অধ্যাপক ড. সুফি মোস্তাফিজুর রহমানের জন্ম ১৯৬৪ সালের ২২ এপ্রিল, কুড়িগ্রাম জেলায়। জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় থেকে প্রথম শ্রেণিতে প্রথম স্থান অর্জন করে ইতিহাসে স্নাতক ও প্রত্নতত্ত্বে স্নাতকোত্তর সম্পন্ন করেন। ভারতের ডেকান কলেজ পোস্ট গ্র্যাজুয়েট অ্যান্ড রিসার্চ ইনস্টিটিউট থেকে ১৯৯৯ সালে পিএইচডি ডিগ্রি পান। পিএইচডি গবেষণার বিষয় ছিল ‘পুন্ড্রনগর-এর কেন্দ্রস্থান বগুড়া জেলায় মাঠ পর্যায় প্রত্নতাত্ত্বিক গবেষণা’। তিনি চার্লস ওয়ালেস ভিজিটিং ফেলো হিসেবে ইনস্টিটিউট অব আর্কিওলজি, লন্ডন বিশ্ববিদ্যালয়ে পোস্ট ডক্টরালে গবেষণা করেন। জাতীয় এবং আন্তর্জাতিক পর্যায়ে বহু সেমিনারে নিজস্ব গবেষণা প্রবন্ধ পাঠ করেছেন। দেশে-বিদেশে তাঁর ৫০-এর অধিক গবেষণা প্রবন্ধ প্রকাশিত হয়েছে। প্রথম গ্রন্থ প্রকাশিত হয় ২০০০ সালে বঙ্গীয় শিল্পকলা চর্চার আর্ন্তজাতিক কেন্দ্র থেকে ‘Archaeological Investigation in Bogra District’। তাঁর সম্পাদিত গ্রন্থ ‘প্রত্নতাত্ত্বিক ঐতিহ্য’ ও ‘Archaeological Heritage’ প্রকাশিত হয় ২০০৭ সালে বাংলাদেশ এশিয়াটিক সোসাইটি থেকে ‘বাংলাদেশ সাংস্কৃতিক সমীক্ষা শীর্ষক’ প্রকল্পের অধীনে। তাঁর রচিত (মুহাম্মদ হাবিবুল্লাহ পাঠান যৌথ) উয়ারী-বটেশ্বর শেকড়ের সন্ধানে, প্রথমা, ২০১২ গ্রন্থটি চিত্ররঞ্জন সাহা, প্রথম আলো বর্ষসেরা গ্রন্থ ও আইএফআইসি ব্যাংক সাহিত্য পুরস্কার লাভ করে।
অধ্যাপক ড. সুফি মোস্তাফিজুর রহমান ১৯৯৬ সাল থেকে উয়ারী-বটেশ্বরে প্রত্নতাত্ত্বিক অনুসন্ধান এবং ২০০০ সাল থেকে প্রত্নতাত্ত্বিক খনন পরিচালনা করছেন। ২০১১ সাল থেকে বিক্রমপুরে প্রত্নতাত্ত্বিক অনুসন্ধান ও খননে নেতৃত্ব দিয়ে আসছেন। তিনি শুধু একজন মাঠপর্যায়ের প্রত্নতাত্ত্বিক গবেষক নন, দেশের ঐতিহ্য-স্বার্থ রক্ষা ও ঐতিহ্য-সচেতনতা সৃষ্টির লক্ষ্যে নিবেদিত একজন সক্রিয় কর্মী। প্রত্নতত্ত্ব বিষয়ে পত্রপত্রিকায় কলাম লেখেন নিয়মিত। জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রত্নতত্ত্ব বিভাগে শিক্ষাদান ছাড়াও তিনি প্রতিষ্ঠা করেছেন ‘ঐতিহ্য-অন্বেষণ’ নামে প্রত্নতাত্ত্বিক গবেষণাকেন্দ্র। তাঁর নেতৃত্বে ভাই গিরিশচন্দ্র সেন জাদুঘর ও বৌদ্ধ পদ্ম-মন্দির প্রত্নস্থান জাদুঘর প্রতিষ্ঠিত হয়েছে এবং গঙ্গারিডি জাদুঘরের কাজ চলমান। তিনি ট্যুরিজম ফাউন্ডেশন পুরস্কার ২০১২ এবং অগ্রসর বিক্রমপুর ফাউন্ডেশন প্রবর্তিত জ্ঞানালোক পুরস্কার ২০১৫ লাভ করেন। বাংলাদেশের প্রত্নতত্ব, পুরাকীর্তি ও ঐতিহ্যবাহী স্থাপনা নিয়ে বন্ধন-এর মুখোমুখি গুণী এ ব্যক্তিত্ব। তাঁর সঙ্গে আলাপচারিতায় ছিলেন রাকিবুল আজম রানা।
বাংলাদেশের সমৃদ্ধ প্রত্নতত্ত্ব ও পুরাকীর্তি বিষয়ে জানতে চাই?
