নগরের পোস্টার, ব্যানার, বিলবোর্ড কথন

সুজলা-সুফলা, শস্য-শ্যামলাখ্যাত বাংলাদেশের অপরূপ সৌন্দর্যে ঢাকা পড়ে গেছে দেশজুড়ে অনিয়ন্ত্রিত বিজ্ঞাপন, প্রচারপত্র, প্রচার ও বিজ্ঞাপনচিত্রে। বিশেষত যততত্র ও এলোপাতাড়িভাবে লাগানো সাইনবোর্ড, পোস্টার, প্ল্যাকার্ড, ব্যানার, ফেস্টুন, বিলবোর্ড ইত্যাদির কারণে। আমরা ছোট থেকে যে প্রাকৃতিক বাংলাদেশ দেখেছি, তা এখন নেই বললেই চলে। সে সময় চট্টগ্রামের যে নয়নাভিরাম প্রাকৃতিক সৌন্দর্য ছিল, তা আজ আর নেই। চট্টগ্রাম থেকে বাস বা ট্রেনে ঢাকা আসা-যাওয়ার পথে যে নৈসর্গিক সবুজ শস্যক্ষেত ও নদী-খাল-নালা দেখা যেত, তা এখন নানা ধরনের পোস্টার, প্রচার ও বিজ্ঞাপনচিত্রে প্রায় ঢাকা পড়ছে। চট্টগ্রাম শহর থেকে বেরিয়ে ভাটিয়ারী-কুমিল্লা-ফৌজদারহাটে পৌঁছালে বাস-ট্র্রেন থেকে বঙ্গোপসাগর দেখা যেত, যা এখন আর দেখা যায় না। অবশ্য অনেক জায়গায় ঘরবাড়ি ও অন্যান্য স্থাপনার কারণেও এই অবস্থার সৃষ্টি হয়েছে। লক্ষণীয় যে আগে এসবের নিয়ন্ত্রণে দেশে কোনো আইন ছিল না, অথচ এখন আইন আছে কিন্তু মানা হচ্ছে না। আবার সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের নৈতিকতাবোধও হারিয়ে গেছে, যার কারণে যে বা যারা যেভাবে পারছে সেভাবে যেকোনো স্থানে নিজেদের ইচ্ছেমতো অপকর্মটি করছে।

যেদিকে তাকাই সর্বত্রই বিভিন্ন ধরনের বিজ্ঞাপন, প্রচারপত্র, পোস্টার ও বিজ্ঞাপনচিত্রে সয়লাব। দেশের গেটওয়েখ্যাত ঢাকা বিমানবন্দরের প্রবেশমুখে হাজারো সাইনবোর্ড, ব্যানার, পোস্টার, ফেস্টুন ও বিলবোর্ড, যার বেশির ভাগই এবড়োথেবড়োভাবে লাগানো এবং অনেক ক্ষেত্রে ছিঁড়ে ঝুলে রয়েছে। দৃশ্যত, কোনো পোস্টারই সুন্দর ও সুষ্ঠুভাবে লাগানো হয়নি। যে বা যারা যেভাবে পেরেছে এসব তৈরি করে লাগিয়েছে। অনেক ক্ষেত্রে একটার ওপর রয়েছে আরেকটা। এভাবে নগরীর সীমিত কিছু এলাকা ব্যতীত পুরো রাজধানী ঢাকা পোস্টার, ফেস্টুন, ব্যানার ও বিলবোর্ডে। লক্ষণীয়, একদিকে অপরিকল্পিত ও অনিয়ন্ত্রিত উন্নয়নের আগ্রাসনে নগরীতে সবুজ বিলীনপ্রায়, অন্যদিকে যা আছে তাও অনিয়ন্ত্রিত পোস্টার ও বিজ্ঞাপনচিত্রের দাপটে হারিয়ে গেছে। এমনকি নগরীর দৃষ্টিনন্দন ইমারত, স্থাপনা এবং অবকাঠামোগুলোও অনেক ক্ষেত্রে আচ্ছাদিত হয়েছে। ফলে সার্বিকভাবে নগর পরিবেশ বিদ্ঘুটে হয়ে গেছে এবং দৃশ্যমান দূষণ-এর সৃষ্টি করেছে। আর নির্বাচন ও বিভিন্ন অনুষ্ঠানকালে অবস্থা হয় আরও সঙ্গীন। অথচ দেশের কোথাও বিনা অনুমতিতে ও নির্ধারিত স্থান ব্যতীত অন্যত্র বিজ্ঞাপন, প্রচারপত্র, প্রচার ও বিজ্ঞাপনচিত্র লাগানো বা সাঁটার সুযোগ নেই।

