উন্নয়ন পরিকল্পনা ও নিয়ন্ত্রণে যত অসংগতি

উন্নয়ন পরিকল্পনা প্রণয়ন, বাস্তবায়ন ও নিয়ন্ত্রণে দ্বৈততা, বিভিন্ন ধরনের অসংগতি ও সমন্বয়হীনতার বিষয়টি সর্বজনবিদিত। তন্মধ্যে একই কাজ বিভিন্ন সংস্থার মাধ্যমে এমনকি অনেক ক্ষেত্রে একই সময় ও এলাকায় বাস্তবায়ন, স্ব-স্ব শিডিউল অব স্পেশিফিকেশন ও রেটে কাজ পরিচালনা, দায়িত্বপ্রাপ্ত লোকজনের সাইটে সাইটে অনুপস্থিতি ও অসমন্বিত উন্নয়নের বিষয়গুলো প্রণিধানযোগ্য। কিছু কাজ যেমন রাস্তার পাশে ড্রেন নির্মাণ বিভিন্ন সংস্থার মাধ্যমে সম্পাদন করে কিছুদিন যেতে না-যেতেই তা ভেঙে ফেলা বা অকার্যকর হওয়ার বিষয়টি সর্বত্র চোখে পড়ে। অনুরূপভাবে অনেক ক্ষেত্রে সড়কে একেক সংস্থার অধীনে একেক ধরনের মিডিয়ান বা আইল্যান্ড নির্মাণ করে অল্প কিছুদিন পর তা ভেঙে ফেলা বা স্ব-স্ব ডিজাইনে নতুন করে নির্মাণের প্রবণতা দেখা যায়। এই প্রক্রিয়ায় অনেক সময় কোনো কোনো ক্ষেত্রে কাজের বাস্তবায়ন না করেই ঠিকাদারকে বিল প্রদানের অভিযোগও রয়েছে। তা ছাড়া দেশের উন্নয়নকাজে ‘পুকুরচুরি’ বলেও একটা কথা প্রচলিত আছে। বাস্তবে স্থানীয় থেকে কেন্দ্র সব পর্যায়েই এই সমস্যা বিদ্যমান। স্থানীয় পর্যায়ে যেমন ইউনিয়ন পরিষদ, পৌরসভা, জেলা পরিষদ বা উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের কাজে দ্বৈততা ও সমন্বয়হীনতা, তেমনি শহর-নগর পর্যায়ে বিভিন্ন মন্ত্রণালয় ও তদীয় বিভিন্ন সংস্থার মধ্যে এই বিষয়টি দিনে দিনে প্রকট থেকে প্রকটতর হচ্ছে। যে কারণে, পৌর ও শহর-নগর এলাকায় বিভিন্ন সার্ভিসেস লাইনের (পানি, পয়ঃপ্রণালি, গ্যাস, বিদ্যুৎ, টেলিফোন ইত্যাদি) কাজের বাস্তবায়ন, রক্ষণাবেক্ষণ ও সম্প্রসারণে বরাবরই সৃষ্টি হয় সমস্যার। স্থানীয় থেকে কেন্দ্রীয় কোনো পর্যায়ে কোনো সেবা সংস্থার কাছে এসব সার্ভিসেসের সঠিক বা As-Built Drawings নেই। ফলে প্রায় ক্ষেত্রে এসব সেবা-সার্ভিসেসের সম্প্রসারণে অনুমানভিত্তিতে খোঁড়াখুঁড়ি চলে, যাতে প্রায়ই প্রয়োজনের চেয়ে বেশি সড়কে কাটাকাটি/খোঁড়াখুঁড়ি হয় এবং কাজের বাস্তবায়ন বিলম্বিত হয়। আবার অনেক ক্ষেত্রে একটি সড়কে এক সংস্থার কাটাকাটি ও খোঁড়াখুঁড়ি শেষ না হতেই আরেক সংস্থার খোঁড়াখুঁড়ি শুরু হয়  এবং একবার কাটাকাটি/খোঁড়াখুঁড়ি শুরু হওয়ার পর কখন যে তা শেষ হয়ে সড়কটি পূর্বাবস্থায় ফিরবে তা অনিশ্চিত। 

