মিথেনে নতুন বিপদ

গ্রামে প্রায়ই রাতের আঁধারে কৃষিখেত বা ডোবা-নালায় দেখা যায় হঠাৎ জ্বলে ওঠা আগুন, গোলা হয়ে উড়তে থাকে এক স্থান থেকে আরেক স্থানে। কিন্তু কেন জ্বলে এই আগুন? এর উৎসই বা কী? তা নিয়ে গ্রামে অলৌকিক কেচ্ছা-কাহিনির অন্ত নেই। তবে আধুনিক বিজ্ঞান উদ্ঘাটন করেছে আগুন লাগার রহস্য! প্রাকৃতিক এক গ্যাসের কারণেই জ্বলে ওঠে এই আগুন। নাম যার মিথেন। ডোবা-নালায় ঘাস-পাতা পচে মিথেন গ্যাস তৈরি হয়। এই মিথেন গ্যাস ফসফরাসের উপস্থিতিতে বাতাসের সংস্পর্শে এলেই ধরে আগুন। এতে আসলে ভৌতিক কোনো ব্যাপার নেই। বাতাসের সংস্পর্শে এলে জ্বলে ওঠা বর্ণহীন, গন্ধহীন ও স্বাদহীন গ্যাস মিথেন পানিতেও কিঞ্চিৎ পরিমাণে দ্রাব্য। মিথেন গ্যাসের রাসায়নিক সংকেত । তবে এই গ্যাস শুধু গ্রামের কর্দমাক্ত ভ‚মিতেই নয়, বরং শহরের ল্যান্ডফিল থেকেও প্রচুর পরিমাণে উৎপন্ন হচ্ছে, যা বাড়িয়ে তুলছে বৈশ্বিক উষ্ণতা; হচ্ছে বহুবিধ ক্ষতির কারণ। 

বৈশ্বিক উষ্ণতা বৃদ্ধির জন্য দায়ী গ্রিনহাউস গ্যাসগুলোর মধ্যে সবচেয়ে ক্ষতিকর হলো মিথেন। সম্প্রতি বিশ্বখ্যাত সায়েন্স জার্নাল নেচার-এর এক গবেষণায় উঠে এসেছে, মিথেনের নিঃসরণ-বিষয়ক যে ধারণা আগে প্রচলিত ছিল তা ভুল, বাস্তবে এই গ্যাসের নিঃসরণের পরিমাণ আরও বেশি। নেচারের গবেষণায় বলা হয়েছে, তেল, গ্যাস বা কয়লা উৎপাদনের সময় আগে যা ধারণা করা হতো, তার তুলনায় ২০-৬০ শতাংশ বেশি পরিমাণে মিথেন নিঃসৃত হয়। গবেষক দলের প্রধান স্টেফান শয়েটজের মতে, ‘আগে মিথেন নিঃসরণ-বিষয়ক যেসব পরিমাপক ছিল, তা বস্তুত ভুল ছিল। প্রকৃতপক্ষে বর্তমানে মিথেনের উৎপাদনের হার প্রচলিত ধারণার প্রায় দ্বিগুণ।’

বিজ্ঞানীরা বলছেন, বায়ুমন্ডলে মিথেনের পরিমাণ কার্বন ডাই-অক্সাইডের তুলনায় অনেক কম হলেও এই গ্যাস উষ্ণতা বৃদ্ধিতে ২৮ গুণ বেশি কার্যকর। গ্রিনহাউস ইফেক্টের জন্য দায়ী গ্যাসগুলোর মধ্যে মিথেনের অবস্থান দ্বিতীয়। ২০০৭ সালের পর থেকে বায়ুমন্ডলে এর হার বিপজ্জনক মাত্রায় বাড়ছে। মিথেন গ্যাসের উপস্থিতিতে তাপমাত্রা বৃদ্ধি, ধান পুড়ে যাওয়া বা হিটশক এমনকি অ্যাসিড রেইন হতে পারে। সাম্প্রতিক সময়ে অসহ্য গরম ও ধানের হিটশক বৃদ্ধি জানান দিচ্ছে বাংলাদেশে মিথেন গ্যাসের আধিক্য।

