কাবা শরিফ বৃত্তান্ত

লাব্বাইক আল্লাহুম্মা লাব্বাইক
লাব্বাইকা লা শারিকা লাকা লাব্বাইক…

প্রতিবছর লাখ লাখ নিবেদিতপ্রাণ মুসলমানের মুখ থেকে ভেসে আসে এ শব্দগুলো যে ঘরকে ঘিরে, তা হলো কাবা শরিফ, তথা হারাম শরিফ। প্রতিটি মুসলমান বিশ্বাস করেন, জমিনের বুকে মহান আল্লাহ তাআলার পবিত্র প্রথম স্থাপনা হলো কাবা শরিফ। আর এই কাবাকে নিয়ে রহস্য আর গবেষণার যেন শেষ নেই। কাবা ছোট চতুর্ভুজ আকৃতির পবিত্র স্থাপনাটি যত না দেখার জন্য, তারচেয়ে বেশি আগ্রহ মানুষের এর পেছনের ইতিহাস ও ঐতিহ্যের কারণে। আসুন তবে জানা যাক মুসলমানদের প্রাণকেন্দ্র কাবা শরিফ সম্পর্কে।

সৌদি আরবে অবস্থিত কাবা, যার অর্থ সম্মানিত উঁচু স্থান, প্রাচীনতম, প্রাচীন, স্বাধীন বা মুক্তি পাওয়ার জায়গা বা সম্মানিত বাড়ি। মুসলমানদের বিশ^াস, কাবা শরিফ পৃথিবীর ঠিক মধ্যবর্তী স্থানে বা ঠিক পৃথিবীর কেন্দ্রে অবস্থিত। হাজার হাজার বছর ধরে এ গৃহটি সত্যিকার অর্থেই প্রাচীন বা প্রাচীনতম। এখানে মানুষ আসে পাপমুক্তি ও সওয়াবের আশায়। এ ছাড়া এই কাবা শরিফের দিকে মুখ করে বিশে^র সব মুসলিম প্রতিদিন পাঁচবার সিজদারত হয়, যার শুরু ১৪৫০ বছর আগে মহানবী হজরত মুহাম্মদ (সা.)-এর সময় থেকে তাঁরই ইমামতিতে।

কাবা শরিফের গঠন ও একাল-সেকাল

বর্তমানে কাবা শরিফের উচ্চতা ৩৯ ফুট ৬ ইঞ্চি, আয়তন ৬২৭ বর্গফুট। কাবা শরিফের ভেতরের কক্ষটি ১৩৯ মিটার। এর দেয়াল ১ মিটার প্রশস্ত। তাওয়াফ করার স্থান ভেতরের মেঝে থেকে ২ দশমিক ২ মিটার উঁচু। এর চারটি কোণ কম্পাসের প্রায় ৪ বিন্দু বরাবর মুখ করা। হেরেম শরিফের এই চারটি কোণকে চারটি নামে ভাগ করা হয়েছে। এগুলো হচ্ছে- 

  • পূর্ব কোণ: রুকন আল-আসওয়াদ
  • উত্তর কোণ: রুকন আল-ইরাকি
  • পশ্চিম কোণ: রুকন আল-সামি এবং
  • দক্ষিণ কোণ: রুকন আল-ইয়েমেনি।

মুসলিমদের কাছে পৃথিবীর অন্য কোনো ভবন কাবা ঘরের মতো সম্মানিত ও পবিত্র নয়। কারণ আদম (আ.) থেকে শুরু করে সব নবী-রাসুলের কাছে এ ইমারত ছিল সবচেয়ে গুরুত্ববহ। এর পুনর্নির্মাণ করেছেন ইব্রাহিম (আ.), ইসমাইল (আ.) ও হজরত মুহাম্মদ (সা.) স্বয়ং। ইতিহাস বলছে, শুরু থেকে কাবা শরিফ মোট ১২ বার পুনর্গঠন করা হয়েছে। এটি প্রথম নির্মাণ করেন হজরত আদম (আ.), যিনি মানব সৃষ্টির প্রথম মানুষ বা আদি পিতা। আর এটাই ছিল প্রথম ঘর পৃথিবীর বুকে, যা মানবতার জন্য আল্লাহ্ তাআলার উপাসনার একমাত্র মনোনীত গৃহ।