সমস্যাটির ব্যাপকতা রাজধানী ঢাকায়। নিঃসন্দেহে অসংখ্য মন্ত্রণালয় ও সংস্থার সম্পৃক্ততায় সুনির্দ্দিষ্টভাবে বলতে গেলে কোনো সমন্বয়কারী না থাকায় সমস্যাটির ব্যাপকতা বেড়েছে। বর্তমানে ১৪-১৫টি মন্ত্রণালয় ও তদীয় ৫০-৫৫টির মতো সংস্থা প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে রাজধানীর উন্নয়ন-প্রক্রিয়া ও ব্যবস্থাপনার সঙ্গে জড়িত। কিন্তু নেই কোনো সমন্বয়ক। ফলে নগরীর উন্নয়নে তথৈবচ অবস্থা। লক্ষ করলে দেখা যায়, প্রাক্-মোগল ও মোগল আমলে স্বতঃস্ফূর্তভাবে গড়ে ওঠে ঢাকা। তখন ঢাকার পরিকল্পিত উন্নয়নে কোনো প্রতিষ্ঠান ছিল না। রাজপরিবারের নিজস্ব দর্শন ও তত্ত্বাবধানে সব করা হতো, যেভাবে গড়ে উঠেছে পুরান ঢাকা। আর কোম্পানি আমলে ঢাকা ছিল সম্পূর্ণ অবহেলিত। তবে ব্রিটিশ আমলে যেসব উন্নয়ন হয়েছে তাতে যথেষ্ট নিয়ন্ত্রণ ছিল, যার প্রতিচ্ছবি ঢাকার রমনা এলাকায় এখনো দৃশ্যমান। ধারণা করা হয়েছিল, পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার পর ওই ধাঁচে বা আরও পরিকল্পিতভাবে ঢাকা তথা দেশের উন্নয়ন ও বিকাশ ঘটবে। কিন্তু তা হয়নি। প্রথমত, পূর্ব ও পশ্চিম পাকিস্তানের উন্নয়নে বৈষম্য তো ছিলই। ফলে যেভাবে পশ্চিম পাকিস্তানের শহর-গ্রামে উন্নয়ন হয়েছে, সেভাবে পূর্ব পাকিস্তানে হয়নি। যার পরিপ্রেক্ষিতে পাকিস্তান-ভারত বিভক্তির অল্প কিছুদিন পর পূর্ব বাংলার (পশ্চিম পাকিস্তানের) মানুষ স্বাধিকার ও স্বায়ত্তশাসনের দাবি অতঃপর স্বাধীনতার দাবিতে আন্দোলনে নেমে পড়ে। যখন অত্র অঞ্চলে কোনো কিছুই আর পরিকল্পনা মোতাবেক বাস্তবায়িত হয়নি। নির্মাণ ও উন্নয়ন নিয়ন্ত্রণের জন্য একটি শক্তিশালী ইমারত নির্মাণ আইন প্রণীত হলে সেটিও এখানে তেমন কার্যকর হয়নি। আইনটির দেশজুড়ে কার্যকরণে কোনো প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলা হয়নি, ফলে যা হওয়ার তা-ই হয়েছে। আর স্বাধীন বাংলাদেশে তো ‘স্বাধীন উন্নয়ন’ চলছে! যেখানে যা দরকার নেই, সেখানে তা হচ্ছে। আবার যেখানে যা দরকার, সেখানে তা হচ্ছে না। এই প্রক্রিয়ায় অনেক জায়গায় ব্রিজ বা কালভার্ট নির্মিত হয়েছে, কিন্তু সড়ক নির্মিত হয়নি। অনেক জায়গায় কৃষিজমি নষ্ট, খাল-বিল ভরাট করে পরিবেশের বিপর্যয়সহ আত্মঘাতী উন্নয়নও হয়েছে।

