প্রারম্ভিকা
ঢাকার নগরায়ণের দীর্ঘ ইতিহাস থাকলেও কখনো এই নগর পরিকল্পিত ছকে বিকশিত হয়নি। প্রস্তাব ও বাস্তবায়নে বরাবর গরমিল। দৃশ্যত কোনো উন্নয়ন প্রকল্পই মূল পরিকল্পনা মোতাবেক বাস্তবায়িত হয়নি। নগরের বেশির ভাগ সড়ক নেটওয়ার্ক আঁকাবাঁকা, যা অনেক ক্ষেত্রে সংকুচিত করেই নির্মিত। আবার কিছু গুরুত্বপূর্ণ সড়ক তো হঠাৎ থেমেও গেছে। অথচ পরিকল্পনায় এসব সড়ক নেটওয়ার্ক সোজাসুজি ও পর্যাপ্ত চওড়ায় দৃশ্যমান। এর মধ্যে নাম বদলের অপসংস্কৃতিতে নগরের কোন সড়কটি কখন নির্মিত হয়েছে, তাও নতুন প্রজন্মের জানার অবকাশ নেই। এর পেছনে প্রধান কারণ হলো- একদিকে যেমন ধারাবাহিক রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতা ও যথোপযুক্ত প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো ও নিয়ন্ত্রণব্যবস্থার অভাব; অন্যদিকে ঢাকাকেন্দ্রিক উন্নয়ন, অস্বাভাবিক জনস্ফীতি, পরিসংখ্যান/তথ্যের অভাব, উন্নয়নে সমন্বয়হীনতা ও অব্যবস্থাপনা। তা ছাড়া ভ‚মি অধিগ্রহণে জটিলতা, অপ্রতুল বাজেট বরাদ্দ, উন্নয়ন-প্রক্রিয়ায় টপ-ডাউন অ্যাপ্রোচ, প্রভাবশালীদের দৌরাত্ম্য ইত্যাদি তো আছেই।
ঐতিহাসিকভাবে ‘বায়ান্ন বাজার তেপান্ন’ গলির শহর বলে পরিচিত প্রাক্-মোগল আর মোগল ঢাকার উন্নয়ন ছিল অনেকটা স্বতঃস্ফূর্ত। কোম্পানি ও ব্রিটিশ আমলে ছিল অবহেলিত আর পাকিস্তান ও বাংলাদেশ আমলে অনিয়ন্ত্রিত। দুঃখের বিষয়, স্বাধীনতা অর্জনের আজ প্রায় ৫০ বছর পরও প্রায় সবকিছু চলছে সেই একইভাবে বরং অধিকতর অসমন্বিতভাবে ও আমলাতান্ত্রিকতার মধ্য দিয়ে। ফলে নগরবাসীর প্রত্যাশা ও প্রাপ্তিতে মেলবন্ধন ঘটছে না। অথচ এই দীর্ঘ সময়ে নগরের পরিধি বেড়েছে, উন্নয়নে যুক্ত হয়েছে আধুনিক প্রযুক্তি, নগরের উন্নয়নের সঙ্গে সম্পৃক্ত হয়েছে অনেক সংস্থা, কিন্তু বাড়েনি সেবার মান। বরং কমেছে সড়ক ও খোলা জায়গার পরিমাণ, উধাও হয়েছে একদা ঢাকার গর্বের অসংখ্য খাল-নালা-ঝিল-বিল ও বিস্তীর্ণ জলাভ‚মি। বেড়ে গেছে অবৈধ নির্মাণ ও দখলের প্রবণতাও। এমনকি নগরের বিভিন্ন স্থানে সংরক্ষিত কার পার্কিং স্পেস, বর্জ্য সংরক্ষণ ও ব্যবস্থাপনার জায়গাগুলোও বেদখল বা অন্য ব্যবহারে চলে গেছে। পাশাপাশি ক্রমবর্ধিষ্ণু জনগণের জন্য বিভিন্ন ইউটিলিটি সার্ভিসেসের সম্প্রসারণে সমগ্র নগরে সারা বছরই চলে খোঁড়াখুঁড়ি, যাতে সর্বস্তরের জনভোগান্তিসহ সার্বিক নগর পরিবেশ বিপর্যয়ই বলা যায়। সব মিলিয়ে ঢাকার বর্তমান অবস্থা এমন যে বৃষ্টি না হতেই জলাবদ্ধতা আর ভয়াবহ যানজটে নগরজীবন এখন অচল ও অবরুদ্ধ প্রায়। এই বাস্তবতায় ঢাকার নগর পরিকল্পনায় নবসংযোজিত Detailed Aera Pla-s (DAP) নিয়ে শুরু হয়েছে তুমুল আলোচনা-সমালোচনা আর বিতর্ক!
