শিক্ষা, সাহিত্য, সংস্কৃতি ও ঐতিহ্যের লালনভূমি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়। প্রাচ্যের অক্সফোর্ডখ্যাত এ বিশ্ববিদ্যালয়ে বাঙালি জাতির মুক্তি সংগ্রাম আর গৌরবোজ্জ্বল ইতিহাসের স্মৃতির মিনার হিসেবে দাঁড়িয়ে আছে এর নান্দনিক ভাস্কর্যগুলো। অতীত ইতিহাসকে প্রজন্মের পর প্রজন্মে ছড়িয়ে দিতে কালক্রমে নির্মাণ করা হয় স্থাপত্যের শৈল্পিক কারুকার্যে সমৃদ্ধ এমন সব ভাস্কর্য।
দেশের প্রতিটি গৌরবময় আন্দোলনের সূতিকাগার ছিল দেশের সর্বোচ্চ এই বিদ্যাপীঠ। ভাষা আন্দোলন আর স্বাধীনতার সংগ্রামে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের গৌরবময় ভূমিকার কথা কে না জানে! পাকিস্তান আমলে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় নেতৃত্ব দিয়েছে ভাষা আন্দোলন, শিক্ষা আন্দোলন, সামরিক স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলন, স্বাধিকার আন্দোলন, ঊনসত্তরের গণ-অভ্যুত্থান আর একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধে। আর স্বাধীনতার পর নেতৃত্ব দিয়েছে স্বৈরাচার প্রতিরোধ আন্দোলনসহ নানা রাজনৈতিক সংগ্রামে। ঐতিহাসিক এসব ঘটনার নিদর্শনে নির্মিত ভাস্কর্যগুলো আমাদের চেতনার প্রতীক; পাশাপাশি দর্শনীয়ও বটে। এ রচনায় থাকছে এমনই কিছু গৌরবদীপ্ত ভাস্কর্য কথন-
অপরাজেয় বাংলা
বাংলাদেশের স্বাধীনতাযুদ্ধের স্মরণে নিবেদিত তিনজন মুক্তিযোদ্ধাকে চিত্রায়িত ভাস্কর্যটি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কলা ভবনের সামনে অবস্থিত। ভাস্কর্যের মাঝের মুক্তিকামী মানুষটি একজন গ্রাম্য কৃষক। বাম হাতে গ্রেনেড, ডান হাতে ধরা কাঁধে ঝোলানো রাইফেল। বাম পাশে দাঁড়ানো হাতে রাইফেল নিয়ে একজন ছাত্র এবং ডান দিকে সেবার প্রতীক নারী, যার কাঁধে ঝোলানো প্রাথমিক চিকিৎসার ব্যাগ। ভাস্কর্যটি কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে বাংলার নারী-পুরুষের মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণকে মনে করিয়ে দেয়। এটির নির্মাতা মুক্তিযোদ্ধা ও স্থপতি সৈয়দ আব্দুল্লাহ খালিদ। ১৯৭৩ সালে ভাস্কর্যটির নির্মাণকাজ শুরু হয়। শেষ হয় ১৯৭৯ সালে। ৬ ফুট বেদির ওপর নির্মিত স্থাপনাটির উচ্চতা ১২ ফুট, প্রস্থ ৮ ফুট ও ব্যাস ৬ ফুট। ১৯৭৩ সালে স্বাধীনতা ভাস্কর্যের প্রাথমিক কাজটি শেষ হলে সে কাজটির ওপর ২২ জুলাই ১৯৭৩-এ দৈনিক বাংলায় একটি উপসম্পাদকীয় লেখেন সাংবাদিক সালেহ চৌধুরী। শিরোনাম, ‘অপরাজেয় বাংলা’। মজার ব্যাপার হলো, সেই থেকে লোকমুখে মুখে শ্রুত হতে হতে স্বাধীনতার এই ভাস্কর্যটির নাম হয়ে যায় ‘অপরাজেয় বাংলা’।
অপরাজেয় বাংলার রাইফেল হাতে মূর্তির মডেল সৈয়দ হামিদ মকসুদ। তিনি ১৯৭৩ সালে বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র ছিলেন। অপরাজেয় বাংলার মাঝের মূর্তিটির মডেল বদরুল আলম বেনু। তিনি শুধু একজন মডেলই ছিলেন না, ছিলেন সৈয়দ আবদুল্লাহ খালিদের একান্ত সহযোদ্ধা। ১৯৭৩ থেকে ১৯৭৯ পর্যন্ত সব চড়াই-উতরাইতে শিল্পী আবদুল্লাহ খালিদের সঙ্গে যে দুজন সর্বান্তভাবে জড়িত ছিলেন তাঁদের একজন হলেন তৎকালীন চারুকলার ছাত্র বদরুল আলম বেনু আর অন্যজন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র ডাকসুর সাংস্কৃতিক সম্পাদক ম. হামিদ।