দুর্ভাগ্য, আমাদের দেশের মানুষ পণ্ডিত বা গবেষকদের নিয়ে খুব একটা ভাবে না। অন্য খাতের কথা আমি জানি না কী গবেষণা হয়, তবে প্রত্নতত্ত্ব ও পুরাকীর্তি নিয়ে গবেষণা নেই বললেই চলে। যার ফলে আমাদের সমৃদ্ধ অতীত আমরা তুলে আনতে পারিনি। আমাদের দেশের একটা ইতিহাস আছে, প্রাগৈতিহাসিক যুগে মানুষের বসতি ছিল কিন্তু খোঁজা হয়নি। সেই ব্রিটিশ আমলে রাঙামাটি ও সীতাকুণ্ডে পাওয়া গিয়েছে প্রাগৈতিহাসিক হাতিয়ার, সেগুলো কোথায় গেল কেউ জানে না। ব্রিটিশ ঐতিহাসিকেরা এগুলোর কথা উল্লেখ করেছেন। দুঃখের বিষয় হলো সংস্কৃতি মন্ত্রণালয়ের অধীনে যে বিভাগ তাদের মধ্যেও ওই হাতিয়ারগুলো খোঁজার কোনো উদ্যোগ নেই, এমনকি তারা তা জানেও না। বিশ্ববিদ্যালয়ে যে গবেষণা হয় তা চর্বিতচর্বণে ভরা। ভালো মানের শিক্ষক যে দুই-চারজন নেই তা বলা যাবে না, আছে, কিন্তু তাঁরা মাঠ পর্যায়ে কাজ করতে চান না। আমার কাছে মনে হয়েছে শিক্ষকদের মাঠ পর্যায়ে কাজ করতে দুটি সমস্যাÑএকটি হলো অর্থিক, অন্যটি মাঠ পর্যায়ে কাজ করতে সময় অনেক বেশি লাগা। তার থেকে যদি বিশ্ববিদ্যালয়ে বেশি সময় দেওয়া যায়, শিক্ষা গবেষণায় টুকটাক সময় আর ক্যাম্পাস রাজনীতিতে বেশি সময় দেওয়া যায় তবে সুবিধা অনেক বেশি।
একটি কথা প্রচলিত আছে এ দেশের ভূমি বেশি প্রাচীন নয়! এখানে বেশি প্রাচীন সভ্যতা পাওয়া যাবে না! বাংলাদেশের ভূমি নবীন বটে, এখনো গঠিত হচ্ছে কিন্তু পুরোটা নয়। এখানে যে লাল মাটি আছে বরেন্দ্র অঞ্চল, মধুপুর অঞ্চল, সিলেটের কিছু অঞ্চল এবং চট্টগ্রামের কিছু অঞ্চলÑএগুলো হলো প্লাইস্টোসিন ল্যান্ড। এই ভূমির বয়স ১৮ লাখ থেকে ১০ হাজার বছর। তাহলে এই যে আমাদের বিশাল প্রাচীন ভূমি এখানে কি মানবসভ্যতা গড়ার উপযোগী নয়? সেখানে আমরা পাচ্ছিও বটে প্রাচীন সভ্যতা। মানবসভ্যতায় কৃষির উদ্ভাবন আট থেকে দশ হাজার বছর আগের। আর তারও আগের, আমাদের লাখ লাখ বছর আগের ভূমি আছে। তাহলে মানবসভ্যতা বিকাশের জন্য এখানে ভূমির কোনো অভাব নেই। কিন্তু পড়ালেখা না করে সরলভাবে এই রকম কথা বাজারে প্রচলিত করে ! বইও লিখেছে এবং এঁরা অনেক বড় বড় গবেষক! এই হলো বাংলাদেশের সমৃদ্ধ অতীত ঐতিহ্য, সম্ভাবনা-অবহেলা-অযত্নে আমরা জানি না। মিথ্যা তথ্য, অসম্পূর্ণ তথ্য, গবেষণার অভাব, গবেষণার ইচ্ছা না থাকার ফলে আমাদের এই সমৃদ্ধ অতীত আমরা খুব কম জানি, কিন্তু সমৃদ্ধ অতীত আছে আমাদের।
বিগত দুই দশকে বেশ কিছু প্রত্নস্থান আবিষ্কৃত হয়েছে। আবিষ্কৃত এসব প্রত্নস্থানের সন্ধান মিলেছে কি কোনো অনুসন্ধানে নাকি ঘটনাচক্রে?
এ কথা ঠিক, পৃথিবীর অনেক বড় বড় প্রত্নস্থান আকস্মিকভাবে আবিষ্কৃত হয়েছে। যেমন- হরপ্পা সভ্যতা আবিষ্কৃত হয়েছে রেললাইন স্থাপন করতে গিয়ে। রেললাইনের জন্য বড় বড় রাস্তা হচ্ছে। কন্ট্রাক্টরা বড় বড় টিলা থেকে মাটি কেটে নিয়ে আসছে তখন ইট বেরিয়ে আসে এবং ওই ইট তারা ব্যবহারও করেছে। আমাদের দেশেও কিন্তু আকস্মিক আবিষ্কারের ঘটনা আছে। যেমন- ময়নামতিতে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় যখন বাংকার করতে যায় তখন ওর ইট বেরিয়ে আসে। তার আগে কিছু ক্লু ছিল কিন্তু তা সামান্য, বড় আকারের আবিষ্কার হয়েছিল সেই সময়ে। তবে আমাদের দেশে আনুষ্ঠানিকভাবে অনুসন্ধান করেও প্রত্নস্থান আবিষ্কৃত হয়েছে। যেমন-মহাস্থানগড় (পুন্ড্রনগর) এর আবিষ্কারক স্যার আলেকজেন্ডার কার্নিহাম। তিনি আসেন ১৮৭৯ সালে, তখন মহাস্থানগড় পুরো জঙ্গল, প্রত্নস্থান ওভাবে জানা নেই কিন্তু তিনি হিউয়েন সাংয়ের বর্ণনা পড়ে এসেছিলেন। হিউয়েন সাং সপ্তম শতাব্দীতে পুন্ড্রনগড় পরিদর্শন করেন। তাঁর বিবরণ পড়েই কার্নিহাম খুঁজতে এসেছেন এবং করতোয়া নদী দেখেই বলেছেন মহাস্থানগড়ই হলো পুন্ড্রনগড়। এটা তো পরিকল্পিত! তারপর