বিভিন্ন গবেষণা বলছে, বর্ণ ও গন্ধহীন এই মিথেন গ্যাস যখন ওপরে ওঠে, তখন সেটা তাপকে আটকে রাখে। মিথেনের এই ক্ষমতা কার্বন ডাই-অক্সাইডের চেয়েও অনেক বেশি। তাপকে আটকে রাখার মাধ্যমে এই গ্যাস বায়ুমন্ডলের তাপমাত্রাকে বাড়িয়ে দিচ্ছে, যা জলবায়ু পরিবর্তনের প্রধান একটি কারণ। বাংলাদেশ পরিবেশ আন্দোলনের (বাপা) সাধারণ সম্পাদক শরীফ জামিল মনে করেন, ‘বিপজ্জনক এই গ্যাসের উপস্থিতি পরিবেশের জন্য হুমকিস্বরূপ। মিথেনের উপস্থিতি বাড়লে সেটার প্রভাব রাজধানী ঢাকাসহ সারা দেশে পড়বে। তাহলে ভয়াবহ অ্যাসিড রেইনসহ নানা দুর্যোগ ঘটতে পারে। পাল্টে যেতে পারে আমাদের জলবায়ুর প্যাটার্নও।’

হঠাৎ কেন আলোচনায় মিথেন? চলতি বছরের এপ্রিলে মার্কিন গণমাধ্যম ব্লুমবার্গ জানায়, ‘ঢাকার আকাশে প্রচুর মিথেন গ্যাসের অস্তিত্ব মিলেছে। এ কারণে জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে আছে বাংলাদেশ। স্যাটেলাইটের ছবি দেখে ধারণা করা হচ্ছে, যেখানে ময়লা-আবর্জনা ফেলার ভাগাড় আছে, সেখানে মিথেনের ঘনত্ব অনেক বেশি।’ ঢাকা ও এর আশপাশে রয়েছে এ রকম বড় দুটো ভাগাড় বা ল্যান্ডফিল, যেখানে শহরের সব বর্জ্য এনে ফেলা হয়। এর একটি ঢাকার দক্ষিণে মাতুয়াইলে। ১০০ একরের এই ভাগাড়টি ২৫ বছরের পুরোনো। অরেকটি সাভারের আমিনবাজারে। ৫২ একরের ভাগাড়টি চালু হয় ২০০৭ সালে। ল্যান্ডফিল দুটোতেই ধারণক্ষমতার বেশি আবর্জনা রয়েছে বলে মনে করছে গবেষণা প্রতিষ্ঠানটি।

দেশীয় গবেষকেরাও বলছেন একই কথা; তাঁরা বলছেন, এই ল্যান্ডফিলগুলোতে ধারণক্ষমতার বাইরে বেশি বর্জ্য মজুত আছে। এগুলো পরিষ্কার করা প্রয়োজন, নইলে ঘটতে পারে বড় বিপদ। স্টামফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিবেশবিজ্ঞান বিভাগের চেয়ারম্যান ও বায়ুমন্ডলীয় দূষণ অধ্যয়ন কেন্দ্রের (ক্যাপস) প্রতিষ্ঠাতা পরিচালক অধ্যাপক আহমদ কামরুজ্জামান মজুমদার মনে করেন, ‘এই ল্যান্ডফিলগুলো অনেক আগেই কার্যক্ষমতা হারিয়েছে। এখান থেকে আবর্জনা সরানো এখন সময়ের দাবি। আবর্জনা রিসাইকেল এখন নেক্সট বিগ থিং। পৃথিবীর অনেক দেশই এখন টনকে টন আবর্জনা কিনছে। সেগুলো দিয়ে তারা সার, জ্বালানি, মন্ড ছাড়াও প্রয়োজনীয় জিনিস বানাচ্ছে। কৃষিপ্রধান দেশ বাংলাদেশ, যারা বিদেশ থেকে জৈব ও প্রাকৃতিক সার আমদানি করে। অথচ সামান্য সহযোগিতা পেলে হয়তো আমরাই আবর্জনাকে সম্পদে রূপান্তর করতে পারতাম।’