ঢাকার বিকাশ ও বিবর্তন
ঢাকা বিশ্বের পুরোনো শহর বা স্থাপনাগুলোর একটি। প্রাক্-ঐতিহাসিক আমলে ঢাকার বিভিন্ন ধরনের প্রাচুর্যে আকৃষ্ট হয়ে এখানে অনেক রাজাধিরাজের শাসন চলে, হয় ক্ষমতার যুদ্ধ। রাজা বিক্রমাদিত্য, কামরুপের বৌদ্ধরাজ ও তুঘলগী (মুসলিম) সাম্রাজ্যের মধ্যে ঢাকার কর্তৃত্বের দখল নিয়ে যুদ্ধ-বিগ্রহের অনেক কাহিনি রয়েছে। ১৬০০ শতাব্দীর শুরুতে মোগলদের আসার আগে এখানে তুর্ক-আফগান-পর্তুগিজ-ওলন্দাজ (ডাচ)-ফরাসি-গ্রিক বণিকদেরও আনাগোনা ছিল, যার কিছু স্মৃতি-বিস্মৃতি এখনো নগরের বিভিন্ন স্থানে দৃশ্যমান। মোগল সম্রাট জাহাঙ্গীরের আমলে ঢাকার নাম ‘জাহাঙ্গীরনগর’ আখ্যায়িত করে এখানে সুবে বাংলার রাজধানী স্থাপন করা হয়। সে সময় এখানে ভারতের বিভিন্ন অঞ্চল থেকে হিন্দু-মুসলিম অনেক পেশাজীবীর আগমন ঘটে। তাদের নামে শহরের বিভিন্ন জায়গা বা বসতি ও মহল্লাগুলোর পরিচিতি এবং বিস্তৃতি ঘটে। ১৬৭৯ সালে ঢাকায় ভ্রমণরত পর্তুগিজ পরিব্রাজক টমাস বাউরি তাঁর স্মৃতিকথায় লেখেন- ‘ঢাকার নগরায়ণের পরিধি উত্তর-দক্ষিণ প্রায় ৪০ মাইল পর্যন্ত বিস্তৃত এবং শহর অভ্যন্তরের খাল-নদী পথে ৫০০-৬০০ টনের জাহাজও চলাচল করে। মেঘনা-শীতলক্ষ্যা-বংশী নদীর সঙ্গে সংযুক্ত বুড়িগঙ্গা-বালু-টঙ্গী-তুরাগ নদ পরিবেষ্টিত ঢাকার অভ্যন্তরে অসংখ্য খাল-বিলের সমন্বয়ে শহরের বিভিন্ন স্থানে রয়েছে অনেক দ্বীপ-অনুদ্বীপ।’ তখন বিশ্ব পর্যটকেরা ঢাকাকে ‘প্রাচ্যের ভেনিস’ বলতেন। কিন্তু কালক্রমে আজ তার কিছুই আর অবশিষ্ট নেই!
ঢাকার অধঃপতন শুরু হয় ব্রিটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির শাসনামলে, যখন (১৭০৪ সালে) এখান থেকে রাজধানী অপসারণ করে প্রথমে মুর্শিদাবাদ ও অতঃপর কলিকাতায় নেওয়া হয়। পশ্চিম বাংলার বনেদি হিন্দুদের ষড়যন্ত্রে ভূ-রাজনীতির শিকার হয়ে ঢাকার প্রতি কোম্পানির শাসকদের অবহেলায়্র নগরজুড়ে প্রাক্্-মোগল ও মোগলদের নির্মিত ইমারত ও স্থাপনাগুলো ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয়। নগরের পরিধি সংকুচিত ও জনসংখ্যা কমে গিয়ে একপর্যায়ে (১৮০০ শতাব্দীতে) ঢাকা ছোট্ট একটা মফস্বল শহরে রূপ নেয়। ব্রিটিশ জরিপকার র্যানেল-এর মতে, তখন ঢাকার নগরায়ণ বুড়িগঙ্গা নদীর ধারে বাঁধ বরাবর ৪ মাইলের মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল এবং মোগল শাসনামলে যেখানে ঢাকার জনসংখ্যা ১০ লাখে উন্নীত হয়েছিল, তা নেমে গিয়ে দাঁড়ায় মাত্র ৬৮ হাজারে। তবে ব্রিটিশ শাসনামলের শেষ দিকে পূর্ব বাংলার মানুষজনের চরম অসন্তুষ্টি ও নেতৃবৃন্দের চাপে ঢাকা জেলা বোর্ড ও পৌরসভা গঠন, পুরান ও নতুন ঢাকার মধ্যবর্তী স্থানে কয়েকটি (ওয়ারী, গোপীবাগ ইত্যাদি) আবাসিক এলাকার পত্তন, বুড়িগঙ্গা নদীর ধারে পানি শোধনাগার স্থাপন, নগরীতে পানি ও বিদ্যুৎ সরবরাহ এবং রেল সার্ভিস চালুর মাধ্যমে নগরের সংস্কার ও পুনঃ উন্নয়নে স্বল্পমাত্রায় উদ্যোগ গৃহীত হয়।
