প্রকৃতির নিবিড় মায়ায় সুবর্ণ দিঘি

শহরের কোলাহল, দূষণ ও কর্মব্যস্ততাকে ছুটি দিয়ে, দুদণ্ড প্রশান্তি মিলবে এমন এক স্বপ্নের নীড় খুঁজছিলেন প্রকৃতিপ্রেমী অবসরপ্রাপ্ত ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মীর্জা বাকের সারোয়ার এবং তাঁর সহধমির্নী ডাক্তার আশরাফি আহমেদ। শহর থেকে দূরে পাখিডাকা গ্রাম্য পরিবেশে, যেখানে একঘেয়েমি দূর হয়ে মিলবে অখণ্ড অবসর। কাঙ্খিত সেই স্বপ্ননীড় গড়তে এ দম্পতি বেছে নেন গাজীপুরের শ্রীপুর থানার মাওনাকে। প্রকৃতির কোলে নির্মাণ করেন অবসর বাড়ি ‘সুবর্ণ দিঘি’। স্থাপনাটির রূপকার স্থপতি জালাল আহমেদ ও স্থপতি শাহ্ নেওয়াজ বাপ্পি। দেশীয় ঐতিহ্যের ধারা আর দেশীয় নির্মাণ উপকরণে নির্মিত এ স্থাপনাটি প্রকৃতির সঙ্গে মিলেমিশে যেন একাকার।

স্থাপত্য প্রতিষ্ঠানটির একক পরিবারের বাড়ি বা অবসর বাড়ির স্থাপত্য নকশার কাজে আগ্রহ কিছুটা কম। কারণ, অধিকাংশ ক্লায়েন্ট মূল নকশার পরিবর্তন করে স্থাপনার আসল সৌন্দর্য নষ্ট করে ফেলে। তবে এ কাজটি করার ক্ষেত্রে ক্লায়েন্টের সঙ্গে স্থপতিদের শর্ত ছিল ডিজাইনে কোনো পরিবর্তন আনা যাবে না এবং যা কিছু করার তা তাঁদের সঙ্গে পরামর্শ করেই করতে হবে। এই শর্তে রাজি হলে কাজটি করতে আগ্রহী হন স্থপতিরা এবং প্রকল্প স্থান পরিদর্শনে যান প্রতিষ্ঠানের স্থপতিরা। নিখাদ গ্রাম্য পরিবেশ। আশপাশে অল্প-বিস্তর মাটির বাড়ি। স্থপতিরা প্রথমেই লক্ষ করেন ওই অঞ্চলের মাটি লাল আর উঁচু-নিচু। যেখানে স্থাপনাটি নির্মিত হবে সেখানে কিছু ছোট-বড় গাছ রয়েছে, জমির মালিকও কিছু গাছ লাগিয়েছেন। স্থপতিদের উদ্দেশ্য ছিল বাড়িটির ডিজাইন এমনভাবে করা যেন, প্রকৃতিকে যতটা সম্ভব কম ক্ষতি করে এবং গাছ না কেটে বাড়িটি নির্মিত হয়। একই সঙ্গে নিচু জমি ভরাট বা উঁচু জমির মাটি না কেটে ঢালু পাশে কলাম বা পিলার করে বাড়িটি নির্মাণের। দেখে যেন মনে হয় বাড়িটি একদম শূন্যে ভাসছে।

