বসবাসের জায়গায় জীবাণুর অনুপ্রবেশ

আমরা যেখানে বসবাস করি কিংবা আমাদের বসবাসের স্থানের চারপাশে অনেক ধরনের মাইক্রো-ব্যাকটেরিয়া জন্মায়, যা সর্বত্রই বিদ্যমান থাকে। কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছে, আমাদের স্বাস্থ্যের জন্য এটি ক্ষতিকর কিনা? আর ক্ষতিকর হলেও কীভাবে বসবাসের জায়গা এই ধরনের মাইক্রো-ব্যাকটেরিয়া মানুষের স্বাস্থ্যের ওপর প্রভাব ফেলে? বর্তমানে পৃথিবীতে বিভিন্ন ধরনের জীবাণু মানুষের স্বাস্থ্যের জন্য হুমকিস্বরূপ। উদাহরণস্বরূপ বলা যায় বর্তমানের করোনাভাইরাস-এর কথা। যার জন্য আজ বিশ্ব আতঙ্কিত। যে ভাইরাসের জন্য জনজীবনে নেমে এসেছে চরম দুর্ভোগ। শুধু অর্থনৈতিক ক্ষেত্রেই নয়, জীবনযাপনের মান-সম্পর্কÑ সবকিছুতেই নেমে এসেছে চরম বিপর্যয়। তাই আমাদের অবস্থানগত পরিবেশে জীবাণুর বিস্তার প্রতিরোধে স্থপতি-পরিকল্পনাবিদ-প্রকৌশলীদের কোনো কিছু করার আছে কি না এসব বিষয় নিয়ে আমাদের ভাবতে হবে। কারণ, যখন কোনো জীবাণুর কথা আসে, তখনই আমরা বিভিন্ন ধরনের অ্যান্টি-ব্যাকটেরিয়াল, অ্যান্টি-ভাইরাল সাবান কিংবা বিশেষ ধরনের কোনো প্রতিষেধকের কথা ভাবি। ঠিক সেই মুহূর্তে আমাদের ভাবতে হয় আমাদের বসবাসের জায়গা নিয়ে। কারণ, এই জীবাণুর হুমকির বিরুদ্ধে লড়াই করার জন্য আমাদের বসবাসের স্থান অবশ্যই পরিষ্কার রাখতে হবে। অন্যদিকে আমাদের প্রায়ই মনে করিয়ে দেওয়া হয় যে প্রোবায়োটিক জীবাণুগুলোর উল্লেখযোগ্য স্বাস্থ্যসুবিধা রয়েছে। এগুলো আমাদের পরিবেশে সর্বদাই উপস্থিত থাকে। হয়তোবা বেশির ভাগ আমাদের স্বাস্থ্যের জন্য উপকারী ও প্রয়োজনীয় হিসেবেও পরিচিত। তবে কিছু কিছু রোগবাহী জীবাণু আছে, যেগুলো বসতবাড়িতে আমাদের খুব সহজেই অসুস্থ করে তুলতে পারে। এমনকি এটি মৃত্যুর কারণও হতে পারে। তাই কী কী জীবাণু আমাদের বসবাসের চারপাশে থাকতে পারে, সেগুলো সম্পর্কে আমাদের জানা অত্যন্ত প্রয়োজন শুধু আমাদের নিজেদের স্বাস্থ্য সুরক্ষার জন্য নয়, যা অন্যের স্বাস্থ্যের সুরক্ষাও নিশ্চিত করবে।

এনএসএফ ইন্টারন্যাশনালের বিজ্ঞানীরা দক্ষিণ-পূর্ব মিশিগানের ২২টি পরিবারকে পরীক্ষা-নিরীক্ষা করেন। তাঁরা দেখতে পান যে ডিশ ওয়াশিং স্পঞ্জে সর্বাধিক পরিমাণ জীবাণু রয়েছে। তার পরে দাঁত ব্রাশ হোল্ডার, রান্নাঘরের সিংক, কফি রাখার জায়গা, বিশেষ করে রান্নাঘরের কাউন্টার টপস, চুলার চারপাশ যেখানে অনেক সময় রান্না করার সময় খাবার পড়ে থাকে, খেলনা এবং টয়লেটের বসার জায়গায় সব থেকে বেশি পরিমাণে জীবাণু বংশবিস্তার করে। তা ছাড়া ময়লা রাখার জায়গা একটি বসতবাড়িতে সব সময় সঠিকভাবে রক্ষণাবেক্ষণ করা হয় না। এসব স্থানে যেকোনো সময় জন্মাতে পারে যেকোনো ধরনের জীবাণু এবং যেকোনো সময় পরিবারের মানুষের স্বাস্থ্যের প্রতি তা হতে পারে হুমকিস্বরূপ।

