নগর পরিকল্পনা একটি কারিগরী ও রাজনৈতিক প্রক্রিয়া যার মাধ্যমে ভূমির ব্যবহার এবং নাগরিক জীবনব্যবস্থার নকশা প্রণয়ন করা হয়। এই প্রক্রিয়ার মধ্যে বায়ু, পানি, নগরের অবকাঠামো, পরিবহণ ব্যবস্থা, পরিসেবা ব্যবস্থাপনা ইত্যাদি অন্তর্ভুক্ত। নগর পরিকল্পনার মাধ্যমে মানব বসতির সঠিক উন্নয়ন নিশ্চিত হয়। নগরের সম্পদ (যেমন পানি, গ্যাস) কীভাবে মানুষের কাছে পৌছে দেয়া হবে, অবকাঠামোগত বিন্যাস ও স্থানভেদে ভূমির সঠিক ব্যবহার নিশ্চিতিকরণ ইত্যাদি বিষয় নগর পরিকল্পনার মাধ্যমে বাস্তবায়ন করা হয়। নগর সম্পর্কিত গবেষণা ও বিশ্লেষণ, কৌশলগত চিন্তা, স্থাপত্য, নগর নকশা, জনমত নিরীক্ষণ, নীতিমালা প্রণয়ন, বাস্তবায়ন ও ব্যবস্থাপনা নগর পরিকল্পনার বৃহৎ ক্ষেত্রের অন্তর্গত। নগর পরিকল্পনার অন্যতম বিষয় নগরের কোন অংশবিশেষের নকশা প্রণয়ন করা। নগরের সঠিক ব্যবস্থাপনা নিশ্চিতের উদ্দেশ্যে প্রয়োজনীয় নীতিমালা প্রণয়নে নগর পরিকল্পনাবিদগণ কাজ করে থাকে।
বাংলাদেশে নগর পরিকল্পনার কথা বললে প্রথমেই মাথায় আসে রাজধানী ঢাকার কথা। আর ঢাকা যে একটি অপরিকল্পিত নগরী তা বলতে কারো বিশেষজ্ঞ হতে হয় না। প্রায় দুই কোটি মানুষের এই নগরীর শোচনীয় অবস্থার প্রেক্ষিতে যে কেউ চোখ বুঁজে বলে দিতে পারবেন। ট্র্যাফিক জ্যাম, জলাবদ্ধতা, মশার অত্যাচার, শব্দদূষণ, অপরিকল্পিত আবাসন, বস্তি, ফুটপাথ দখল প্রভৃতি এই মহানগরীর প্রধান বৈশিষ্ট্য। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো (বিবিএস) এবং জাতীয় জনসংখ্যা গবেষণা ও প্রশিক্ষণ প্রতিষ্ঠান (নিপোর্ট)-এর তথ্য অনুযায়ী, প্রতিদিন ঢাকা শহরের জনসংখ্যা বাড়ছে ১ হাজার ৪১৮ জন করে। বছরে যা দাঁড়ায় পাঁচ লাখ সাড়ে ১৭ হাজার। ফলে ঢাকা শহর উপরের দিকে যেমন বাড়ছে, বাড়ছে আনুভূমিকভাবেও। আর এই বৃদ্ধি হচ্ছে কোনো সমন্বিত পরিকল্পনা ছাড়াই।
নগর পরিকল্পনার প্রধান উদ্দেশ্য হল পরিবেশ ও নগরকাঠামোকে সম্বৃদ্ধ ভবিষ্যতের জন্য প্রস্তুত করা, যেমন প্রস্তাবিত এলাকায় পরিবেশগত সম্পদ ও গাছপালার উপস্থিতি নিশ্চিত করা, পরিবহন ব্যবস্থা, আবাসিক এলাকা, বাণিজ্যিক এলাকা, শিল্প এলাকা, গণপরিসর, বিনোদন এলাকাগুলোর মডেলিং ও শ্রেণীবিভাগ, প্রস্তাবিত নগর এলাকার জনসংখ্যা এবং জনগণের