ভূগর্ভস্থ পানির অতিব্যবহারে ডুবে যাবার আশংকায় ঢাকার

এই রহস্যময় বিশ্বব্রক্ষান্ডে পৃথিবী নামক গ্রহে পানির উপস্থিতি নিঃসন্দেহে এক অপার বিস্ময়। প্রতিটি প্রাণীর জীবনের অস্তিত্ব টিকে রাখার জন্য পানি অপরিহার্য। পানির প্রতিটি ফোঁটায় লুকিয়ে রয়েছে জীবনের গল্প। শুধু জীবন-জীবিকা রক্ষার জন্যই নয় কোন সভ্যতা টিকে থাকার নেপথ্যেও রয়েছে পানি। ভূপৃষ্ঠ ও ভূগর্ভ থেকে আমরা পানি পাই। কিন্তু ভূগর্ভস্থ পানি নিরাপদ, স্বাস্থ্যকর ও সহজপ্রাপ্য হওয়ায় এই পানির ওপর আমরা অতিমাত্রায় নির্ভরশীল।

আর অতিরিক্ত নির্ভরতার কারণে বিশ্ব ব্যাপি আশঙ্কাজনকভাবে নামছে পানির স্তর। ফলে ভয়াবহ এক পরিবেশ বিপর্যয়ের দোরগোড়ায় বিশ্বের বহু স্থান। অতিরিক্ত পানি উত্তোলনের পাশাপাশি ব্যাপক নগরায়নের চাপে ক্রমেই দেবে যাচ্ছে বিশ্বে ^র অনেক শহর-জনপদ। অন্যদিকে জলবায়ু পরিবর্তনজনিত কারণে সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বেড়ে ডুবতে বসেছে সমুদ্র উপকূলীয় দেশ ও নিম্নাঞ্চল। বাংলাদেশও ঝঁকিপূর্ণ দেশের তালিকার শীর্ষসারিতেই অবস্থান করছে। 

বিশ্বে র ঝুঁকিপূর্ণ যত ডুবন্ত শহর

জাকার্তা বিশ্বের অন্যতম ঘনবসতিপূর্ণ বন্দর নগর, যেখানে এক কোটিরও বেশি নাগরিকের বাস। তবে আশপাশের শহরগুলোর বাসিন্দাদের ধরলে লোকসংখ্যা হবে তিনগুণ। নগরটি অত্যন্ত বন্যাপ্রবণ। কারণ জাকার্তার অর্ধেকটা সমুদ্রসীমার নিচে অবস্থিত। ফলে এই শহরের মানুষ অতিরিক্ত মাত্রায় ভূগর্ভস্থ পানি উত্তোলন করে। আর এর ফলেই পানির স্তর নেমে ক্রমেই দেবে যাচ্ছে এ নগরী। বিশ্বে যেসব শহর খুব দ্রুত ডুবে যাচ্ছে, জাকার্তা সেগুলোর মধ্যে একটি।

গত ১০ বছরে উত্তর জাকার্তার ২ দশমিক ৫ মিটার ইতিমধ্যেই ডুবে গেছে। একই সঙ্গে বেশ কিছু এলাকা বছরে ২৫ সেন্টিমিটার করে পানির নিচে চলে যাচ্ছে, যা বিশ্বের অন্যান্য উপকূলীয় মেগাসিটিগুলোর তুলনায় দ্বিগুণেরও বেশি। নিয়ন্ত্রণ করা না গেলে এই মেগাসিটি ২০৫০ সালের মধ্যে সম্পূর্ণরূপে পানির নিচে চলে যাবে বলে আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন গবেষকেরা।

জাভা সাগর বেষ্টিত জাকার্তার মধ্যে দিয়ে বয়ে গেছে ১৩টি নদী। এ কারণে খুব স্বাভাবিক ভাবেই বছরে কয়েকবার বন্যার কবলে পড়ে নগরটি। নগর কর্তৃপক্ষ বিশেষজ্ঞদের এসব গবেষণা কিংবা সতর্কবাণীকে গুরুত্ব দিতে চান না। জাকার্তা ছাড়াও ইন্দোনেশিয়ার বেশ কয়েকটি অঞ্চলের পানির উচ্চতা বৃদ্ধির প্রভাব পড়তে শুরু করেছে। মুরা বারু এলাকার বেশ কয়েকটি অফিস ভবন পরিত্যক্ত হয়ে পড়েছে। ভবনগুলোর প্রথম তলা সম্পূর্নভাবেই পানির নিচে চলে গেছে।