অন্যদিকে বিজ্ঞানীদের একটি বড় দল, যার নেতৃত্বে ছিলেন জর্দান পেসিয়া যিনি ইয়েল বিশ্ববিদ্যালয়ের রাসায়নিক ও পরিবেশগত প্রকৌশলের অধ্যাপক তিনি এবং তাঁর দল ১৯৮টি বাড়ি থেকে নমুনা পরীক্ষা করেছেন ঘরের ধুলোয় অণুজীবের বৈচিত্র্য নির্ধারণের জন্য।

গবেষকেরা দেখতে পান যে সর্বাধিক সাধারণ ছত্রাকের প্রজাতি হলো লেপটোসফেরুলিনা চর্টারিয়াম, এপিকোকাম নিগ্রাম এবং ওলেলেমিয়া সেবি। সর্বাধিক প্রচুর পরিমাণে ব্যাকটেরিয়া ছিল স্ট্যাফিলোকক্কাস, স্ট্রেপ্টোকোকাস এবং কোরিনিব্যাকটেরিয়া পরিবার থেকে। এমনকি গবেষণা থেকে এটিও দেখা যায়, পোষা প্রাণীসহ শহরতলিতে যাঁরা বাস করেন, তাঁদের বাড়িতে ছিল আরও বিভিন্ন ধরনের ব্যাকটেরিয়া প্রজাতি।

এদিকে কোরিয়ার সিউল জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের বিজ্ঞানীরা গবেষণা করেছেন আমাদের রেফ্রিজারেটর আর টয়লেটে বসার স্থানগুলো নিয়ে। তাঁরা দেখিয়েছেন যে এখানে অধিক পরিমাণে ব্যাকটেরিয়া থাকে। এই ব্যাকটেরিয়ার বেশির ভাগই মানুষের ত্বকের সঙ্গে খুবই সম্পর্কযুক্ত, যা প্রচুর পরিমাণে জীবাণুর উৎস, যেটা যেকোনো সময় মানুষকে বিভিন্ন ধরনের হুমকির সম্মুখীন করতে পারে।

সুতরাং আমাদের বসবাসের জায়গায় শোবার ঘর থেকে শুরু করে ড্রইং রুম, ডাইনিং রুম, কিচেন, টুথব্রাশ হোল্ডার সব ক্ষেত্রেই বিভিন্ন ধরনের জীবাণু যেকোনো সময় জন্মাতে পারে। কিন্তু জীবাণুর প্রভাব নির্ভর করে আমাদের বয়স, আমাদের ইমিউন সিস্টেমের ওপর। কারণ, একজন মানুষ থেকে আরেকজন মানুষের ইমিউন সিস্টেম-এর পার্থক্য রয়েছে। সব ধরনের জীবাণু সব ধরনের মানুষকে আক্রমণ করে না। আমাদের বসবাসের জায়গার সঙ্গে, আমাদের জীবনযাপনের সঙ্গে এই জীবাণুগুলোর সংক্রামিত হওয়ার অনেক উপায় রয়েছে। তাই স্থাপত্য নকশা বলি কিংবা যেকোনো ধরনের নকশা বলি কিংবা জীবনযাপনের ধারা বলি না কেন, সেখানে আমাদের সুস্পষ্টভাবে খেয়াল রাখতে হবে এই বিষয়গুলোর দিকে, যা আমাদের ভবিষ্যৎ স্বাস্থ্যের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বিশেষ করে বাড়ির শিশু আর বয়স্কদের জন্য এর গুরুত্ব অপরিসীম।

প্রকাশকাল: বন্ধন, ১২০তম সংখ্যা, এপ্রিল-আগস্ট ২০২০।

স্থপতি সজল চৌধুরী
+ posts

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Scroll to Top