তখন দৃশ্যত ঢাকাকে নবরূপে গড়ার লক্ষ্যে ইউরোপীয় পরিকল্পনার ধাঁচে তৎকালীন পুরান ঢাকাসংলগ্ন রমনা-তেজগাঁও এলাকাকে ‘Garde- City’ হিসেবে গড়ে তোলার উদ্যোগ গৃহীত হয়। লক্ষ করলে দেখা যায়, নগরের দক্ষিণ-পূর্বে গুলিস্তান-হাটখোলা-দিলখুশা-ঝিলপাড়, পশ্চিমে নীলক্ষেত হয়ে উত্তরে ইস্কাটন পর্যন্ত এলাকাটিকে ব্রিটিশ Garde- City Moveme-t এর দর্শনে কলকাতার Ede- Garde- Subrub-এর আদলে গড়ে তোলার ব্যবস্থা করা হয়েছিল, যার অবয়ব এখনো দৃশ্যমান। কিন্তু তখন বঙ্গভঙ্গ রোধ করার মাধ্যমে ঢাকা থেকে বাংলার রাজধানী কলিকাতায় স্থানান্তরের কারণে নগরের বিভিন্ন স্থানে প্রস্তাবিত ও নির্মাণাধীন ইমারত-স্থাপনা ও অবকাঠামোর কাজ থেমে যায়। পরবর্তী সময়ে সীমিত পরিসরে কিছু ইমারত নির্মিত হলেও এগুলোর ব্যবহারে অন্য কাজ চলে। যেমন, রমনার কেন্দ্রে প্রাদেশিক সেক্রেটারিয়েট কাম আইন সভার জন্য নির্মিত ভবনাদি অন্য ব্যবহারে চলে যায়, যার উল্লেখযোগ্য অংশে এখন চলছে হাইকোর্ট ও সুপ্রিম কোর্ট।
ওই পর্যায়ে পূর্ব বাংলার নবাব পরিবার ও সুধীসমাজের চরম অসন্তোষে তখন কথিত আছে, ‘Imperial Co-cesssio-s’ হিসেবে নগরের যৎকিঞ্চিৎ পুনঃ উন্নয়নে ব্রিটিশ পরিকল্পনাবিদ স্যার প্যাট্রিক গ্যাডেসকে একটি উন্নয়ন প্রতিবেদন তৈরির দায়িত্ব দেয়। ১৯১৭ সালে দাখিলকৃত ‘Report O- Tow- Pla–i-g Dhaka’ শীর্ষক গ্যাডেসের প্রতিবেদনে ঢাকার উন্নয়ন ও সম্প্রসারণে অনেক সুপারিশ থাকলেও এটির অনুমোদন ও বরাদ্দ নিয়ে অস্পষ্টতা রয়েছে। অর্থাৎ গ্যাডেসের প্রস্তাবসমূহের বাস্তবায়নের কোনো রেকর্ড দেখা যায় না। বরং সে সময় নবাব পরিবার ও উদীয়মান অন্যান্য মুসলিম নেতৃত্বের চাপে গুলিস্তান, রমনা এলাকায় বিদ্যমান প্রাক্-ঐতিহাসিক অনেক স্থাপনা, কবর ইত্যাদি গুঁড়িয়ে দিয়ে সীমিত পরিসরে ‘রমনা নিউ টাউন’ ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিকল্পনা করা হয়। এ জন্য অনেকে তো রমনা এলাকায় বিদ্যমান কবর-মাজার ইত্যাদিকে গুঁড়িয়ে সেখানে নতুন শহর প্রতিষ্ঠা করাকে ‘ঢাকার ওপর আল্লাহর অভিসম্পাত’ বলেও মনে করেন!
১৯২১ সালে মূলত নবাব পরিবারের দানকৃত জমিতে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা করা হয়। অতঃপর আবার তার ভেতরে প্রতিষ্ঠিত হয় আহসানউল্লাহ ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজ (বর্তমানে বুয়েট), ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ, আর্ট কলেজ, পিজি হাসপাতাল প্রভৃতি। ফলে শুরুতে যেভাবে ও আঙ্গিকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিকল্পনা করা হয়েছিল, সেভাবে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় তথা অপরাপর কোনো প্রতিষ্ঠানই গড়ে উঠতে পারেনি। তবে এ কথা সত্যি, ব্রিটিশ শাসনামলের একেবারে শেষদিকে ঢাকার উন্নয়নে শাসকগোষ্ঠীর কিছুটা আন্তরিকতা পরিলক্ষিত হয়।
কিন্তু প্রথম এবং দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ, ভারতবর্ষজুড়ে ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলন ও পাক-ভারত বিভক্তির প্রেক্ষাপটে ধারাবাহিক রাজনৈতিক অস্থিরতা তথা ঢাকার উন্নয়নে প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামোর অনুপস্থিতি ও নিয়ন্ত্রণহীনতার কারণে সে সময় নগরীতে আর তেমন কোনো উন্নয়ন ঘটেনি, বরং সে সময় পাক-ভারত বিভক্তিকে কেন্দ্র করে ভারত থেকে মুসলিম উদ্বাস্তুদের ঢাকায় যত্রতত্র বসতি স্থাপনের কারণে ঢাকা নগরীতে এলোপাতাড়ি ঘরবাড়ি নির্মাণ ও খাল-নালা ভরাট তথা দখলের প্রবণতা শুরু হয়।
ঢাকার নগর পরিকল্পনা: প্রস্তাবনা ও বাস্তবায়নে গরমিল!