বিভিন্ন সময়ে উপায়হীন পরিস্থিতিতে স্থানে স্থানে বিচ্ছিন্নভাবে নগর এলাকার কিছু সড়কের ধার থেকে এসব বৈধ-অবৈধ ব্যানার ও বিলবোর্ড অপসারণ করা হলেও কার্যকর নিয়ন্ত্রণব্যবস্থা ও সমন্বয়হীনতায় অপসারণের কয়েক দিন যেতে না-যেতেই তা আবারও স্থান করে নেয় স্বস্থানে। যেমন উত্তর ও দক্ষিণে বিভাজিত ঢাকা ও চট্টগ্রামের বর্তমান মেয়ররা দায়িত্ব নেওয়ার পর নগরীর সৌন্দর্য ফিরিয়ে আনতে এখানে-ওখানে কিছু বিলবোর্ড ও ব্যানার অপসারণ করলেও আজ অবধি কোথাও অবস্থার তেমন কোনো উন্নতি হয়নি। কোথাও কখনো সংশ্লিষ্ট আইনটির প্রয়োগের বিষয়েও কিছু শোনা যায়নি। প্রশ্ন জাগে, এতদ্বিষয়ে যে একটা আইন আছে, তাও নগরীর মেয়র মহোদয়গণ জানেন কি না? জানা থাকলে তো এত দিন সংশ্লিষ্টদের বিশাল আর্থিক জরিমানা করা হতো, হতো কারাদণ্ড এবং নগরীর পরিবেশও হতো অনেক সহনীয়। 

উল্লেখ্য, ২০১২ সালে জাতীয় সংসদে অনুমোদিত ‘দেয়াললিখন ও পোস্টার নিয়ন্ত্রণ’ আইনে পোস্টার বলতে কাগজ, রেক্সিন বা অন্য যেকোনো কিছু দিয়ে তৈরি ও প্রস্তুতকৃত যেকোনো ধরনের বিজ্ঞাপন, প্রচারপত্র, প্রচার ও বিজ্ঞাপনচিত্রকে বোঝানো হয়েছে এবং সে হিসেবে যেকোনো ধরনের দেয়াললিখন, সাইনবোর্ড, ব্যানার, তোরণ, বিলবোর্ড, লিফলেট, হ্যান্ডবিল ইত্যাদি এর আওতায় পড়ে। বিজ্ঞাপন কিংবা প্রচারপত্রের ধরন, কোথায় লাগানো যাবে ও কীভাবে তার সবকিছু আইনটিতে বর্ণিত আছে এবং ক্ষেত্রমতো প্রয়োজনীয় বিধিমালা প্রণয়নের নির্দেশনাও রয়েছে। তা ছাড়া যেকোনো ধরনের ইনডোর কিংবা আউটডোর সাইন তৈরি ও স্থাপনের ক্ষেত্রে আমাদের জাতীয় বিল্ডিং কোডে বিস্তারিত কারিগরি বর্ণনা আছে, যেটি ইমারত নির্মাণের আওতায় প্রণীত ও অনুমোদিত। যে বা যারা এই আইন অনুসরণে সাইনবোর্ড, প্রচারপত্র ও বিজ্ঞাপনচিত্র তৈরি করে লাগাবে না এবং যদি এর কোনোটি নাগরিকদের দৃষ্টি ও মননকে আঘাত করে বা কোনো জায়গার সৌন্দর্য নষ্ট ও দৃষ্টিকটু দূষন-এর সৃষ্টি করে, তার বা তাদের বিরুদ্ধে যথাযথ ব্যবস্থা গ্রহণের বিষয়ে উভয় আইনে সুস্পষ্ট উল্লেখ রয়েছে।