বেশ কয়েকটি স্কুলেও একই অবস্থা দেখা গেছে। এই এলাকাগুলোতে এখন মাছ চাষ করা হচ্ছে। বর্তমান পরিস্থিতির কোনো পরিবর্তন না হলে ২০৫০ সাল নাগাদ উত্তর জাকার্তার ৯৫ শতাংশ পানিতে নিমজ্জিত হয়ে পড়বে। জাকার্তার বর্তমান অবস্থা এতটাই ভয়াবহ যে, দেশটির সরকার আগামী কয়েক বছরের মধ্যে তার রাজধানীকে পূর্ব কালিমান্তানে স্থানান্তরের ঘোষণা দিয়েছেন। বিশাল ক্রান্তীয় জঙ্গল সাফ করে তৈরি করা হবে ইন্দোনেশিয়ার নতুন রাজধানী। কিন্তু তা হতে পারে পরিবেশের জন্য আরো বড় হুমকি।

ভূগর্ভস্থ পানির অতিরিক্ত উত্তোলন, অতিব্যবহার ও সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধির কারণে জাকার্তা ছাড়াও দ্রুত তলিয়ে যাওয়া শহরগুলোর মধ্যে শীর্ষে রয়েছে –

ভূগর্ভস্থ পানি

১৯৯৩ সাল থেকে প্রতিবছর সাগরের পানির উচ্চতা ৫ ইঞ্চি করে বৃদ্ধি পাচ্ছে। ২১০০ সালের মধ্যে শহরটির প্রায় ৯৫% এলাকা পানির নিচে তলিয়ে যাওয়ায় আশংকা।

দূর্যোগে ভিন্নমাত্রা সিংকহোল 

গভীর নলকূপের মাধ্যমে ভূগর্ভস্থ পানির ব্যবহার এবং প্রাকৃতিক জলাধার রক্ষা না করা হলে কী ধরনের বিরূপ পরিস্থিতির সম্মুখীন হতে হয়, প্রকৃতির ভারসাম্য কীভাবে হুমকির মুখে পড়ে, সেটি আমরা তুরস্কের কনিয়া রাজ্যের পরিণতির থেকে কিছুটা অনুধাবন করতে পারি। আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমে এ বিষয়ে নিউজ হেডলাইন হয়েছিল ‘দৈত্যকায় সিংকহোল তুরস্ককে গিলে খাচ্ছে।’ বিপুল গম উৎপাদনখ্যাত তুরস্কের এ অঞ্চলের কৃষকরা পানি ব্যবস্থাপনার জন্য ভূঅভ্যন্তরের পানি বিরামহীনভাবে উঠাতে থাকে।

এতেই হুমকির মুখে পড়ছে জমির তলার ভিত। গত ১০-১৫ বছরে অবস্থার অবনতি ঘটেছে প্রচুর পরিমাণে। সেচের জন্য সেই পানি আবার ফসলের জমির পাশে বড় গর্ত করে জমিয়ে রাখে। আর এ কারণেই হুটহাট জমির মধ্যে দেখা দিচ্ছে ভূমিধস। সৃষ্টি হচ্ছে ১০ মিটার চওড়া ও ১৫০ মিটার গভীর বিশাল গর্ত। গর্তগুলো নিচের দিকে বেশি চওড়া হওয়ায় সহজে এগুলো ভরাট করা সম্ভব হয় না। ওপরে মাটি দিলে নিচের দিকে ধসে যেতে থাকে।

