বিশ্বব্যাপী জনসংখ্যা বৃদ্ধি, নগরায়ণ আর শিল্পায়নের ফলে ভূগর্ভস্থ পানির ব্যবহার ক্রমেই বাড়ছে। ভূগর্ভস্থ পানির অধিক ব্যবহারের কারণে দ্রুত নামছে পানির স্তর। ফলে দেখা দিচ্ছে সুপেয় পানির সংকট। মানবজাতির জন্য এটা বড় হুমকি। এই হুমকি মোকাবিলায় বিজ্ঞানী ও উদ্ভাবকেরা আবিষ্কার করছেন নব নব প্রযুক্তি ও কৌশল। ভূগর্ভস্থ পানির ব্যবহার কমিয়ে ভূউপরিস্থিত পানির ব্যবহার বাড়ানোর উপায় বের করতে রেইন ওয়াটার হার্ভেস্টিং, নদী-জলাশয়ের পানি ব্যবহার, লোনা পানি বিশুদ্ধকরণসহ নানা ধরনের প্রচেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন তাঁরা। এ প্রচেষ্টার ধারাবাহিকতায় গবেষকেরা উদ্ভাবন করেছেন ওয়াটার সেভিং ব্রিক বা বৃষ্টির পানি সংগ্রাহক ইট।
আমাদের নিত্যপ্রয়োজনীয় ব্যবহারিক দ্রব্যের তালিকায় রয়েছে প্লাস্টিক। প্লাস্টিক সামগ্রীর বহুল ব্যবহারের ফলে সৃষ্টি হচ্ছে প্রচুর প্লাস্টিক বর্জ্য, যা পরিবেশের ওপর বিরূপ প্রভাব ফেলছে। প্রাকৃতিক এ সমস্যা সমাধানে নির্মাণশিল্পের নতুন আবিষ্কার ওয়াটার সেভিং ব্রিকস, যা প্রাকৃতিক ভারসাম্য রক্ষার রাখতে পারে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা। ওয়াটার সেভিং ব্রিকস বাতিল প্লাস্টিক ও শুকনো গাছের পাতার মিশ্রণে তৈরি বিশেষ ধরনের ইট, যা বৃষ্টির পানি সংগ্রহের কাজে ব্যবহার করা হয়। সেভ ওয়াটার ব্রিকস ডিজাইন প্রকৃতপক্ষে অসাধারণ ডিজাইন। এই ডিজাইনের ফলে পরিত্যক্ত মালামাল (প্লাস্টিক বর্জ্য ও গাছের পাতা) ব্যবহার করে সেগুলোকে ইট তৈরির কাজে লাগানো যায়, যার ফলে পরিবেশ থাকে সুরক্ষিত। এই ইট ভবনের বাইরের দেয়াল ও উন্মুক্ত স্থানে ব্যবহার করা হয়, যাতে পর্যাপ্ত বৃষ্টির পানি সংগ্রহ করতে পারে। আর সংগৃহীত পানি সরাসরি বাগান, পুকুর, সেচ, অগ্নি নির্বাপন, টয়লেট অথবা পরিশোধিত করে মানুষের ব্যবহারিক কাজে লাগানো যায়। এই ইট তৈরির মাধ্যমে প্লাস্টিক বর্জ্যরে পুনর্ব্যবহার সম্ভব।
ভবন তৈরির উপাদান হিসেবে ইটের ব্যবহার নতুন কিছু নয়। কিন্তু সময়ের সঙ্গে সঙ্গে গবেষকেরা ইটের উপাদান, উৎপাদন পদ্ধতি, আকার-আকৃতি ও বৈশিষ্ট্যের পরিবতর্নে এনেছেন নতুনত্ব। যার ফলে নির্মাণশিল্পে ইটের গুরুত্ব বাড়ার পাশাপাশি এসেছে গতি ও সৃজনশীলতা। তেমনই বিকল্প নির্মাণসামগ্রীর অনুসন্ধান করে ডিজাইনার জিন ইয়াং য়্যুন (Jin-Young Yoon) এবং জেং ওয়ং কওন (Jeong Woong Kwon) পুনর্ব্যবহারের উপযোগী পরিত্যক্ত মালামাল ব্যবহার করে ইট তৈরির নতুন পথ আবিষ্কার করেন। বৃষ্টির পানি জমানোর জন্য ইটের ব্যবহার করে নতুন প্রথা প্রবর্তন করেন তাঁদের সেভ ওয়াটার ব্রিকসের ডিজাইনে। যা Incheon International Design Award Competition 2009-এর চূড়ান্ত পর্বে মনোনীত