স্বোপার্জিত স্বাধীনতা
‘স্বোপার্জিত স্বাধীনতা’ ভাস্কর শামীম শিকদারের নির্মিত একটি ভাস্কর্য। এই ভাস্কর্যের পুরো গা-জুড়ে রয়েছে একাত্তরে পাকিস্তানি হানাদারদের অত্যাচারের খণ্ডচিত্র। চৌকো বেদির ওপর স্থাপন করা হয়েছে মূল ভাস্কর্য। ওপরে বামে আছে মুক্তিযোদ্ধা কৃষক আর ডানে অস্ত্র হাতে দুই বীর মুক্তিযোদ্ধা। মাঝখানে অস্ত্র হাতে নারী ও পুরুষ যোদ্ধারা উড়িয়েছে বিজয় নিশান। কিন্তু পতাকা ওড়ানোর জন্য বাঙালি যে রক্ত দিয়েছে, সয়েছে নির্যাতন, তার একটি খণ্ডচিত্র বেদির চারপাশে চিত্রায়িত। এ ভাস্কর্য বেদির বাম পাশে ফুটে উঠেছে ছাত্র-জনতার ওপর অত্যাচারের নির্মম চেহারা। ১৯৮৮ সালের ২৫ মার্চ এ ভাস্কর্য গড়া শেষ হয়। ভাস্কর্যটির অবস্থান ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের টিএসসি প্রাঙ্গণে।
তিন নেতার মাজার
আমাদের স্বাধীনতা, স্বাধিকার আন্দোলন আর জাতীয় চেতনার অগ্রসৈনিক তিন নেতা হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী, শেরেবাংলা এ কে ফজলুল হক এবং খাঁজা নাজিমুদ্দিন ঘুমিয়ে আছেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্যাম্পাসে। আশির দশকে অনন্য স্থাপনায় নির্মিত এই সমাধিসৌধের স্থপতি মাসুদ আহমেদ।
মীর জুমলার গেট
দোয়েল চত্বর থেকে টিএসসি যেতে রাস্তার মাঝখানে একটি পিলার এবং রাস্তার দুই পাশে সংরক্ষিত কারুকার্যমণ্ডিত প্রাচীন গেটটি মীর জুমলার গেট (ঢাকা গেট) নামে পরিচিত। এটি মোগল আমলে নির্মিত ঢাকার একটি প্রবেশপথ। পুরাতাত্ত্বিক নিদর্শন বিচারে এটি আমাদের দেশের অমূল্য এক সম্পদ।
বুদ্ধিজীবী স্মৃতিফলক
বাংলাদেশের বিভিন্ন জাতীয় সংকটকালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের যে গৌরবোজ্জ্বল ভূমিকা রয়েছে, তারই স্মরণে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য ভবনের পশ্চিম পাশের নীলক্ষেত-ফুলার রোডের সংযোগ সড়কদ্বীপে বুদ্ধিজীবী স্মৃতিফলক নির্মাণ করা হয়েছে। ত্রিভুজাকৃতির এই সড়কদ্বীপে টেরাকোটা স্মৃতিফলকের মাধ্যমে উপস্থাপনা করা হয়েছে। এই স্মৃতিফলকগুলো মার্চ ১৯৯৪ সালের ২৬ মার্চ বুদ্ধিজীবী স্মৃতিফলক হিসেবে উদ্বোধন করা হয়। ১৯৯৬ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে এর নির্মাণকাজ শেষ হয়। এই স্মৃতিফলকে ১৯ জন শিক্ষক, একজন ডাক্তার, বিশ্ববিদ্যালয়ের ১০১ জন ছাত্র, ৩১ জন কর্মচারী সব মিলিয়ে ১৫২ জন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শহীদদের নাম অন্তর্ভুক্ত রয়েছে। এই স্মৃতিফলকে মোট ১৪টি দণ্ডায়মান প্রাচীর রয়েছে, যেগুলোর গায়ে পোড়ামাটির ফলক স্থাপিত। এই প্রাচীরগুলোর মধ্যে ছয়টি ছোট এবং আটটি আকারে বড়। তবে উচ্চতার বিচারে সবগুলোই একই রকমের। কম প্রশস্ত প্রাচীরের উভয় পাশে শহীদদের নাম-পরিচয় রয়েছে এবং বাকি আটটির একদিকে টেরাকোটা নকশাফলক রয়েছে।