২০২০ সালে তুরস্কে যেখানে ৩৬০টি সিংকহোল ছিল, এ বছর সেখানে সাড়ে ৬০০-এর বেশি গর্ত তৈরি হয়েছে। এটি যে শুধু তুরস্কের সমস্যা তা নয়, এটি এখন যুক্তরাষ্ট্র, চীন, রাশিয়া, ইতালি, স্পেনেও দেখা যাচ্ছে। এখন থেকে বাংলাদেশ ভূগর্ভস্থ পানি ব্যবহারে সতর্ক না হলেও অদূর ভবিষ্যতেও অনুরূপ প্রতিকূল পরিস্থিতির সম্মুখীন হতে হবে, যা শুধু কৃষি জমির জন্য হুমকি নয়, মানববসতির ক্ষেত্রে হুমকি হয়ে দাঁড়াবে। তাই, আমাদের প্রাকৃতিক জলাধার রক্ষা ও ভূপৃষ্ঠের পানি ব্যবহারে মনোযোগী হওয়ার বিকল্প নেই। অন্যথায় শুধু বিপর্যয় নয় ধ্বংসও অনিবার্য।

ঢাকার জন্য স্পষ্ট সতর্কবার্তা

বিশ্বের দ্রুত ডুবন্ত নগরের ৪র্থ তালিকায় অবস্থান করছে বাংলাদেশের রাজধানী ঢাকা। এখানে অতিমাত্রায় ব্যবহারের ফলে দ্রুত নামছে ভূগর্ভস্থ পানির স্তর। জনসংখ্যা, ভূ-প্রকৃতি পরিবেশগত বৈশিষ্ট্য ও মানবসৃষ্ট বিভিন্ন দূষণ মিলিয়ে জাকার্তার সাথে আমাদের রাজধানী শহর ঢাকার অনেকটাই মিল রয়েছে। অতিসত্বর যদি যথাযথ ব্যবস্থা গ্রহণ না করা হয় তাহলে ঢাকার অবস্থাও জাকার্তার মত হবে বলেই মনে করেন বিশেষজ্ঞগণ।

শুধু তাই নয় অপরিকল্পিত সেচ ব্যবস্থার মাধ্যমে ভূগর্ভস্থ পানির মাত্রারিক্ত ব্যবহার করা হলে ভূগর্ভের পানির স্তর নিচে নেমে ভয়াবহ অবস্থার সৃষ্টি হতে পারে যার পরিণতি হবে অনেকটাই ভারতের ফতেহপুর সিক্রি ও হলদিয়ার মত। উল্লেখ্য, ফতেহপুর সিক্রির মনোরম নগরী পানির অভাবে পরিত্যক্ত হয়েছিল। শত শত কোটি টাকার শিল্প বিনিয়োগের পর পশ্চিমবঙ্গের হলদিয়ার ভূগর্ভস্থ প্রাকৃতিক জলাধারগুলো মরে গিয়েছে।

১৯৮০ সালে উত্তরবঙ্গে রংপুর, দিনাজপুর জেলার গভীর ও অগভীর নলকূপের সাহায্যে সেচব্যবস্থা গড়ে তোলার ওপর সমীক্ষা চালাতে গিয়ে স্যার ম্যাকডোনাল্ড অ্যান্ড পার্টনার্স নামে ব্রিটিশ কনসালটিং ফার্মের প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছিল ভূগর্ভস্থ পানির ব্যবহার কমাতে। সেই আহবানে কর্ণপাত করা হয়নি। বরং ভূগর্ভস্থ পানির ব্যবহার বাড়ানো হয়েছে, প্রাকৃতিক জলাধার বিশেষ করে চলনবিল, গাজনার বিল, যশোর, ফরিদপুর, ময়মনসিংহের বিল, সিলেটের হাওর শুকিয়ে ইরি চাষের স্কিম নেওয়া হয়েছে।

২০১৫ সালে নাসা-র ‘গ্র্যাভিটি রিকভারি অ্যান্ড ক্লাইমেট এক্সপেরিমেন্ট’ (গ্রেস) উপগ্রহের পাঠানো তথ্যে দেখা গেছে, অতিব্যবহারের ফলে যে কয়েকটি দেশের ভূগর্ভস্থ জল দ্রুত শেষ হয়ে যাচ্ছে তাদের মধ্যে বাংলাদেশ বেশ এগিয়ে। ঢাকা ওয়াসার ১ হাজার এবং বেসরকারি নিবন্ধিত ৪ হাজার এবং নিবন্ধনহীন আনুমানিক আরো ৪থেকে ৫০০ গভীর নলকূপ ৮০০ থেকে ১১০০ ফুট গভীর থেকে অব্যাহত ভাবে প্রতিদিন ৩০০থেকে ৪০০কোটি লিটার পানি উত্তোলন করছে।