১৯৪৭ সালে পাক-ভারত বিভক্তির পর ঢাকা-চট্টগ্রামের অবস্থা এমন দাঁড়ায় যে ‘ইমারত নির্মাণ আইন-১৯৫২’ জারি করে এলোপাতাড়ি নির্মাণ রোধে ব্যবস্থা নিতে হয়। কিন্তু ওই আইনটির কার্যকর বাস্তবায়নে স্বতন্ত্রভাবে কোনো প্রতিষ্ঠান গড়ে ওঠেনি। ১৯৫৬ সালে ঢাকায় ডিআইটি (ঢাকা ইম্প্রুভমেন্ট ট্রাস্ট) প্রতিষ্ঠার পর সংস্থাটির ওপর এই দায়িত্বটি অর্পিত হয়। কিন্তু এই সংস্থাটিকে কখনো এসব কাজের দায়িত্ব পালনে সেভাবে সাজানো হয়নি। তা ছাড়া একটি সংস্থার ওপর পরিকল্পনা প্রণয়ন, নিয়ন্ত্রণ ও উন্নয়নের দায়িত্ব অর্পণ করাও ঠিক হয়নি। নিয়ন্ত্রণ ও মনিটরিংয়ের দায়িত্ব সর্বত্র একটি স্বতন্ত্র ও আলাদা প্রতিষ্ঠানের ওপর থাকে, যাতে পেশাগত ও নিরপেক্ষভাবে মনিটরিং করা যায়। আজ এটা নিঃসন্দেহে বলা যায় যে ডিআইটির (পরে রাজউক-রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ) ওপর এই গুরুত্বপূর্ণ কাজের দায়িত্ব চাপিয়ে দেওয়ার পরিপ্রেক্ষিতে সংস্থাটির প্রাতিষ্ঠানিক দুর্বলতা ও অসংখ্য সংস্থার মধ্যে সমন্বয়হীনতার কারণে নগরের আজকের এই করুণ অবস্থার সৃষ্টি হয়েছে।
১৯৫৯ সালে ঢাকার প্রথম মহাপরিকল্পনা প্রণয়নকালে ব্রিটিশ উপদেষ্টারা এই সমস্যটি আঁচ করে তাঁরা ডিআইটির পরিবর্তে Dhaka Pla–i-g a-d Developme-t Authority প্রতিষ্ঠার জন্য সুপারিশ করেছিল, যাতে সংস্থাটির নগর পরিকল্পনা শাখা অধিকতর সমৃদ্ধ হয়। কিন্তু তা করা হয়নি, বরং ডিআইটি পরে রাজউককে পর্যায়ক্রমে পরিকল্পনার চেয়ে অতিমাত্রায় উন্নয়নের দিকে নিয়ে যাওয়া হয়। স্বাধীনতার পর পরিবর্তিত প্রেক্ষাপটে ১৯৭৪ সালে জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ঢাকা মহানগরের সমন্বিত পরিকল্পনা ও উন্নয়নে Dhaka Me-tropolito- a-d Developme-t Authority প্রতিষ্ঠার জন্য একটি অধ্যাদেশ জারি করে, কিন্তু ১৯৭৫ সালে তাঁর হত্যার মাধ্যমে ওই উদ্যোগটিরও কবর রচিত হয়। অতঃপর দেশের উন্নয়ন-প্রক্রিয়ায় যুক্ত হয়েছে ‘আবেগ’ ও ‘জেদাজেদির’ উন্নয়ন! যেমন, জিয়াউর রহমানের শাসনামলে সরোওয়ার্দী উদ্যানে যেখানে বঙ্গবন্ধু ৭ই মার্চে ঐতিহাসিক ভাষণ দিয়েছিলেন, স্বাধীনতার পর যেখানে ইন্দিরা মঞ্চ নির্মিত হয়, পরে সেখানে নির্মিত হয় শিশু পার্ক। আর অবশিষ্ট অংশে বর্তমান সরকার নির্মাণ করছে স্বাধীনতা স্তম্ভ কমপ্লেক্স। এভাবে বর্তমানে ঢাকার অভ্যন্তরে প্রধান উন্মুক্ত স্থানটি প্রায় হারিয়ে যাওয়ার পথে। যেভাবে পর্যায়ক্রমে সরকারি-বেসরকারি অব্যবস্থাপনায় তথা দখলবাজদের দৌরাত্ম্যে নগরের ভেতর-বাইরে আরও অনেক খোলা জায়গা, খাল-নালা, পার্ক-খেলার মাঠ এমনকি সরকারিভাবে অধিগ্রহণকৃত ও উন্নয়ন জমি কিংবা বন্যাপ্রবণ এলাকা বেদখল হয়ে যায়। এমনকি বর্তমানে শত বছরের পুরোনো ওসমানী উদ্যানের নিচেও সরকারি ব্যবস্থাপনায় সচিবালয়ের গাড়ি পার্কিং ব্যবস্থা নির্মাণের তোড়জোড় চলছে।
স্বাধীনতার উত্তরকালে (১৯৭৬-১৯৮২ সালে) বিশেষজ্ঞরা ঢাকা মহানগরের পরিকল্পিত উন্নয়নে বিভিন্ন সমীক্ষায় ডিআইটি এবং নগরের উন্নয়নের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট অপরাপর সব সংস্থাকে একীভূত করে Dhaka Me-tropolito- Pla–i-g Authority এবং Dhaka Me-tropolito- a-d Developme-t Authority নামে ভিন্নভাবে দুটি প্রতিষ্ঠান গড়ে তুলতে সুপারিশ করে, কিন্তু তাও হয়নি, বরং সেই থেকে নগরের উন্নয়নে যোগ হয়েছে আরও অনেক সংস্থা। আর বরাবরের মতো ঢাকায় নগর পরিকল্পনার অবস্থান এখনো Back Bea-ch- এ। অতঃপর একই ধরনের কাজে জড়িত হয়ে পড়েছে অসংখ্য সংস্থা। শুধু তা-ই নয়, যেসব সংস্থার ঢাকায় কাজ করার ম্যান্ডেট নেই, এ রকম অনেক সংস্থাও ঢাকার উন্নয়নে জড়িত হয়ে স্ব-স্ব পরিকল্পনায় বিভিন্ন ধরনের প্রকল্প বাস্তবায়ন করছে। এমন সব বিভিন্ন কারণে কখনো ঢাকার পরিকল্পনা ও বাস্তবায়নে সাদৃশ্যতা ছিল না; হয়নি ঠিকমতো উন্নয়নও। এর সঙ্গে উন্নয়ন-প্রক্রিয়ায় যুক্ত হয়েছে ‘Top Dow- Approch’ অর্থাৎ পরিকল্পনায় যা থাকুক না কেন, উপরিওয়ালারা যা চায় তা-ই বাস্তবায়ন করা।