ঢাকায় একসময় অনেক খাল-নালা ও বিল-ঝিল ছিল, যার বেশির ভাগই নগরীর আবাসন সমস্যা নিরসনের নামে ভরাট করে সার্বিক পরিবেশ নষ্ট করা হয়েছে। অন্যদিকে দেশের সবকিছু ঢাকামুখী করায় নগরীতে অস্বাভাবিক জনস্ফীতি ঘটেছে। দেশের হার্ট বা রাজধানী হয়েও কখনো এখানে জনসংখ্যার নিয়ন্ত্রণ ছিল না। স্বাধীনতার পর বিষয়টি আরও প্রকট রূপ নেয়। রাতারাতি ঢাকায় জনসংখ্যা দ্বিগুণ-ত্রিগুণে উন্নীত হয়। আর একটা অনিয়ন্ত্রিত পরিস্থিতিতে যত্রতত্র ঘরবাড়ি নির্মিত হয়ে নগরীর খাল-নালাগুলোও বিলীন হতে থাকে। অথচ এসব খাল-নালাগুলো ছিল ঢাকার লাইফ লাইন ও প্রধান পরিবহন পথ। তখন এসব খাল-নদীপথে জাহাজও চলাচল করত। আশির দশক পর্যন্ত ঢাকার কিছু খাল-নালা দিয়ে নৌকা চলাচল করত, শহর অভ্যন্তরে নদীপথে সব মালামাল পরিবহন করা হতো। কিন্তু এরপর সবকিছু উলটপালট হয়ে যায়। অবশ্য স্বাধীনতার পর জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান চেষ্টা করেছিলেন রাজধানীর উন্নয়নকে নিয়ন্ত্রণে রাখার। এ জন্য তিনি একটা অর্ডিন্যান্সও জারি করেছিলেন, কিন্তু তাঁর অকাল মৃত্যুতে বদলে যায় সবকিছু। 

অথচ ১৯৫৩ সালে প্রণীত নগর উন্নয়ন আইন মতে, ঢাকার মহাপরিকল্পনাভুক্ত এলাকায় যেকোনো ধরনের প্রকল্প গ্রহণের আগে ডিআইটি পরে রাজউকের সঙ্গে পরামর্শকরণ ও মহাপরিকল্পনার ভূমি ব্যবহার অনুসরণে ও অনুমোদন বা অনুমতি গ্রহণ বাধ্যতামূলক। বিষয়টি সমন্বয় ও মনিটরিংয়ের জন্য নগরীর বিভিন্ন সার্ভিসেস সংস্থার প্রধান, পেশাজীবী-নীতিনির্ধারক ও জনপ্রতিনিধির সমন্বয়ে গঠিত একটি শক্তিশালী ‘বোর্ড অব স্ট্র্রাটিজ’ ছিল, যার মাধ্যমে নগরীর উন্নয়ন কর্মকাণ্ড পরিচালিত হতো। বিভিন্ন সংস্থার অধীনে গৃহীতব্য বড় প্রকল্পগুলোর পরিকল্পনা ও বাস্তবায়ন নিয়ে বোর্ড সভায় আলোচনা হতো এবং মনিটরিং করা হতো বাস্তবায়নও। স্বাধীনতার আগ পর্যন্ত ঢাকায় এভাবে কমবেশি সমন্বয়ের মাধ্যমে উন্নয়ন হচ্ছিল। কিন্তু ঝামেলা শুরু স্বাধীনতার পর, বিশেষ করে যখন সিটি করপোরেশনের মেয়রের পদটি পদমর্যাদায় বড় করা হয়। সমস্যাটি জটিল আকার ধারণ করে প্রেসিডেন্ট এরশাদের শাসনামলে, যখন মেজর জেনারেল মাহমুদুল হাসানকে ঢাকার মেয়র করা হয়। তিনি ডিআইটির চেয়ারম্যানের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত ‘বোর্ড অব স্ট্রাটিজ’-এর সভায় আসতেন না। আর তখন যদি নগর উন্নয়ন আইন সংশোধন করে মেয়রের অধীনে বা সভাপতিত্বে ‘বোর্ড অব স্ট্রাটিজ’-এর সভা আহ্বানের ব্যবস্থা করা হতো, তাহলে হয়তো আজকের এই অবস্থার সৃষ্টি হতো না। নব্বইয়ের দশকে দেশে গণতান্ত্রিক শাসনব্যবস্থা প্রতিষ্ঠার পর নির্বাচিত সরকারও নগরীতে সুশাসন প্রতিষ্ঠায় এগিয়ে আসেনি। বরং পূর্বেকার জনপ্রতিনিধিত্বশীল ডিআইটির পরিবর্তে আমলাতান্ত্রিক রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (রাজউক) বহাল রাখা হয় এবং অতঃপর আরেক তুঘলকি সিদ্ধান্তের মাধ্যমে ঢাকা সিটি করপোরেশনকে দ্বিখণ্ডিত করে রাজধানীতে অসমন্বিত উন্নয়নের মাত্রা প্রকট করা হয়।