স্থাপনাটির নকশা ও নির্মাণের জন্য স্থাপত্য প্রতিষ্ঠানটি ওই স্থানের প্রাকৃতিক ও সামাজিক পরিবেশ, ইতিহাস, সংস্কৃতি, ব্যবহারকারীদের সামাজিক অবস্থান প্রভৃতি বিষয়গুলো গুরুত্বসহকারে বিবেচনায় নেয়। ‘সুবর্ণ দিঘি’ একটি ছোট পরিবারের পারিবারিক ভ্যাকেশন হাউস হলেও পরিসরের আয়তন প্রায় ১২ বিঘা। এর মধ্যে বাড়ির আয়তন ২৫০০ বর্গফুট। বাকি জায়গায় বাগান, পুকুর ও উন্মুক্ত স্থান। বাড়িতে আছে দুটি শোবার, একটি বসার ও খাবার যৌথ ঘর, সঙ্গে একটি রান্নাঘর। উত্তর দিকের জমিটা বেশি ঢালু হওয়ায় সেখানে ডেক বা প্ল্যাটফর্মের মতো করা হয়েছে পর্যাপ্ত উন্মুক্ত পরিসরসহ। ডেকে বসে যেখান থেকে আশপাশের ধানখেত, দূরে জঙ্গল দৃষ্টিগোচর হয় সহজেই। খোলা ডেকে গাছের ছায়ায় বসে দৃশ্যগুলো উপভোগ করার জন্য লাগানো হয়েছে ছাতিমগাছ। গাছটি মাটি থেকে মেঝে ফুঁড়ে আকাশ ছুঁতে চাইছে। ছাতির মতো গাছটির নিচে রয়েছে বেদির মতো বসার আসনও।

সবুজের মাঝে দাঁড়িয়ে থাকা দ্বিতল এ স্থাপনাটি দূর থেকে যে কারও চোখ আটকে দেবে। বাড়িটির সর্বত্রই প্রশান্তির ছাপ স্পষ্ট। স্থাপনাটি প্রকৃতির সঙ্গে মিলেমিশে একাকার। চারপাশ ঘিরে ছায়াঢাকা পায়ে হাঁটাপথ, নানা ধরনের গাছের উপস্থিতি ও উন্মুক্ত পরিসর বাড়িটির সৌন্দর্য বাড়িয়েছে বহুগুণ। খুব কাছেই খনন করা হয়েছে লেকসদৃশ আঁকাবাঁকা দিঘি। দিঘির পাড়ে লাগানো দৃষ্টিনন্দন ঘাস। রান্নাঘরের ওপর দিকে দোতলার মতো। সেখানকার ছাদে বড় খোলা জায়গা রাখা হয়েছে বারান্দার মতো করে। নাম যার গ্রিন গ্যালারি। প্রকৃতি পর্যবেক্ষণের সুবিধার্থেই এ স্থানটি রাখা হয়েছে। বর্ষায় বৃষ্টির ঝিমঝিম শব্দ আর এর অনাবিল সৌন্দর্য দেখার জন্য স্থানটি সত্যিই চমৎকার।

অত্র অঞ্চলের বাড়িগুলো মাটি দিয়ে তৈরি হলেও তথাকথিত উন্নয়নের সঙ্গে তাল মেলাতে গিয়ে হারিয়ে ফেলছে নিজস্ব স্বকীয়তা। তাঁদের ধারণা, মাটির বাড়ি মানেই গরিবের আর পাকা বাড়ি ধনীর। প্রচলিত এ ধারণাটিকে বদলানো ও স্থানীয় বাসিন্দাদের মাটি দিয়ে বাড়ি তৈরিতে উৎসাহী করার চেষ্টা থেকেই বাড়িটি মাটির। এ স্থাপনাটির দেয়াল তৈরি করা হয়েছে মাটি দিয়ে। কাজটি শৈল্পিক ও মানসম্মতভাবে করার জন্য সহযোগী হিসেবে ডাকা হয় মাটির দেয়াল তৈরির পারদর্শী ‘ত্রি’-এর আব্দুন নাঈমকে। মাটির স্থাপনা নির্মাণে তিনি দেশ-বিদেশে প্রশিক্ষিত ও দক্ষ। এ ছাড়া যশোর ও আশুলিয়াতে ইতিপূর্বে নির্মিত মাটির বাড়ির অভিজ্ঞতাকেও তিনি এ স্থাপনা নির্মাণে কাজে লাগিয়েছেন।