এরপর হজরত নূহ (আ.)-এর সময়ের প্লাবনে কাবা শরিফ পুরোপুরি ভেঙে যায়। পুনর্নির্মাণ করেন আল্লাহ তাআলার নির্দেশে হজরত ইব্রাহিম (আ.) ও শিশুপুত্র ইসমাঈল (আ.)। সে সময়ে এর পরিমাপ ছিল পূর্ব প্রাচীর ৪৮ ফুট ৬ ইঞ্চি। হাতিম পাশর্^প্রাচীর ছিল ৩৩ ফুট এবং হাজরে আসওয়াদ বা কালো পাথরের ও ইয়েমেনের কোনার পাশর্^ ছিল ৩০ ফুট। পশ্চিম দিকে ৪৬.৫ ফুট।

নবী করীম (সা.) যখন নবুয়ত পাননি তখন কুরাইশগণ এ কাবা পুনর্নির্মাণ করেন। তবে গোলযোগ বাধে হাজরে আসওয়াদ পাথর স্থাপনা নিয়ে। কারণ, কাবা পুনর্নির্মাণ কুরাইশরা সব গোত্রের সঙ্গে মিলেমিশে করলেও এই সম্মানিত পাথর স্থাপনের সম্মান কোনো গোত্রপতিই ছাড়তে নারাজ। কারণ, এটি একমাত্র পাথর, যা জান্নাত থেকে আল্লাহ তাআলা ফেরেশতাদের দিয়ে পৃথিবীর বুুকে পাঠিয়েছেন। কালো পাথর স্থাপন করা নিয়ে দ্বন্দ্ব শুরু হয় গোত্রপতিদের মধ্যে। শেষমেশ সব গোত্রপ্রধান সিদ্ধান্ত নেন পরদিন সকালে প্রথম যিনি কাবা শরিফে আসবেন, তিনি যা ফয়সালা করবেন তা মেনে নেওয়া হবে।

পরদিন কাবাগৃহে প্রথম প্রবেশ করেন মহানবী হজরত মুহাম্মদ (সা.)। সিদ্ধান্ত মোতাবেক রাসুলে পাক (সা.) নিজের চাদরের কোনা সব গোত্রের সর্দারদের ধরতে বললেন এবং নিজ হাতে পাথর তুলে কাপড়ের ওপর রাখলেন। পরে সবাই মিলে কাবা ঘরের নিকট কাপড়ের কোনা ধরে নিয়ে গেলে আবার তিনি পাথরটি তুলে নিজেই স্থাপন করলেন। প্রচলিত আছে বেহেশত থেকে পাঠানো কালো এ পাথরটি আগে কালো ছিল না, এটি ছিল ধবধবে সাদা। যুগে যুগে পাপী আর অনাচারী মানুুষের মুুখের চুম্বনে পাপ ধারনের ফলে এটি ধীরে ধীরে কৃষবর্ণ ধারণ করে।

হজরত মুহাম্মদ (সা.)-এর পরে এর পুনর্নির্মাণ করেন ইবনে আয যুবায়ের (রহ.)। তিনি হিজর থেকে পাঁচ হাত জায়গা এতে যোগ করেন এবং দুটি দরজা স্থাপন করেন। যেমনটি হজরত মুহাম্মদ (সা.) তাঁর জীবদ্দশায় চেয়েছিলেন। আগে এতে মাত্র একটি দরজা ছিল। সে সময়ে হাতেমকে আবারও কাবার অংশের মধ্যে অন্তর্ভুক্ত করা হয়, যা আধা বৃত্তকার প্রাচীর দ্বারা আবৃত কাবা ঘরের পাশে অবস্থিত। ইবনে আয যুবায়ের আউত (রহ.) এক প্রকার সুগন্ধিযুক্ত কাঠ তিন স্তম্ভের ওপরের ছাদে রেখেছিলেন।

কুরাইশগণ ছয়টি স্তম্ভ করেছিলেন কিন্তু তিনি তিনটি স্তম্ভ রাখলেন। পরে চারপাশে চারটি স্তম্ভ করেছিলেন। উচ্চতায় তখন ছিল ৯ হাত উঁচু; প্রস্থ ছিল ২০ হাত। দেয়ালগুলো ছিল ২ হাত প্রশস্ত। পরবর্তী সময়ে বাদশাহ হারুন-উর-রশিদ এটা পুনর্নির্মাণ করতে চান। তবে ইমাম মালেক (রহ.)-এর সঙ্গে পরামর্শ করলে তিনি তা না করার ব্যাপারে মত দেন। এতে বাদশার মত পরিবর্তন হয়। কারণ, এভাবে সব বাদশাই এটি পুনর্নির্মাণ করতে চাইতেন, যা ছিল অযৌক্তিক ও অপ্রয়োজনীয় একটি কাজ।