উয়ারী-বটেশ্বরের কথা যদি বলি সেটা অনেকটাই আকস্মিক, কিছুটা পরে পরিকল্পিত। আকস্মিক কেন? যেহেতু প্রাচীন সভ্যতা ছিল মাটির নিচে চলে গেছে, সেই মানুষগুলো তো আর নেই। আমরা জানি না। কিন্তু ওই অঞ্চলে যখন মানুষ জমি চাষ করে, পুকুর করে, বিভিন্ন কাজে গর্ত করে, নালা করে তখন মাটি উলটপালট হয়। যার ফলে ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র পাথরের পুঁতি, ধাতব মুদ্রা বেরিয়ে আসে। বিশেষ করে লাল মাটিতে এরা লুকিয়ে থাকে, বৃষ্টিপাত হলে পরিষ্কার হয়ে এগুলো চোখে পড়ে তখন স্থানীয় মানুষ এগুলো সংগ্রহ করে। ওই গ্রামে প্রায় সবার বাড়িতে পুঁতির মালা আছে। তারা তজবি হিসেবে এগুলো ব্যবহার করে। এটা কতকাল ধরে চলে আসছে সে ব্যপারে মানুষ জানে না, নিশ্চয়ই অনেক দিন থেকে পাওয়া যায়। কিন্তু প্রথম রিপোর্ট করেন হানিফ পাঠান নামে একজন স্কুলশিক্ষক! উনি পণ্ডিত মানুষ ছিলেন । যে পুঁতি গুলো ওখানে পাওয়া যায়, ওগুলো নিয়ে ওখানে একটা কথা প্রচলিত আছে, হজরত সুলায়মান (আ.) শয়তান তাড়ানোর জন্য নামাজ পড়ার পর পুঁতি দিয়ে শয়তানতে ঢিল দিতেন। কিন্তু হানিফ পাঠান সাহেব বলেছিলেন, এই জিনিসগুলো আসলে তা না। এগুলো হয়তো মানবসভ্যতার চিহ্ন। কোনো মানুষ এগুলো ব্যবহার করেছেন কিংবা তৈরি করেছেন। তার জানার ইচ্ছা আর কৌতূহল থেকেই ব্যাপারটা ধরতে পেরেছেন। তিনি প্রথম রিপোর্ট করেন ১৯৩৩ সালে। এরপর ১৯৫৫ সালের দিকে আরেক স্কুলশিক্ষক তাঁর ছেলে হাবিবুল্লা পাঠান বাবার দায়িত্বটা নিজের কাঁধে নেন এবং তিনি খোঁজেন, লেখেন এবং সংগ্রহ করেন, এভাবেই চলছে।
১৯৭০ সালে ঢাকা জাদুঘরের পরিচালক, প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তরের পরিচালক, সংস্কৃতি সচিব ও বড় বড় লোকজন যাঁরা এ খাতে নেতৃত্ব দেন, তাঁরা স্থানটি পরিদর্শন করেন। প্রত্নতত্ত্ব কিন্তু এসি গাড়িতে গেলে হয় না। তাঁরা তো আর কাজ করেন না, অর্ডার দেন মাত্র। আমার শিক্ষক, ক্যামব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক দিলীপ কুমার চক্রবর্তী বলতেন, প্রত্নস্থান আবিষ্কার করতে হলে শরীরে মাটি লাগাতে হয়, মাটিতে বসতে হয়, হামাগুড়ি দিতে হয়। আমাকে জাহাঙ্গীরনগর বিশ^বিদ্যালয়ে এই স্যার পড়িয়েছেন। স্যার বলতেন বাবা তুমি যাও উয়ারী-বটেশ্বরে, ওই জায়গার মাটি গায়ে লাগাও দেখবে উয়ারী-বটেশ্বর কথা বলছে। আর বড় বড় লোকজন যাঁরা গেলেন পরিদর্শনে, তাঁরা পরবর্তী সময়ে আর যাননি। তখন শো-আপ করতে গিয়েছিলেন, দায়িত্ব পালন করতে গিয়েছিলেন! আমার বইতে লিখেছি বড় বড় লোকজন যাঁরা গিয়েছিলেন বিষয়টিতে তাঁরা তেমন মনোযোগ দেননি। আসলে এখন বুঝি, মনোযোগ শব্দটি পরিবর্তন করব। আসল ঘটনা বের করতে হলে আসল কথাটি বলতে হবে। তাঁরা আসলে ব্যাপারটি বুঝতেই পারেননি। তাঁদের বোঝার ক্ষমতাও ছিল না। কথাটা তাঁদের জন্য অপমানজনক হলেও বলতে হবে। সরকারের অর্থ নষ্ট করে যদি দক্ষতার সঙ্গে কাজ করতে না পারেন, তাহলে তো আমি বলতেই পারি আপনার বোঝার সক্ষমতা নেই। ১৯৮৮ সালে আমার শিক্ষক দিলীপ কুমার চক্রবর্তী উয়ারী-বটেশ্বরে প্রথম যান। স্যার ১৯৯২ সালে একটা বই লেখেন ‘Ancient Bangladesh’ নামে। আমাদের ইতিহাস নিয়ে খুব কম বই আছে। দুই-একটা বই আছে ধরেন আর্ট, পেইন্টিংয়ের ওপর। কিন্তু একটা বই দরকার, যেখানে সব আছে। ইউরোপ বা আমেরিকার কিন্তু বাংলাদেশকে জানার জন্য আলাদা আলাদা বই পড়বে না। তারা এমন একটা বই পড়তে চাইবে, যেটা পড়লে সমগ্র বাংলাদেশ সম্পর্কে জানা যাবে। আবার যাঁরা বিশেষজ্ঞ তাঁরা দুই-চারজন পড়তে চাইবে। কিন্তু স্যারের ‘এনসেন্ট বাংলাদেশ’ সারা পৃথিবী পড়ে। বাংলাদেশ সম্পর্কে একটা পুরো ধারণা দেওয়া আছে বইটিতে। এই কাজটিই বাংলাদেশের কোনো পণ্ডিত করেননি! এখন ওই বইতে স্যার লিখলেন