতার প্রতিযোগিতায় কেউ কথা রাখে না। বিরোধী দল তো বরাবর দেশের উন্নয়নকে বাধাগ্রস্ত করেই ক্ষমতায় যেতে চায়। ২০১৪ সালের শুরুতে অনুষ্ঠিত জাতীয় নির্বাচনকে কেন্দ্র ২০১৫ সালের প্রথম তিন মাসে জ্বালাও-পোড়াওয়ের রাজনীতিতে পুরো দেশের উন্নয়নই স্থবির হয়ে পড়েছিল। তার সঙ্গে আন্তর্জাতিক রাজনীতি তো আছেই। বিশ্বব্যাংক পদ্মা সেতু নির্মাণে সহায়তা প্রদানে ঋণচুক্তি স্বাক্ষর করেও দুর্নীতির অভিযোগ তুলে পিছিয়ে যায়। আর বাংলাদেশকে নিয়ে ভূ-রাজনীতিতে বিশ্বব্যাংকের সঙ্গে ADB, IMF, EU ও JICA-এর পাশাপাশি মধ্যপ্রাচ্যের অনেক মুসলিম দেশও তাদের প্রতিশ্রুত অনেক প্রকল্পে ঋণ সহায়তা বন্ধ করে দেয়। এর মধ্যেও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নেতৃত্ব ও প্রজ্ঞায় নিজস্ব অর্থায়নে পদ্মা সেতুর নির্মাণকাজ চলছে।
প্রসঙ্গক্রমে উল্লেখ্য, ক্ষমতাসীন সরকারের নির্বাচনী ইশতেহারে পদ্মা সেতুর মতো দেশের বিভিন্ন জায়গায় বড় আকারের আরও কিছু উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়নের অঙ্গীকার ও প্রতিশ্রুতি ছিল। ঢাকা-চট্টগ্রামে এক্সপ্রেসওয়ে নির্মাণ, কক্সবাজারের অদূরে সোনাদিয়ায় গভীর সমুদ্রবন্দর নির্মাণসহ চট্টগ্রাম ও মংলা বন্দরের আধুনিকায়ন; ঢাকার অদূরে একটি নতুন বিমানবন্দর নির্মাণ, রাজধানী ঢাকায় পাতাল রেল, মনোরেল, মেট্রোরেল, সার্কুলার রেলপথ ইত্যাদি উল্লেখযোগ্য। নির্বাচনোত্তর সরকার এসব কিছু প্রকল্পগুলোর বাস্তবায়নে বিভিন্নভাবে চেষ্টা চালায়। PPP-এর মাধ্যমেও কিছু প্রকল্প বাস্তবায়ন করাও ছিল বড় ধরনের চমক। কিন্তু অদ্যাবধি বিষয়টি অনেকটা চমকেই সীমাবদ্ধ। কারণ, এতদ্বিষয়ে প্রণীত আইন অনুমোদনে অনেক বিলম্বসহ প্রকল্প অনুমোদন ও কর্মপদ্ধতি সহজীকরণ না হওয়ায় কিছু উদ্যোক্তারা অনেকটা এগিয়েও পিছিয়ে যান এবং কয়েকটি প্রকল্প PPP-এর মাধ্যমে বাস্তবায়নের জন্য গৃহীত হলেও কখন সেগুলোর বাস্তবায়ন কার্যক্রম শুরু ও শেষ হবে তা সম্পূর্ণ অনিশ্চয়তা পড়েছে। যেমন- রাজধানী ঢাকায় যানজট সমস্যার সমাধানে কুর্মিটোলা বিমানবন্দর থেকে যাত্রাবাড়ীর কুতুবখালী পর্যন্ত এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ের নির্মাণে ইথাল-থাই কনসোর্টিয়ামের সঙ্গে চুক্তিবদ্ধ হওয়ার পর তিন-চার বছর পেরিয়ে গেলেও সরেজমিনে কাজটির কোনো অগ্রগতি চোখে পড়ে না। আবার কিছু মেগা প্রকল্পের বাস্তবায়ন নিয়ে নতুন ধরনের রাজনীতিও চলছে। যেমন ক্ষমতাসীন সরকার সোনাদিয়ায় গভীর সমুদ্রবন্দর নির্মাণের চেয়ে এখন খুলনার পায়রায় গভীর সমুদ্রবন্দর স্থাপনে বেশি আগ্রহী হয়ে পড়েছে। এভাবে অগ্রাধিকার তালিকায় হেরফের, বিভিন্ন দাতা সংস্থা ও প্রভাবশালী দেশসমূহের সঙ্গে সরকারের সম্পর্কের টানাপোড়েন, ঋণ-সহায়তা প্রদানে বিভিন্ন ধরনের বাড়তি শর্তারোপ ইত্যাদির কারণে প্রতিশ্রুত প্রকল্পের বাস্তবায়নে সৃষ্টি হয়েছে স্থবিরতার।