অথচ এ রকম দুটি শক্তিশালী আইন থাকা সত্ত্বেও নগরীর তথা দেশের সর্বত্র নিজেদের ইচ্ছেমতো বিভিন্ন ধরনের বিজ্ঞাপন, পোস্টার, ব্যানার ইত্যাদি সাঁটিয়ে ও দেয়ালে লিখে একটি বিশ্রী অবস্থার সৃষ্টি করা হয়েছে। সম্পূর্ণ অনিয়ন্ত্রিত পরিস্থিতিতে দেশজুড়ে প্রতিদিন নিজেদের খেয়াল-খুশিমতো যত্রতত্র পোস্টার, প্ল্যাকার্ড, ব্যানার লাগানো হচ্ছে। নগরীর কিছু এলাকা (ক্যান্টনমেন্ট, পার্লামেন্ট কমপ্লেক্স, গণভবন, বঙ্গভবন, প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়, সচিবালয় ইত্যাদি ও কিছু করপোরেট অফিস) ব্যতীত পুরো নগরই ছেয়ে গেছে হাজার পোস্টার আর ব্যানারে। অনেক জায়গায় পোস্টারের ওপর পোস্টার লাগানো হয় এবং এ নিয়ে স্থানে স্থানে মারামারি ও খুনখারাবির ঘটনাও ঘটে। তা ছাড়া বিভিন্ন ধরনের রাসায়নিক দ্রব্যের সংমিশ্রণে তৈরি আঠা, লেই বা গাঁদ দিয়ে লাগানো অনেক পোস্টার সহজে অপসারণ করাও যায় না এবং যেখানে লাগানো হয় সেখানে স্থায়ী দাগ বা ক্ষতের সৃষ্টি হয়। অদ্ভুত বিষয় হলো, যারা এসব পোস্টার লাগায়, তারা কখনো সেগুলো তোলে না, বরাবর সরকারকেই তা তুলতে হয়। আর প্রায়ই বৃষ্টি, বাতাসে বা আপনাতে ওঠে গিয়ে বা খসে পড়ে নগরীর সৌন্দর্য নষ্ট করে, অনেক ক্ষেত্রে বিভিন্ন ধরনের দুর্ঘটনাও ঘটে। এই অবস্থায় হাইকোর্ট গত ২২ আগস্টের মধ্যে ঢাকা মহানগরীর বিভিন্ন স্থানে সাঁটানো সব পোস্টার, ব্যানার, স্থাপিত তোরণ, দেয়াললিখন ইত্যাদি মুছে ফেলা বা সরানোর জন্য নগরীর দুই মেয়রকে নির্দেশ দিয়েছে। 

জানা যায়, সম্প্রতি বাংলাদেশ পরিবেশ আইনবিদ সমিতির (বেলা) এক আবেদনের ওপর ভিত্তি করে হাইকোর্ট এই আদেশ দেয়। এর আগে ২০১২ সালে বেলার পক্ষ থেকে আদালতে একটি রিট পিটিশন দাখিল করা হয়, যখন সিটি করপোরেশনকে অনতিবিলম্বে রাজধানীর সব ঘরবাড়ির দেয়াল থেকে সব লিখন এবং যত্রতত্র সাঁটানো পোস্টার, ব্যানার ইত্যাদি অপসারণের নির্দেশ দেওয়া হয়। কিন্তু ওই আদেশটি বাস্তবায়িত না হওয়ায় এখন বেলার আবেদনে আবারও নির্দেশ দেওয়া হয়। কথা হচ্ছে, বাস্তবে সিটি করপোরেশনের পক্ষে এত বিলবোর্ড, পোস্টার, ব্যানার ইত্যাদি অপসারণ করা সম্ভব হবে কি না? কারণ, এর পেছনে স্থানীয় টাউট-বাটপার ও দলীয় মাস্তানরা জড়িত এবং অনেক ক্ষেত্রে দলীয় বড় নেতা বা গডফাদারদেরও স¤পৃক্ততা রয়েছে। যাদের অত্যাচার থেকে সরকারি অফিস, দোকানের সাঁটার, পাবলিক স্পেস, পার্ক, পদচারী-সেতু, বৈদ্যুতিক খুঁটি, ফ্লাইওভার, গাছ, বাস কিছুই বাদ নেই। অথচ কর্তৃপক্ষ নির্বিকার!