উয়ারী-বটেশ্বর ২২০০ বছরের পুরোনো। উয়ারী-বটেশ্বরের সঙ্গে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া এবং ভূ-মধ্যসাগর অঞ্চলের বাণিজ্যিক সম্পর্ক ছিল। তখন আমি স্যারের কাছে জানতে চাইলাম আপনি কিসের ভিত্তিতে বলছেন এটি। স্যার বললেন, বাবা, আমি তো অল্প স্বল্প জিনিস পেয়েছি, তার ভিত্তিতে বলছি আর তুমি তো প্রমাণ করেই দিচ্ছ। কাজ করো, আরও বেরিয়ে আসবে। আমি ১৯৯৬ সাল থেকে উয়ারী-বটেশ্বর যাওয়া শুরু করলাম, নামমাত্র। ২০০০ সাল থেকে আনুষ্ঠানিকভাবে যাই। গিয়ে জরিপ এবং উৎখননকাজ শুরু করলাম যা এখনো অব্যাহত আছে। সার্বিকভাবে আমরা বলতে পারি, প্রত্নস্থান অনুসন্ধানেও মিলছে, ঘটনাচক্রেও মিলছে।
এসব প্রত্নস্থানের সংস্কার ও রক্ষণাবেক্ষণ ঠিকভাবে হচ্ছে কি?
প্রত্নস্থান আবিষ্কার এবং গবেষণার থেকেও বড় চ্যালেঞ্জ হলো বৈজ্ঞানিকভাবে তা সংরক্ষণ। সেটি আমাদের দেশে হয়নি বললেই চলে! এটার জন্য পেশাদার, দক্ষ সংরক্ষণবিদ ও প্রত্নতত্ত্ববিদ দরকার এবং এর সঙ্গে অর্থও একটা বড় চ্যালেঞ্জ। আপনি যদি পাহাড়পুর যান, দেখবেন যাচ্ছেতাই অবস্থা। এটা তো বিশ্বঐতিহ্য। সব কক্ষ দেখবেন সমান উচ্চতার, নতুন ইট, একবারে ভাটার ইট এবং ইটের মধ্যে যে নাম এবিসিডি (ABCD) লেখা বা কোম্পানির নাম লেখাসহ। এই বর্ণমালাগুলো যে উল্টিয়ে দেওয়া যায়, সেটাও খেয়াল করেনি। তাহলে আপনি সংরক্ষণের জন্য চিন্তা করেন কোন জিনিস? পাহাড়পুরে যে তিন হাজারের বেশি টেরাকোটা পাওয়া যায়, সেগুলো এখনো আছে। এগুলোর সঙ্গে আমাদের সামাজিক বিষয় আছে, ইতিহাস আছে, অনেক বিষয় জড়িয়ে আছে কিন্তু। শুধু টেরাকোটা মানে টেরাকোটা না। টেরাকোটার গুলোতে দেখবেন নম্বর দেওয়া আছে। এগুলো গায়ের মধ্যে লেখা! অধিদপ্তরের ভিন্ন একটা প্রজেক্ট হলো তারা বলল টেরাকোটার গুলো আবার গোনার দরকার আছে। তাহলে উপায় কী, আগের নম্বরগুলো তো বাংলায় লেখা, এবার ইংরেজিতে লেখো। তখন বাংলায় লেখাটা সাদা রং দিয়ে ঢেকে দিয়ে ইংরেজি লেখাটা কালো রং দিয়ে লিখল! প্রত্নবস্তুর গায়ে কখনো লিখতে হয় না। যদি লিখতেই হয় তবে ট্যাগ ব্যবহার করে বা এমন জায়গায় লেখতে হয় যেখানে সহজে চোখ যায় না। এগুলো বললাম মিনিমাম বিষয়, আরও আছে ।
হাজার বছর বা আরো পুরোনো যে ইটের ঘরবাড়ি পাই এগুলো তার মর্টার কিন্তু কাদামাটি। কিন্তু সংরক্ষণের পর সবগুলো মর্টার দেখতে পাই লাইম সুরকি দেওয়া। এগুলো নিঃসন্দেহে সংরক্ষণের ত্রুটি। অনেক জায়গায় তারা সিমেন্টও দিয়েছে। উৎখনন করে পেয়েছে ধরেন দুই ফুট দেয়াল, সেখানে বানিয়ে রাখছে পাঁচ ফুট দেয়াল। পাহাড়পুরে গেলে দেখা যাবে এগুলো। সবগুলোই রি-কনস্ট্রাকশন করা। কিন্তু সংরক্ষণ পদ্ধতি হলো কিছু জিনিস একই রকম রাখতে হয়, দেখাতে হয়।
ঢাকাকে তো মসজিদের শহর বলা হয়। কিন্তু ঢাকা কেন মসজিদের শহর? মসজিদ আছে তাই। এখানে আছে সুলতানি, মোগল ও ব্রিটিশ যুগের মসজিদ। কিন্তু সংস্কৃতি মন্ত্রণালয়ের কাছে এগুলোর কোনো তথ্য-প্রমাণ আছে বলে আমি শুনিনি। কতগুলো মসজিদ ওই সময়ের তাও বলতে পারবে না। আগে তো একটা জরিপ করতে হবে, তারপর ঠিক করতে হবে কোনটা কোনটা সংরক্ষণ করব। দুই ধরনের সংরক্ষণ করতে হয়। তার মধ্যে একটা হলো প্রটেকটিভ মনুমেন্ট, ধরেন ৫০০ মসজিদ আছে, সবগুলোই যদি সুলতানি বা মোগল যুগের হয়, তখন সবগুলোই প্রটেকটিভ ঘোষণা করবে। কারণ, ১০০ বছরের পুরোনো যদি কোনো স্থাপত্য বা প্রত্নবস্তু হয়, যার ঐতিহাসিক এবং নান্দনিক মূল্য আছে, তখন সেটা সংরক্ষণ করবে সরকার। আর মোগল যুগ তো ১০০ বছরের বেশি, সুলতানি যুগ আরও বেশি। এখন তাঁরাই যদি না জানেন কতগুলো মসজিদ আছে, তাহলে কীভাবে সংরক্ষণ করবে। যাঁরা এই দায়িত্ব পালন করেন, তাঁদের অফিস তো ঢাকাতেই, সেই ঢাকায় কতগুলো ঐতিহাসিক মনুমেন্ট সেই খবরই তাঁদের কাছে নেই!