যেমন, ১৯৫৯ সালের মহাপরিকল্পনায় ভবিষ্যৎ ঢাকার বিনির্মাণে প্রস্তাব ছিল নর্থ-সাউথ রোডটিকে বুড়িগঙ্গা নদীর ধার পর্যন্ত সম্প্রসারিত করে নদীর ওপারে জিঞ্জিরা এলাকায় বুড়িগঙ্গাকে সম্মুখে রেখে সেখানে পূর্ব পাকিস্তানের প্রাদেশিক পার্লামেন্ট কমপ্লেক্স স্থাপনের জন্য। কিন্তু তদস্থলে ষাটের দশকের শুরুতে পাকিস্তানের সামরিক আইয়ুব খানের আগ্রহে তাঁর নামে তেজগাঁওয়ের পশ্চিমে Experime-tal Farms-এর জন্য সংরক্ষিত জায়গায় ঢাকার সেকেন্ড ক্যাপিটাল-দ্বিতীয় রাজধানী (আইয়ুব নগর) পরিকল্পনা ও উন্নয়ন করা হয় (যা বর্তমানে ‘শেরেবাংলা নগর’ নামে পরিচিত)। অনুরূপ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উল্লেখযোগ্য অংশ নগরের উত্তর দিকে স্থানান্তর করে সেখানে (ফয়েদাবাদ এলাকায়) একটি নতুন বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার জন্য সুপারিশ করা হয়েছিল, কিন্তু অজ্ঞাত কারণে সেটিও হয়নি। অন্যদিকে মহাপরিকল্পনার আলোকে কুর্মিটোলার উত্তরে বিস্তীর্ণ জমিতে একটি স্বয়ংসম্পূর্ণ Satellite City প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে বিস্তারিত সমীক্ষা হলেও প্রস্তাবের ব্যত্যয় ঘটিয়ে পাকিস্তান আমলের শেষ দিকে সেখানে দায়সারা গোছের -North Dhaka Satellite City নামে একটি আবাসিক শহর পরিকল্পিত হয়, যা আজকের ‘উত্তরা’ উপ-শহর। এভাবে কোনো রকমে গড়ে ওঠে মিরপুর উপ-শহর, কিন্তু এর কোনোটিই স্বয়ংসম্পূর্ণতা নিয়ে পরিকল্পিতভাবে বাস্তবায়িত হয়নি। ওখানে নেই কোনো পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়, হাসপাতাল বা বাণিজ্য কেন্দ্র (CBD). ফলে দক্ষিণে নারায়ণগঞ্জ থেকে উত্তরে সাভার-গাজীপুর পর্যন্ত বিস্তীর্ণ ও প্রায় দুই কোটি মানুষ অধ্যুষিত আজকের ঢাকা মহানগরের প্রায় সবাই এখনো মূলত ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ, পিজি হাসপাতাল [বর্তমানে ইঝগগট] এবং মতিঝিল ও কারওয়ান বাজার বাণিজ্যিক এলাকার ওপর নির্ভরশীল।
উদ্ভূত অবস্থায় এটা লক্ষণীয়, বিভিন্ন সময়ে নগরের ভেতর-বাইরে সরকারি-বেসরকারি ব্যবস্থাপনায় যেসব আবাসন বা নিউ টাউন প্রকল্প গৃহীত হয়েছে, তার একটিও মূল পরিকল্পনা অনুযায়ী হয়নি। ষাটের দশকে পরিকল্পিত ধানমন্ডি, মোহাম্মদপুর, বনানী, গুলশান, বারিধারা থেকে শুরু করে বাস্তবায়নাধীন সব প্রকল্পেই এই বিচ্যুতি লক্ষণীয়। আগে এসব প্রকল্পগুলো গৃহীত হয়েছিল খড়ি উবহংরঃু চৎড়লবপঃ হিসেবে। তখন সেখানে বরাদ্দকৃত প্লটে দু-তিন তলার বেশি ইমারত নির্মাণ করতে অনুমতি দেওয়া হতো না আর এই বিবেচনায় প্রকল্পগুলোতে পানি-বিদ্যুত-গ্যাস ও সুয়ারেজ লাইন স্থাপিত হয়েছে। কিন্তু নগরীতে ক্রমবর্ধিষ্ণু জনস্ফীতিতে সিদ্ধান্ত পরিবর্তন করে সেখানে এখন ১০-১২-১৪ তলার ইমারত নির্মাণের অনুমতি দেওয়া হয়েছে বা হচ্ছে। একটি প্লটে যেখানে আগে একটি পরিবার থাকত, সেখানে ১০-১৫ অনেক ক্ষেত্রে আরও বেশি পরিবার বসবাস করছে, ব্যবসা-বাণিজ্যেরও ব্যাপক বি¯ৃÍতি ঘটেছে। তন্মধ্যে ধানমন্ডি, গুলশান ও বনানীতে অসংখ্য বেসরকারি অফিস ভবন এবং বিশ্ববিদ্যালয়ও স্থাপিত হয়েছে। ফলে পরিকল্পনার ব্যত্যয় তথা বিভিন্ন সমস্যায় পতিত হয়ে বর্তমানে এসব শহর-উপশহরগুলোতে বসবাসের চরিত্র হারিয়েছে। এই অবস্থা এখন পুরো রাজধানীজুড়ে।