বিএডিসির এক গবেষণা মতে, সত্তরের দশকে যেখানে ভূগর্ভস্থ পানিস্তর ছিল ২০-৩০ ফুটের মধ্যে, তা বর্তমানে ১৮০থেকে ২৮০ ফুট পর্যন্ত নেমে গেছে। অন্যদিকে সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে ঢাকার ভূস্তরের উচ্চতা ৫০ ফুট। এ অবস্থায় মাটির নিচ থেকে অব্যাহতভাবে পানি তোলা হলে আগামীতে ঢাকার পানিতে সমুদ্রের লবণ পানি চলে আসবে। তাই ঢাকাসহ আশপাশের এলাকায় শিল্প ও সেচ কাজের জন্য মাটির নিচ থেকে পানি তোলা বন্ধ করা প্রয়োজন। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এভাবে পানির স্তর নিচে নামতে থাকলে একসময় শুধু পানির অভাবেই ঢাকা ছাড়বে মানুষ। অন্যদিকে, উপকূলীয় অঞ্চলসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে ভূগর্ভে ঢুকে পরছে লোনা পানি, যা হবে ভয়াবহ সংকটের কারণ। 

জলের স্তর কেন দিন দিন ক্রমশ নিচের দিকে নেমে যাচ্ছে সেটা বুঝতে হলে আগে আমাদের জানতে হবে ভূগর্ভস্থ জলের সঙ্গে সম্পর্ক আসলে কি।

ভূগর্ভস্থ জল

মাটির ঠিক নীচে থাকে ভূগর্ভস্থ জলের একটা স্তর, যাকে বলা হয় ‘ওয়াটার টেবল’ বা ‘জলতল’। মূলত বৃষ্টির পানি জমে তৈরি এই জলতল আমাদের বিভিন্ন জলাশয়ে জলের জোগান দেয়। এর নীচে থাকে ভূগর্ভস্থ জলের সম্ভার (অ্যাকুইফার), যা কোথাও জলতলের কাছাকাছি আবার কোথাও মাটির অনেক গভীরে প্রায় বিচ্ছিন্ন অবস্থায় থাকে। ভূ-গর্ভের শিলাস্তরে এই পানি ৩৬৫ দিনে ৩০০ ফুট প্রবাহের ধীর গতিতে শত সহস্র কোটি কোটি বছরে সঞ্চিত হয়েছে। ভূতলে উন্মুক্ত জলভান্ডার থেকে পানি উত্তোলন করা হলে তা বাষ্প হয়ে বৃষ্টির সময় ফের পূর্ণ হয়ে ওঠে। বৃষ্টির জল চুঁইয়ে ঢুকে জলতল অবধিও সহজেই পৌঁছে যায়।

বৃষ্টিপাতে জলস্তরের যে স্বাভাবিক রিচার্জ হয়, নিষ্কাশনের হার তার থেকে অনেকটা বেশি হয়ে পড়েছে। এমনিতে ওয়াটার টেব‌লের নীচের মাটি জলে সম্পৃক্ত হলে সেই জল চুঁইয়ে ভূগর্ভস্থ জলভান্ডার অবধি পৌঁছে তাকেও রিচার্জ করতে পারে। কিন্তু যে ওয়াটার টেব্লের নীচে কাদামাটি বা শক্ত পাথরের স্তর থাকে সেখান থেকে জল চুঁইয়ে অ্যাকুইফার অবধি পৌঁছয় না; সেখানে জলের সম্ভার বেশি হয়ে গেলে তা পাশাপাশি গড়িয়ে সমুদ্রে চলে যায়।

