আমার স্থাপত্যবিদ্যা শিক্ষার সূচনা চট্টগ্রাম প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ে (চুয়েট)। ভূ-প্রকৃতিগত দিক থেকে চট্টগ্রাম পার্বত্য অঞ্চল। এখানে আসার পর থেকেই পাহাড় সম্পর্কে আমার কৌতূহল বাড়তে থাকে। সময় পেলেই প্রাকৃতিক সৌন্দর্য উপভোগের জন্য বন্ধুদের সঙ্গে বেরিয়ে পড়তাম রাঙামাটি-বান্দরবানের পাহাড়ি জনপদে। বিশ্ববিদ্যালয় প্রাঙ্গণেও পাহাড়, টিলা ও ছোট্ট একটি হ্রদ আছে। প্রকৃতির এমন সান্নিধ্য ক্রমেই পাহাড়ের প্রতি ভালো লাগা সৃষ্টি করে। শিক্ষাবর্ষের শেষ সমাপনী প্রকল্প নির্বাচনের সময় এমন একটি প্রকল্প খুঁজছিলাম, যা আমার মনের মতো। নতুন প্রকল্পের তালিকায় পেলামও একটা মনের মতো প্রকল্প, নাম ‘পার্বত্য চট্টগ্রাম কমপ্লেক্স’। পার্বত্য চট্টগ্রামকে নিয়ে। তখনই এটি নিয়ে চিন্তাভাবনা শুরু করি।
প্রকল্পটি একটি সরকারাধীন হওয়ায় প্রকল্পের অবস্থান ও করণীয়সমূহ ছিল পূর্বনির্ধারিত। এই নির্ধারিত কার্যক্রম নিয়েই শুরু করতে হয় কাজ। রাজধানীর বেইলি রোডে প্রকল্পটির স্থান নির্ধারিত হওয়ায় প্রথমেই বিবেচনায় নিতে হয়েছিল এর অবস্থানগত দিকটি। সমতলভূমিতে পার্বত্য চট্টগ্রাম কমপ্লেক্স ভবনকে কীভাবে উপস্থাপন করব তা ছিল অত্যন্ত চ্যালেঞ্জিং। পড়াশোনা করতে থাকি যাদের জন্য এই স্থাপনাটি তৈরি হবে অর্থাৎ আদিবাসীদের জীবনধারা ও বসবাস প্রণালি নিয়ে। এরপর ওদের ঘরবাড়ি ও অন্যান্য স্থাপনা নিয়ে বিশ্লেষণ করে তাদের বসবাসের পরিবেশ ও উপাদান সম্পর্কে জানতে পারি। এখান থেকে সিদ্ধান্তে আসি, যাদের জন্য নির্মিত হবে এই স্থাপনাটি, তাদের বসবাসের জায়গার মতো এবং এর সঙ্গে আর একটা বিষয়ে লক্ষ রাখতে হবে যে ঢাকার এই সমতলভূমিতে পার্বত্য চট্টগ্রাম কমপ্লেক্সটিকে দেখে যেন বোঝা যায় এটি পার্বত্য চট্টগ্রাম কমপ্লেক্স। অর্থাৎ এই স্থাপনাটিতে যেন পার্বত্য চট্টগ্রামের ছোঁয়া থাকে।
পূর্বের নিরীক্ষা থেকে আদিবাসীদের সম্পর্কে যে মূলতত্ত্বে উপনীত হতে পেরেছিলাম, তা হলো ‘আদিবাসী হলো সেই জনগোষ্ঠী, যারা কালের বিবর্তনেও তাদের আদিম সত্তাকে ধরে রেখেছে।’ অর্থাৎ অতীতের সঙ্গে বর্তমানের একটা যোগসূত্র স্থাপন করেছে। এই সূত্র ধরে ধরেই কল্পনা শুরু করলাম। শুরুতে কল্পনাগুলোকে স্কেচ খাতায় এঁকে রাখলাম। সেখান থেকে আমি ভবনের আকৃতি নির্বাচনের জন্য প্রথমে চিন্তা করি যে কীভাবে পার্বত্য চট্টগ্রামকে উপস্থাপন করা যায় ঢাকা শহরের সমতলভূমিতে। ভাবনায় উঁকি দেয় আমাদের দেশের প্রত্নতাত্ত্বিক স্থান ময়নামতি, পাহাড়পুর বিহারের স্থাপত্য নকশা। স্থানগুলোর ধ্বংসাবশেষ যে স্থাপনাগুলো এখনো অবশিষ্ট রয়েছে সেগুলো বিশ্লেষণ করলে তার বিশেষ কিছু নকশার ধরন পাওয়া যায়। এরপর প্রাচীন ভবনের আকৃতি ও কাঠামোগত বৈশিষ্ট্য নিয়ে বিশ্লেষণ শুরু করি। প্রথম মনুষ্য নির্মিত স্থাপনা ‘মাস্তাবা’ থেকে শুরু করে বর্তমানের গগনচুম্বী অট্টালিকা ‘বুর্জ আল-খলিফা’ পর্যন্ত যত এ ধরনের স্থাপনা আছে সবগুলোকে। এই বিশ্লেষণ থেকে খুঁজে পাই কীভাবে ‘মাস্তাবা’ নামক একতলা সমাধিগৃহ থেকে তখনকার নির্মাণশ্রমিকেরা বহুতল ভবন তৈরি করেছিল, কোন পদ্ধতি অবলম্বন করেছিল এবং বর্তমানের এই গগনচুম্বী ভবনগুলোতেও কীভাবে ওই একই পদ্ধতিকে পুনঃসংস্কার করে ব্যবহার করা হচ্ছে। আমি যা খুঁজে পাই তা হলো, তখনকার নির্মাণশ্রমিকেরা বহুতল ভবন তৈরির সময় ভবনের অবকাঠামোগত ভারসাম্যের জন্য ক্রমহ্রাসমান মেঝের নকশা তৈরি করত। অর্থাৎ মাটিস্থ মেঝের ক্ষেত্রফল সব থেকে বড় হয় আর যত ওপরে উঠত ততই মেঝের ক্ষেত্রফল কমে। যার ফলে ভবনগুলোয় থাকত একটা বড় মঞ্চ ও চূড়া। এটাই ছিল তখনকার ভবনগুলোর আকৃতি পাহাড়ের মতো হওয়ার নেপথ্য কারণ। এই বিশ্লেষণ থেকেই আমি আমার ভবনের এমন আকৃতি নির্বাচন করি।
ভবনের আকৃতি নির্বাচনের পর নকশা সম্পর্কিত কয়েকটি নীতি নির্ধারণ করি। নীতিগুলো ছিল-
- প্রথমত, যেহেতু বাংলাদেশের পরিপ্রেক্ষিতে ভবনে প্রাকৃতিক বায়ু চলাচলের ওপর বেশি প্রাধান্য দেওয়া উচিত, তাই আমি আমার ভবনে ‘বায়ু-চিমনির প্রভাব’কে (Air-Stack Effect) কাজে লাগিয়েছি। এর জন্যই আমি আমার ভবনের মধ্যে ৯৬’ x ৯৬’ এর একটা অলিন্দ (Atrium) তৈরি করি।
- দ্বিতীয়ত, যেহেতু আমার ভবনটি একটি বহু কর্মসূচিসংক্রান্ত ভবন হবে, তাই এই ভবনটিতে সব বয়সের এবং সক্ষম-অক্ষম সব ধরনের মানুষ অবাধে ও সর্বজনীনভাবে প্রবেশ করতে পারে সেই বিষয়টি নিশ্চিত করতে চেয়েছিলাম। সেই কারণে স্থপতি রনালদ লরেন্স মাচে (Ar. Ronald Lawrence mace) কর্তৃক প্রণীত সবর্জনীন নকশা (Universal Design) নীতিটি আমার নকশায় প্রয়োগ করি। এর ফলস্বরূপ আমার ভবনের সব জায়গা র্যাম্প দিয়ে যুক্ত করি।
নীতিনির্ধারণের পর আমি আমার মূল নকশা তৈরির কাজ শুরু করি। আমার নকশায় যে কার্যক্রমগুলো ছিল তা হলো:
প্রদর্শনী প্রাজ্ঞন, হস্তশিল্প প্রদর্শনী ও বিক্রয়কেন্দ্র, গ্রন্থাগার, একটি বহুমুখী হল, একাধিক কার্যালয়, একটি পার্বত্য চট্টগ্রাম প্রশাসনিক কার্যালয়, সুইমিংপুল, ২০ কক্ষবিশিষ্ট একটি ভাড়াযোগ্য হোটেল, ২০ কক্ষবিশিষ্ট কর্মচারীদের জন্য শয়নালয়, মন্ত্রীদের জন্য ফ্ল্যাট বাড়ি এবং একটি রেস্তোরাঁ। এ ছাড়া রয়েছে একটি ভূগর্ভস্থ পার্কিংব্যবস্থা।
ভবনের নকশার জন্য ভবনের আকৃতি হলো, নীতিনির্ধারণ হলো, কার্যক্রম নির্ধারণ হলো, এখন কল্পনার সঙ্গে আমার ভবনের নকশাকে মেলাতে হবে। পার্বত্য চট্টগ্রামের পরিবেশের একটা বিশেষ বৈশিষ্ট্য হলো এর সবুজ প্রকৃতি। সে জন্য আমি সবুজ দেয়াল এবং সবুজ ছাদ সম্পর্কে পড়াশোনা শুরু করি। সেখান থেকে সবুজ প্রাঙ্গণ সম্পর্কে ধারণা পরিষ্কার হয়। আমি ভবনের প্রতিটি ধাপেই সবুজ প্রাঙ্গণ রেখেছি। এই সবুজ প্রাঙ্গণ থেকে