উচ্চশিক্ষার জন্য বর্তমানে অস্ট্রেলিয়ায় মেলবোর্ন শহরের অবস্থান করতে হচ্ছে। শহরটিকে উচ্চশিক্ষার জন্য বেছে নেওয়ার পেছনে কিছু কারণ রয়েছে বৈকি! খুব কাছ থেকে একটি শহরকে দেখতে চেয়েছি, যে শহরটি বিশ্বে বসবাসযোগ্য শহরগুলোর মধ্যে প্রথম সারিতে; বিগত ২০০২ সাল থেকে আজ পর্যন্ত এ ১৮ বছর ধরে একই অবস্থানে রয়েছে সফলতার সঙ্গে। গ্লোবাল লিভেবিলিটি ইনডেক্স অনুযায়ী স্বাস্থ্য, শিক্ষা, সংস্কৃতি, পরিবেশ আর অবকাঠামোগত দিক থেকে শহরটির অর্জন শতভাগের মধ্যে ৯০.৪ ভাগ। প্রতিদিনই শহরের কোথাও না কোথাও হেঁটে দেখতে বের হই। যদিও শহরের মধ্যে যানে চলাচল করা যায় বিনা পয়সায়, তবে আমার ধারণা একটি শহরকে চিনতে-জানতে ও সখ্য গড়ে তুলতে চাইলে হেঁটে হেঁটে দেখতে হবে। তবেই সেই শহরকে আস্তে আস্তে জানা যায়।
বাংলাদেশের প্রায় বড় বড় সব শহর দেখেছি। বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয় (বুয়েট)-এর স্থাপত্য বিভাগে পড়ার সূত্রে ঢাকার অলিগলি ঘুরে বেড়িয়েছি; দেখেছি খুব কাছ থেকে। চট্টগ্রাম প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের স্থাপত্য বিভাগে শিক্ষকতা করার সুবাদে চট্টগ্রাম শহরকেও দেখেছি নিবিড়ভাবে। এ ছাড়া বিভিন্ন সময়ে নিজের জেলা শহর সিরাজগঞ্জ, পাবনা, রাজশাহী, সিলেট কিংবা খুলনাসহ প্রায় বড় বড় সবকটি শহরকেই দেখার সুযোগ হয়েছে। দেখেছি শহরগুলোর পরিবর্তন আর পরিবর্ধন। তবে কষ্ট হয় যখন দেখি উন্নত বিশ্বের সবগুলো শহর যখন সময়ের সাথে সাথে বাসযোগ্য হিসেবে গড়ে ওঠার প্রত্যয়ে প্রতিযোগিতায় লিপ্ত, আমরা ঠিক তখনই বছরের পর বছর পিছিয়ে যাচ্ছি বসবাসযোগ্য শহরের তালিকা থেকে। শহরগুলো পরিণত হচ্ছে অস্বাস্থ্যকর শহর হিসেবে।
এবার ফেরা যাক মেলবোর্ন শহরের দিকে। খুঁজে বের করতে চাই আমাদের শহরগুলো থেকে এই স্বাস্থ্যসম্মত শহরের যত পার্থক্য। মেলবোর্ন শহরের সব থেকে উল্লেখযোগ্য দিক হচ্ছে এর স্বাস্থ্যব্যবস্থা। বিশ্বের মধ্যে অন্যতম স্বাস্থ্যকর শহর এটি। এখানে রয়েছে সরকারি-বেসরকারি স্বাস্থ্য প্রতিষ্ঠান, যা বিশ্বমানের গবেষণা-উন্নয়ন দ্বারা পরিচালিত। এখানে প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবার মাধ্যমে সমাজের যে কেউ সব ধরনের স্বাস্থ্যবিষয়ক পরামর্শ পেতে পারে এবং সেই পরামর্শ অনুযায়ী পরে চিকিৎসা নিতে পারে। শহরে রয়েছে প্রায় ২০০-এর মতো স্বাস্থ্যসেবা প্রতিষ্ঠান। তা ছাড়া ইমার্জেন্সি সার্ভিস, প্রেগন্যান্সি, বয়স্ক স্বাস্থ্য, মানসিক স্বাস্থ্য, পরিবারকেন্দ্রিক স্বাস্থ্য সুরক্ষা, শিশু স্বাস্থ্য এবং সর্বোপরি কাউন্সিলিংয়ের সর্বোচ্চ সুযোগ সুবিধা রয়েছে শহরটির প্রায় প্রতিটি জায়গায়। এখানে এমন কিছু শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান রয়েছে, যেখানে শিশুদের বয়স অনুযায়ী প্রয়োজনীয় প্রতিষেধক টিকা ছাড়া ভর্তি করা সম্ভব নয়।