সুবর্ণ দিঘির দেয়াল তৈরি করা হয়েছে রেমড আর্থ পদ্ধতিতে। পদ্ধতিটি হলো পাথরের গুঁড়া মাটির সঙ্গে মিশিয়ে কাঠের ফ্রেমের মধ্যে ব্লক তৈরি করে জমাট বাঁধানো। কিছুটা শুকিয়ে গেলে আবারও অনুসরণ করা হয় একই পদ্ধতি। এভাবে ব্লকের মধ্যে মাটিগুলো শক্ত হতে এক-দুই দিন সময় লাগে। এর নির্মাণকাজ হয়েছে শীতে। স্থানীয় মাটি ছিল তিন রঙের। স্থপতিরা চেয়েছিলেন তিন ধরনের রংই দেয়ালে ফুটিয়ে তুলতে। কাজটি করতে একটার পর একটা রঙের মাটি জমাট বাঁধিয়ে দেয়ালের কাজ সম্পূর্ণ করা হয়। কাজ শেষে অসাধারণ এক শিল্পকর্ম ফুটে ওঠে স্থাপনাজুড়ে।

বাড়িটির দেয়ালের মাটিতে সিমেন্টের ব্যবহার নেই। আর তাই দেয়ালে যেন পানি না লাগে সে চেষ্টা করা ছিল বরাবরের মতো। কারণ, পানি লাগলে স্থায়িত্ব কমে আর পানি স্পর্শ কম পেলে শত বছরও টিকে! আর তাই ওপরের চালটাকে কিছুটা বাড়িয়ে দেওয়া হয়েছে, যাতে বৃষ্টির ছাপ লাগলেও সরাসরি পানি যেন দেয়াল বেয়ে না পড়ে। এ ছাড়া মাটির প্ল্যাটফর্মটাকে উঁচু করে নির্মাণ করায় ও নিচে ফাঁকা রাখায় প্ল্যাটফর্মে বৃষ্টি পড়ে যেন দেয়ালে না লাগে সে জন্য কংক্রিটের স্কাটিং দিয়ে চার ইঞ্চি উঁচু করে তার ওপরে মাটির দেয়াল করা হয়েছে। দেয়ালের ওপরে ছাদের ভার দেওয়া গেলেও তা না করে লম্বা পাইপ, মেঝের সঙ্গে নাট-বোল্ট দিয়ে আটকে তাতে ছাদের ভার স্থাপন করা হয়েছে। এতে দেয়ালে বাড়তি কোনো ওজন পড়েনি। ছাদের চালে ব্যবহার করা হয়েছে মাটির রঙের সঙ্গে মিলিয়ে ইন্ডাস্ট্রিয়াল টিন। বাড়ির ভেতরে যেন গরম না হয়, সে ব্যবস্থাস্বরূপ চাল ও দেয়ালের মাঝে যে ফাঁকা জায়গা সেটাকে তালের কাঠ দিয়ে লম্বালম্বি করে ভরাট করা হয়েছে। বাঁশ দিয়ে করা হয়েছে ফলস সিলিং। সামঞ্জস্য রাখতে ঘরের আসবাবগুলোও তৈরি করা হয়েছে বেতের।

স্থাপনাটির কর্ণধার বাড়িটিতে যে কাজই করেছেন, স্থপতিদের পরামর্শ নিয়েই করেছেন। ফলে এর স্থাপত্য নকশা এখনো রয়েছে অটুট ও অবিকৃত। নির্মাণকালীনও তিনি অনেক সময় দিয়েছেন; সহযোগিতা করেছেন। তাঁর সহযোগিতা ছাড়া এমন একটি প্রত্যন্ত অঞ্চলে সফলভাবে কাজটি সম্পন্ন করা সম্ভব হতো না। স্থপতি নাবিলা বিনতে নাসির ছিলেন প্রকল্পটির সার্বক্ষণিক দেখভালের দায়িত্বে। স্থানীয় বাসিন্দাদের মধ্যেও বাড়িটি নিয়ে ছিল বেশ কৌতূহল। অনেকেই দূর-দুরান্ত থেকে বাড়িটি দেখতে আসেন। ২০১৪ সালে বাড়িটির নির্মাণকাজ শুরু হয়ে শেষ হয় ২০১৫ সালে। নান্দনিকতার স্বীকৃতিস্বরূপ চমৎকার এ স্থাপনাটি ২০১৫ সালে বার্জার অ্যাওয়ার্ড ফর এক্সিলেন্স ইন আর্কিটেকচার পুরস্কারে সম্মানিত হয়।

প্রকাশকাল: বন্ধন, ৮৪তম সংখ্যা, এপ্রিল ২০১৭।

রাকিবুল আজম রানা
+ posts

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Scroll to Top