এতে মিষ্টি পানি সরাসরি অ্যাকুইফারে ফিরতে পারছে না। মিশছে সমুদ্রের নোনা জলের সঙ্গে, তার পর বাষ্প-মেঘ-বৃষ্টি চক্রের মধ্যে দিয়ে মাটিতে ফিরে এলেও তা সব সময় ভূগর্ভে পৌছাতে পারে না। আর এ ভাবেই খালি হয়ে যাচ্ছে বিভিন্ন অঞ্চলের মাটির নীচের জল। কুয়োর জল নেমে যাচ্ছে, শুকিয়ে যাচ্ছে পুকুর, খাল, নদীও। তার সরাসরি প্রভাব পড়ছে পরিবেশে। দীর্ঘ সময় অব্যাহতভাবে ঢাকার ভূগর্ভস্থ পানি উত্তোলনের ফলে সৃষ্ট ফাঁপা তথা ভয়েড থাকার কারণে যে কোনো সময় বিভিন্ন অংশ দেবে যেতে পারে এবং সামন্য ভূমিধসে ঐ এলাকা তছনছ বা ধ্বংস হয়ে যেতে পারে।

বিশেষ করে শহরে এই বিপদ বেশি। কারণ সেখানে নগরায়নের ব্যাপক চাপ থাকায় একের পর এক গড়ে উঠছে বহুতল ভবন, সড়ক অবকাঠামো। তাছাড়া লক্ষ লক্ষ মানুষ ও যানবাহনের চাপও কম নয়। 

নিরাপদ পানির শঙ্কা

পৃথিবীতে যে পরিমাণ পানির উপস্থিতি, তার মাত্র ৩ শতাংশ পানযোগ্য। এর বিশাল অংশই অ্যান্টার্কটিকা ও গ্রিনল্যান্ডে বরফ হিসেবে জমা কিংবা মাটির নিচে রক্ষিত। পৃথিবীর মোট পানির মাত্র ১ শতাংশ মানুষের ব্যবহার উপযোগী। যেটির অধিকাংশই মানুষের নাগালের বাইরে। বিজ্ঞান প্রযুক্তির আশীর্বাদে যেখানে মানুষের জীবন ক্রমেই হচ্ছে আয়েশি ও স্বাচ্ছন্দ্যময়, সেখানে পৃথিবীতে ১৫০ কোটিরও বেশি মানুষের জন্য নেই নিরাপদ পানির সংস্থান।

প্রতি বছর পানিবাহিত রোগে পৃথিবীজুড়ে মারা যাচ্ছে প্রায় সাড়ে তিন কোটি মানুষ। যেসব অঞ্চলে সুপেয় পানির প্রাপ্যতা নিয়ে সংকট বিদ্যমান, সেখানকার চিত্র আরও ভয়াবহ। জলবায়ু পরিবর্তনের সাথে পানির প্রাপ্যতার একটি সম্পর্ক বিদ্যমান। মূলত জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে নানান আপদ দেখা দেয়। সেই আপদের মধ্যে খরা, বৃষ্টিপাতহীনতা অন্যতম। বৃষ্টিপাত কম হলে স্বাভাবিকভাবেই ভূগর্ভস্থ ও ভূ-অপরিস্থ পানির ওপর প্রভাব পড়ে।

কারণ ন্যুনতম যে পরিমাণ পানি রির্চাজ হওয়ার কথা সেই পরিমাণ পানি রিচার্জ না হয় না। ফলে দেখা দেয় পানির সঙ্কট। সুপেয় পানির সংকট তীব্র থেকে হচ্ছে তীব্রতর। এ কারণে ভূগর্ভস্থ পানির ওপর নির্ভরশীলতা কমিয়ে আনতে এর বদলে বিশেষজ্ঞরা এখন মাটির উপরিভাগের পানি অর্থাৎ পুকুর বা নদী নালার পানির ব্যবহার বাড়াতে জোর দেবার কথা বলছেন।

