ভূগর্ভের পানি বিশুদ্ধকরণ কৌশল

পেশায় স্থপতি, স্থাপত্য নিয়েই কাজ। কয়েকটি দাগ দিয়েই তৈরি করে ফেলি একটি বসবাসের উপযোগী আবাসন; সুন্দর সুন্দর অবকাঠামোর ডিজাইন। পেশাগত কাজের পাশাপাশি সামাজিক দায়বদ্ধতাও ভাবায় আমাকে। বিশেষ করে মানুষের মৌলিক চাহিদাগুলো। এর মধ্যে অন্যতম স্বাস্থ্য। সুস্থ থাকার জন্য প্রয়োজন নিরাপদ খাবার পানির। খাওয়া ছাড়াও দৈনন্দিন জীবনে পানির প্রয়োজন কতটা ব্যাপক তা বলার অবকাশ রাখে না। বাসাবাড়ি, কলকারখানা, কৃষি খামারÑ প্রতিটি ক্ষেত্রেই প্রয়োজন পানির। আমরা সাধারণত সমুদ্র, নদী-নালা, খাল-বিল ও বৃষ্টি থেকে পানি পেয়ে থাকি। তারপরও আমাদের প্রয়োজন থেকে যায়। তাই আমরা ভূগর্ভ থেকে পানি উত্তোলন করে প্রয়োজন মেটাই। কিন্তু ব্যবহার ও পানযোগ্য পানি আমরা কতটা পাই? ভূগর্ভের পানিতে থাকে প্রচুর আয়রন, আর্সেনিক ও অন্যান্য ক্ষতিকর, রাসায়নিক ও খনিজ উপাদান। এই পানি পানের ফলে মানুষের স্বাস্থ্যঝুঁকি বাড়ে; বিভিন্ন রোগে আক্রান্ত হয়ে অনেকেই হয় মৃত্যুপথযাত্রী। এই বিষয়টি ভাবিয়ে তোলে! কীভাবে ভূগর্ভের এই পানিসম্পদকে দূষণমুক্ত করে ব্যবহারের উপযোগী করা যায় তা নিয়ে শুরু করি গবেষণা এবং একপর্যায়ে সমাধানের পথও পেয়ে যাই! ভূগর্ভের পানি বিশুদ্ধকরণ কৌশলের আদ্যন্ত তুলে ধরতেই এ লেখনী।

আমরা জানি, ভূগর্ভের বালু ও নুড়ি পাথরের মধ্যেই পানির অবস্থান। বালুর গুণগতমানের ওপরেই নির্ভর করে পানির ভালো-মন্দ। মন্দ বলতে আয়রণ, আর্সেনিক, ঘোলাটে ও দুর্গন্ধকেই বোঝায়। এই পানি কৃষি, গৃহস্থালি, কলকারখানা, গৃহনির্মাণসহ সর্ব ক্ষেত্রেই অব্যবহারযোগ্য। এ অবস্থা থেকে পরিত্রাণ পেতেই মূলত কাজ শুরু করি। প্রকল্পটি স্থাপত্যকর্মের মতোই চিন্তায় ফেলে আমাকে। কোনো প্রকল্পের প্রণোদিত নকশাটি যতক্ষণ না মনঃপূত হয় ততক্ষণ পর্যন্ত ভাবতে থাকি। দেখা যায়, ঠিক একসময় তার সমাধানও পেয়ে যাই। ঠিক তদ্রুপ পানিও আমাকে ওই রকম একটি চিন্তায় ফেলে। একপর্যায়ে মনে পড়ে ছোটবেলায় স্কুলে শেখা পানি বিশুদ্ধরণ কৌশলটি। অর্থাৎ বালু, কয়লা ও নুড়িপাথরের সাহায্যে পানি বিশুদ্ধকরণ পদ্ধতিটি। উপকরণ পেয়ে গেলাম, কিন্তু কী করে এই বালু, কয়লা ও নুড়িপাথরকে ভূগর্ভে প্রবেশ করাই? ভাবনাটা ক্রমেই প্রগাঢ় হয়। সিটু পাইলিং (Situ Piling) পদ্ধতিতে এই সমস্যার সমাধানে সচেষ্ট হই।