শহরটির বিন্যাস এমন যে যেকোনো নাগরিক যে প্রান্তেই বসবাস করুক না কেন, তার আশপাশেই প্রয়োজনীয় হাসপাতাল, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, বাজার, পার্কিংয়ের ব্যবস্থা, বিনোদনকেন্দ্র সবকিছুই পেয়ে যাবে। বিশেষ করে সবুজ গাছগাছালিসংবলিত পার্ক। শহরটিতে রয়েছে বেশ কটি বিশ্বমানের বিশ্ববিদ্যালয়, যেগুলোর সাথে ইন্ডাস্ট্রি কলাবরেশন ওতপ্রোতভাবে জড়িত। কারণ, উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানের সাথে কমার্শিয়াল ইন্ডাস্ট্রির যোগাযোগ না থাকলে উচ্চশিক্ষা-পরবর্তী চাকরি কিংবা কর্মক্ষেত্র প্রসারিত হয় না। সমগ্র শহরটিতে রয়েছে পাবলিক ট্রান্সপোর্টের সুশৃঙ্খল নেটওয়ার্ক। বিষয়টি আরেকটু খোলাসা করে বলা যায়, এখানে যানবাহনে যাতায়াতের ক্ষেত্রে পাবলিক ট্রান্সপোর্ট কার্ড ব্যবহার করতে হয়। শহরের মূল বিজনেস এরিয়াতে যানবাহনের জন্য বিশেষ করে ট্রাম লাইনের জন্য ফ্রি ট্রান্সপোর্ট জোন হিসেবে নির্ধারণ করা এবং মূল বিজনেস জোনের মধ্যে যাতায়াতে খরচ লাগে না। আর অন্যান্য পাবলিক যানবাহনে যেমন বাস-ট্রেনে খরচ খুবই কম। সমগ্র শহরটিতে ট্রেন নেটওয়ার্ক খুবই সুসংহত এবং শক্তিশালী।
তা ছাড়া রাস্তার কিছু নির্দিষ্ট দূরত্ব পরপর বাসস্ট্যান্ড আর ট্রামস্টেশন রয়েছে। সুতরাং যে কেউই খুব সহজেই এক জায়গা থেকে আরেক জায়গায় যাতায়াত করতে পারে। তবে আমার কাছে যে বিষয়টি সব থেকে ভালো লাগে সেটি হলো এখানকার রাস্তার পাশে কিছুদূর পরপর বসার জায়গা। ছোট-বড় সবুজ পার্ক, আর সেখানে নির্দ্বিধায় ঘুরে বেড়ায় বিভিন্ন পাখি আর ফুলের সমারোহ। রাস্তায় হেঁটে যাওয়া কোনো নাগরিক কিছুটা সময়ের জন্য হলেও হতে পারেন বিমোহিত।
স্থাপত্য এবং নগরকেন্দ্রিক গবেষণায় প্রমাণিত যে একটি শহরের প্রাণ একদিকে যেমন শহরের মানুষ, ঘরবাড়ি, রাস্তাঘাট, অফিস, কলকারখানা প্রভৃতি ঠিক তেমনি শহরের মাঝখানে গাছগাছালিঘেরা সবুজ চত্বর সে শহরের ফুসফুস। পাখিগুলোকে দেখলে সব থেকে ভালো লাগে। নির্দ্বিধায় মানুষের ভিড়ে ভাবগম্ভীর মুখে ঘুরে বেড়াচ্ছে। কোথাও কোনো চিন্তার অবকাশ নেই। শহরে তাদেরও যেন মানুষের মতো সমান অধিকার!
চলবে
প্রকাশকালঃ বন্ধন, ১২৪তম সংখ্যা, ডিসেম্বর ২০২০