প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশ

প্রতি বর্গকিলোমিটারে মিঠা পানির প্রাপ্যতার হিসাবে বাংলাদেশের অবস্থান পৃথিবীতে এক নম্বর। ব্রাজিলের রিজার্ভ ৪ হাজার ২৩৩ কিউবিক কি.মি, যা পৃথিবীতে সর্বাধিক। আমাদের রিজার্ভ ১ হাজার ২২৩ কিউবিক কি.মি। ব্রাজিলের আয়তন বাংলাদেশের ৫৮ গুণ। সেই হিসাবে ২য় অবস্থানে থাকা ব্রাজিলের চেয়ে আমাদের পানির প্রাপ্যতা ৬.৭ গুণ বেশি। প্রতিবেশী দেশগুলোর রিজার্ভ ভারত ১ হাজার ৯১১ কিউবিক কি.মি, চীন ২ হাজার ৮৪০ কিউবিক কি.মি, পাকিস্তানে ২৪৬ কিউবিক কি.মি।

রাশিয়ার আয়তন বাংলাদেশের ১১৫ গুণ। তাদের রিজার্ভ ৪ হাজার ৫০৮ কিউবিক কি.মি। বাংলাদেশের মাত্র সাড়ে তিন গুণ। ২৮দেশের সমন্বয়ে গঠিত ইউরোপীয় ইউনিয়নের রিজার্ভ ২ হাজার ৫৭ কিউবিক কি.মি। বাংলাদেশের দ্বিগুণের কম। অস্ট্রেলিয়ার রিজার্ভ ৪৯২ কিউবিক কি.মি, যা বাংলাদেশের রিজার্ভের অর্ধেকেরও কম। এই পরিসংখ্যান থেকে এটা বুঝতে অসুবিধা হয় না যে, আমরা আসলে পানিতে ডুবে আছি। তা সত্বেও, বছরের ৪ মাস দেশের একটা বড় অংশ পানিশূন্যতায় হাহাকার করে।

দেশে ছোট-বড় মিলে নদী রয়েছে ২৩০টি। অপরিকল্পিত ও অদূরদর্শী উন্নয়ন কার্যক্রমের ফলে বড় বড় নদীগুলো থেকে সৃষ্ট ছোট নদীগুলোর মুখ বন্ধ হয়ে যাচ্ছে। দখল ও দূষণ হচ্ছে প্রায় প্রতিটি নদী। সরকার নদীকে একটি ‘জীবনসত্তা’ হিসেবে ঘোষণা দেওয়ার পরও আজও পানির উৎস তথা নদী, খালবিল ও জলাভূমির দখল বাণিজ্য কমেনি।

নদীগুলো দখল ও দূষণ হচ্ছে। এসব নদীর পানিগুলো প্রায়ই ব্যবহারের অযোগ্য হয়ে যাচ্ছে। অন্যদিকে কৃষিতে রাসায়নিক সার ও কীটনাশক ব্যবহার, উপকূলীয় অঞ্চলে অপরিকল্পিত চিংড়ি চাষের কারণে লবণাক্ততা, দেশের অসংখ্য জেলায় আর্সেনিক দূষণ, নদীর তীরবর্তী ও নদী পানিপ্রবাহকে বাধাগ্রস্ত করে বিভিন্ন অবকাঠামো নির্মাণ এবং নদীর গর্ভে শিল্পকারখানার বর্জ্যসহ অন্যান্য মানব সৃষ্ট বর্জ্য নিক্ষেপের কারণে আজ বাংলাদেশে পানি সঙ্কট তীব্র আকার ধারণ করছে। এই সঙ্কটটা মার্চ-মে মাসে বেশি পরিলক্ষিত হয়। অবশ্য কোন কোন এলাকায় বছরব্যাপীই পানি সঙ্কট দেখা দেয়।

পানির অব্যবস্থাপনা করণীয়

মাটির নিচে পানির আধার সুরক্ষা ও পানির গুণাগুণ বজায় রাখতে ভূ-উপরিস্থ ও ভূ-গর্ভস্থ পানির সমন্বিত ও সুষ্ঠ ব্যবস্থাপনা খুবই গুরুত্বপূর্ণ। অন্যদিকে পানি সঙ্কটের মূলে পানি সম্পদের বা আধারের স্বল্পতার পাশাপাশি পানির অব্যবস্থাপনাও একটি বড় কারণ। সুপেয় পানি সম্পদের উৎসগুলোকে দূষণ ব্যাপক পানি প্রাপ্যতা সমস্যা সৃষ্টি করছে। এর মধ্যে যদি প্রাপ্য পানির সঠিক ব্যবস্থাপনা না হয় তাহলে পানি সঙ্কট তো দেখা দেবেই। আর তাই ভূগর্ভস্থ জল সংরক্ষনে আমাদের যা যা করনীয় সেগুলো সম্পর্কে প্রস্তাবনা তুলে ধরা হল- 

