একটি প্রতিষ্ঠানের সার্বিক উন্নতি ও সাফল্য নির্ভর করে যোগ্য কর্মী বাহিনীর শতভাগ পেশাদারির ওপর। কর্মীর ওপর কাজের বোঝা চাপিয়ে নয়; বরং সুন্দর, স্বাচ্ছন্দ্যময় কর্মপরিবেশেই নিশ্চিত করে সঠিক কাজের নিশ্চয়তা। দিন কিংবা রাতের অনেকটা সময় কর্মীরা কর্মক্ষেত্রে থাকে। ফলে এর সঙ্গে জড়িয়ে থাকে স্বাস্থ্য সুরক্ষা, নিরাপত্তা, ভবিষ্যৎ সম্ভাবনা সর্বোপরি মানসিক প্রশান্তি। এ জন্য একটি আদর্শ কর্মপরিবেশ নিশ্চিত করা যেকোনো প্রতিষ্ঠানের কর্তাব্যক্তিদের প্রত্যাশিত। ডিমিট্রিস ব্যাটারির নির্বাহী পরিচালক এম এ মালেক এমনি এক কর্মক্ষেত্র রূপদানের রূপকার। নির্ভরতায় পাশে পেয়েছেন দীর্ঘদিনের কর্মসহযোগী ডিজাইনার সাকিল হককে। আগ্রহ, প্রয়োজন, বাজেট আর পরিকল্পিত ধারণাকে সঙ্গী করে ২০১৫ সালের ডিসেম্বরে কাওরান বাজারস্থ ঢাকা ট্রেড সেন্টারের ১২ তলায় যাত্রা শুরু করেন ২৫০০ বর্গফুটের ডিমিট্রিস ব্যাটারি অফিসের। ডিজাইনার সাকিল হক ও তাঁর সহযোগী স্থপতি সুহাস বিশ^াসকে নিয়ে শুরু করেন নিজস্ব প্রতিষ্ঠান ‘ব্ল্যাক এন অরেঞ্জ’-এর কাজ। যাঁদের বিশ^াস, শূন্য থেকে সম্পূর্ণতায় আর কাজের ব্যাপারে স্বাচ্ছন্দ্য ও স্বাধীনতায়।
কমলা রঙের কার্পেটে মোড়ানো অফিসের প্রবেশপথ। কাচের দরজা ঠেলে ঢুকতেই চোখে পড়ে নান্দনিক অভ্যর্থনা কক্ষ। একপাশে ডেস্ক অপর পাশে কালো রঙের নরম আরাম কেদারা। একটু এগিয়ে আরেকটি দরজা দিয়ে ঢুকলেই মূল কর্মপরিসর। পায়ের তলায় আকর্ষণীয় পিভিসি ফ্লোর ম্যাটের ওপরে হেঁটে গেলে অনুভূতি মেলে উডেন ফ্লোরের। সিলিংজুড়ে এলইডি লাইটের কৌশলী ব্যবহারে চোখ পায় প্রশান্তির ছোঁয়া। আড়াই হাজার বর্গফুটের এক্সিকিউটিভ রুম, ম্যানেজার রুম, ডাইনিং রুম, মিনি কনফারেন্স রুম, এস আর এক্সিকিউটিভ রুমের সমন্বয়ে তৈরি অফিসটিতে প্রতিটি রুমেই ভিন্নাকৃতির মানানসই দেশীয় উপকরণে তৈরি ফার্নিচার, পুরো অফিসে সাদা আর গাঢ় মেহগনি রঙের মায়াবী মুগ্ধতা এর সৌন্দর্য বাড়িয়েছে বহুগুণ। ল্যান্ডস্কেপ অর্থাৎ প্রচুর ইনডোর প্লান্টস স্নিগ্ধতা বাড়ানোর পাশাপাশি বজায় রাখে অক্সিজেনের পর্যাপ্ত মাত্রা। লবির কর্নারে রয়েছে আলাদা দুটো জানালা, যা দিয়ে অনায়াসেই আসছে প্রাকৃতিক আলো আর অবারিত বাতাস, রুমগুলো শব্দ নিরোধক হওয়ায় কর্মীর কাজের গোপনীয়তা বজায় থাকার পাশাপাশি মুক্তি মিলছে শব্দদূষণের বিরক্ত থেকেও। কর্মক্ষেত্রটিতে কর্মীর নিজস্ব কাজের জায়গা ছাড়াও হাঁটাচলার জায়গাটি বেশ প্রশস্ত। ফলে নির্বিঘ্নে কাজ করার পাশাপাশি অনায়াসে চলাচলের সুযোগ উপভোগ করা যায় এখানে। অতিরিক্ত ঠান্ডা ও গরমের হাত থেকে রেহাই পেতে লাগানো হয়েছে এয়ার কন্ডিশনার।
