ঢালাইয়ে কংক্রিটে পানির অনুপ্রবেশ

স্থাপনা তৈরির অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ নির্মাণ উপকরণ কংক্রিট। বস্তুটির সঠিক ব্যবহার নিশ্চিতকরণের ওপরই নির্ভর করে স্থাপনার স্থায়িত্ব। তাই আমরা যদি নির্মাণে কংক্রিটের গুণগতমান ও পরিমাণ সঠিক সময়ে, সঠিকভাবে ব্যবহার করতে না পারি, তাহলে তা ভবনের বাহ্যিক ও অভ্যন্তরীণ পরিবেশকে নষ্ট করে ভবনকে ব্যবহারের অনুপযোগী করে তোলে। এটা ভবনের জন্য মারাত্মক হুমকি। তাই আমাদের উচিত সঠিক নিয়মে পর্যাপ্ত পর্যবেক্ষণের মাধ্যমে ভবনের ঢালাইয়ের কাজ করা। তাই চলুন দেখি ঢালাই ও প্লাস্টারের কাজ সঠিক নিয়মে ও সময়ের মধ্যে না করলে ভবিষ্যতে ভবনে কী কী সমস্যা হতে পারে।

ঢালাই নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে না করার পেছনে প্রধান বাধা হতে পারে বৃষ্টি। তবে তা বর্ষা মৌসুমের জন্য। অনেক সময় দেখা যায় বিশেষত গ্রামাঞ্চলে মিস্ত্রিরা বৃষ্টিকে উপেক্ষো করেই ঢালাইয়ের কাজ করে। আবার অনেকেই ঢালাইকালে অজ্ঞতাবশত কংক্রিটে অতিরিক্ত পানি মেশায়। রেডিমিক্স কংক্রিটের ক্ষেত্রে যানজটে অতিরিক্ত সময় ব্যয় হয়। এসব কারণে কংক্রিটের স্বাভাবিক গুণাগুণ নষ্ট হয়। শ্রমিক মজুরি বা সময় বাঁচাতে কেউ যদি বৃষ্টি উপেক্ষা করে নির্মাণকাজ চালিয়ে যায়, তাহলে তা ভবনের জন্য মারাত্মক ক্ষতির কারণ হয়ে দাঁড়ায়।

কংক্রিট তৈরিতে খোয়া, বালু, সিমেন্ট, পানি একটি নির্দিষ্ট অনুপাতে মেশানো হয় একটি নির্দিষ্ট শক্তিমাত্রা পেতে (Strength Gain)। এর মধ্যে পানির সঙ্গে সিমেন্টের একটি নির্দিষ্ট অনুপাত থাকে, যা সিমেন্টকে জমাট বাঁধতে সহায়তা করে। কারণ, সিমেন্ট তখনই জমাট বাঁধবে, যখন সিমেন্টে Hydrolysis Reacting ঘটবে। আর এই Hydrolysis ঘটানোর প্রধান সহায়ক উপাদান হলো পানি। তাই সম্পূর্ণ সিমেন্ট যাতে Hydrolysis হয়, তার জন্য সিমেন্টের পরিমাণের ওপর নির্ভর করে একটি নির্দিষ্ট পরিমাণ পানি মেশানো হয় সিমেন্টে। আর তাই আমরা যখন কংক্রিট তৈরি করি, তখন একটি নির্দিষ্ট পরিমাণ পানি মেশাই। যদি এই পরিমাণের চেয়ে কম বা বেশি পানি মেশাই তাহলে উভয় ক্ষেত্রেই তা কংক্রিটের Total Ultimate Strength Gain সৃষ্টিতে প্রতিবন্ধকতা তৈরি করবে। এটা আবার কেমন?

যদি আমরা পরিমাণের চেয়ে কম পানি ব্যবহার করি বা মেশাই তাহলে সিমেন্ট সম্পূর্ণভাবে Hydrolysis হবে না। এর কারণ, সিমেন্ট সম্পূর্ণ Hydrolysis হতে যে পরিমাণ পানি দরকার তা দেওয়া হচ্ছে না। এ ক্ষেত্রে সম্পূর্ণ সিমেন্ট জমাট বাঁধবে না। যার ফলে কংক্রিটের Design Strength কমে যাবে, যা হবে ভবনের জন্য হুমকিস্বরূপ।

অপর দিকে যদি কংক্রিটে পরিমাণের চেয়ে বেশি পানি ব্যবহার করা হয় অথবা বৃষ্টি বা অন্য কোনো কারণে কংক্রিটে যদি অতিরিক্ত পানি প্রবেশ করে, তাহলে সিমেন্ট তার Total Hydrolysis হতে যে পরিমাণ পানি লাগবে তা সে গ্রহণ করবে। বাকি পানি কংক্রিটের মধ্যে অবস্থান করবে। তবে পানি যদিও পরে কিউরিংয়ের সময় কংক্রিটের সিমেন্ট Hydrolysis-এর সময় শোষণ করে নেবে। কিন্তু সে ক্ষেত্রে একটা সমস্যার সৃষ্টি হবে, তা হলো সিমেন্ট যখন পানি শোষণ করে নেবে তখন পানির অবস্থানটাতে একটা শূন্যতার সৃষ্টি হবে, যা ভবনের ভবিষ্যতের জন্য মারাত্মক ক্ষতিকর প্রভাব ফেলে। কীভাবে? ভবনের বিভিন্ন উপকরণে (Element) যখন ছোট ছোট ফাটল (Crack) তৈরি হবে, তখন ওই ছিদ্রের কারণে ফাটল আরও বড় আকার ধারণ করবে। যার ফলে এ ফাটল দিয়ে প্রবেশ করা পানি রডে মিশে মরিচা সৃষ্টি করে ভবনকে আস্তে আস্তে দুর্বল করে ফেলবে। এভাবে অসংখ্য বড় ফাটল তৈরি হবে, যা ভবনের জন্য মোটেও ভালো ফল বয়ে আনবে না। তাই সঠিক ও নির্দিষ্ট পরিমাণ পানি মিশিয়ে বৃষ্টির পানি বা অন্য কোনো পানি কংক্রিটে মিশতে দেওয়া থেকে প্রতিরোধ করে ভালো মানের কংক্রিট তৈরি করার মাধ্যমে একটা Structure-কে শক্তিশালী করার কোনো বিকল্প নেই।

তাই আমাদের উচিত হবে কংক্রিট তৈরি করার সময় পরিমাণমতো সব উপাদান ভালো করে মেশানো এবং আরও উচিত হবে কংক্রিটকে ঢালাই করার সময় যেন অতিরিক্ত কোনো পানি কংক্রিটে মিশতে না পারে সে জন্য বৃষ্টির সময় প্রায় সব ধরনের ঢালাই থেকে বিরত থাকা। একজন প্রকৌশলীকে যেমন সচেতন থাকা উচিত, তেমনি একজন ঠিকাদার ও রাজমিস্ত্রি তার কাজের গুণকে ফুটিয়ে তোলার জন্য বিষয়গুলো সম্পর্কে অবগত থাকা উচিত। এবং একজন বাড়ির মালিকেরও এ জ্ঞান সম্পর্কে ধারণা থাকা উচিত। তাঁর অতি শখের, কষ্টের ও অর্থের বিনিময়ে বানানো বাড়িটা যেন সামান্য অবহেলায় কোনো ক্ষতির সম্মুখীন না হয়।

প্রকাশকাল: বন্ধন, ৬৪তম সংখ্যা, আগস্ট ২০১৫

প্রকৌশলীয় সুখ দেব
+ posts

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Scroll to Top