স্থাপত্য গাছের মতোই মাটি থেকে বেড়ে ওঠে, যার ভিতটা আসলে শিকড়। গাছ না থাকলে যেমন প্রকৃতির চিত্রপট হতো বিবর্ণ; মলিন, তেমনি স্থাপত্য না থাকলে মানুষের শৈল্পিক মনস্তাত্ত্বিক অভিব্যক্তিও প্রকাশ পেত না। যুগ যুগ ধরে মানুষ প্রকৃতিতে যে স্থাপত্যশিল্প ব্যঞ্জনা তৈরি করেছে, তা তার ক্রমবর্ধমান শৈল্পিক চিন্তাচেতনারই বহিঃপ্রকাশ। ইট, পাথর, বালু, সিমেন্টে মানুষ সৃজন করেছে স্থাপত্যের শৈল্পিক চিত্রপট। বিক্রমপুরের লৌহজং থানার ডহুরিতে নির্মিত ‘বিক্রমপুরী ভবন’ এমনই এক শৈল্পিক সৃষ্টি। স্থাপনাটি সৃজন করেছেন স্থাপত্য প্রতিষ্ঠান আইসোভিস্টস (ISOVISTS)-এর প্রধান স্থপতি জামাল উদ্দীন শেখ। দেশীয় স্থাপত্যরীতিতে নির্মিত এ স্থাপনাটি এক নিমেষেই মানুষের মনকে করে তোলে আন্দোলিত, বিমোহিত।
ত্রিতলা এ স্থাপনাটি দূর থেকে যে কারও চোখ আঁকড়ে ধরবে। বাড়িটির চারপাশ ঘিরে ছায়াঢাকা পায়ে হাঁটা পথ আর বর্ণিল সব ফুলের উপস্থিতি। ফলগাছেরও কমতি নেই। বাড়িটি দাঁড়িয়ে রয়েছে সবুজের মাঝে ঘাসফড়িং হয়ে। সামনে পেছনের উন্মুক্ত পরিসর স্থাপনাটির সৌন্দর্য বাড়িয়েছে বহুগুণ। এর খুব কাছেই নদী, দেখলেই বোঝা যায় সবুজ বাংলার প্রিয় রূপকেই ফুটিয়ে তুলেছেন স্থপতি তাঁর নান্দনিক স্থাপনায়।
বিক্রমপুরী ভবন আসলে প্রকৃতিপ্রেমী চারণ সমাজসেবক, আবদুল জলিল বিক্রমপুরীর অবসরস্থল। তাঁর নামের সঙ্গে মিল রেখেই বাড়িটির নামকরণ। ব্যস্তজীবনের ছকে বাঁধা সময় আর ঢাকার বিরক্তিকর একঘেয়ে জীবন ফেলে যেন সুযোগ পেলেই ছুটে আসতে পারেন প্রকৃতির কাছে, পরিবারের সবাইকে নিয়ে, হয়তো বিভিন্ন উৎসবে স্বজনদের সঙ্গে একত্র হয়ে। হয়তো দক্ষিণা খোলা বাতাস আর মিষ্টি রোদের মাঝে নিজেকে মেলে ধরে সময় কাটাবেন সামাজিক কাজেও। সপ্তাহে দুই-একবার এসে প্রকৃতির মাঝে সময় কাটাতে এবং গ্রাম-বাংলার সরল মানুষের সঙ্গে মেলামেশার উদ্দেশ্যেই নির্মিত বিক্রমপুরী ভবনটি। ঢাকা-মাওয়া সড়ক হয়ে মাত্র দুই ঘণ্টার ব্যবধানে লৌহজং থানার ডহরীতে নদীর পাশে দাঁড়িয়ে আছে সবুজের মাঝখানে শান্ত বাড়িটি।