নতুন পরিকল্পনা: Structure plan- & Urban- Area Plans
স্বাধীনতার পর থেকে রাজধানী ঢাকার পরিকল্পিত উন্নয়ন ও সম্প্রসারণে এ পর্যন্ত অনেক বেসামরিক-সামরিক অধ্যাদেশ ও আইন জারিসহ বিভিন্ন ধরনের অনেক Actio- I-toriam Pla-s, Strategic Report ইত্যাদি প্রণীত হলেও তার একটিরও কাক্সিক্ষত বাস্তবায়ন হয়নি। তন্মধ্যে DMAIDUP সমীক্ষাটি ছিল অন্যতম। এই Strategic সমীক্ষার অনেক গুরুত্বপূর্ণ সুপারিশ ছিল, কিন্তু এর কিয়দংশও বাস্তবায়িত হয়নি। বরং তদস্থলে ১৯৮৬ সালে তৎকালীন সামরিক সরকার কর্তৃক ডিআইটিকে আমলাতান্ত্রিক রাজউকে রূপান্তরিত করা হয়। সে সময় (১৯৮৮ সালে) ভয়াবহ বন্যায় ঢাকাসহ প্রায় পুরো দেশ তলিয়ে গেলে আন্তর্জাতিক সহায়তায় প্রণীত হয় Flood Actio- Pla-, তন্মধ্যে ঢাকার জন্য প্রণীত FAP-8 এর আওতায় নগরের বন্যা ও জলাবদ্ধতা নিরসনে অনেক সুপারিশ করা হয়। কিন্তু সমন্বয় ও নিয়ন্ত্রণহীনতার কারণে এই পরিকল্পনাটিরও যথাযথ বাস্তবায়ন হয়নি। নগরের পূর্ব-পশ্চিমে প্রস্তাবিত Rete-tio- Po-ds-এর প্রস্তাবিত একটিরও বাস্তবায়ন হয়নি, বরং নদী চতুষ্টয়ের ধারে বন্যা নিয়ন্ত্রণ বাঁধ ও দেয়াল নির্মাণের মাধ্যমে বাঁধের ভেতরের জায়গায় ভ‚মিদস্যুদের আগ্রাসনে দখল ও ভরাট হয়ে ঢাকার সার্বিক পরিবেশে মরুময়তার সৃষ্টি হয়েছে। আগে ঢাকায় বৃষ্টি বা বন্যা হলে নদীপথে পানি চলে যেত, কিন্তু প্রায় খাল ভরাট হয়ে যাওয়া বা করে ফেলায় এবং প্রবহমান খালগুলোর ওপর বক্স কালভার্ট ও সড়ক নির্মাণ করে নতুন সমস্যার সৃষ্টি করা হয়েছে।
উদ্ভূত অবস্থায় জাতিসংঘ (U- HABITAT-এর সহায়তায়) ১৯৯৫ সালে Dhaka Metropolitan- Development Plan- (DMDP ১৯৯৫-২০১৫) শীর্ষক যে নতুন মহাপরিকল্পনাটি প্রণীত হয়, সেটিরও তেমন কিছুর বাস্তবায়ন হয়নি। ঞযৎবব-ঞরবৎ পদ্ধতির এই নতুন মহাপরিকল্পনায় Stracture Pla- , Urban- Area Plan- এবং Detailed Area Plan- (DAP) অন্তর্ভুক্ত ছিল। কথা ছিল, একই সঙ্গে উঅচ প্রণয়নের, কিন্তু প্রণীত হয়নি। দীর্ঘদিন পর ২০১০ সালে উঅচ প্রণয়ন সম্পন্ন ও অনুমোদন হলেও বিবিধ প্রাতিষ্ঠানিক দুর্বলতার কারণে সেটিরও তেমন কিছু বাস্তবায়ন হয়নি। বরং প্রশ্ন ওঠে, নগর উন্নয়ন আইনের সংশোধন ব্যতিরেকে কীভাবে এই নতুন পদ্ধতির চষধহং-গুলোর প্রস্তুত ও অনুমোদন হলো? আরও আশ্চর্যের বিষয় ছিল তখন রাজউকের নিজস্ব অর্থায়নে বাস্তবায়নাধীন পূর্বাচল প্রকল্প এলাকায় ঝঃৎঁপঃঁৎব চষধহ-এ কীভাবে নতুন ক্যান্টনমেন্ট বা বিমানবন্দর স্থাপনের জন্য প্রস্তাব করা হলো, যা আজও মিলিয়ন ডলারের প্রশ্ন হয়ে আছে? এভাবে ওই পরিকল্পনায় সাভারে ‘ধামসোনা নতুন শহর’ প্রতিষ্ঠার প্রস্তাবটিও আজ অবধি শুধু নকশায় শোভা পাচ্ছে।
এই অবস্থায় ২০১৫ সালের শেষ দিকে CRDP প্রকল্পের আওতায় ঢাকার জন্য নতুন করে প্রণীত Dhaka Streuture Pla- (২০১৬-২০৩৫)-এর ওপর রাজউক ভবনে অনুষ্ঠিত এক আলোচনা সভায় পূর্তমন্ত্রী ও ঢাকার মেয়রদ্বয়সহ উপস্থিত প্রায় সবাই অসন্তোষ প্রকাশ করেন। নতুন Streuture Plan-এর অনেক প্রস্তাব বাস্তবায়নযোগ্য নয় বলেও নীতিনির্ধারকগণ মতামত জানিয়েছেন। কাজেই এবারও ঢাকার নতুন মহাপরিকল্পনা যে কী ভাগ্য বরণ করতে যাচ্ছে তা অনুমেয়!