চাহিদা অনুযায়ী যোগাযোগ ও অন্যান্য বন্টন সংযোগ প্রভৃতি ব্যবস্থার সুষ্ঠু প্রয়োগ নিশ্চিত করা। এছাড়াও নগর পরিকল্পনার প্রধান উদ্যেশ্য হল উন্নত মানব বসতি এবং জনকল্যাণ, যেমন, ভাল স্যানিটেশন এবং পরিবেশের দক্ষ ব্যবহার (যার মধ্যে বায়ু এবং জল দূষণ হ্রাস করা এবং কার্বন নিঃসরণ হ্রাস করা) আরও ভাল উপায়ে এবং এর মাধ্যমে অর্থনৈতিক উন্নয়নের জন্য দৃঢ় ভিত্তি।
নগর পরিকল্পনার প্রেক্ষাপট
ঊনবিংশ শতকের মাঝামাঝি সময়ে শিল্প নগরীগুলোতে উদ্ভূত সমস্যার প্রতিক্রিয়া থেকে নগর পুনর্গঠনের প্রক্রিয়া শুরু হয়। এই প্রক্রিয়াই আধুনিক নগর পরিকল্পনার সূচনা করে। ঊনবিংশ শতকের মাঝামাঝি সময়ে শিল্প নগরীগুলোতে উদ্ভূত সমস্যার প্রতিক্রিয়া থেকে নগর পুনর্গঠনের প্রক্রিয়া শুরু হয়। এই প্রক্রিয়াই আধুনিক নগর পরিকল্পনার সূচনা হয়। এছাড়া নগরের পুনঃউন্নয়ন বা পুনর্গঠনের ক্ষেত্রেও নগর পরিকল্পনা কাজ করে। বিশ্বের অনেক দেশে ক্রমশ বর্ধিষ্ণু নগরায়নের প্রেক্ষাপটে সঠিকভাবে নগরের উন্নয়নের ক্ষেরে নগর পরিকল্পনার প্রয়োগ করা হয়। বিংশ শতাব্দীর শেষাংশে একটি ধারণা প্রবর্তিত হয় যে সকল ধরনের পরিকল্পনার মূল লক্ষ্য টেকসই উন্নয়ন নিশ্চিতকরণ।
নগর পরিকল্পনার বিবেচ্য বিষয়
নগর এলাকার নকশা এবং পরিকল্পনা জনসংখ্যার ঘনত্বের উপর নির্ভর করে। জনসংখ্যা বেশি হলে উন্নয়নের ভারসাম্য নষ্ট হয় এবং গ্রিনহাউস গ্যাস ও দূষণ বৃদ্ধির মতো বিভিন্ন প্রভাবের দিকে নিয়ে যায়। শহুরে নকশা এবং পরিকল্পনা করার সময় নিম্নে উল্লেখিত দিকগুলো বিবেচনা করা উচিত:
নান্দনিকতা: নগর পরিকল্পনা ও নকশায় নান্দনিকতা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। নান্দনিক নগর বাসিন্দাদের মানসিক উন্নয়নে সাহায্য করে পাশাপাশি নগরকে দেয় মনোরম চেহারা।
প্রাকৃতিক দুর্যোগ থেকে রক্ষা: শহরাঞ্চলের পরিকল্পনা করার সময় বন্যা ও ঝড়ের ঝুঁকি বিবেচনা করা উচিত। চরম আবহাওয়া বা অন্যান্য জরুরী পরিস্থিতিতে, নিরাপদ এবং নিরাপদ স্থানান্তর রুট থাকা উচিত। অনেক পরিকল্পিত শহরে নিরাপদ আশ্রয়কেন্দ্র, দূর্যোগ প্রতিরোধী বাঁধ নির্মাণ করা হয়।
বস্তি: দ্রুত নগরায়নের ফলে বিশ্বের প্রধান শহরগুলোতে, বিশেষ করে উন্নয়নশীল দেশগুলোতে বস্তির সংখ্যা বৃদ্ধি পায়। বস্তি যেন না গড়ে ওঠে, সে জন্য নিম্ন আয়ের মানুষের জন্য আবাসন পরিকল্পনা থাকা জরুরী।