আর এখন তো সবকিছুতেই কথা আর কথা। কথামালার রাজনীতিতে জড়িয়ে কিছু প্রকল্পের কাজ অনেক দূর এগিয়েও বাস্তবায়িত হয়নি। দেশজুড়ে সড়কের বেহাল দশা হলেও সরকারের সাবেক আর বর্তমান মন্ত্রীদের কথায় কোনো পার্থক্য নেই। যেখানে মাওয়া-জাজিরা পয়েন্টে প্রথম পদ্মা সেতুর কাজ অর্থায়নের জন্য আটকে ছিল, সেখানে অচিরে পাটুরিয়া-দৌলতদিয়া পয়েন্টে আরেকটি নতুন সেতু নির্মাণের ঘোষণায় মানুষ কারও কথায় আস্থা রাখতে পারছে না। এভাবে অতিকথনের কারণে আড়িয়ল বিলে বঙ্গবন্ধুর নামে নতুন বিমানবন্দর নির্মাণের পরিকল্পনার অকাল মৃত্যু ঘটে।
অন্যদিকে, নব্বইয়ের দশক থেকে দেশ গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ায় ফেরত এলেও দেশের উন্নয়ন দর্শনে এখনো স্বৈরশাসকদের ছায়া বহাল রয়েছে। অর্থের সংস্থান না থাকলেও বড় বাজেট ঘোষণা করা যেন নিয়মেই পরিণত হয়েছে। তারপর একই ধারায় কথার ফুলঝুড়ি ছড়িয়ে ও নানা আশ্বাস দিয়ে যেসব লোকজন নির্বাচিত হয়, ক্ষমতায় বসে তারা তাদের মতো রাজত্ব করেন। অনেক ক্ষেত্রে নির্বাচিত ব্যক্তিরা এলাকায়ও যান না, ফলে অনেক স্থানে Free Style-এর উন্নয়ন হয় এবং কাজের গুণগতমান ভালো হয় না। অন্যদিকে সরকারের তরফ থেকে যেকোনো কিছুর জন্য বিরোধী দলকে দায়ী করাও যেন একটা নিয়মে পরিণত হয়েছে। আর বিরোধী দলে থাকলে তো কথাই নেই। সরকারের সবকিছুতেই ‘না’ আর ‘না’! যে যত বেশি ‘না’ বলে অর্থাৎ নেতিবাচক রাজনীতি করে, আবেগপ্রবণ বাঙালিরা আবার তাদেরই বেশি ভোট দেয়, পরবর্তী মেয়াদে নির্বাচিত করে।
দেশের বড় দুটি রাজনৈতিক দলের মধ্যে চরম অনৈক্যের প্রেক্ষাপটে হালে ‘গণতন্ত্র’ ও ‘উন্নয়ন’ একসঙ্গে চলতে পারে কি না এবং সিঙ্গাপুর-কোরিয়া-ভিয়েতনামের মতো ‘স্বৈরতান্ত্রিক উন্নয়ন’ ব্যবস্থা চালু করা যায় কি না, তা নিয়েও কথাবার্তা হচ্ছে। যখন যারা ক্ষমতায় যায়, তখন তারা বিরোধী দলকে বধ করে উন্নয়ন কার্যক্রম চালিয়ে নিজেদের জনপ্রিয়তা বহাল ও বৃদ্ধি করতে চায়। উল্লেখিত দেশসমূহে এ ধরনের উন্নয়নপ্রক্রিয়া চললেও বাঙালি তথা বাংলাদেশিদের শাশ্বত চরিত্র, মানসিকতা ও সংস্কৃতিতে ওসব দেশের মতো মানুষের মুখ বন্ধ করে দেশের উন্নয়ন করা যাবে কি না, তাও একটা বিরাট প্রশ্ন। কারণ, ইতিপূর্বে জাতির জনক বঙ্গবন্ধু কর্তৃক ‘বাকশাল’ ব্যবস্থা চালু করে অথবা বিভিন্ন সময়ে সামরিক জান্তার সরকার কর্তৃক দেশের উন্নয়নে বিভিন্ন ধরনের অনেক পদক্ষেপ নিয়েও বাঙালিদের মন জয় করতে পারেনি। সবমিলে একটি উন্নয়ন প্রকল্পের সাইটে সত্যিকারে কী উন্নয়ন হয়, কতটুকু বাস্তবায়ন হয় এবং কারা উপকৃত হয় তা নীতিনির্ধারক পর্যায়ে অজানা থেকে যায়। অনেক ক্ষেত্রে এ ধরনের প্রকল্প বাস্তবায়ন-উত্তর Liability-ই হয়ে যায়।