এটাও লক্ষণীয় যে আমাদের দেশে নগর ও উন্নয়ন পরিকল্পনায়ও রয়েছে অনেক অসংগতি। ১৯৫৬ সালে নগর উন্নয়ন আইনের আওতায় ডিআইটি পরে ১৯৮৭ সালে এটিকে রাজউকে পরিণত করার পর আজ অবধি সংস্থার নগর পরিকল্পনা শাখার অবস্থান ব্যাকবেঞ্চে অর্থাৎ পেছনের সারিতে। দ্বিতীয়ত, সে সময় ঢাকার উন্নয়নে যে মহাপরিকল্পনাটি প্রণীত হয়েছিল, তা প্রাদেশিক রাজধানীর বিবেচনায় প্রণীত। ওই মহাপরিকল্পনাটিতে ঢাকায় ডিপ্লোমেটিক এনক্লেভ তথা বিদেশি সংস্থার স্থাপনা প্রতিষ্ঠায় কোনো ভূমি/স্থান চিহ্নিত করা হয়নি। অবশ্য এমনও হতে পারে, পশ্চিম পাকিস্তানের শাসকগোষ্ঠী তা চায়নি যে বাঙালিরা বিদেশিদের সংস্পর্শে আসুক! ফলে পূর্ব পাকিস্তানে যেসব দেশের কনস্যুলেট ও বিদেশি সংস্থার দপ্তর ছিল, তা নগরীর বিভিন্ন স্থানে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে স্থাপিত হয়। ওই পর্যায়ে জেনারেল আইয়ুব খানের ক্ষমতা দখলের পর ঢাকার মহাপরিকল্পনার অনেক প্রস্তাবনার ব্যত্যয়, পরিবর্তন ও পরিপন্থী উন্নয়নও হতে শুরু করে। অর্থাৎ পরিকল্পনায় যা-ই থাকুক না কেন, রাষ্ট্রপ্রধান যা চান তা-ই হতে থাকে। যে অপসংস্কৃতি থেকে আজ অবধি আমরা আর বের হতে পারিনি। মোট কথা, ষাটের দশক থেকে দেশের পরিকল্পনা, উন্নয়ন এককথায় সবকিছুতে পেশাদারির (Bottom up Approach) পরিবর্তে Top down Approach-এর যাত্রা শুরু হয়। আবার এও সত্য যে ঢাকার প্রথম মহাপরিকল্পাটিতে নগরীর কোথায় কী হবে তা সুনির্দ্দিষ্টভাবে উল্লেখ ছিল না। মহাপরিকল্পনা প্রণেতাদের সুপারিশ ছিল পরিকল্পনায় প্রস্তাবিত ভূমি ব্যবহারের আলোকে এলাকাভিত্তিক জোনাল প্ল্যান (স্থানীয় উন্নয়ন পরিকল্পনা বা DAP) প্রণয়ন করার। কিন্তু তা হয়নি। প্রতি পাঁচ বছর অন্তর মহাপরিকল্পনাটির রিভিউ করারও যে সুপারিশ ছিল, তাও কখনো মানা হয়নি।

জেনারেল আইয়ুব খান ক্ষমতা গ্রহণের পর তাঁর নিজস্ব দর্শনে ঢাকায় একটি সেকেন্ড ক্যাপিটাল নির্মাণের প্রকল্প হাতে নেওয়া হয়। অথচ ১৯৫৯ সালের মহাপরিকল্পনার প্রতিবেদনে বলা হয়, ঢাকায় এ ধরনের প্রকল্প গ্রহণের জন্য উপযুক্ত স্থান হচ্ছে বুড়িগঙ্গা নদীর ওপারে জিনজিরায়। এ জন্য ভবিষ্যৎ ঢাকার বিনির্মাণে নর্থ-সাউথ রোডটি নগরীর উত্তর-দক্ষিণ (বুড়িগঙ্গা নদীর ধার থেকে বিমানবন্দর সড়ক পর্যন্ত) সরাসরি বা সোজাসুজি সম্প্রসারণের সুপারিশ ছিল। কিন্তু এটি সেভাবে বাস্তবায়িত হয়নি। নর্থ-সাউথ সড়কটি দক্ষিণে ইংলিশ রোড প্রান্তে বাধাগ্রস্ত বুড়িগঙ্গার ধার পর্যন্ত যায়নি। আর উত্তর দিকে সড়কটির প্রস্তাবিত এলাইনমেন্টে স্বয়ং জেনারেল আইয়ুব খান কর্তৃক ‘বায়তুল মোকাররম’ মসজিদ নির্মাণের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করে উত্তরমুখী সম্প্রসারণ থামিয়ে দেওয়া হয়। একইভাবে মহাপরিকল্পনায় ভূমি ব্যবহারের ব্যত্যয় ঘটিয়ে তেজগাঁওয়ের পশ্চিমে Experimental Farms-এর জন্য সংরক্ষিত জায়গায় তাঁর নামে সেকেন্ড ক্যাপিটাল বা ‘আইয়ুব নগর’ প্রতিষ্ঠার কার্যক্রম শুরু হয়। অনুরূপভাবে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উল্লে¬-খযোগ্য অংশ উত্তর দিকে ফয়েদাবাদ এলাকায় স্থানান্তর করে সেখানে একটি নতুন বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার জন্য সুপারিশ ছিল, কিন্তু অজ্ঞাত কারণে সেটিও হয়নি।