প্রতিনিয়ত আবিষ্কৃত এসব প্রত্নতত্ত্ব গবেষণা থেকে যেসব তথ্য পাওয়া যাচ্ছে, তা থেকে কি এ দেশের ইতিহাস নতুন করে লিখতে হবে বা লেখার প্রয়োজন আছে?
সবকিছু মিলিয়ে আমাদের নতুন করে ইতিহাস লেখার প্রয়োজন অবশ্যই আছে। গবেষণায় যদি দেখেন আমাদের মহাস্থানগড় আবিষ্কার হলো ১৮৭৯ সালে আর আমি পিএইচডি করলাম ১৯৯৯ সালে। মাঝখানে কোনো পিএইচডি হয়নি! একটা প্রত্নস্থান নিয়ে একাধিক পিএইচডি হওয়ার কথা। আমি ভারতে পিএইচডির সময় যে প্রত্নস্থান উৎখনন করেছি তখন ওই স্থানের ওপর চার-পাঁচটা পিএইচডি হচ্ছিল। উৎখননকাজ শেষ হতে হতে গবেষণাও একটা পর্যায়ে দাঁড়িয়ে যায়। আমাদের কোথাও ময়নামতি, পাহাড়পুর ও মহাস্থানগড়েরর ওপর পিএইচডি হয়েছে? গবেষণা যাকে বলে, সেটা তো হয়নি। যারা করেছে নিজ উদ্যোগে। মহাস্থানগড়ের ওপর আমার পিএইচডিটা হয়েছে আবিষ্কারের ১০০ বছর পরে। আমার গবেষণায় আমি দেখিয়েছি মহাস্থানগড়ের যে জায়গাগুলোতে প্রত্নস্থান আবিষ্কৃত হয়েছে, সেখানে ভূমির গঠন, পরিবেশ একটা বিরাট ভূমিকা পালন করেছে। এগুলো কেমন করে, ওখানে লালমাটি উঁচু নিচু (রিজেস এবং ভ্যালিস)। রিজেস হলো বসতি আর ভ্যালিস হলো চাষাবাদ যোগ্য। এখন এটা তো ইতিহাসের নতুন মাত্রা। আপনি যদি বন্যার কথা বলেন, ওই সময় তো বন্যা ছিল। তারা বন্যাকে চিহ্নিত করেছে। কী বুদ্ধিই না দেখিয়েছে! এটা কি বাঙালিদের মেধা না? এটা কি ইতিহাসের নতুন যোগ না? কিন্তু আমাদের যাঁরা ইতিহাস চর্চা করেন, আমি দেখেছি এই লাইনে খুব কম গবেষক চিন্তা করেন । ইতিহাস কিন্তু নতুন করে লেখা শুরু হয়ে গেছে। আগে ছিল হিস্ট্রি অব ইন্ডিয়া, ক্যামব্রিজ আর এখন করেছে হিস্ট্রি অব বাংলাদেশ, ক্যামব্রিজ। এখানে উয়ারী-বটেশ্বর দিয়ে শুরু হয়েছে। আন্তর্জাতিক স্বীকৃতিতে এগুলো প্রাপ্ত। পাঠ্যপুস্তকে উয়ারী-বটেশ্বরের কথা এসেছে।
বিক্রমপুর একটি প্রাচীন নগর, যার অনেক অংশ পদ্মায় বিলীন হয়েছে, নদীগর্ভে বিলীনকৃত পুরাকীর্তি বিষয়ে আমাদের গবেষণা কতটুকু? যদি না থাকে এসব প্রত্নসম্পদ নিয়ে গবেষণা ও উদ্ধারের ব্যপারে আপনাদের কোন উদ্যোগ আছে কি না?