  • সর্বক্ষেত্রে জলের অপব্যবহার বন্ধ করতে হবে। মানুষের মধ্যে সচেতনা বৃদ্ধি করতে সব ধরণের পদক্ষেপ নিতে হবে।
  • পুকুর, লেক, খাল খনন করে বৃষ্টির জল জমিয়ে রাখতে হবে।
  • ভূগর্ভস্থ পানির পরিবর্তে ভ‚পৃষ্ঠের পানি ব্যবহারে গুরুত্ব দিতে হবে। প্রাযুক্তিক উপায়ে জলদূষণ রোধ করতে হবে।
  • কৃষিকাজে ভূগর্ভস্থ পানির ব্যবহার কমানো এখন সময়ের দাবি। কারণ এক কেজি ধান উৎপাদনে প্রায় ৩৩০০ লিটার পানি লাগে। আর একজন মানুষ ৩৩০০ লিটার বিশুদ্ধ পানি দিয়ে সাড়ে ৩ বছর তার জীবনধারণ করতে পারবে। বিএডিসির সূত্রে, দেশে প্রায় ১৭ লাখ শ্যালো টিউবওয়েল দ্বারা সেচের জন্য পানি উত্তোলন করা হয়। কিন্তু ভূগর্ভস্থ পানির স্তর ক্রমাগত নিচে নেমে যাওয়ায় প্রায় ৪ লাখ শ্যালো টিউবওয়েল অকেজো হয়ে পড়েছে। বরেন্দ্র অঞ্চলে পানির স্তর আশঙ্কাজনকভাবে নেমে যাচ্ছে। জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী প্রতি বছর ১ থেকে ৩ লাখ নলকূপ স্থাপন করা হচ্ছে। এ পরিস্থিতিতে সেচ কাজে বিজ্ঞানসম্মত আধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহার করে পানির ব্যবহার কমাতে হবে। এসব পদ্ধতির মধ্যে ক্ষুদ্র সেচ প্রযুক্তিতে ঘন ঘন বিরতিতে অল্প অল্প পরিমাণে জল সরাসরি গাছের শিকড়ের গোড়ায় প্রেরণ,  স্প্রিক্লার যন্ত্রের সাহায্যে ফোয়ারার মত বর্ষণ সেচ পদ্ধতি চালুসহ কম পানিতে চাষের বিভিন্ন পদ্ধতি আবিষ্কার করতে হবে। 
  • পানির দূষণের অন্যতম কারণ শিল্পবর্জ্য ও কঠিন বর্জ্য। রাজধানী ও আশেপাশের অসংখ্য শিল্প প্রতিষ্ঠান কোন রকম পরিশোধন ছাড়াই দূষিত পানি সরাসরি নদী-খাল-জলাশয়ে ফেলছে। ফলে এসব পানি হয়ে পড়ছে ব্যবহার অনুপোযোগী। সঠিক পরিশোধন ছাড়া এসব দূষিত পানি যেন ছাড়া না হয় সে ব্যবস্থা গ্রহন করতে হবে।
  • নব্যতা হারানো নদী খননের ব্যবস্থা নিতে হবে। পাশাপাশি নদীর পানি যেন যতটা সম্ভব কৃষিকাজে ব্যবহার করা যায় সে লক্ষ্যে পুরাতন খাল খনন ও নতুন করে খাল কাটা প্রয়োজন। আর এই খালের পানি দিয়ে কৃষিতে সেচের ব্যবস্থা করতে হবে।
  • সরকারী খাস জমিতে পুকুর ও জলাধার খনন করে সেখানে পানি ধরে রাখার ব্যবস্থা করতে হবে। এতে যেমন মাছ চাষ করা যাবে তেমনি পরিবেশও থাকবে শীতল।
  • খাল-বিলে আধার তৈরি করে বৃষ্টির পানি মাটির নিচে পাঠানোর ব্যবস্থা নিতে হবে।
  • বৃষ্টির জল ভূগর্ভস্থ জলের ব্যবহার যত সম্ভব কমানোর সবচেয়ে ভালো উপায় হল বৃষ্টির জল সংরক্ষনের ব্যবস্থাপনা। বিশেষজ্ঞদের মতে ৬৭৬ বর্গমিটার বাড়ির ছাদের বৃষ্টির জল ধরে রাখতে পারলে তা অন্তত ৪০ জন মানুষের সারা বছরের জলের চাহিদা মেটাতে পারবে। এজন্য সরকারী-বেসরকারী প্রতিষ্ঠানে রেইন ওয়াটার হার্ভেস্টিং ব্যবস্থা রাখার জন্য পদক্ষেপ নিতে হবে।  
  • জলা ভূমি ও ছোট বড় জলাশয় রক্ষা করতে হবে। প্রয়োজনে নতুন নতুন জলাশয় সৃষ্টি করতে হবে।
  • বনাঞ্চল সৃষ্টি ও সবুজায়নের মাধ্যমে মাটির জলধারণের ক্ষমতা বাড়িয়ে ভূগর্ভস্থ জলতলের সমতা বজিয়ে রাখতে হবে।