নতুন ‘ড্যাপ’: প্রণীত না হতেই বিতর্ক!
নিয়ম অনুসারে Streuture Pla- অনুমোদিত হলে তার আলোকে তথা বিশেষজ্ঞ ও জনমতের পর্যালোচনায় অঞ্চলভিত্তিক বিশদ উন্নয়ন পরিকল্পনা (DAPs) প্রণয়নের কথা, কিন্তু এবারও তার ব্যত্যয় হয়েছে বিভিন্নভাবে। স্থানীয় দুটি উপদেষ্টা প্রতিষ্ঠান যথাক্রমে Sheltech Pvt Ltd. এবং Developme-t Desig- Co-salte-t pvt. Ltd-এর ওপর ঢাকার ১৫২৮ বর্গ কি.মি জায়গার ওপর ড্যাপ প্রণয়নের দায়িত্ব অর্পিত হয়। দুটি উপদেষ্টা প্রতিষ্ঠান খসড়া ড্যাপ প্রণয়ন করে দাখিল করার পর এটিকে সমন্বিত করার জন্য Sheltech Pvt Ltd-কে দায়িত্ব দেওয়া হয়। ২০১৯ সালের শেষের দিকে পূর্বেকার প্রক্রিয়ায় কীভাবে ড্যাপ প্রণীত হয়েছে তা নিয়ে আলোচনা-সমালোচনা শুরু হলে বিশ্ববাসী মহামারি COVID-19 এর প্রেক্ষাপটে অনেক দিন সবকিছু স্তিমিত ছিল। এই অবস্থায় কয়েক মাস আগে গৃহায়ণ গণপূর্ত মন্ত্রণালয়ের সম্মতিতে খসড়া ড্যাপের ওপর জনমত গ্রহণ ও অনুমোদন-প্রক্রিয়া শুরু হয়। ৪ নভেম্বর ২০২০ তারিখে জনমত গ্রহণের সময়সীমা শেষ হওয়ার পর ড্যাপের প্রস্তাবসমূহ জনসম্মুখে প্রকাশ হতে থাকে।
বলাবাহুল্য, এবার ড্যাপ প্রণয়নের দায়িত্বে ছিলেন মূলত নগর পরিকল্পনাবিদেরা। অথচ এখন বিশ্ববাসী যেকোনো কিছুর পরিকল্পনা প্রণয়ন একটি বহুমাত্রিক কাজ হিসেবে বিবেচিত। তদস্থলে শুধু নগর পরিকল্পনাবিদদের দ্বারা প্রণীত এই ড্যাপ নিয়ে বিভিন্ন পেশাজীবী মহল ও নগরবাসীর মধ্যে কঠোর আলোচনা-সমালোচনা শুরু হয়েছে। বিশেষ করে ইনস্টিটিউট অব আর্কিটেক্টস বাংলাদেশ (OI) এবং বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব প্ল্যানার্স -এর মধ্যে প্রাতিষ্ঠানিক বিতর্কের অবতারণা হয়েছে। এ নিয়ে পরস্পরের মধ্যে ব্লেইম গেমসও শুরু হয়েছে। সমভাবে ইনস্টিটিউট অব ইঞ্জিনিয়ার্স, বাংলাদেশ , বেলা ও রিহ্যাব-এদের মধ্যেও ড্যাপের বিভিন্ন প্রস্তাব নিয়ে অসন্তোষ দেখা দেয়। ইতিমধ্যে অনেকটা বৈরী অবস্থানে ওঅই এবং ইওচ এর পক্ষ থেকে প্রস্তাবিত ড্যাপের ওপর আনুষ্ঠানিকভাবে পরস্পরের পর্যালোচনা ও অভিমত দিয়েছে। এ নিয়ে স্যোশাল মিডিয়াতেও তর্ক-বিতর্কের ঝড় চলছে, যার পরিপ্রেক্ষিতে ঢাকার এবারকার ড্যাপের পরিণতি নিয়ে সৃষ্টি হয়েছে প্রচন্ড উদ্বেগের।
এই ‘ড্যাপ’ বিতর্কে এবার আরও যেসব কথাবার্তা হচ্ছে, তার অনেকটাই এমন:
ইতিমধ্যে এসব বিষয়সহ ড্যাপ (২০১৬-৩৫)-এর যথাযথ পর্যালোচনা, সুপারিশ প্রদান ও অনুমোদন বিষয়ে স্থানীয় সরকার মন্ত্রীকে আহŸায়ক করে ছয় সদস্যের একটি মন্ত্রিপরিষদ কমিটি গঠন করা হয়েছে। গঠিত কমিটির আগামী দুই মাসের মধ্যে তাদের সুপারিশ প্রদানের কথা। সবাই তাকিয়ে আছে এই কমিটি কী সুপারিশ করে?