দৃশ্যত অনেক জায়গায় এসব অনাচার স্থায়ী রূপ নিয়েছে। অনেক ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট লোকজন ব্যক্তিমালিকানাধীন হোল্ডিংস এমনকি ঘরের ছাদেও জোর করে বিলবোর্ড স্থাপন করছে। আর যখন-তখন ও যত্রতত্র দলীয় ও ধর্মীয় তোরণ স্থাপন তো আছেই। ঝড়-বৃষ্টিতে ঘরের ছাদে, রাস্তার ধারে ও ফুটপাতে যেনতেনভাবে স্থাপিত এসব বিলবোর্ড ভেঙে বা ধসে পড়ে প্রায়ই এখানে-ওখানে পথচারীসহ মানুষজন আহত-নিহত হয়। নগরীর কিছু সড়ক ও সড়কমোড়ে তো যেনতেনভাবে স্থাপিত তোরণের কারণে সড়কের পরিবহন ক্ষমতায় প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টিসহ অনেক সময় সেগুলো আপনাতে ভেঙে পড়ার বিষয়টি লক্ষণীয়। বাস্তবে এভাবে প্রতিদিন, সপ্তাহে বা মাসে দেশজুড়ে কত লক্ষ-কোটি টাকার পোস্টার লাগানো হয়, কে কীভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয় এবং এগুলো তুলতে বা অপসারণ করতে সরকারের কত টাকা ব্যয় হয়, এর কোনো ধরনের পরিসংখ্যান ও হিসাব কারও কাছেই নেই।

কিছুদিন আগে উত্তর ঢাকার মেয়র আনিসুল হক রাস্তায় নেমে দেয়ালে সাঁটানো এ ধরনের কিছু পোস্টারের ওপর ক্রস চিহ্ন দিয়ে নগরীর বিভিন্ন স্থানে অবৈধভাবে লাগানো পোস্টার ৩০ মের মধ্যে অপসারণের নির্দেশ দিয়েছিলেন। কিন্তু মেয়র মহোদয়ের এই নির্দেশ মানা হয়নি এবং প্রদত্ত সময় উত্তীর্ণের পর আজ অবধি কোথাও একটা পোস্টারও কেউ তোলেনি কিংবা সরিয়ে নেয়নি। অতঃপর জাতীয় পার্টির সম্মেলনকে কেন্দ্র করে দলের নেতা হাজী সাইফুদ্দিন আহমদ মিলনের নামে নগরী লাখ লাখ পোস্টারে ছেয়ে যায়। মেয়র আনিসুল হক তাঁর ওই সব পোস্টার নিয়ে মন্তব্য করে তাঁকে স্বপ্রণোদিত হয়ে তুলে ফেলার জন্য বলার পরও একটি পোস্টারও অপসারিত হয়নি। আর এ জন্য কারও বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা গৃহীত হয়েছে এমন কোনো খবরও চোখে পড়েনি। অথচ আইনে এটি ফৌজদারি অপরাধ। সর্বশেষ হাইকোর্ট প্রদত্ত সময়সীমাও (২২ আগস্ট) উত্তীর্ণ হয়ে গেছে। অথচ নগরীর সর্বত্র এখনো পোস্টার, ব্যানার ও তোরণে ছেয়ে আছে। যদিও গতানুগতিক নিয়মে দুটি সিটি করপোরেশন থেকে দাবি করা হয় যে হাইকোর্টের আদেশ ৯০ শতাংশ বাস্তবায়িত হয়েছে। অবশ্য স্থান বিশেষে চাপের মুখে কিছু কিছু বিলবোর্ডে বিজ্ঞাপনশূন্য হয়ে থাকলেও সেগুলোর ঝুঁকিপূর্ণ কাঠামো ঠিকই দাঁড়িয়ে আছে। 