পরিবহন: শহর এলাকায় সকলের জন্য পরিবহন ব্যবস্থা নিশ্চিত করা একটি বড় সমস্যা। ট্রাফিক বৃদ্ধি পরিবেশের ওপর বিরূপ প্রভাব ফেলতে পারে এবং গ্রিনহাউস গ্যাসের উৎপাদন বাড়ায়। প্রশস্ত রাস্তা নির্মাণই যানজটের একমাত্র সমাধান নয়। চওড়ার চেয়ে ভালো ইন্টারসেকশন ডিজাইন রাস্তাকে দক্ষ করে তোলে। পাশাপশি সার্ভিস, রিং ও পাইপাস রোড যানজট নিরসনে দারুণ সহায়ক।
স্যাটেলাইট টাউন: কেন্দ্রের সাথে যুক্ত স্যাটেলাইট শহরের পরিকল্পনা নাগরিকদের জীবনমান উন্নত করে এবং শহুরে যানজট হ্রাস করে। স্যাটেলাইট শহর প্রধান শহর থেকে কিছুটা বিচ্ছিন্ন এবং প্রশাসনিক, অর্থনৈতিক এবং সামাজিক স্তরে মোটামুটি স্বয়ংসম্পূর্ণ। এই বিকল্পটি দ্রুত বর্ধনশীল শহরের জন্য ব্যবহার করা উচিত।
পরিবেশগত কারণ: প্রাকৃতিক সম্পদ এবং গাছপালা রক্ষার চেষ্টা করা উচিত। এটি তাপ নিয়ন্ত্রন করে, দূষিত বাতাস শোষণ করে সতেজ বাতাস সরবরাহ করে এবং জলবায়ু পরিবর্তনকে কিছুটা হলেও নিয়ন্ত্রণে সহায়ক ভ‚মিকা রাখে।
জোনিং: জোনিং বলতে বোঝায় উন্নত প্রশাসন এবং টেকসই উন্নয়নের জন্য আবাসিক, বাণিজ্যিক, শিল্প এলাকা ইত্যাদির মতো ক্ষেত্রগুলিকে শ্রেণিবদ্ধ করা। সুতরাং এই অঞ্চলে যে সমস্ত ক্রিয়াকলাপ সম্পাদন করা উচিত বা করা উচিত নয় সেগুলো জোনিং এ বিশেষভাবে উল্লেখ থাকে এবং সে অনুযায়ীই বিভিন্ন অঞ্চল গড়ে ওঠে।
জল এবং স্যানিটেশন: জল এবং স্যানিটেশন পরিকল্পনা এবং শহুরে নকশার একটি মূল বিবেচ্য বিষয়। এটি জনস্বাস্থ্যের সাথেও সম্পর্কিত। তাই শহুরে সেক্টর ডিজাইন করার সময় সর্বদা জল সরবরাহ, বর্জ্য জল পরিশোধন সুবিধা এবং সঠিক নিষ্কাশন ব্যবস্থার যাবতীয় বিষয় পরিকল্পনায় থাকতে হয়।
পরিশেষে
বিশ্বের মোট জনসংখ্যার ৫০ শতাংশ শহরাঞ্চলে বসবাস করে এবং ২০৫০ সালে এটি ৬৮ শতাংশে পৌঁছবে। জনসংখ্যার এই ক্রমবৃদ্ধি স্বাভাবিকভাবেই নগরের প্রতিবেশব্যবস্থা, নাগরিক স্বাস্থ্য তথা সামগ্রিক অর্থনীতির জন্য অত্যন্ত হুমকি। একমাত্র সঠিক পরিকল্পনার মাধ্যমে নগর ও অঞ্চলগুলোকে সাজানো গেলে এ ধরণের সমস্যা অনেকাংশেই মোকাবেলা সম্ভব। প্রকাশকালঃ বন্ধন, ১৪১তম সংখ্যা, মে ২০২২