শেষের আগে
উল্লেখিত প্রেক্ষাপটে বর্তমানে ঢাকার উন্নয়নে বিভিন্ন সংস্থা কর্তৃক নিজস্ব মহাপরিকল্পনা প্রণয়ন ও ঢাকার ভবিষ্যৎ নিয়ে সর্বমহলে জোরালো আলোচনা-সমালোচনা হচ্ছে। কথা হচ্ছে, কোম্পানি আমল থেকে পাকিস্তান পর্যন্ত ঔপনিবেশিক শাসনামলের মতো একটি স্বাধীন দেশের রাজধানীর উন্নয়ন ও নিয়ন্ত্রণ হতে পারে কি না! স্বাধীনতার পর অনেক বিলম্বে হলেও দ্বিতীয় মহাপরিকল্পনা (DMDP ১৯৯৫-২০১৫) প্রণয়নের প্রেক্ষাপট ছিল একটি স্বাধীন দেশের রাজধানীকে যুগোপযোগী করে গড়ে তোলা এবং একবিংশ শতাব্দীর চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় রাজধানীকে প্রস্তুত করা। আর ২০১৫ সালে প্রণীত Structure Pla- প্রণয়নের অন্যতম প্রেক্ষাপট ছিল- MDGথেকে SDG তে উত্তরণসহ বাংলাদেশকে বিশ্বে মধ্যম আয়ের দেশ হিসেবে উন্নীত ও প্রতিষ্ঠা করা। কিন্তু দেশি-বিদেশি কারিগরি সহযোগিতায় প্রণীত দুটি মহাপরিকল্পনার মুখ্য প্রস্তাবসমূহ নিয়ে শুরুতেই সৃষ্টি হয় বিতর্কের।
অথচ লক্ষণীয়, পূর্বেকার মতো এখনো নগরের অভ্যন্তরে বিশাল জায়গাজুড়ে ঢাকা, মিরপুর ও সাভার সেনানিবাস, পিলখানায় বিডিআর (বর্তমানে বিজিবি) ইত্যাদিকে যথাস্থানে রেখে দেওয়া নগর পরিকল্পনা ও নগরায়ণের দৃষ্টিতে কতটুকু যুক্তিযুক্ত, তা নিয়ে সর্বমহলে কথা হচ্ছে। এটা বলার অপেক্ষা রাখে না যে এসব Welled City-এর কারণে নগরের উত্তর-দক্ষিণ ও পূর্ব-পশ্চিমে প্রস্তাবিত অনেক সড়ক ও অন্যান্য পরিবহন প্রকল্পের বাস্তবায়ন বাধাগ্রস্ত হয়ে আছে। STP/RSTP তে প্রস্তাবিত উত্তরা থেকে মতিঝিল পর্যন্ত প্রস্তাবিত গজঞ-৩ প্রকল্পের অ্যালাইনমেন্টে মিরপুর ও ঢাকা সেনানিবাসের নিরাপত্তার প্রশ্নে কয়েক দফায় পরিবর্তন করতে হয়েছে। তা ছাড়া, একটি স্বার্থান্বেষী মহলের কারণে তেজগাঁও পরিত্যক্ত বিমানবন্দরটিকে রক্ষা করার নামে জাতীয় সংসদ ভবন প্লাজার ওপর দিয়ে মেট্রোরেল নেওয়ার প্রস্তাবের কারণে প্রকল্পটির কার্যকারিতা এখনো অনিশ্চয়তার দোলাচলে!
আগেকার দিনে এসব বিষয়ে পাকিস্তানের তৎকালীন সামরিক জান্তা ও শাসনগোষ্ঠীকে দোষারোপ করা হলেও স্বাধীন বাংলাদেশের রাজনৈতিক নেতৃত্ব ও নীতিনির্ধারকেরা কি এই অপশক্তির কবল থেকে নিজেদের দূরে সরিয়ে রাখতে পেরেছে! উদ্ভূত অবস্থা থেকে উত্তরণে ইতিমধ্যে বিভিন্ন মহল থেকে যেসব বিকল্প প্রস্তাব (প্রশাসনিক বিকেন্দ্রীকরণ, নগর সরকার প্রতিষ্ঠা, বিকল্প রাজধানী প্রতিষ্ঠা ইত্যাদি) দেওয়া হয়েছে সেগুলোর গ্রহণ ও বাস্তবায়নের কোনো সম্ভাবনা আছে কি? ঢাকার নতুন মহাপরিকল্পনাটিও কি একইভাবে শুধু দেয়ালেই শোভা পাবে?
প্রকাশকালঃ বন্ধন, ১২৫তম সংখ্যা, জানুয়ারি ২০২১