প্রসঙ্গক্রমে, ২০০৭-০৮ সালে সেনাশাসিত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের আমলে ‘দেয়াললিখন ও পোস্টার নিয়ন্ত্রণ’ শীর্ষক আইনটি প্রথম অর্ডিন্যান্স আকারে জারি করা হয়। সে সময় দেশের যত্রতত্র বিশেষ করে রাজধানী ঢাকার সর্বত্র দেয়ালে লিখন ও পোস্টার সাঁটানো নিয়ন্ত্রণের জন্য ওই অধ্যাদেশটি জারি করা হয়। ১/১১-র ওই সরকার নিয়ে অনেক তর্ক-বিতর্ক থাকলেও তাদের ওই উদ্যোগটা ছিল অত্যন্ত প্রশংসনীয় এবং সর্বস্তরের মানুষ এই আইনটিকে কার্যকর করতে সহযোগিতাও করেছিল। উদ্ভূত অবস্থা থেকে রেহাই পেতে তথা স্ব-স্ব স্থাপনার সৌন্দর্যের স্বার্থে দেশের সব সচেতন মানুষ ওই আইনটি প্রণয়নে খুবই খুশি হয়েছিল। কিন্তু সে সময় দেশের অস্থিতিশীল পরিস্থিতিতে এই অধ্যাদেশটি তেমন কার্যকর করা যায়নি। কারণ, এর জন্য সুনির্দিষ্ট কোনো নিয়ন্ত্রণকারী প্রতিষ্ঠান ছিল না, যদিও দায়িত্ববান সামরিক কর্মকর্তারা যেখানে-সেখানে পোস্টার লাগানো যাবে না এবং বিনা অনুমতিতে যে বা যারা পোস্টার লাগিয়েছে কিংবা দেয়ালে লিখেছে, তা সরানোর জন্য বলার পরপরই রাতারাতি ও স্বতঃস্ফূর্তভাবে ঢাকার বিভিন্ন স্থান থেকে তা অপসারিত ও দেয়াললিখন মুছে ফেলা হয়েছিল। অতঃপর ২০০৯ সালে গণতান্ত্রিক সরকারব্যবস্থা কায়েমের পর এই অধ্যাদেশটি আইনে পরিণত করা হবে কি হবে না, তা নিয়ে জাতীয় সংসদে দীর্ঘ তর্ক-বিতর্ক হয়। কারণ, এতদ্সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন ব্যবসার সঙ্গে অনেক সাংসদেরাও জড়িত এবং তাঁরা চেয়েছিলেন এই অধ্যাদেশটি যেন আইনে পরিণত না হয়। যাক, সংসদে অধ্যাদেশটির ওপর অনেক বাদানুবাদ ও বিভিন্ন পর্যায়ে সচেতন মানুষজনের আলোচনা-সমালোচনার পরিপ্রেক্ষিতে অবশেষে ২০১২ সালে সংকুচিত আকারে জাতীয় সংসদে আইনটি অনুমোদন লাভ করে। 

আইনটিতে ‘দেয়াললিখন’ বলতে বাসস্থান, অফিস, আদালত, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, ব্যবসাকেন্দ্র, শিল্পকারখানা, দোকান বা অন্য যেকোনো স্থাপনা, কাঁচা বা পাকা যা-ই হোক না কেন, এর বাইরের ও ভেতরের দেয়াল বা সেগুলোর সীমানা নির্ধারণকারী দেয়াল বা বেড়া; এবং বৃক্ষ, বিদ্যুতের খুঁটি, খাম্বা, সড়কদ্বীপ, সড়ক বিভাজক, ব্রিজ, কালভার্ট, সড়কের উপরিভাগ ও বাড়ির ছাদে প্রচার বা ভিন্নরূপ কোনো উদ্দেশে যেকোনো রঙের কালি বা চুন বা কেমিক্যাল দিয়ে দেয়াল বা যানবাহনে কোনো লিখন, মুদ্রণ, ছাপচিত্র বা চিত্র অঙ্কন করাকে বলা হয়েছে। অনুরূপ ‘পোস্টার লাগানো’ বলতে কাগজ, রেক্সিন, বা ইলেকট্রিক মাধ্যমসহ অন্য যেকোনো মাধ্যমে প্রস্তুতকৃত কোনো প্রচারপত্র, প্রচারচিত্র, বিজ্ঞাপনচিত্র এবং যেকোনো ধরনের ব্যানার ও বিলবোর্ড প্রচার বা ভিন্নরূপ নিয়ন্ত্রণের উদ্দেশে, দেয়াল বা যানবাহনে, আঠা বা অন্য কোন পদার্থ দ্বারা পোস্টার সেঁটে দেওয়া, লাগিয়ে দেওয়া, ঝুলিয়ে দেওয়া, টাঙিয়ে দেওয়া বা স্থাপন করার কথা বলা হয়েছে। আর আইনটি কার্যকর করার দায়িত্ব অর্পিত হয়েছে সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন স্থানীয় কর্তৃপক্ষের ওপর। রাজধানী ঢাকায় মহাপরিকল্পনাভুক্ত এলাকায় এই আইনটির প্রতিপালনের দায়িত্ব অর্পিত হয়েছে ঢাকা সিটি করপোরেশনসহ অপরাপর স্থানীয় কর্তৃপক্ষের ওপর।