বিক্রমপুরের প্রত্নসম্পদ পদ্মায় বিলীন হয়েছে এটা একটা মিথ। এটা যাঁরা তৈরি করেছেন, তাঁরা না জেনে তৈরি করেছে। যাঁরা লিখেছেন, না জেনে লিখেছেন। বিশেষ করে বাংলাদেশের অন্যতম ইতিহাসবিদ, গবেষক বিক্রমপুরেরই মানুষ। তাঁর বইয়ে দেখেছি বিক্রমপুরের পুরাকীর্তি পদ্মায় গেছে। কিন্তু আমার বিশ্বাস বিক্রমপুরের যে জায়গাটায় প্রাচীন বসতি ছিল, সেই স্থানটি তিনি পরিদর্শন করেননি! নদী থাকলে কীর্তি ধ্বংস হবেই। কিন্তু যেটা ধ্বংস হয়ে গেছে সেটা তো আমরা জানি না, যেটা আছে সেটাও কি আমরা খুঁজেছি? যদি না খুঁজি তাহলে কেমন করে বলব যে পদ্মা নিয়ে গেছে। একবারেই যদি না পাই কিছু তখন বলতে পারি। আমাদের দেশের অনেকেই কথা বলেন অযৌক্তিক। শুধু নিজের চেয়ারের পরিচয়ে কথা বলেন। না জেনে এবং একটি কাজ করে ওটাকে ফুলিয়ে ফাঁপিয়ে বলা গবেষণার একধরনের অসততা। এটা করে মনোরঞ্জন হতে পারে কিন্তু দেশের কোনো উপকার হয় না, ক্ষতি ছাড়া। বিক্রমপুর চন্দ্র, বমর্ণ এবং সেনের রাজধানী, অতীশ দীপঙ্করের জন্মভূমি। ২০০৫ সালে আমি প্রথম যাই ওই এলাকায় যাই, এশিয়াটিক সোসাইটির বই লেখার সময়। তখন আমার কাছে মনে হয়েছে এটা খুব সমৃদ্ধ জায়গা, এখানে কিছু একটা আছে। প্রত্নবস্তুর ক্লুগুলো এখন পাচ্ছি এখানে। সুলতানী যুগের মসজিদ, মোগল যুগের ইদ্রাকপুর দুর্গ আছে বিক্রমপুরে। ড. নূহ-উল-আলমের আমন্ত্রণে আমরা ২০১১ সালে বিক্রমপুরে প্রত্নতাত্ত্বিক জরিপ ও খনন শুরু করি । নয়টি স্থান নির্বাচন করে কাজ শুরু করি, নয়টিতেই প্রাচীন বসতির চিহ্ন পাই। ২০১২ সালে একটা বৌদ্ধবিহারের সন্ধান পাই। সেখানে দুই বছর কাজ করে সাতটি ভিক্ষু কক্ষ আবিষ্কার করেছি। আমাদের কাছে মনে হয়েছে বিক্রমপুরের রঘুরামপুর, সুখবাসপুর, রামপাল ও পঞ্চসারে প্রাচীন বসতি আছে। আর যে ভিক্ষু কক্ষগুলো আবিষ্কার করলাম ওটার অ্যালামনাই দেখে মনে হয়, হতে পারে এটা পাহাড়পুর (সোমপুর মহাবিহার) থেকেও বড়। ওখানে একাধিক বৌদ্ধ বিহার থাকতে পারে।
প্রত্নস্থানের খনন কাজে কী ধরনের সাবধানতা অবলম্বন জরুরি, আমাদের দেশে খননকালে সেসব সাবধানতা মেনে কাজ করা হচ্ছে কি?
উৎখনন অবশ্যই একটা বিশেষ টেকনিক, উৎখনন মানে যেটা হয়ে গেল সেটা আর ফিরে পাওয়া যাবে না। অতএব সেই জিনিসটি যত্নসহকারে নিয়মনীতি মেনে করতে হয় এবং আমরা সেটা করি। এখানে প্রচুর সাবধানতা অবলম্বন করতে হয়। মনে করেন উৎখনন শুরু করলেন গাইতি দিয়ে। কোনো একটা ফিচার পেয়ে গেলে গাইতি আর ব্যবহার করতে পারবেন না। তখন কর্নি ব্যবহার করতে হবে। কোনো কেনো সময় কর্নিও ব্যবহার করা যাবে না, ব্রাশ ব্যবহার করতে হবে। এখন যদি চিন্তা করেন শুধু ব্রাশ দিয়ে কাজ করবেন তাহলে তো হবে না। আপনাকে ব্রাশও চালাতে হবে, কর্নিও, গাইতি এবং কোদালও চালাতে হবে। যখন যেটা প্রয়োজন সেটাই ব্যবহার করতে হবে। অবস্থা বুঝে ব্যবস্থা নিতে হবে। সে জন্য উৎখননে অভিজ্ঞতা এবং দক্ষতার খুব প্রয়োজন।
প্রত্নস্থান সন্ধান ও খননের সুবিধার্থে অনেক আধুনিক প্রযুক্তি ও যন্ত্রপাতি উদ্ভাবিত হয়েছে, আমাদের দেশে সেগুলো কি আছে বা ব্যবহার করা হচ্ছে?
চীনে আমরা দেখলাম ওরা প্রত্নস্থান থেকে কিছু পেলে ল্যাবরেটরিতে চলে যায় ট্রিটমেন্ট করতে। যার যেমন সামর্থ্য-দক্ষতা আছে, তাদের কাজটাও ঠিক ওই রকমই হয়। উৎখননের জন্য আমাদের দেশে পর্যাপ্ত যন্ত্রপাতি আছে। আর সব তো বাংলাদেশে তৈরি হয় না বাইরে থেকেও কিছু আনতে হয়। আমরা যারা কাজ করি, সবাই বেশ দক্ষ। যেমন উয়ারী-বটেশ্বরে আমরা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক ছাত্রছাত্রীরা মিলে কাজ করি এবং শিক্ষার্থীরা তাঁদের পরীক্ষার অংশ হিসেবে কাজ করছে। তা ছাড়া আমরা কাজ করার সময় ভূ-তত্ত্ব অধিদপ্তর, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভূ-তত্ত্ব বিভাগ ও জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের ভূগোল ও পরিবেশবিজ্ঞান বিভাগের শিক্ষকদের সাহায্য নিয়েছি। প্রত্নতত্ত্ব হলো মাল্টি ডিসিপ্লিন, প্রত্নতাত্ত্বিক একা কাজ করতে পারে না। তাদের সঙ্গে অন্য বিশেষজ্ঞ থাকাটা জরুরি।
খনন একটি সময় ও ব্যয়সাপেক্ষ ব্যাপার, খননকাজে আপনাকে কী কী প্রতিবন্ধকতা ও কী ধরনের বাধার সম্মুখীন হতে হয়?