বাড়িটির স্থাপত্য ডিজাইন খুবই সাদামাটা। পাখির চোখে দেখলে মনে হবে একটা লম্বা আয়তাকৃতির মূল ভবন সবুজের মাঝখানে দাঁড়িয়ে। চারপাশে সবুজ গাছ, মায়াবী ছায়া, যেন ইচ্ছে করে শুধু পরান ভরে দেখি। স্থপতি এই প্রকল্পটি তৈরি করেছেন মনের মাধুরী মিশিয়ে, শিল্পের সবটুকু রস ঢেলে। কোনো কৃত্রিম প্রযুক্তির ব্যবহার ছাড়াই বাড়িটি তার বাসিন্দাদের জন্য হয়ে উঠছে আরামদায়ক, একই সঙ্গে পরিবেশবান্ধব। স্থপতির প্রকল্প কনসেপ্ট ছিল স্থাপত্য ক্যানভাস বা চিত্রপট তৈরি করা, যা ফুটে উঠেছে ভবনটির গঠনে। বাড়িটির প্রকাশভঙ্গিতে তিনি ব্যবহার করেছেন উদ্ভাসিত ইট। ভবনটির ইটের দেয়ালের মাঝে তৈরি করেছেন পারস্পরিক সম্পর্ক, পুরো স্থাপত্যে যা পেয়েছে ভিন্ন এক মাত্রার শৈল্পিক রূপ।
স্থাপত্যের ভেতরে এবং বাইরের সংযোগ স্থাপনের পাশাপাশি সৃষ্টি করেছেন আলো-ছায়ার মায়াবী জগৎ। ভবনটির নিচতলায় রয়েছে ফরমাল লিভিং, ডাইনিং স্পেস, গেস্ট রুম, রান্নাঘর, সার্ভিসের জায়গা আর গ্যারেজ। আলাদা করে তৈরি করা হয়েছে সার্ভিস কোট। ফরমাল লিভিংকে প্রসারিত করা হয়েছে, যা বাইরের খোলা প্রাঙ্গণকে সংযুক্ত করেছে, ঠিক যেন গ্রামের বৈঠকখানার মতো। দোতলায় রয়েছে চারটি বেডরুম। এর প্রতিটি রুম থেকেই বাইরে যাওয়া যায়। ভেতরে ডাবল হাইট এবং ট্রিপল হাইট খোলা জায়গা রাখা হয়েছে বিভিন্ন ফ্লোর সরাসরি দেখার জন্য। তৃতীয় তলায় রয়েছে একটি হলরুম, যা থেকে সরাসরি বাইরের চত্বরে আসা যায়। এ ছাড়া নির্মাণ করা হয়েছে কিছু ব্যতিক্রমী চত্ত্বর। প্রতিটি পরিসরে ক্রস ভ্যান্টিলেশন ছাড়াও স্থাপনার শীতলভাব বজায় রাখতে বাহিরে ব্যবহার করা হয়েছে দুই স্তরের ফাঁপা ইটের দেয়াল (Cavity Wall), কোথাও-বা আবার ঘাসের ছাদ। দক্ষিণা হাওয়াকে প্রধান্য দিয়েই স্থাপনাটি ডিজাইন করা হয়েছে। সামনের পরিসরে করা হয়েছে বিস্তৃত বাগান। ভবনের পেছনেও অনেকটা খোলা জায়গা। প্রকৃতিকে তিনি নিয়ে গেছেন স্থাপনার ভেতর। তৈরি করেছেন বৃষ্টিতে ভেজার ছাদ। ছাদে দাঁড়ালে সীমাহীন আকাশ আর দিগন্ত কাছে টেনে নেয়। পুরো বাড়িটি যেন প্রকৃতির চিত্রপটে আঁকা এক স্থাপত্য গ্যালারি।
প্রায় দুই বিঘা জায়গাজুড়ে স্থাপত্য পরিসরটির নির্মাণকাজ শেষ করতে সময় লেগেছে প্রায় আড়াই বছর। ন্যাশনাল বিল্ডিং কোডসহ আনুষঙ্গিক নিয়ম মেনে বাড়িটি নির্মিত। কম উচ্চতাসম্পন্ন ভবন হলেও ভূমিকম্প, ঝড়, মাটির অবস্থা প্রভৃতি বিষয় বিবেচনায় রেখেই এ বছরের শুরুতে ভবনটির নির্মাণকাজ শেষ হয়। স্থানীয় বাসিন্দাদের মধ্যেও ভবনটি নিয়ে রয়েছে ব্যাপক কৌতূহল।
প্রকাশকাল: বন্ধন, ৮২তম সংখ্যা, ফেব্রুয়ারি ২০১৭।