আইনে বলা হয়েছে, সংশ্লিষ্ট সংস্থা কর্তৃক নির্ধারিত স্থান ব্যতীত অন্য কোনো স্থানে দেয়াললিখন বা যেকোনো ধরনের পোস্টার লাগানো হলে তা দণ্ডনীয় অপরাধ হিসেবে বিবেচিত হবে। অবৈধভাবে দেয়াললিখন বা পোস্টার লাগানোর অপরাধে আইনে বিভিন্ন ধরনের আর্থিক ও জেল-জরিমানা নির্ধারণ করা হয়েছে। এ ছাড়া অবৈধ দেয়াললিখন ও পোস্টার প্রদত্ত সময়ের মধ্যে অপসারণ করা না হলে তা সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ ক্ষেত্রমতো মুছে দিয়ে বা তুলে কিংবা নামিয়ে ফেলে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি, কোম্পানি, প্রতিষ্ঠান, সমিতি, সংঘ, সংগঠন, সংস্থা বা সুবিধাভোগী থেকে এর সমুদয় খরচ আদায় করা যাবে। অনাদায়ে বিভিন্ন ধরনের অর্থদণ্ডসহ ৩০ দিন পর্যন্ত কারাদণ্ড প্রদানের বিধান রয়েছে। বিশেষ করে কোনো প্রতিষ্ঠান বা কোম্পানি কর্তৃক এই আইনের অধীন কোনো অপরাধ সংঘটিত হলে ওই অপরাধের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট সব পরিচালক, ব্যবস্থাপক, সচিব, অংশীদার, কর্মকর্তা ও কর্মচারী ওই অপরাধে দায়ী বলে বিবেচিত হবে। এমনকি নির্বাচন কমিশন কর্তৃক পরিচালিত কোনো নির্বাচনে প্রচারণাসংক্রান্ত নির্ধারিত আকৃতির পোস্টার লাগানোর পর যদি তা নির্ধারিত সময়সীমার মধ্যে অপসারণ করা না হয়, সে ক্ষেত্রেও সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির বিরুদ্ধেও আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণের নির্দেশনা রয়েছে।

