হংকং বিশ্বের সব থেকে ব্যয়বহুল শহরের একটি। নিয়নের আলোয় ঝলমলে শপিংমল, যেখানে বিক্রি হয় নামীদামি সব গহনা, নামী ব্র্যান্ডের বিলাসবহুল সামগ্রী ও প্রযুক্তি, আকাশছোঁয়া উঁচু দালানের আভিজাত্য আর বাণিজ্যের স্বর্গভূমি। হংকং বলতে আমাদের সামনে ঠিক এ রকমই আলোঝলমলে ব্যস্ত নগরীর চিত্র ফুটে ওঠে। কিন্তু ওই যে কথায় আছে, প্রদীপের নিচেই অন্ধকার। তেমনি এই ঝা-চকচকে শহরের আরেকটি ভীষণ অন্ধকার রূপ রয়েছে। সেটির বর্ণনা পড়তে হয়তো আপনার ভালো লাগবে না, যেমন আমার ভালো লাগেনি এ রকম কিছু নিয়ে লিখতে। ব্যক্তিগত আবেগ আপাতত তুলে রাখি। আসুন, আরেক বাস্তবতার সঙ্গে পরিচয় হই। পরাবাস্তবের মতো যা বোঝার সাধ্যের বাইরে থাকলেই বরং বেশি ভালো।
বৈভবের বিপরীতে হংকংয়ে যে দৈন্যদশার চিত্র, তার পেছনেও রয়েছে ভিন্ন এক ইতিহাস। খুব সাধারণ আর অনুমেয় ইতিহাস-যুদ্ধ। চীনের গৃহযুদ্ধের সময় (১৯২৭-১৯৫০) অনেকেই নিজ বাসভূম ছেড়ে আশ্রয় নিয়েছিল হংকংয়ে। ১৯৫১ থেকে ১৯৬১ মাত্র ১০ বছরে হংকংয়ের জনসংখ্যাা বেড়ে দাঁড়ায় দেড়গুণ। স্বাভাবিকভাবেই এই বাড়তি জনসংখ্যাার জন্য আবাসন বিশাল এক সমস্যা হয়ে দাঁড়ায়। আর হংকংয়ের সরকারি নীতি অনুযায়ী আপনি কোনো জমির মালিক হতে পারবেন না, সমস্ত ভূমির অধিস্বত্ব সরকারের। সরকার প্রয়োজনবোধে এই জমি ইজারা দেয়। আবার অভিবাসন নীতি অনুযায়ী সাত বছরের আগে আপনি এই জমি ইজারা পাওয়ার অধিকারীও নন। এখন এই বিপুলসংখ্যাক অভিবাসী, যাঁরা আবার বেশির ভাগই দরিদ্র, তাঁদের আবাসনের ব্যবস্থা কী হবে? সরকার তাঁদের জন্য খুপরির থেকেও ছোট সাইজের থাকার জায়গার ব্যবস্থা করল। একটি ফ্ল্যাটে ১৫-২০টি খাঁচাসদৃশ থাকার জায়গা, ফ্ল্যাটের সব বাসিন্দার জন্য একই রান্নাঘর আর পয়োব্যবস্থা। কিন্তু এই ফ্ল্যাটের দেখভালও সরকারের পক্ষ থেকে চালিয়ে যাওয়া বেশ কঠিন। সরকার তখন ব্যবসায়ীদের কাছে জমি ইজারা দেওয়া শুরু করল। শুরু হলো নতুন আবাসন ব্যবসা আর আবাসন সংস্কৃতি ‘কেইজ হোম’ (ঈধমব ঐড়সব)। কেউ কেউ অবশ্য একে কফিন-ঘরও বলে থাকে। বললে অবশ্য সেটিও অত্যুক্তি হবে না।
কেমন এই কফিন-ঘর বা খাঁচা-ঘর? সব থেকে বড় খাঁচা-ঘরটির আয়তন ছয় ফুট বাই চার ফুট, বেশির ভাগই ছয় ফুট বাই দুই ফুট বা আরও ছোট। একটির ওপরে আরেকটি বিছানা বসানো আর এই জায়গাগুলো লোহা বা ধাতব খাঁচা দিয়ে আটকানো। আক্ষরিক অর্থেই এটি একটি খাঁচা। সাধারণ একটি ৪০০ বর্গফুটের ফ্ল্যাটে পাঁচ-ছয়টি পরিবারের বাস। প্রতিটি রুম এমন ওপর-নিচ খাঁচায় বিভক্ত। রান্নাঘর আর টয়লেট একই স্থানে। যদি কোনো ফ্ল্যাটে বসার ঘর থেকে থাকে, সেটি সাধারণত সবার ব্যবহারের জন্য উন্মুক্ত। ভেন্টিলেশনের নেই কোনো ব্যবস্থা। ভীষণ গরম, নোংরা আর স্যাঁতসেঁতে একেকটি ফ্ল্যাট রোগবালাই আর ছারপোকার সূতিকাগার।
খাঁচার ভেতর খুব কষ্টে পাতা যায় একজনের শোবার মতো বিছানা। এখানেই রাখতে এর বাসিন্দাকে তার সমস্ত ব্যবহার্য জিনিসপত্র। এর উচ্চতা এমন যে একজন পূর্ণবয়স্ক মানুষ কোনোমতে মাথা সোজা করে বসতে পারে। মোট কথা, সুস্থভাবে থাকার জন্য কোনোভাবেই বাসযোগ্য পরিবেশ নয় এটি। তবু এখানে বহু মানুষ বাস করছে। শুধু তা-ই নয়, তার জন্য তাকে ভাড়াও গুনতে হচ্ছে আকাশচুম্বী। একেকটি খাঁচার গড়ে ভাড়া ২ হাজার হংকং মুদ্রা, যা প্রায় ২৫০ মার্কিন ডলার বা বাংলাদেশি টাকায় ২০ হাজার টাকার সমান। তবুও এ রকম খাঁচার চাহিদার কমতি নেই। বরং এর চাহিদা বেড়েই চলছে। সমানতালে বাড়ছে এর ভাড়াও।