অন্যদিকে মহাপরিকল্পনার আলোকে কুর্মিটোলার উত্তরে বিস্তীর্ণ জমিতে একটি স্বয়ংসম্পূর্ণ Satellite City প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে বিস্তারিত সমীক্ষা হলেও প্রস্তাবের ব্যত্যয় ঘটিয়ে সেখানে দায়সারা গোছের North Satellite Town নামে একটি আবাসিক শহর পরিকল্পিত হয়, যা আজকের উত্তরা উপশহর। একইভাবে কোনো রকমে গড়ে ওঠে মিরপুর উপশহর। আর ধানমন্ডি-গুলশান-বনানী-বারিধারার মতো Low Density আবাসিক এলাকাও শহরের অভ্যন্তরে হওয়ার কথা ছিল কি না সন্দেহ! অথচ তা-ই হয়েছে। কিন্তু এর কোনোটিই আবার স্বয়ংসম্পূর্ণভাবে পরিকল্পিত বা উন্নয়নও করা হয়নি। কারণ, এসব আবাসিক শহর ও এলাকায় নেই কোনো পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়, হাসপাতাল বা বাণিজ্য কেন্দ্র স্থাপনের জায়গা। ফলে দক্ষিণে নারায়ণগঞ্জ থেকে উত্তরে সাভার-গাজীপুর পর্যন্ত বিস্তীর্ণ প্রায় দুই কোটি মানুষ অধ্যুষিত আজকের ঢাকা মহানগরীর প্রায় সবাই এখনো ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, ঢাকা মেডিকেল কলেজ, পিজি হাসপাতাল (বর্তমানে বিএসএমএমইউ) এবং মতিঝিল ও কারওয়ান বাজার বাণিজ্যিক এলাকার ওপর নির্ভরশীল।

বস্তুতপক্ষে স্বাধীনতার পর বিশেষ করে সামরিক শাসনামলে ঢাকা তথা দেশের উন্নয়নে যতসব অসংগতির বিস্তার ঘটতে থাকে। পাকিস্তানের আইয়ুব খানের স্টাইলে দেশে নতুন পদ্ধতির স্থানীয় সরকারব্যবস্থা চালু হয়। প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানের আমলে গৃহীত Liberal Policy of Industrilization-এর সুবাধে রাজধানীর বুকেও বিভিন্ন শিল্পপ্রতিষ্ঠান গড়ে উঠতে শুরু করে। সে সময় নগরীর অভ্যন্তরে সর্বত্র গার্মেন্টস শিল্প চালু হতে থাকে। অতঃপর এরশাদের শাসনামলে দ্বৈতনীতিতে একদিকে স্থানীয় পর্যায়ে উন্নয়নের নামে উপজেলা পদ্ধতি চালু করে বিকেন্দ্রীকরণ, অপরদিকে জেলা-বিভাগ থেকে অনেক কিছু রাজধানীতে নিয়ে এসে ঢাকামুখী করে ফেলা হয়। যখন চট্টগ্রাম থেকে রেলওয়ের সদর দপ্তর, চা বোর্ড ইত্যাদি আরও অনেক কিছু রাজধানীতে আনা হয়। পাশাপাশি তখন একদিকে ঢাকার বিধিবদ্ধ নগর পরিকল্পক সংস্থা ডিআইটিকে রাজউকে পরিবর্তন এবং অন্যদিকে ঢাকা পৌরসভা আইনে সংশোধনী এনে সিটি করপোরেশনকেও তার আওতাভুক্ত এলাকার উন্নয়নে নগর পরিকল্পনা প্রণয়নের ক্ষমতা দেওয়া হয়। সংশোধিত সিটি করপোরেশন আইনের তৃতীয় তফসিলে বলা হয়, সিটি করপোরেশন তার আওতাভুক্ত এলাকায় মহাপরিকল্পনা প্রণয়ন, ওয়ার্ডভিত্তিক উন্নয়ন পরিকল্পনা প্রণয়ন ও বাস্তবায়ন, নগরীর সম্প্রসারণে ভূমি উন্নয়ন প্রকল্প গ্রহণ ও বিভিন্ন ধরনের অবকাঠামোগত উন্নয়ন প্রকল্পও গ্রহণ করতে পারবে, যার পরিপ্রেক্ষিতে সিটি করপোরেশনের পক্ষ থেকে তাদের নিজস্ব পরিকল্পনায় স্থানে স্থানে বিভিন্ন ধরনের অনেক অবকাঠামোগত উন্নয়নসহ ২০০৪-০৫ সালে যাত্রাবাড়ী থেকে গুলিস্তান পর্যন্ত ফ্লাইওভার প্রকল্পটি গ্রহণ করা হয়।