কিন্তু বাস্তবে অদ্যাবধি দেশের কোথাও এই আইনটির প্রয়োগ হয়েছে মর্মে কোনো খবর নেই। ধারণা করা হচ্ছে, ঢাকা উত্তর ও দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের মেয়র মহোদয়গণও হয়তো আইনটি সম্পর্কে জ্ঞাত নন! আবার এমনও হতে পারে, হয়তো-বা আইনটির যথাযথ প্রয়োগে অদ্যাবধি প্রণীত হয়নি কোনো বিধিবিধান! কারণ, এই ব্যবসার সঙ্গে শুধু হোমরাচোমরারা নয়, করপোরেশন সংশ্লিষ্ট অনেকেই জড়িত। সিটি করপোরেশন থেকে অনুমোদন পেতে বড় অঙ্কের লেনদেন চলে, তাই সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা চান না যে এই আইনটি কার্যকর হোক। আইনটি কার্যকর হলে এত দিন নগরীর যত্রতত্র দেয়াললিখন ও পোস্টার বা বিজ্ঞাপন সাঁটানোর অপরাধে অসংখ্য মামলা হতো এবং অনেকেই জেল-জরিমানায় পড়ত। নিশ্চয় করপোরেশনের সংশ্লিষ্ট লোকজন আইনটিকে ধামাচাপা দিয়ে গতানুগতিক নিয়মে নগরীর যত্রতত্র বিভিন্ন ধরনের বিজ্ঞাপন লাগানো বা সাঁটানোর অনুমতি দিয়ে চলেছে। জানা যায়, আইনটিকে ধামাচাপা দিয়ে আগে থেকে প্রচলিত একটি সংক্ষিপ্ত নীতিমালার আওতায় সিটি করপোরেশন নগরীতে বিজ্ঞাপন লাগানোর অনুমতি দেবে। যেহেতু ওই নীতিমালাটির আইনগত ভিত্তি নেই, সেহেতু কাউকে কঠোরভাবে নিয়ন্ত্রণ করা যাচ্ছে না। এ ছাড়া যারা বিজ্ঞাপনশিল্পের সঙ্গে জড়িত, ব্যবসা করে তাদের নিয়ন্ত্রণেও কোনো শক্ত নিয়মাবলি বা বিধিবিধান নেই। ফলে এদের কাউকে সঠিকভাবে নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব হচ্ছে না। এতে স্বাভাবিকভাবে জাতীয় সংসদে প্রণীত আইনটির প্রয়োগ না হওয়ায় পুরো দেশ, বিশেষত রাজধানী ঢাকা বিভিন্ন ধরনের ব্যানার, ফেস্টুন, পোস্টার, বিলবোর্ড, নিয়ন সাইনে ছেয়ে গেছে। যে বা যারা যেভাবে পেরেছে সেভাবে এসব বিজ্ঞাপন লাগিয়েছে, লাগিয়ে যাচ্ছে। বিশেষ করে রাজনৈতিক ব্যক্তির প্রচার, কোচিং, ওরস শরিফ, হেলথ ক্লাব ও রেস্টুরেন্ট ব্যবসায় বিভিন্ন ধরনের পোস্টারে নগরী সয়লাব। আগেকার দিনে শুধু দলীয় প্রধান বা বড় নেতাদের ছবি পোস্টারে দেখা যেত। কিন্তু এখন দলীয় কর্মী ও পাতিনেতাদের ছবি ও নাম এসব পোস্টারে শোভা পায়। আর তুলনামূলকভাবে পেনাফ্লেক্সের পোস্টারে কম খরচ পড়ায় যত্রতত্র এই বিজ্ঞাপনে সয়লাব হয়ে গেছে এবং প্রায় ক্ষেত্রে এসব বিজ্ঞাপনগুলো ঝুলে পড়ে বা ঝড়-বাতাসে ছিঁড়ে পড়ে মানুষের চলাচলে সমস্যা সৃষ্টিসহ নগরীর সৌন্দর্যহানি ঘটায়। বস্তুতপক্ষে, গণ-আকারে ও এলোপাতাড়িভাবে যত্রতত্র বিভিন্ন ধরনের পোস্টার সাঁটিয়ে পুরো নগরকেই নোংরা করে ফেলা হয়েছে।

বিশ্বের সর্বত্র এই বিষয়টি যথাযথভাবে নিয়ন্ত্রিত হয় এবং এর মাধ্যমে সরকার বিশাল আকারের রাজস্ব আদায় করে। অথচ দেশের আনাচে কানাচে বা অলিগলি থেকে রাজধানী পর্যন্ত সর্বত্র প্রতিদিন বিভিন্ন ধরনের লাখ লাখ পোস্টার লাগিয়ে শুধু বিশাল অঙ্কের অর্থের অপচয় এবং কর আদায় থেকে সরকার বঞ্চিত হচ্ছে না, এগুলো তুলতে ও পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন করতে সরকারের বিশাল অর্থ ব্যয় হচ্ছে। হিসাব করলে, এই অপব্যয়ের পরিমাণ প্রতিবছরে হাজার কোটি টাকার কম নয়। এখানে প্রসঙ্গক্রমে, আরেকটি অনিয়ন্ত্রিত প্রচারমাধ্যম হলো বিভিন্ন ধরনের প্রচারপত্র বিশেষ করে লিফলেট, হ্যান্ডবিল ইত্যাদি। এক সময় (বিশেষ করে নির্বাচনের আগে নেতাদের পরিচিতি ও কার্যকমের প্রচার ও বর্ণনায়) লিফলেট ও হ্যান্ডবিলের প্রচলন থাকলেও কালচক্রে এটি আর এতে সীমাবদ্ধ থাকেনি। একটা বড় ধরনের ব্যবসায় রূপ নিয়েছে। প্রতিদিন বিভিন্ন ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের প্রচারণায় দেশজুড়ে এ ধরনের কোটি কোটি লিফলেট বিলি ও প্রচার করা হয়। কিন্তু এর ওপর কোথাও কোনো ধরনের নিয়ন্ত্রণ আছে বলে মনে হয় না। এটি যে একটি আইনের অংশ তাও কেউ জানে কি না সন্দেহ!