এখানে আর্থিক বিষয়ই বড় প্রতিবন্ধকতা। আর সহযোগিতার কথা যদি বলেন, ওই ধরনের সহযোগিতা প্রথম দিকে পাইনি। এই কাজগুলোতে সহযোগিতা করার লোক কম। তবে পরে যে পাইনি তা বলা যাবে না। অনেকেই এগিয়ে এসেছেন, ব্যক্তিগতভাবে সহযোগিতা করেছেন, প্রাতিষ্ঠানিকভাবে এগিয়ে এসেছেন। যদিও সেটা অপ্রতুল। এটা তো একটা বিশেষ ধরনের কাজ, বিশেষ ধরনের খরচ, প্রচলিত খরচের সঙ্গে মেলালে তো চলবে না। সেটা অনেকে বুঝতেই চান না। অনেকে খুবই সন্দেহ করেন, যা আমাদের জন্য অসম্মানের। একবার অর্থ মন্ত্রণালয়ের একজন অতিরিক্ত সচিব মিটিংয়ের মধ্যে আমাকে বললেন, আপনারা দিনে কত বর্গমিটার মাটি কাটবেন? আমি বললাম, পাঁচ দিনে এক সেন্টিমিটার আবার এক দিনে পাঁচ সেন্টিমিটার। তখন তিনি খুবই রাগান্বিত হয়েছিলেন, বলেছিলেন আমি আপনাকে বোঝাতে পারছি না, আমি বললাম আমি আপনাকে বোঝানোর চেষ্টা করছি। এগুলোর মুখোমুখি হতেই হয়। আমাদের এই কাজগুলোতে ফান্ডিংটা যদি আরও শক্তিশালী হয় তাহলে উয়ারী-বটেশ্বর ও বিক্রমপুরে আরও অনেক কাজ করা সম্ভব।
দেশের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে প্রত্নতত্ত্ববিষয়ক পড়ালেখার সুযোগ কতটুকু? কেন বিশ্ববিদ্যালয়গুলো এ বিষয়ে ডিপার্টমেন্ট খুলছে না?
আমাদের দেশে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে এই বিষয়ে প্রথম বিভাগ খোলা হয়। তারপরে কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ে খোলা হলো। আমার মনে হয়েছে আরও কিছু বিশ্ববিদ্যালয়ে এই বিভাগ খোলা প্রয়োজন। অনেক বিশ্ববিদ্যালয়েই এই বিভাগটি না থাকার কারণ হিসেবে আমার যেটি মনে হয়েছে, বিশ্ববিদ্যালয়ের যারা নীতিনির্ধারক তাঁদের মধ্যে এই বোধটা কম। নীতিনির্ধারকেরা রাজনীতি নিয়ে ব্যস্ত থাকার কারণে এই দিকগুলোতে তেমন সময় দিতে পারেন না। বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্যগণ তো নীতিনির্ধারকদের প্রধান, তাঁরা নিজেরাই যদি ভালো গবেষক না হন, উচ্চশিক্ষা যদি কম থাকে তাহলে কোনটি হলে দেশের মঙ্গল হবে সেটি চিন্তা করার সুযোগ থাকে না।
বিশ্ববিদ্যালয় থেকে প্রত্নতত্ত্ব বিষয় নিয়ে উত্তীর্ণ শিক্ষার্থীরা কি আশানুরূপ কাজের সুযোগ পাচ্ছে? না পেলে কীভাবে তা বাড়ানো যায়?
শিক্ষার্থীরা আশানুরূপ কাজের সুযোগ পাচ্ছেন না। যাঁরা সুযোগগুলো দেবেন তাঁরা বুঝতে পারছেন না, কোন কাজে কাকে ব্যবহার করতে হবে। যার ফলে শিক্ষার্থীরা সরাসরি সুযোগগুলো নিতে পারছেন না। প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তর এবং আমাদের দেশে যতগুলো জাদুঘর আছে, সবখানেই এঁদের চাকরির সুযোগ আছে। প্রত্নতত্ত্ব ছাড়াও আমরা জাদুঘরবিষয়ক পড়াশোনা করাই। অধিকাংশ জাদুঘর চালানোর জন্য সঠিক ব্যক্তি হলেন একজন প্রত্নতত্ত্ববিদ। এ ছাড়াও কলেজগুলোতে যদি প্রত্নতত্ত্ববিদদের শিক্ষকতা করানোর সুযোগ দেওয়া হয়, প্রাচীন ইতিহাস পড়ানোর জন্য, সেখানেও এঁরা ভালো করবেন বলে আমার বিশ্বাস।
প্রত্নতত্ত্ব বিষয়ে গবেষণা, অনুসন্ধান, খনন, রক্ষণাবেক্ষণ ও আধুনিকায়নের কাজে সরকারি সহযোগিতা কতটা পান? এ ক্ষেত্রে সরকারের করণীয় কী?