আমরা কেজিং বা ড্রেজিং করে ভূগর্ভের গভীরে চলে যাই। কাদা, বালু মিশ্রিত কাদা অপসারণ করে শক্ত বালুর ওপর পাইল স্থাপন করি। কেজিংটির মধ্যে রডের খাঁচা নামাই, তার পরিবর্তে ফিল্টারযোগ্য বালু প্রবেশ করাই। এভাবে প্রথমে একটি এবং পরে বৃত্তাকারে এর চারপাশে অনুরূপভাবে বালুর স্তর তৈরি করি। এরপর পাশাপাশি কয়লা ও নুড়িপাথরের স্তর তৈরি করি। এভাবে বৃত্তের ঠিক মাঝখানে একটি র১” /২”   বা ২”  ব্যাসের ফিল্টারযুক্ত পিভিসি পাইপের সঙ্গে ইস্টেইনার পাইপ সংযুক্ত করি। এবার টিউবওয়েল বা মটরের সঙ্গে সংযুক্ত করলেই পেয়ে যাব ফিল্টারকৃত বিশুদ্ধ ও পরিচ্ছন্ন পানি।

ভূগর্ভস্ত পানি বিশুদ্ধকরণ পদ্ধতিটি

প্রথমত, টিউবওয়েল স্থাপনকারী অভিজ্ঞ লোক দিয়ে হ্যান্ড বোরিংয়ের মাধ্যমে বালু উত্তোলন করে নির্ণয় করে নিতে হবে কোন স্তরে ফিল্টারটি স্থাপন করতে হবে। ধরে নিই, ৪০ থেকে ৫৫ ফুট গভীরের স্তরটিই টিউবওয়েল স্থাপনের মোটামুটি উপযোগী।

আমরা উঁচু ভবন, সেতু, ফ্লাইওভার নির্মাণের জন্য Situ-Piling করে থাকি। অনুরূপভাবে প্রথমে ২৪ ইঞ্চি বা ৩০ ইঞ্চি ব্যাস নিয়ে ৫৫ ফুট গভীরে একটি কেজিং করে এর ভেতরের সব কাদা ও কাদাযুক্ত বালু অপসারণ করে পরিচ্ছন্ন কেজিংটির মধ্যে স্বচ্ছ ফিল্টারযোগ্য বালু প্রবেশ করাই। গর্তটি ২ ফুট ৬ ইঞ্চি ভরে যাওয়ার পর দেড় ইঞ্চি বা ২ ইঞ্চি ডায়া পিভিসি পাইপের নিচের মাথায় একটি ৯/১০ ফুটের ওয়াটার ফিল্টার শক্তভাবে আটকিয়ে তার নিচের মাথাটি কর্ক দ্বারা সম্পূর্ণরূপে বন্ধ করে দিয়ে কেজিংয়ের বালুর মধ্যে স্থাপন করি। এরপর ওপর থেকে আগের মতো স্বচ্ছ ফিল্টারযোগ্য বালু (১২ ফুট ৬ ইঞ্চি) প্রবেশ করাই।