এক্সিকিউটিভ রুমে রয়েছে মিনি কনফারেন্স রুম, যেখানে সহজেই প্রয়োজনীয় মিটিং সেরে নেওয়া যায়। রুমটির সৌন্দর্য বাড়াতে কর্নারে রয়েছে গ্লাস পেইন্টিং, যা অফিসটির সার্বিক কর্মকাণ্ডের ফসল, ডিমিট্রিস ব্যাটারির ডিসপ্লে করা আছে লবিতে।
কর্মক্ষেত্রটির লক্ষণীয় দিক স্টোরেজ সিস্টেম। প্রতিটি রুমেই সূক্ষ¥তার সঙ্গে স্টোরেজ রাখায় জায়গার বাহুল্যতা কমিয়েছে বহুগুণ আর হাতের নাগালেই প্রয়োজনীয় জিনিসটি পাওয়ার বেড়েছে সুবিধা, বেড়েছে কর্মীর মানসিক প্রশান্তি।
প্রতিটি রুমে আলো ও রঙের খেলা, পর্যাপ্ত অক্সিজেন প্রাপ্তির সুব্যবস্থা, গোপনীয়তা রক্ষা, অনায়াস যাতায়াত, প্রচুর স্টোরেজ, নিরাপদ খাবার জায়গা অর্থাৎ একটি আদর্শ কার্যোপযোগী কর্মক্ষেত্রের প্রায় সব দিক মেনেই নির্মিত হয়েছে ডিমিট্রিস ব্যাটারি অফিস।
খাবারের সুবিধার্থে রাখা হয়েছে ছোট ছিমছাম ডাইনিং এরিয়া। সিলিং ফ্যান, ফিল্টারকৃত নিরাপদ পানি, চেয়ার টেবিলের সমন্বয়ে তৈরি রুমটিতে ক্ষুধা মেটানোর পাশাপাশি টানা কাজের একঘেয়েমি কাটাতে আড্ডা কিংবা অনাবিল বিনোদনের সুযোগও রয়েছে।
প্রকল্পটি নির্মাণের সময়কাল ছিল ৩০ দিন তথা এক মাস। তবে লেগেছে ৪০ দিন। কর্মক্ষেত্রে ব্যবহৃত হয়েছে মেলামাইন বোর্ড, হোয়াইট বোর্ড, গর্জন কাঠ ও গ্লাস। ডিজাইনার দেশীয় উপকরণে স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করেন বলেই ব্যবহার করেছেন স্থানীয় বাজারে প্রাপ্ত কাস্টমাইজডকৃত ফার্নিচার। ইন্টেরিয়রে ব্যবহৃত হার্ডওয়্যারগুলো দেশের বাইরের। প্রকল্পটির অবস্থান কাওরান বাজারে হওয়ায় সুলভ মূল্যে সহজপ্রাপ্য উপকরণ ব্যবহারের সুযোগ পেয়েছেন। তবে বেশি উঁচুতে বিভিন্ন আকৃতির উপকরণ ওঠানামা করাটা ছিল বেশ কষ্টসাধ্য। বিশেষত এসি লাগাতে ঝুঁকি নিতে হয়েছে বেশি। আবার কর্মসহায়ক মিস্ত্রিদের পর্যাপ্ত নিরাপদ পোশাক ও প্রশিক্ষণের অভাবটিও অনুভব করেছেন সচেতন অথচ দক্ষ এই ডিজাইনার।
সবকিছুর মধ্যেও ক্লায়েন্টের দেওয়া সর্বোচ্চ স্বাধীনতাটি উপভোগ করেছেন দারুণভাবে। কারণ, প্রায় সবক্ষেত্রেই কাজ করতে সবচেয়ে বিরক্তির মুখোমুখি হতে হয় ক্লায়েন্টের অনধিকার হস্তক্ষেপের কিংবা সিভিল ওয়ার্কারদের সঙ্গে কর্মভাগের সিদ্ধান্ত চাপিয়ে দেওয়ার বিষয়টিতে। কিন্তু এ ক্ষেত্রে এ ধরনের আপত্তিকর ব্যাপার না ঘটায় প্রায় শতভাগ সন্তুষ্টিপূর্ণ কর্মসম্পাদনে ক্লায়েন্টের নির্ভরতার যোগ্য প্রমাণ মিলেছে।