সরকারি সহযোগিতা যেটা পাচ্ছি সেটা এই সরকার আসার পর থেকে, দুই-একজন আমলা-মন্ত্রীর কারণে। অধিকাংশ মন্ত্রী এবং আমলা আমাদের সাহায্য করতে চান না। আমরা জোর করে সহযোগিতা আদায় করি। এর জন্য হৃদয়ে অনেক রক্তক্ষরণ হয়। তবে সরকারের নীতিনির্ধারক মহলের আরও আন্তরিক হওয়া উচিত আমাদের প্রতি। তাঁরা যদি মনে করেন এই কাজটি হলে দেশের ইতিহাস সমৃদ্ধ হবে, পর্যটনশিল্প বিকাশলাভ করবে, বাঙালির পরিচয়ের যে স্বল্পতা তা মিটবে অনেকটা। এগুলো যদি তাঁরা বুঝতে পারেন, তখন তাঁদের পক্ষে ইতিবাচক সাড়া দেওয়া সম্ভব।
দেশের প্রত্নতত্ত্ব বিভাগের সঙ্গে আপনাদের সমন্বয় আছে কী? তাদের কর্মকাণ্ড সম্পর্কে আপনার মূল্যায়ন?
আমাদের কাজের সঙ্গে সমন্বয় বলতে আমরা তাদের সঙ্গে একটি চুক্তি করেছি। সেই চুক্তি অনুযায়ী আমরা কাজ করার চেষ্টা করছি। এটুকু সমন্বয় আমাদের মাঝে আছে। কাজ শেষ করে যে ফরমালিটিগুলো মানতে হয় সেগুলো আমরা করি। এক কথায় বললে বলব সংস্কৃতি বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের অধিনে প্রত্নতত্ত্ব বিভাগে দক্ষ জনশক্তির খুব অভাব ! যেটা বলতে চাই দক্ষতা, অভিজ্ঞতা ও পেশাদারিত্ব ছাড়া ওই বিভাগ চলছে না।
পর্যটনশিল্পের বিকাশে ঐতিহ্যবাহী এসব দেশের প্রত্নতত্ত্ব ও পুরোনো স্থাপনা সংরক্ষণের গুরুত্ব সম্পর্কে কিছু বলুন? কী ধরনের অবদান রাখবে বলে আপনি মনে করেন?
প্রথমেই বৈজ্ঞানিক প্রক্রিয়ায় আমাদের প্রত্নসম্পদগুলো সংরক্ষণ করতে হবে। বৈজ্ঞানিক প্রক্রিয়ায় সংরক্ষণ হলে পর্যটনশিল্পে বাংলাদেশের উয়ারী-বটেশ্বর এবং বিক্রমপুর অনেক বড় ভূমিকা রাখবে। কারণ, উয়ারী-বটেশ্বর বাংলাদেশের প্রাচীনতম নগর, বাংলাদেশের প্রথম রাজ্য। সেই রাজ্যের রাজধানী, নদীবন্দর। এর সঙ্গে আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের সম্পর্ক ছিল। এটা একটা শিল্পাঞ্চল ছিল। উয়ারী-বটেশ্বর যে কী, সেটা এই মুহূর্তে বলে শেষ করা যাবে না। কারণ, ওখানকার কাজ এখনো হাজার ভাগের এক ভাগও শেষ হয়নি।
পাহাড়পুর, ময়নামতি, মহাস্থানগড়ের মতো ঐতিহ্যবাহী স্থানগুলোকে কীভাবে আরও পর্যটনবান্ধব করা যায়?
পর্যটনবান্ধব করতে হলে আগে উৎখননকাজ শেষ করে সংরক্ষণ করতে হবে। উৎখনন চলমান অবস্থায় সংরক্ষণ শুরু করা সঠিক নয়। এটা ভুল কাজ। আমাদের পাহাড়পুর নিয়ে কোটি কোটি ডলার এসেছে। কাজ করতে গিয়ে অনেক ক্ষতি হয়েছে। একটা উদাহরণ দিই- বাগেরহাট ষাটগম্বুজে ষাটটি পিলার আছে, সবগুলোই পাথরের। অধিদপ্তর সিদ্ধান্ত নিল পিলারগুলো দুর্বল হয়ে গেছে, এগুলোকে শক্তিশালী করতে হবে। ইট দিয়ে ড্রেসিং করে সিমেন্ট দিয়ে প্লাস্টার করে দিল। স্থাপত্যেও আদি বৈশিষ্ট্য নষ্ট হয়ে গেলো! পর্যটনবান্ধব করতে হলে এই ভুলগুলো আমাদের শুধরে নিতে হবে।
আমাদের অর্থনীতিতে এসব পুরাকীর্তি ও স্থাপনা কী রকম ভূমিকা রাখতে পারে বলে মনে করেন?
দারুণ ভূমিকা রাখতে পারে। কারণ, বাংলাদেশ প্রাচীন ঐতিহ্যে সমৃদ্ধ এক জনপদ। প্রাগৈতিহাসিক যুগ থেকে শুরু করে ঔপনিবেশিক যুগের সব ঐতিহ্য এখানে আছে। এই যে পুরাকীর্তিগুলো, এগুলো পর্যটকদের আকর্ষণ করে। সেই আকর্ষণটা তৈরি করতে পারলে যে কী ধরনের পরিবর্তন হতে পাওে তা ভাবাই যায় না।
আপনাকে ধন্যবাদ
তোমাকে ও বন্ধনকেও ধন্যবাদ!
প্রকাশকাল: বন্ধন, ৮৩তম সংখ্যা, মার্চ ২০১৭।