এ ক্ষেত্রে আরও একটা লক্ষণীয় বিষয় হলো, হালে ইলেকট্রনিক মিডিয়া ও বিভিন্ন ধরনের পত্রপত্রিকার ব্যাপক প্রসারে মানুষ এখন যেকোনো পণ্য বা সামগ্রী সম্পর্কে সেসব প্রচারণা বা অ্যাডভার্টাইজমেন্টস থেকে সবকিছু জানতে পারে এবং তথ্য সংগ্রহ করে। অনুরূপ সর্বস্তরের মানুষ প্রতিদিন মোবাইল ফোনে এসএমএস ইত্যাদির মাধ্যমেও সার্ভিস পেয়ে থাকে। ফলে বাস্তবে খুব কম মানুষজনই পোস্টার, লিফলেট দেখে ও পড়ে। অথচ রঙচঙেভরা ও দামি দামি কাগজে এসব লিফলেট প্রকাশিত হয় এবং এর বেশির ভাগই আবার রাস্তায় ও ময়লার ডাস্টবিনে চলে যায়। বর্তমান আধুনিক প্রযুক্তিগত যুগে এই প্রচারমাধ্যমটিকে পুরোটাই অপ্রয়োজনীয় ও অপব্যয় বলে মনে হয়। শুরুতে উল্লেখ করেছি, ইতিমধ্যে ঢাকার বিভিন্ন স্থানে লাগানো পোস্টার অপসারণের জন্য মেয়র কর্তৃক প্রদত্ত সময়সীমা এবং অতঃপর হাইকোর্টের দেওয়া সময়সীমাও উত্তীর্ণ হয়ে গেছে। কিন্তু নগরীর কোনো জায়গা থেকে এসব পোস্টার অপসারিত হয়নি, বরং আগে মতো সর্বত্র পোস্টার লাগানো অব্যাহত রয়েছে। আগের মতো দেয়ালে লেখা বা চিকা মারাও অব্যাহত আছে, যদিও দৃশ্যত বিলবোর্ড কিছুটা নিয়ন্ত্রণে প্রতীয়মান হয়। মেয়ররা অচিরে ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনার কথা বলছেন, যদিও এখনো সরেজমিনে এর কোনো লক্ষণ দেখা যাচ্ছে না। কিন্তু এভাবে তো বিষয়টিকে ছেড়ে দেওয়া যায় না, নিয়ন্ত্রণ করতেই হবে। আইন ও বিধিবিধান অনুসরণে সব ধরনের বিজ্ঞাপন, প্রচারপত্র, প্রচারচিত্র ও বিজ্ঞাপনচিত্র তৈরি ও পরিচর্যার সংস্কৃতি চালু করতে হবে। এর মাধ্যমে শুধু শহর-নগর বা দেশের সৌন্দর্য যথাসম্ভব পুনরুদ্ধার করতে হবে, এতে সরকারের প্রতিবছর হাজারো কোটি টাকা রাজস্ব আয় করা সম্ভব হবে।

প্রকাশকাল: বন্ধন, ৭৯তম সংখ্যা, নভেম্বর ২০১৬।

প্রকৌশলী মো. এমদাদুল ইসলাম
+ posts

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Scroll to Top