তবে শুধু ল্যান্ডফিল নয়, মিথেনের আরও উৎসের কথা জানিয়ে তিনি বললেন, ‘মিথেনের ৫-৬টা উৎস থাকে। মিথেন সমুদ্র থেকে আসতে পারে। তবে বাংলাদেশের সমুদ্রোপক‚ল থেকে কোনো মিথেন হয় না। কৃষির আবর্জনা থেকে মিথেন আসতে পারে। ব্লুমবার্গের যে রিপোর্ট, সেটা এ বছরের ফেব্রুয়ারি বা মার্চের। সময়টা ছিল শীতকাল। সুতরাং সেখান থেকে মিথেন আসার সুযোগ নেই। আবার কয়লাখনি থেকে মিথেন তৈরি হয়। কিন্তু বাংলাদেশ সেরকম কোনো কয়লাখনিও নেই। তা ছাড়া তেলের খনি কিংবা গ্যাসের খনি লিক করেও মিথেন নির্গত হয়। দেশে এমন কোনো ঘটনাও ঘটেনি। গবাদিপশুর মল থেকেও মিথেন হয়, সেটা বাংলাদেশে মডারেট (সহনীয়) পর্যায়ে রয়েছে। এখানে সিংহভাগ মিথেনই ধানখেত থেকে তৈরি হয়। যখন চাষিরা জমিতে পানি দেন, তখন মাটিতে থাকা ব্যাকটেরিয়া বিপুল পরিমাণ গ্যাস সৃষ্টি করে। ল্যান্ডফিল থেকেও প্রচুর মিথেন উৎপন্ন হচ্ছে। সেখানে প্রচুর ময়লা-আবর্জনা খোলামেলা পোড়ানো হয়, ফেলে রাখা হয়। দেশের ল্যান্ডফিলগুলোর ম্যানেজমেন্ট না থাকার কারণে তা মিথেন উৎপাদনের ঘাঁটি হয়ে উঠেছে। কারণ হচ্ছে বায়ূদূষণের।’

তবে গবেষকেরা বলছেন, শুধু স্যাটেলাইটের ছবির ওপর ভিত্তি করে মিথেনপ্রবণ এলাকা চিহ্নিত করা যায় না। কার্বন আইসোটোপ বিশ্লেষণ করলে বোঝা যাবে এই মিথেনের উৎস কী। মিথেনের উৎস জানতে যেখানে মিথেনের ঘনত্ব বেশি সেখানে আরও গবেষণা ও পরীক্ষা-নিরীক্ষা করা প্রয়োজন বলে মনে করছেন গবেষকেরা। কার্বন ডাই-অক্সাইডের তুলনায় মিথেনের ৮৪ গুণ বেশি ক্ষতি করার সক্ষমতা রয়েছে। জলবায়ুর পরিবর্তন ঠেকাতে এই জাতীয় গ্যাসের নির্গমন কমাতে হবে।

রিসাইকেল ছাড়া মিথেন গ্যাসের উৎস ধানখেত, আবর্জনার ভাগাড়, গ্যাস পাইপের ছিদ্র, কয়লার মজুতÑ এসব বদলানোর ব্যাপারে চিন্তা করার তাগিদ দিয়েছেন পরিবেশবিদরা। তাঁরা বলছেন, কৃষিকাজে চাষের ক্ষেত্রে ফসলের বৈচিত্র্য বাড়লে মিথেনের নির্গমন আগের তুলনায় কিছুটা কমবে।
প্রকাশকালঃ বন্ধন, ১৩০তম সংখ্যা, জুন ২০২১

সাইফুল হক মিঠু 
+ posts

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Scroll to Top