উল্লেখ্য, ঢাকার কৌশলগত পরিবহন পরিকল্পনায় (STP) চট্টগ্রাম বিভাগ থেকে রাজধানীর প্রবেশমুখে  যাত্রাবাড়ীতে বিভিন্ন ধরনের অনেক Multi-Modal পরিবহন পরিকল্পনা নির্মাণের সুপারিশ ছিল, কিন্তু তদস্থলে সিটি করপোরেশনের নিজস্ব পরিকল্পনায় ও একতরফাভাবে যাত্রাবাড়ী-গুলিস্তান-পলাশী ফ্লাইওভারটির নির্মাণের ফলে সেখানে প্রস্তাবিত অপরাপর MRT/BRT প্রকল্পগুলো এখন আর নির্মাণ করা সম্ভব হচ্ছে না। একই অবস্থার সৃষ্টি করেছে স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তর (এলজিইডি)। এলজিইডির তো রাজধানী ঢাকায় কোনো ধরনের উন্নয়ন প্রকল্প গ্রহণের এখতিয়ার নেই, অথচ তারাও সিটি করপোরেশনের মতো নিজস্ব পরিকল্পনায় ঢাকার অভ্যন্তরে একে একে কয়েকটি ফ্লাইওভার নির্মাণ করে বসে। এতে বিশেষ করে ঢাকা সিটি করপোরেশনের অধীনে বাস্তবায়িত যাত্রাবাড়ী থেকে পলাশী পর্যন্ত হানিফ ফ্লাইওভার এবং স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তরের অধীনে তেজগাঁও থেকে মগবাজার-মৌচাক পর্যন্ত নির্মাণাধীন ফ্লাইওভারটির কারণে STP-ভুক্ত মেট্রোরেল ও এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ে প্রকল্পগুলো সমস্যাসঙ্কুল হয়ে পড়েছে এবং কিছু জায়গায় তো এসব প্রকল্প বাস্তবায়নের পথ বন্ধ হয়ে গেছে। যে কারণে, মেট্রোরেল (MRT-6) ও কুর্মিটোলা বিমানবন্দর থেকে যাত্রাবাড়ী পর্যন্ত নির্মিতব্য ‘ঢাকা এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ে’ প্রকল্পের কাজ এগোচ্ছে না। উদ্ভূত অবস্থায় বহুল প্রত্যাশিত STP-এর বাস্তবায়নের আগে রিভিউ করতে হচ্ছে। অনুরূপভাবে নব্বইয়ের দশকে অনেক ঢাকঢোল পিটিয়ে প্রণীত ঢাকার দ্বিতীয় মহাপরিকল্পনারও (DMDP 1995-2015) কোনো পর্যায়ে কাঙ্খিত বাস্তবায়ন হয়নি এবং এই অবস্থায় সম্প্রতি ঢাকার তৃতীয় মহাপরিকল্পনা CRDP (2016-2035) প্রণীত হয়ে বর্তমানে অনুমোদনের অপেক্ষায় আছে।