জাতিসংঘের জনসংখ্যা সংক্রান্ত এক গবেষণায় বলা হয়েছে, ২০২৫ সালে ৪৮টি দেশে বসবাসকারী ২৮০কোটিরও বেশি মানুষ পানির অভবে পড়বে। ২০৫০ সালে এ ধরনের দেশের সংখ্যা দাঁড়াবে ৫৩ টিতে এবং পানির অভাবে থাকা মানুষের সংখ্যা হবে ৪০০ কোটি।

২০১১ সালের বিশ্ব পানি দিবসে সতর্ক করে বলা হয়েছিল তেল বা গ্যাস নয়, আগামীতে যুদ্ধ হবে পানি নিয়ে, যার উপসর্গ দেখা দিয়েছে লেবানন-ইসরায়েলের মধ্যে হাসবানি নদীর পানি নিয়ে বিরোধ, তুরস্ক-সিরিয়া ও ইরাকের মধ্যে ইউফ্রেটিস নদী, ইসরায়েল-ফিলিস্তিন ও জর্ডানের মধ্যে জর্ডান নদী, সুদান, মিশর, ইথিওপিয়া ও আরও কিছু দেশের মধ্যে নীলনদ নিয়ে, সেনেগাল ও মৌরিতানিয়ার মধ্যে সেনেগাল নদী নিয়ে, ইরান ও আফগানিস্তানের মধ্যে হেলমান্দ নদী নিয়ে টানাহেঁচড়া লেগে আছে।

আর বাংলাদেশ-ভারতের মধ্যে নদীর পানি প্রাপ্যতা নিয়ে রয়েছে চরম উত্তেজনা। তাই পানি ব্যবস্থাপনা নিয়ে আমাদের নতুন করে ভাবতে হবে। পানি নিয়ে উদ্ভূত সব সমস্যার সমাধানে বাস্তবমুখী পরিকল্পনা গ্রহণ করতে হবে। তা না হলে অচিরেই পানি নিয়েই যুদ্ধের সম্মুখীন হতে হবে। পাশাপাশি ডুবে যাবে অনেক জনপদ।

সুপেয় পানি সঙ্কট মোকাবিলায় সুপেয় পানির উৎস রক্ষার পাশাপাশি সুষ্ঠু পানি ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করতে হবে। তাই ভূ-উপরিস্থ ও ভূ-গর্ভস্থ উভয় পানির উৎসকে রক্ষা করতে হবে। এগুলো আমাদের সম্পদ। আমাদের সম্পদ আমাদেরকেই পরিচর্যা ও যত্ন করতে হবে, বাঁচাতে হবে নিজেকে এবং পৃথিবী সব প্রাণসম্পদকে।


প্রকাশকালঃ বন্ধন, ১৪১তম সংখ্যা, মে ২০২২

মুহাম্মাদ আহসান
+ posts

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Scroll to Top