প্রকৃতিঘেরা তেরাদল কমিউনিটি মসজিদ

তেরাদল গ্রামটি সিলেটের বিয়ানীবাজার উপজেলার নদীঘেঁষা নৈসর্গিক এক গ্রাম। প্রবাসী গ্রাম হিসেবে যা সুপরিচিত। প্রকৃতির মায়ায় ঘেরা গ্রামটির অনন্য এক স্থাপনা তেরাদল কমিউনিটি মসজিদ। খুবই সাধারণ, বাহুল্যবর্জিত ও ব্যতিক্রমী নান্দনিক এই মসজিদটির স্থাপত্যশৈলী গ্রামের সাধারণ মানুষকে দারুণভাবে প্রভাবিত করছে। আর এই স্থাপনাটির রূপকার তরুণ স্থপতি জিষ্ণু কুমার দাস স্বাধীন।

স্থপতির নামটি শুনেই হয়তো চোখ কপালে উঠতে পারে, যেমনটি উঠেছিল তেরাদল গ্রামবাসীর। একজন হিন্দু কেন মসজিদ ডিজাইন করবে? এমন আপত্তির মুখেই কাজ শুরু করতে হয় জিষ্ণু কুমারকে, যা ছিল তাঁর জন্য রীতিমত চ্যালেঞ্জিং। তবে এ ক্ষেত্রে তিনি অসামান্য সহযোগিতা পান তেরাদল কমিউনিটি মসজিদের মূল ক্লায়েন্ট মোহাম্মদ তোফায়েল আহমদ চৌধুরী লিমনের কাছ থেকে। স্থপতির প্রাথমিক চ্যালেঞ্জের ধাক্কাগুলো তিনিই সামলেছিলেন। তিনি গ্রামের সবাইকে বোঝালেন, ‘আমাদের যখন শরীর খারাপ হয় তখন আমরা ডাক্তারের কাছে যাই। তাঁর ধর্ম কী, সেটা চিন্তা করি না। একজন হিন্দু ডাক্তার যদি একজন মুসলমানের চিকিৎসা করতে পারে, তাহলে একজন হিন্দু স্থপতি কেন একটি মসজিদের ডিজাইন করতে পারবে না?’ গ্রামবাসীও এই যৌক্তিকতা বুঝতে পেরে আর কোনো আপত্তি করেনি।

সমস্যার শেষ এখানেই নয়। ডিজাইন নিয়েও বাধে বিপত্তি। মসজিদের কিবলা নির্ধারণে দেখা দেয় নতুন সমস্যা। ডিজিটাল কম্পাসে ২৭৭ ডিগ্রি নর্থ হচ্ছে বাংলাদেশের কিবলা ডিরেকশন। আগে এনালগ কম্পাসে করা হতো বলে ২৭০ ডিগ্রি নর্থে ছিল, যা বাংলাদেশের কিবলা ডিরেকশন নয়। কিবলা যখন পুরোনো মসজিদ থেকে একটু বেঁকে গেল তখনই সবাই ঘোর আপত্তি জানাল। এ ক্ষেত্রেও মসজিদের নির্মাতা মোহাম্মদ তোফায়েল আহমদ আন্তর্জাতিক ওয়েবসাইটের রেফারেন্স দিয়ে সবাইকে বোঝাতে সমর্থ হন। এ ধরনের নানা প্রতিবন্ধকতা মোকাবিলা করেই কাজ করতে হয়েছে স্থপতিকে।

সমকালীন অনেক স্থপতির মনে হতে পারে, ইসলামিক আর্কিটেকচারের সিম্বলগুলোকে বাদ দিয়ে ডিজাইন করা উচিত। এখন পোস্টমর্ডানিজম চলছে কি না! কিন্তু স্থপতি দাস তা করেননি। যখন তিনি লক্ষ করলেন মসজিদকে ঘিরে রয়েছে গ্রামবাসীর প্রচণ্ড আবেগ ও অনুভূতি। আর সে অনুভূতিকে প্রাধান্য দিয়ে তিনি মসজিদটিকে একটি বিশেষ রূপে গ্রামবাসীর কাছে তুলে ধরতে আগ্রহী হলেন। তিনি চেষ্টা করেছেন স্থাপনায় প্রকৃতিকে ধারণ করতে এবং নির্মাণে কোনো ধরনের বাহুল্য না রাখতে। নির্মাণকাজ শুরুর আগেই স্থপতিকে যেসব বিষয় গুরুত্বসহকারে বিবেচনা করতে হলো, তা হচ্ছে প্রত্যন্ত গ্রাম হিসেবে রিসোর্স (উপাদান, কারিগর) পর্যাপ্ত আছে কি না। দেয়ালে টাইলসের পরিবর্তে কাদামাটিতে তৈরি ইট (Exposed Brick) ব্যবহারের উপযোগী কি না। তিনি নিজেই ইট ভাটায় গিয়ে নিশ্চিত হলেন যেটা চাইছেন সেটা আছে কি না এবং মিস্ত্রির সঙ্গে কথা বলে এই মর্মে সন্তুষ্ট হলেন, তারা পারবে ওই ইট দিয়ে মসজিদের কাজ করতে। যদিও তিনি জানতেন, আগে যে গ্রামের মানুষেরা জল-হাওয়া নিয়ে গর্ববোধ করত, তারাই এখন টাইলস, এয়ারকন্ডিশনার পছন্দ করে। এই গ্রামবাসীও তা-ই চেয়েছিল। কিন্তু স্থপতি ছিলেন দৃঢ়চেতা। তিনি ইট ব্যবহার করে স্থাপনার প্যাটার্ন কিছুটা পরিবর্তন করে গ্রামবাসীর সামনে তুলে ধরলেন, যা সবারই ভালো লাগল।