একইভাবে ঢাকায় ইমারত নির্মাণ নিয়ন্ত্রণ নিয়ে সৃষ্টি হয়েছে বড় সমস্যার। ১৯৫২ সালে প্রণীত ইমারত নির্মাণ আইনের ব্যত্যয় ঘটিয়ে ঢাকা সিটি করপোরেশনসহ দেশের অপরাপর বিভাগীয় পৌর করপোরেশনগুলোকেও স্ব-স্ব কার্য এলাকায় ইমারত নিয়ন্ত্রণের ক্ষমতা দিয়ে নতুন সমস্যার সৃষ্টি করা হয়েছে। কিছু সিটি করপোরেশন তো তাদের স্ব-স্ব এলাকায় নিজস্ব পরিকল্পনায় ইমারতের নকশা অনুমোদনসহ বিপজ্জনক, ধ্বংসোন্মুখ ও ঝুঁকিপূর্ণ ইমারত অপসারণের দায়িত্ব পালন করছে। অথচ বিষয়টি ইমারত নির্মাণ আইনের সঙ্গে সম্পূর্ণভাবে সাংঘর্ষিক। ইমারত নির্মাণ আইনে পরিষ্কারভাবে উল্লেখ আছে, বিভিন্ন এলাকায় সরকার নিয়োজিত অথোরাইজড অফিসাররা ইমারতের নকশা অনুমোদনসহ সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন কার্যক্রম পালন করবেন। অথচ সর্বজনীন এই আইনটি কার্যকরের পর থেকে শুধু গৃহায়ণ ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয়ের অধীন সংস্থাসমূহের (গণপূর্ত অধিদপ্তর, রাজউক, সিডিএ, কেডিএ, আরডিএ ইত্যাদি) মধ্যে এর প্রয়োগ সীমাবদ্ধ রয়ে যায়। দেশের অন্যত্র বা অন্যান্য মন্ত্রণালয়ের অধীনে অন্য কোনো সংস্থা ইমারত নির্মাণ আইন ও তদঅধীনে প্রণীত কোনো বিধিমালা এমনকি জাতীয় বিল্ডিং কোড অনুসরণ করে না। ফলে দেশের পুরো নির্মাণশিল্পে বৈসাদৃশ্যতা বিরাজ করছে এবং যেনতেনভাবে ইমারত নির্মিত হয়ে ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থার সৃষ্টি করছে।

একইভাবে দেশের অবকাঠামো উন্নয়ন খাতে সড়ক অধিদপ্তরের স্পেশিফিকেশনস অ্যান্ড রেইট আব শিডিউলস স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তর বা সংশ্লিষ্ট অন্যরা ব্যবহার ও অনুসরণ করে না। ফলে দেশজুড়ে বিভিন্ন সরকারি পর্যায়ে ইমারত ও অবকাঠামোগত নির্মাণ-উন্নয়নে ভিন্নতাসহ নিয়ন্ত্রণব্যবস্থায় ত্রুটি লক্ষণীয়। পত্রপত্রিকার তথ্য অনুসারে, অনেক দপ্তরের ইমারত নির্মাণে রডের পরিবর্তে বাঁশ বা সিমেন্টের পরিবর্তে মাটি দিয়ে ঢালাই করা হচ্ছে। লক্ষ করলে দেখা যায়, দেশজুড়ে সরকারি ও বেসরকারি পর্যায়ে স্ব-স্ব ব্যবস্থাপনায় অনেক নির্মাণ ও উন্নয়নকাজ চলছে। বড় বড় অনেক ইমারত এবং স্থাপনাও নির্মিত হচ্ছে। বিভিন্ন প্রক্রিয়ায় অনেক মেগা প্রকল্পও বাস্তবায়িত হচ্ছে। কিন্তু এসব কাজ বা প্রকল্পের প্রাক্কলন, দরপত্র-প্রক্রিয়া ও ঠিকাদার নির্বাচনে কোনো সর্বজনীনতা নেই। একই ধরনের কাজ কিংবা প্রকল্প কোথাও প্রাক্কলিত দরের অনেক কম বা বেশিতে বাস্তবায়িত হচ্ছে। সবার জন্য সরকারের অনুমোদিত ক্রয় নীতিমালা থাকলেও তা সর্বত্র অনুসৃত হয় না। যেমন প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের অধীন বিভিন্ন বাহিনী সরকারের ক্রয়নীতি অনুসরণ করে না, ফলে বেসামরিক ও সামরিক বিভাগের উন্নয়নকাজের ব্যয়ে রয়েছে বড় ধরনের পার্থক্য। অন্যভাবে এও বলা যায়, বেসামরিক কাজের বাস্তবায়নে যে দায়বদ্ধতা রয়েছে, সামরিক বিভাগের কাজে সে রকম দায়বদ্ধতা নেই। আরও স্পষ্ট করে বললে সামরিক বিভাগের কাজে অডিটের ঝামেলা নেই, দুদকের বাড়াবাড়ি নেই এবং আমলাতন্ত্রেরও তেমন কোনো দৌরাত্ম্য নেই। এ জন্য (অর্থাৎ দায় এড়ানোর জন্য) ইদানীং সরকারের নিজস্ব অর্থায়নে বাস্তবায়িতব্য প্রকল্পগুলোর কাজ প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের বিভিন্ন বাহিনীর মাধ্যমে সম্পাদন করার প্রবণতা শুরু হয়েছে।