এই ধরনের খাঁচা-ঘর মূলত দরিদ্র, নিম্ন আয় আর অভিবাসী জনগোষ্ঠীর মধ্যে বেশি কাঙ্ক্ষিত । হংকংয়ের গড় মাসিক আয়ের থেকে গড় মাসিক ঘরভাড়া ১৯ গুণেরও বেশি। সে সব জনগোষ্ঠী ন্যূনতম সামাজিক নিরাপত্তা পাওয়ার যোগ্যতা রাখে না কিংবা বিদ্যুৎ বিলের মতো অন্যান্য বিল দেওয়ার সামর্থ্য নেই, নিম্ন আয়ের অভিবাসী, পরিবারহীন আর মাদকাসক্তের একটি বিশাল অংশ এ ধরনের আবাসনের জন্য আবেদন করে থাকে। সরকার যেহেতু এ ধরনের ফ্ল্যাট নির্মাণ ও সেগুলো ভাড়া দেওয়ার ব্যবসা বৈধ করেছে, অনেক ব্যবসায়ীই এটিকে অবৈধ আয়ের উৎসও বানিয়ে ফেলেছেন। নিয়মবহির্ভূত ভাড়া বাড়ানো, ন্যূনতম আবাসন সুবিধার দায় এড়ানো যার মধ্যে অন্যতম।
কেউ কেউ আবার এটিকে ‘লাক্সারি’ খেতাব দিয়েও নতুন ব্যবসা ফেঁদে বসেছে। এ রকম লাক্সারি খাঁচা-ঘরের সব ব্যবস্থাই এক, শুধু তাঁদের দাবি ও পরিস্থিতি অনুযায়ী সেগুলো আরেকটু পরিচ্ছন্ন। ধাতব খাঁচার বদলে কিউবিকল বা কাঠের পার্টিশন, ব্যক্তিগত গোপনীয়তার আরেকটু বেশি সুবিধা এই আর কী! যেহেতু নামের আগে লাক্সারি আছে তাই ভাড়াটাও সে রকম লাক্সারিয়াস। খাঁচার অবস্থানভেদে কোনো কোনোটির ভাড়া ৫ হাজার থেকে ৬ হাজার হংকং ডলার।
জানালাবিহীন, গরাদের মতো এসব ঘরের বাসিন্দাদের স্বাস্থ্যঝুঁকি প্রচন্ড। সংক্রমণ রোগের পাশাপাশি বিশেষ ভালো থাকে না মানসিক অবস্থাও। এ রকম ঘরের বেশির ভাগ বাসিন্দার বয়স ৫০-এর বেশি। বিছানার ওপরে উঠে বসার মতো জায়গা থাকে না, ঠিকমতো শোয়াও সম্ভব নয়। কোনো প্রাকৃতিক আলো-হাওয়ার ব্যবস্থা নেই। পরিচ্ছন্নতার বালাই নেই। নোংরা পরিবেশেই খাবার তৈরির ব্যবস্থা। ব্যক্তিগত পরিচ্ছন্নতার সুযোগও নেই বললেই চলে। আর ব্যক্তিগত নিরাপত্তা? সেটি ভুলে যাওয়াই শ্রেয়। এ ধরনের ঘরে বসবাসকারীরা সামাজিক মর্যাদাহীনতায় ভোগে। খোঁয়াড়ের ভেড়ার থেকেও যাঁদের জীবনযাপনের মান আরও নিচু, তাঁদের আর কী-ইবা মর্যাদা! প্রাণান্তকর খেটেও ন্যূনতম জীবনযাপনের সুযোগ পাওয়া হয়ে ওঠে না তাঁদের।
পরিসংখ্যাান বলছে, মানব উন্নয়ন সূচকে হংকংয়ের অবস্থান বিশ্বে প্রথম দিক থেকে সাত নম্বরে। জনগণের মাথাপিছু আয় ৩ লাখ আর এটি সব থেকে ধনী শহরের একটি যেখানে সবচেয়ে বেশি উঁচু অট্টালিকা রয়েছে। কিন্তু দুই লাখেরও বেশি খাঁচা-ঘরের বাসিন্দার বাস্তবতা জানায় ভিন্ন গল্প। অভিজাত শপিংমলের নিরাপত্তারক্ষী কিংবা বাড়িতে আসা ডেলিভারি ম্যানের সঙ্গে আপনি নিজের তেমন কোনো পার্থক্য হয়তো খুঁজে পাবেন না। পার্থক্য কেবল বোধ হয় ওর থাকার ঘরটিতে। কিন্তু আসলেও কি তাই? মূল পার্থক্য আসলে মানুষ হিসেবে মর্যাদায়। বিশ্বের সভ্যতা আর সম্পদ যতই উন্নত হোক, এই পার্থক্য কমে যাওয়ার বদলে দিন দিন বাড়ছে, সেটি কেবল ওই হংকংয়ের খাঁচা-ঘরের বাসিন্দার ক্ষেত্রে নয়, বরং আমাদের চারপাশে, সবখানে-সর্বত্রই।
প্রকাশকালঃ বন্ধন, ১০৫তম সংখ্যা, জানুয়ারী ২০১৯