নির্মাণের শুরু থেকেই ব্যতিক্রমী এই স্থাপত্যরীতির মসজিদটি সবার আগ্রহের কেন্দ্রবিন্দু হয়ে ওঠে। মসজিদের বিশেষ ধরনের ডোমের ভেতর দিয়ে আলোর অবাধ প্রবেশ, প্রশস্ত আর্চ, ইসলামিক প্যাটার্নের স্কিনগুলোকে ইট দিয়ে তৈরি করে দেশীয় ধাঁচে বানানো প্রভৃতি বেশ কৌতূহলোদ্দীপক। তবে স্থপতি গ্রামবাসীকে ডিজাইন সম্পর্কে পুরো ধারণা প্রথমেই না দিয়ে কাজ শুরুর পর আস্তে আস্তে বুঝিয়েছেন। এ জন্য কোনো ওয়ার্কিং ড্রয়িংও দেননি তিনি। যেমন, ডোম নির্মাণের পর গ্রামবাসী অর্ধ ডোম নিয়ে প্রশ্ন তোলে; ডোম কেন কাটা? স্থপতি প্রথমে আশ্বাস দিলেন পরে পুরোটা করা হবে, এখন অর্ধেক করা হচ্ছে। কিন্তু সাটারিং করার সময় ভেতরে লাইট আসছে দেখে সবাই মহা খুশি। তখন তারা কাটা ডোম মেনে নেন। এ ছাড়া মিহরাবের দুই পাশে ছাদ কাটার বিষয়টিও সূর্য ডোবার ৩ মিনিট পরে মোবাইলে ছবি তুলে সবাইকে দেখিয়ে বুঝিয়েছিলেন তিনি। গ্রামবাসীকে তিনি আশ্বস্ত করতে সমর্থ হন মসজিদ ডিজাইনে ব্যত্যয় হলে মনোযোগসহকারে নামাজ আদায়ও করা যাবে না। স্থপতি দাস নিজে প্রতি সপ্তাহে একবার করে সাইটে গিয়ে চলতি কাজ বুঝে নিতেন এবং পরবর্তী সপ্তাহের কাজ বুঝিয়ে দিয়ে আসতেন।

মসজিদটি নির্মাণে স্থপতির দর্শন ছিল, স্রষ্টাকে তাঁর সৃষ্টির (আলো, বাতাস, প্রকৃতি) মাধ্যমে ধর্মপ্রাণ মানুষকে অনুভব করানো। তিনি চাননি সুন্দর প্রাকৃতিক পরিবেশে কার্বন তৈরির বাক্স বানানোর মতো অপরাধ করতে। চেয়েছেন এমন একটি স্থাপনা নির্মাণ করতে, যা প্রকৃতির সঙ্গে বন্ধুত্ব স্থাপন করবে, যেখানে প্রবেশ করবে অবাধ আলো-বাতাস। মাত্র তিন হাজার বর্গফুট জায়গায় নির্মিত এ স্থাপনাটি শুদ্ধ স্থাপত্য চর্চার অনন্য এক প্রয়াস। 

স্থপতি জিষ্ণু কুমার দাস স্বাধীনের জন্ম ১৯৮৮ সালের ডিসেম্বরে, সিলেট জেলায়। শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের স্থাপত্য বিভাগ থেকে ২০১২ সালে প্রথম শ্রেণিতে প্রথম স্থান অর্জন করে স্নাতক শেষ করেন। পরে ঢাকায় তানিয়া করিম অ্যান্ড এন আর খান অ্যাসোসিয়েটস নামের একটি প্রতিষ্ঠানে কাজ করেন। এরপর ২০১৫ সালে পাবনা বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের স্থাপত্য বিভাগে প্রভাষক হিসেবে যোগ দেন। ওই বছরেই তিনি প্রতিষ্ঠা করেন নিজস্ব স্থাপত্য ফার্ম নির্মাণিক আর্কিটেক্টস

প্রকাশকাল: বন্ধন, ৮৯তম সংখ্যা, সেপ্টেম্বর ২০১৭।

রাকিবুল আজম রানা
+ posts

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Scroll to Top