হয়। ডিজাইনের বিষয়বস্তু ছিল ‘গ্রিন ডিজাইন ও ডেইলি লাইফ’। ডিজাইন অনুযায়ী আমাদের চারপাশের পরিত্যক্ত প্লাস্টিক বর্জ্য ও গাছের শুকনো পাতা চূর্ণ করে ব্লেডিং তৈরি করা হয়। আর এই ব্লেডিং থেকে উৎপাদিত হবে পরিবেশবান্ধব ও বৃষ্টির পানি সংগ্রহকারী ওয়াটার সেভিং ব্রিকস। এই ইট একদিকে যেমন বর্জ্য পদার্থের সদ্ব্যবহার করে পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষা করে, অন্যদিকে বৃষ্টির পানি সংগ্রহ করে পানির চাহিদা কিছুটা হলেও পূরণ করে।
ওয়াটার সেভিং ব্রিকসের আকার-আকৃতির তেমন কোনো বাধ্যবাধকতা নেই। মূলত চাহিদা ও ব্যবহারের ওপর ভিত্তি করেই এই আকার নির্ধারণ করা হয়। তবে এই ইটের উপরিপৃষ্ঠে রয়েছে তিনটি গর্ত, যেগুলো বৃষ্টির পানি সংগ্রহ করতে সাহায্য করে। এ ছাড়া ইটের পাশে পানি প্রবাহের একটি খাত রয়েছে। যেটা দেখতে অনেকটা S কার্ভ ডিজাইনের। এই খাত বা নালা সরাসরি বৃষ্টির পানি বহন করে ভূ-গর্ভস্থ পানির ট্যাংকে সংরক্ষণে সাহায্য করে। এই ইটের পানি শোষণের পরিমাণ কম ও ওজনে হালকা।
এক জরিপে দেখা গেছে, কোরিয়ায় প্রতিবছর প্রায় ২০ টনের বেশি শুকনো পাতা নিঃসরিত হয়। পতিত পাতার কিছু অংশ ফ্লিম প্রোডাকশনের কাজে ব্যবহৃত হলেও বেশির ভাগ অংশ ফেলে দেওয়া অথবা পুড়িয়ে ফেলা হয়। এতে একদিকে যেমন তেল খরচ হয় অন্যদিকে প্রচুর কার্বন ডাই-অক্সাইড নির্গত হয়, যা পরিবেশের জন্য মারাত্মক হুমকিস্বরূপ। উপরিউক্ত তথ্য থেকে প্রতীয়মান হয় ওয়াটার সেভিং ব্রিকস একটি নতুন ধারণার জন্ম দেয়, যার ফলে বর্জ্য পদার্থের সঠিক ব্যবহার করে পরিবেশদূষণ অনেক কমিয়ে আনা সম্ভব।
বর্তমান বিশ্বে প্লাস্টিক বর্জ্য মাথাব্যথার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে, সঙ্গে রয়েছে বিশুদ্ধ পানির অপ্রতুলতা। ওয়াটার সেভিং ব্রিকস ব্যবহারে এই সমস্যাগুলোর সমাধান করা সম্ভব। তাই বহির্বিশ্বে এই ডিজাইনকে গুরুত্বের সঙ্গে মূল্যায়ন করা হচ্ছে। ভবিষ্যতে আমাদের দেশেও এই ইট ব্যবহার করা প্রয়োজন। বিশেষ করে উপকূলীয় অঞ্চলে যেখানে স্বাদু পানির চরম সংকট রয়েছে। রেইন ওয়াটার হার্ভেস্টিং প্ল্যান্টের সাহায্যে বৃষ্টির পানি সংরক্ষণ করে খাবার পানির উৎস কিছুটা নিশ্চিত করা গেলেও কাপড় কাচা, গবাদিপশুর খাবার পানি, চাষাবাদসহ অন্যান্য কাজে ব্যবহারে এই প্রযুক্তি অত্যন্ত কার্যকর হবে। এমনকি নগরের আবাসিক বা সরকারি ভবনে বৃষ্টির পানি ধরে রাখাতে এমন ব্যবস্থা নেওয়া যেতে পারে। বাংলাদেশে প্রতিবছর গড়ে দুই হাজার মিলিমিটার বৃষ্টিপাত হয়, যা বিশ্বের গড় বৃষ্টিপাতের চেয়ে ৮০০ মিলিমিটার বেশি। বাড়তি এই বৃষ্টির পানি সংরক্ষণ করে ভূগর্ভস্থ পানির সংকট মোকাবিলা করা সম্ভব।
প্রকাশকাল: বন্ধন, ৬৩তম সংখ্যা, জুলাই ২০১৫