দুঃখের বিষয়, স্বাধীনতা অর্জনের ৪৫ বছর পর এমনকি গণতান্ত্রিক সরকারব্যবস্থায় আজও প্রায় সবকিছু আগের ধাঁচে চলছে। বরং বলা যায়, অধিকতর অসমন্বিতভাবে ও আমলাতান্ত্রিকতার মধ্য দিয়ে। ফলে কোনো উন্নয়ন প্রকল্পই পরিপূর্ণ ও সঠিকভাবে বাস্তবায়িত হচ্ছে না। এমনকি সুপরিকল্পিতভাবে গৃহীত উন্নয়ন প্রকল্পও ঠিকভাবে বাস্তবায়িত হচ্ছে না। স্বাভাবিকভাবে জনগণের প্রত্যাশা ও প্রাপ্তি মিলছে না।  

এভাবে উন্নয়ন ও নিয়ন্ত্রণে বিভিন্ন অসংগতিতে বর্তমানে শুধু রাজধানী নয়, দেশের অনেক স্থানে জীবনব্যবস্থা সমস্যাসঙ্কুল হয়ে পড়ছে। অথচ এই দীর্ঘ সময়ে দেশের সব পৌর এলাকা, শহর ও নগরীর পরিধি বেড়েছে, উন্নয়নে আধুনিক প্রযুক্তি যুক্ত হয়েছে এবং উন্নয়নের সঙ্গে নতুন নতুন অনেক সংস্থাও সম্পৃক্ত হয়েছে। কিন্তু কোথাও বাড়েনি সেবার মান। বরং কমে গেছে সড়ক ও খোলা জায়গার পরিমাণ, উধাও হয়ে গেছে একদা ঢাকার গর্বের অসংখ্য খাল-নালা-ঝিল এবং বিস্তীর্ণ জলাভূমি প্রায় বিলীন হয়ে গেছে। বেড়ে গেছে অবৈধ নির্মাণ ও দখলের প্রবণতা। এমনকি নগরীর বিভিন্ন স্থানে সংরক্ষিত কার পার্কিং স্পেস, বর্জ্য সংরক্ষণ ও ব্যবস্থাপনার জায়গাগুলোও বেদখল বা অন্য ব্যবহারে চলে গেছে। পাশাপাশি ক্রমবর্ধিঞ্চু বিভিন্ন ইউটিলিটি সার্ভিসেসের সম্প্রসারণে সমগ্র নগরজুড়ে তো সারা বছর চলে খোঁড়াখুঁড়ি, যাতে সর্বস্তরের নগরবাসীর ভোগান্তিসহ সার্বিক নগর পরিবেশ বিপর্যস্তই বলা যায়। সব মিলিয়ে বর্তমানে ভয়াবহ যানজটে নগরজীবন এখন প্রায় অচল ও অবরুদ্ধ প্রায়। যার পরিপ্রেক্ষিতে, বৈশ্বিক মাপকাঠিতে রাজধানী ঢাকা গত কয়েক বছর ধরে একটি ‘বসবাস অযোগ্য’ নগরী হিসেবে রয়ে গেছে। অতি সম্প্রতি প্রকাশিত আন্তর্জাতিক ইকোনমিক ইনটেলিজেন্স ইউনিটের প্রতিবেদনে ১৪১টি দেশের রাজধানীর মধ্যে ঢাকার অবস্থান ১৩৭তম।

প্রকাশকাল: বন্ধন, ৭৭তম সংখ্যা, সেপ্টেম্বর ২০১৬।

প্রকৌশলী মো. এমদাদুল ইসলাম
+ posts

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Scroll to Top