এ প্রসঙ্গে আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো- আমাদের নিজস্ব উন্নয়ন দর্শনের অভাব। বোদ্ধা লোকজনের কথা- যমুনা সেতু অতঃপর পদ্মা সেতু নির্মাণের ব্যবস্থা করে ঢাকায় জনসংখ্যা বৃদ্ধি করা হয়। অথচ তার পরিবর্তে যদি ঢাকা-চট্টগ্রাম-কক্সবাজার, ঢাকা-সিলেট, ঢাকা-গাজীপুর-উত্তর বাংলা ও দক্ষিণ বাংলার মহাসড়কগুলোর উন্নয়ন করা হতো, যমুনা ও পদ্মা নদীর ওপারে দুটি স্বয়ংসম্পূূর্ণ নগর গড়ে তোলা হতো, প্রতিটা বিভাগীয় ও জেলা শহরকে যথাযথভাবে বিনির্মাণ এবং ঢাকার আশপাশের শহরগুলোর সঙ্গে যোগাযোগব্যবস্থার উন্নয়ন করা হতো, তাহলে অবস্থা ঠিক তার উল্টো হতো। চট্টগ্রামকে দেশের বিকল্প রাজধানী বানানো হলে দেশের উন্নয়নে আরও গতি পেত এবং চট্টগ্রাম-মিয়ানমার হয়ে থাইল্যান্ড-মালয়েশিয়া বা চীনের সঙ্গে বাংলাদেশের সরাসরি যোগাযোগ সৃষ্টি হতে পারত। হালে রাজধানী ঢাকায় ঘিঞ্জি ঘনবসতি ও অপরিকল্পিত অবকাঠামোর কারণে বিশাল ব্যয়ে উড়ালসেতু, মেট্রো/পাতাল রেল ইত্যাদি নির্মাণ করে কোনো লাভ হবে কি না তা নিয়েও কথাবার্তা হচ্ছে। আমাদের কি কখনো একটা Home Grown Development Policy হবে না? উন্নয়নে ধারাবাহিকতা রক্ষা করা কী একটা কঠিন কাজ? অপরকে শ্রদ্ধা করলে তো নিজের শ্রদ্ধা বৃদ্ধি পায়- কিন্তু এ কথাটা আমাদের রাজনৈতিক নেতারা বোঝেন না তা নয়। নিশ্চয় বোঝেন। কিন্তু ব্লেমগেমের পলিটিক্স ও নেতৃত্বের অনৈক্যে তা কার্যকর হচ্ছে না।
সম্প্রতি বাংলাদেশ মধ্যম আয়ের দেশের তালিকায় স্থান করে নিয়েছে। অনেকের মতে, সহস্রাব্দ উন্নয়ন লক্ষ্যের (MDG) ধারাবাহিক বাস্তবায়নের পরিপ্রেক্ষিতে এই সফলতা এসেছে। রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা এবং অন্যান্য উন্নয়ন কর্মকাণ্ডেও ধারাবাহিকতা থাকলে এত দিন দেশটি অবশ্যই আরও এগিয়ে যেত। কাজেই দেশের উন্নয়নপ্রক্রিয়ায় অবশ্যই ধারাবাহিকতা প্রয়োজন। একইভাবে দল-মত ভুলে গিয়ে উপযুক্ত ও দক্ষ লোকজনকে যথাস্থানে বসাতে হবে। উদ্যোক্তা মানুষটি আওয়ামী লীগের সমর্থক নাকি বিএনপির সমর্থক সেই বিবেচনা না করে প্রকৃত যোগ্য উদ্যোক্তা ও প্রতিষ্ঠানটিকে সুযোগ-সহায়তা প্রদান করতে হবে। প্রশাসনকে কৃত্যভিত্তিক ও জনমুখী করতে হবে। সুশাসন প্রতিষ্ঠাসহ সুষম উন্নয়নব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা করতে হবে। ট্যাক্স আহরণ ও জিডিপি বাড়াতে হবে। সংশ্লিষ্ট আইনকানুন ও বিধিবিধানকে সময়োপযোগী করে এবং সবাইকে দায়িত্ব দিয়ে ও নির্ভয়ে কাজ করতে উৎসাহিত করতে হবে। বৈশ্বিক উন্নয়ন ধারায় দেশকে এগিয়ে নিতে বিশেষ করে MDG থেকে টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্য (SDG) অর্জনে উন্নয়নপ্রক্রিয়াকে প্রকৃত পরিবেশ ও জনবান্ধব করতে হবে। গতানুগতিক পন্থায় SDG অর্জন সম্ভবপর নয়। এ জন্য প্রয়োজন রাজনৈতিক ঐকমত্য, স্থিতিশীলতা ও নেতৃত্বের দূরদর্শিতা।
প্রকাশকাল: বন্ধন, ৬৮তম সংখ্যা, ডিসেম্বর ২০১৫