১০৩৯ সালে ভারী বর্ষণে এটি ভেঙে দুটি দেয়াল নিচে পড়ে যায়। সুলতান মুরাদ খান এটি পুনর্নির্মাণ করেন। সে সময়ে ইবনে যুবায়ের কর্তৃক নির্মিত দুটি দেয়াল ভেঙে যায়। হাজরে আওয়াদের কাছে থাকা দেয়ালটি ছাড়া বাকিগুলো ভেঙে যায়। ১৯৯৩ সালে এটি পুনর্গঠন করা হয়। এ সময়ের মধ্যে অবস্থিত মূল্যবান জিনিসগুলো ছাদ থেকে ঝুলিয়ে দেওয়া হয়। এ ঘরের ভেতরে তিনটি স্তম্ভ আছে। ছাদ থেকে দুটি আলোর বাতি ঝুলিয়ে দেওয়া হয়েছে। বর্তমানে মেঝে মার্বেল পাথর দ্বারা মোজাইক করা।

কাবা ঘরের ভেতরে রয়েছে যা যা

ইসলামিক সোসাইটি নর্থ আমেরিকার সভাপতি মুজাম্মিল সিদ্দিকি কাবা শরিফের ভেতরে যাওয়ার সুযোগ পেয়েছেন। সাউন্ড ভিশনের সঙ্গে এক সাক্ষাৎকারে তিনি জানান, কাবা শরিফের ভেতরে রয়েছে তিনটি স্তম্ভ, সুগন্ধি দ্রব্য রাখার মতো একটি টেবিল। ছাদ থেকে ঝুলন্ত লণ্ঠন টাইপ আলোর বাতি এবং মেঝে মার্বেল পাথরের। কাবা শরিফের বাইরের দেয়ালগুলোতে কালো কাপড়ের ওপর স্বর্ণের সুতো দিয়ে কালিমা লিখে ঝুলিয়ে দেওয়া আছে, যা কাবা শরীফকে পুুরো ঢেকে রাখে। কোনো জানালা নেই এতে আর রয়েছে একটি মাত্র দরজা।

তাওয়াফ

সৌরজগতের সব কিছুই এর কেন্দ্রকে ঘিরে আবর্তিত। ঠিক তেমনই কাবা শরিফকে ঘিরে ঘড়ির কাঁটার উল্টো দিকে সাতবার করে প্রদক্ষিণ করা হয়, যা মুসলমানদের নিকট ‘তাওয়াফ’ নামে পরিচিত এবং অত্যন্ত কাক্সিক্ষত একটি ইবাদত।

তালা-চাবি

কাবা শরিফ বন্ধ রাখার জন্য কবে থেকে এর তালা-চাবির শুরু হয়েছিল তা সঠিক জানা যায় না। তবে, মোট ৫৮টি তালা-চাবির নিবন্ধন তথ্য পাওয়া যায়। যার মধ্যে ৫৪টি চাবি তুরস্কের সাবেক রাজধানী ইস্তাম্বুলের তোপকপি জাদুঘরে সংরক্ষিত রয়েছে। অত্যন্ত আশ্চর্যের বিষয় হলো, শুরু থেকে আজ পর্যন্ত কাবা ঘরের এ চাবি মক্কার বনু তালহা গোত্রের নিকট সংরক্ষিত এবং তারা এখনো এটি পারিবারিকভাবে সংরক্ষণের দায়িত্ব পালন করে থাকে।

মুসলমানরা বিশ^াস করে, মহান রাব্বুল আলামিনের অনন্য নিদর্শন পবিত্র কাবা। ভৌগোলিকভাবে যেখানে কাবা শরিফের অবস্থান, ঠিক সে বরাবর ওপরে সপ্ত আসমানের ওপরে রয়েছে বাইতুল মামুর, যেখানে ফেরেশতারা একে তাওয়াফ করেন। আর তাই কাবা শরিফ শুধু মুসলমানদের উপাসনালয়ই নয়, পৃথিবীর বুুকে এক টুকরো জান্নাত।

প্রকাশকাল: বন্ধন, ১১২তম সংখ্যা, আগস্ট ২০১৯।

খন্দকার নাসরিন আখতার
+ posts

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Scroll to Top