এখন কেজিংটির নিচ থেকে ১৫ ফুট স্বচ্ছ (ফিল্টারযোগ্য) বালুতে ভর্তি হলো। ওপরের বাকি অংশে ড্রেজিং কাটা বা সাধারণ ভরাট বালু দ্বারা ভর্তি করলে চলবে। পিভিসি পাইপের ওপরের মাথায় ৪-৫ ফুট লম্বা সমব্যাসের জিআই পাইপ সংযুক্ত করে এর ওপরের মাথায় কর্ক দ্বারা সাময়িক বন্ধ করে রাখি, যাতে পাইপটির মধ্যে কোনো ময়লা প্রবেশ করতে না পারে। এখন ২ ফুট ৬ ইঞ্চি রেখে কেজিংটি বালু দিয়ে ভর্তি করলাম। তারপর গাঁ-ঘেষে সুবিধামতো ব্যাস নিয়ে অর্থাৎ অংক কষে বের করে নিতে হবে, যেন ১ম কেজিংটির সাথে নিñিদ্রভাবে মিশে যায়। এবং নিচ থেকে ১৫ ফুট পর্যন্ত স্বচ্ছ ফিল্টারকৃত বালুতে একের পর এক ভর্তি করতে হবে। ওপরের অংশটুকু যেকোনো বালুতেই চলবে। এবার ভূগর্ভের ৪০ থেকে ৫৫ ফুট গভীরে ৬-৭ ফুট ব্যাসের একটা সুন্দর বালুর স্তর হয়ে গেল। এই স্তরটিকে আরও সুরক্ষার জন্য নতুন করে একই পদ্ধতিতে আগের মতো কেজিং করে মোটা বালু, কয়লা ও নুড়িপাথর নির্দিষ্ট অনুপাতে মিশ্রণ করে নিচ থেকে ১৫ ফুট পর্যন্ত আগের মতো একের পর এক ভরে ফেলি। যাতে প্রথমটির সঙ্গে নিñিদ্রভাবে মিশে যায়। এখন ৪০ ফুট গভীরে প্রায় ৯ ফুট ব্যাসে ১৫ ফুটের একটি কৃত্রিম স্তর হয়ে গেল।

এবার ওপরের জিআই পাইপের কর্কটি খুলে এক-দেড় ইঞ্চি জিআই ‘টি’ (১” x ১.৫”   G.I ‘T’)-এর মধ্যে ৩/৪”  এলবো সংযোগ করে এলবোর সঙ্গে ইনার পাইপ ও চেকবাল্ব যুক্ত করে পিভিসি ফিল্টারের নিচ পর্যন্ত পৌঁছে দিতে হবে। এবার ‘T’-এর ওপরের মুখে সহজেই হ্যান্ড টিউবওয়েল স্থাপন করা যায় এবং ‘T’-এর অপর ১”  মুখে একটি ৩/র্৪র্  সকেটের সঙ্গে মটর বা ওয়াটার পাম্পের সংযোগ দিলেই হ্যান্ড টিউবওয়েল ও ওয়াটার পাম্প উভয় হতে ভূগর্ভের আয়রণ, আর্সেনিক, ঘোলাটে ও দূষণ কাটিয়ে স্বচ্ছ পানি সরবরাহ করতে সক্ষম হব।

এই ভূগর্ভস্ত পানি বিশুদ্ধকরণ প্রক্রিয়াটির স্বপক্ষে মত প্রকাশ করেছেন বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) Material & Metallurgical ডিপার্টমেন্টের প্রাক্তন চেয়ারম্যান, অধ্যাপক, প্রকৌশলী ড. মো. আমিনুল ইসলাম। তবে জনহিতকর এই কাজটির বাস্তবায়নে প্রয়োজন অনেক পরীক্ষা-নিরীক্ষা। আর এ জন্য প্রয়োজন সরকারি-বেসরকারি উদ্যোগ। প্রকল্পটি বাস্তবায়িত হলে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলের পানির সমস্যা সমাধানে আসবে যুগান্তকারী সমাধান। দেশ ও জাতি সক্ষম হবে পানির সংকট উত্তরণে। সাশ্রয় হবে অর্থ, সমৃদ্ধ হবে দেশীয় অর্থনীতি। 

প্রকাশকাল: বন্ধন, ৯৮তম সংখ্যা, জুন ২০১৮।

স্থপতি মিজানুর রহমান
+ posts

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Scroll to Top