যখন সবুজ উদ্ভিদগুলো নিচের দিকে বেয়ে নামতে থাকবে তখন সমস্ত স্থাপনাটিকে দেখতে আমার কল্পনার ভবনের মতোই লাগবে। কিন্তু এরপর পড়লাম বড় ধরনের এক ঝামেলায়, সেটা হলো নিচের মেঝেতে দপ্তর কিন্তু এরই ওপরে আবার আবাসিক থাকায় শৌচাগার রাখা দরকার। এখন এই শৌচাগারের পয়োনিষ্কাশনব্যবস্থা কীভাবে করব! তখন ভবনের সম্মিলিত অবকাঠামো নিয়ে পড়াশোনা করে ভবনের জন্য উপযোগী একটা অবকাঠামো ব্যবস্থা পেয়ে গেলাম। এই অবকাঠামোর নাম হলো ‘Steel Pipe Reinforced Column System’’, যার ফলে আমার ভবনের কোথাও পয়োনিষ্কাশন পাইপ উন্মুক্ত দেখা যায় না।
এসব প্রতিবন্ধকতা নিয়েই সজল চৌধুরী স্যার, সজীব পাল স্যার, শ্রী কানু কুমার দাস স্যার ও নাজমুল লতিফ সোহাইল স্যারের তত্ত্বাবধানে আমি এগিয়ে চললাম আমার নকশা উন্নয়নে। তবে শেষের দিকে আমি সজল স্যারের তত্ত্বাবধানেই আমার নকশা শেষ করি। এই নকশা তৈরির প্রথম থেকে শেষ পর্যন্ত আমি আমার কল্পনাগুলোকে বাস্তবে রূপদানের জন্য অনেক স্কেচ করি, যেগুলো আমার কল্পনাকে এবং নকশা তৈরির ধাপকে সহজেই উপস্থাপনযোগ্য করে তুলেছিল।
আমার এই প্রকল্পের শুরুতে আমাকে প্রথমে উৎসাহিত করেছিলেন বাংলাদেশ প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় (বুয়েট)-এর রিয়াদ স্যার। এরপর আমার স্টুডিও শিক্ষক সহকারী অধ্যাপক সজল চৌধুরী স্যারের উৎসাহ ও উদ্দীপনায় আমি আমার নকশা শেষ করি। আমি আমার এই সফলতার জন্য কৃতজ্ঞতা জ্ঞাপন করছি আমার পরিবারের সবাইকে এবং স্থাপত্য বিভাগের সব শিক্ষককে, যাঁরা আমার পাশে ছিলেন। বিশেষ কৃতজ্ঞতা জ্ঞাপন করছি স্থপতি সজল চৌধুরী স্যারকে তাঁর শত ব্যস্ততার মাঝেও আমাকে দিকনির্দেশনা এবং বিশেষভাব উৎসাহিত করার জন্য। সত্যি কথা বলতে আমি আজ যা, তা আমার পিতা-মাতা ও আমার শিক্ষকদেরই অবদান।
এ ছাড়া আমি বিশেষভাবে যাঁদের কাছে কৃতজ্ঞ
- রেসালাত আরেফিন (arch, ০৯)
- দেওয়ান নাফিয আজিজ (arch, ০৯)
- স্থপতি হাসিব সারোয়ার (arch, ০৮)
- তারিক আব্দুল্লাহ ফিরোজ (eee, ১১)
- এ বি এম সোহেল রহমান (cse, ১১)
- মো. মাঈনুল হাসান (cse, ১১)
- মো. নাজমুল ইসলাম (cse, ১১)
- মো. মাহমুদুল হাসান (cse, ১১)
- অর্নব বসু (eee, ১১)
- তালহা তানজির ইসলাম (cse, ১১)
- আব্দুল্লাহ আল মারুফ (cse, ১১)
- উত্তম কুমার মণ্ডল (cse, ১১)
- শুভংকর কুন্ডু (cse, ১১)
- অলকেশ বর্মন (cse, ১১)
- তাজাম্মুল হোসেন (ce, ১১)
- মোহাম্মদ মামুন হোসেন (ce, ১১)
- মো. শাহরিয়ার ইসলাম (ce, ১১)
- দানেশ মুদাসসর (pme, ১১)
- মো. হাসানুর বান্না তানভির (ce,১৪)
এঁরা ছাড়া কৃতজ্ঞতা রইল একান্ত প্রিয়জনদের প্রতি, যাদের সাহায্য ছাড়া আমার একার পক্ষে প্রকল্পটি শেষ করা সম্ভব হতো না এবং যারা সর্বদাই আমার পাশে থেকেছে আমার সুদিন ও দুর্দিনে।
প্রকাশকাল: বন্ধন, ৮৫তম সংখ্যা, মে ২০১৭।