এক নজরে প্রকল্প
প্রকল্পের নাম : ডিমিট্রিস ব্যাটারি অফিস
স্থান : ঢাকা ট্রেড সেন্টার, ৯৯ কাওরান বাজার, ঢাকা
স্বত্বাধিকারী : কনফিডেন্স গ্রুপ
জায়গার পরিমাণ : ২৫০০ বর্গফুট
নির্মাণ উপকরণ : গ্লাস, হোয়াইট বোর্ড, গর্জন কাঠ, মেলামাইন বোর্ড, পিভিসি ফ্লোরমেট।
নির্মাণকাল : ৬ সপ্তাহ
ডিজাইনার : সাকিল হক
স্থপতি : সুহাস বিশ্বাস
ডিজাইনার স্কেচ
ডিজাইনার সাকিল হকের জন্ম ৩০ জুন। বাবা আজিজুল হক ছিলেন ইন্টেরিয়র ডিজাইনার আর মা রাবেয়া বেগম গৃহিণী। দুই ভাইয়ে মধ্যে তিনিই বড়। মনোয়ারা শিশুবাগ থেকে প্রাথমিক ও খিলাগাঁও সরকারি উচ্চবিদ্যালয় থেকে মাধ্যমিকে উত্তীর্ণ হন। এরপর চট্টগ্রাম চারুকলা কলেজ থেকে পেইন্টিং অ্যান্ড গ্রাফিকস বিভাগ থেকে ১৯৯২ সালে লেখাপড়া শেষ করেন।
১৯৯৪ সালে সিল্করুট নামে নিজস্ব প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে কর্মজীবন শুরু করে পরে ২০১২ সালে সিল্করুট পরিবর্তন করে ‘ব্ল্যাক এন অরেঞ্জ’ নামে শুরু করেন বর্তমান পথচলা। এ প্রতিষ্ঠান থেকেই ওয়েব ডিজাইন, ইভেন্ট ম্যানেজমেন্ট, ইন্টেরিয়র, গ্রাফিকস ডিজাইনের কাজ করেন। দেশীয় উপকরণ ব্যবহারে স্বাচ্ছন্দ্য বেশি। ভালোবাসেন প্রকৃতিকে কাজের মাঝে আনতে। জ্যামিতিক ফর্মের চেয়ে শৈল্পিক দিকেই ঝোঁক বেশি। স্থপতি রবিউল হুসাইন ও এনামুল করিম নির্ঝর রয়েছেন দেশীয় প্রিয় স্থপতির তালিকায়; দেশের বাইরে অনুসরণীয় স্থপতি স্যার নরম্যান ফস্টার ও জাহা হাদিদের কাজ। বর্তমানে করা কাজের মধ্যে রয়েছে ‘মি অ্যান্ড মাম’ নামে শপিং শপের ইন্টেরিয়র, বসুন্ধরায় ডুপ্লেক্সের ইন্টেরিয়রসহ অন্যান্য ডিজাইনা। গভীর নেশা দেয়াশলাই সংগ্রহের প্রতি। সে আগ্রহ থেকেই বিশে^র ১১৬টি দেশের ১৭ হাজার ম্যাচ বক্স রয়েছে তাঁর সংগ্রহে। এর মধ্যে তাঁর নিজের নকশা করা ম্যাচের সংখ্যাই ১৫টি। ১৮ শতকের ম্যাচ থেকে শুরু করে বিশে^র সবচেয়ে ক্ষুদ্রাকৃতির দুটো ম্যাচের মধ্যে একটি রয়েছে তাঁর নিজস্ব সংগ্রহে। এ ছাড়া বিশে^র সবচেয়ে বৃহদাকৃতির ম্যাচ, ভিন্ন আকৃতির নানা ধরনের ম্যাচ আছে তাঁর সংগ্রহে। সংগ্রাহকদের নিয়ে রয়েছে ‘শখের মানুষ’ নামে নিজস্ব প্রকাশনা। বাংলাদেশ ম্যাচবক্স কালেক্টরস ক্লাবের প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি গুণী এ ডিজাইনার।
প্রকাশকাল: বন্ধন, ৭৬তম সংখ্যা, আগস্ট ২০১৬।