স্মৃতিফলকের প্রথম দিকের দুটি প্রাচীরের গায়ে বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর ও জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলামের রচনা থেকে পঙ্ক্তি উল্লেখ করা হয়েছে। পোড়ামাটির ফলকগুলোর মধ্যে শিল্পী ’৫২-র ভাষা আন্দোলন, ’৭১-এর মুক্তিযুদ্ধ এবং বিজয় অর্জনের আনন্দ মিছিল উপস্থাপন করেছেন। এ ছাড়া রয়েছে বুদ্ধিজীবীদের ওপর অত্যাচারের নির্মম দৃশ্য। কয়েকটি টেরাকোটায় স্থান পেয়েছে চিরায়ত গ্রাম-বাংলার মনোরম প্রাকৃতিক দৃশ্য। কলসি কাঁখে বাংলার রমণী, পরাধীনতার প্রতীক শিকল, শহীদ মিনার, বাংলাদেশের পতাকার মাঝে সূর্য, ভাষাশহীদদের নাম অংকন করা হয়েছে। সড়কদ্বীপের এই স্মৃতিফলকটি তৈরি করেন স্থপতি মোহায়মেন ও মশিউদ্দিন শাকের। তৈরির এক পর্যায়ে এতে টেরাকোটার ফলক স্থাপন করার বিষয়টি যুক্ত হয়। তবে এর বাস্তবায়ন হয় চারুকলার শিক্ষক আবু সাঈদ তালুকদার ও শিল্পী রফিকুন নবীর হাত ধরে। এখানে ফলকগুলো স্থাপন করা হয়েছে মোজাইক করা ধূসর কংক্রিটের ওপর। আর শহীদদের নাম-পরিচয় রয়েছে কালো মার্বেল পাথরে সাদা রঙের হরফে।
জয় বাংলা জয় তারুণ্য
স্বাধীনতা-উত্তরকালের শহীদের স্মৃতির প্রতি উৎসর্গীকৃত ভাস্কর্য এটি। টিএসসি ও শামছুন্নাহার হলের মাঝখানে শিল্পী আলাউদ্দীন বুলবুলের তৈরি এই ভাস্কর্যটির অবস্থান।
রাজু ভাস্কর্য
১৯৯২ সালের ১৩ মার্চ গণতান্ত্রিক ছাত্রঐক্যের সন্ত্রাসবিরোধী মিছিল চলাকালে সন্ত্রাসীরা গুলিতে মিছিলের নেতৃত্বদানকারী বাংলাদেশ ছাত্র ইউনিয়নের কেন্দ্রীয় নেতা মঈন হোসেন রাজু নিহত হন। রাজুসহ সন্ত্রাসবিরোধী আন্দোলনের সব শহীদের স্মরণে নির্মিত এই ভাস্কর্য ১৭ সেপ্টেম্বর, ১৯৯৭ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের তৎকালীন উপাচার্য এ কে আজাদ চৌধুরী উদ্বোধন করেন। এই ভাস্কর্যের স্থপতি শ্যামল চৌধুরী। এটি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় তথা ছাত্রদের সন্ত্রাসবিরোধী আন্দোলনের অন্যতম প্রতীক। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র-শিক্ষক কেন্দ্রের (টিএসসি) সম্মুখে এর অবস্থান।
স্বাধীনতার সংগ্রাম
ফুলার রোডের মাঝখানে জগন্নাথ হল ও স্যার সলিমুল্লাহ মুসলিম হলের মাঝখানে অবস্থিত এ চত্বরটি স্বাধীনতার স্মৃতিবাহী স্থান। এখানে ভাষা আন্দোলন, স্বাধীনতা আন্দোলন এবং স্বৈরাচার পতন আন্দোলনের নায়কদের প্রতিকৃতি স্থান পেয়েছে। এই ভাস্কর্যটির ভাস্কর শামীম শিকদার। স্বাধীনতার চেতনা বহনকারী ভাস্কর্যটি ১৯৯৮ সালে নির্মিত। এ বিশাল স্থাপত্যশিল্পটি বাংলার কৃতী সন্তানদের প্রতিকৃতির সমন্বয়ে গড়ে উঠেছে। সবচেয়ে বড় প্রতিকৃতিটি স্বাধীনতার স্থপতি শেখ মুজিবুর রহমানের ৭ মার্চের ভাষণের আদলে তৈরি। এ ছাড়া কবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, কাজী নজরুল ইসলাম, মাইকেল মধুসূদন দত্ত, মহাত্মা গান্ধীসহ গ্রাম-বাংলার নানা পেশার মানুষের প্রতিকৃতি রয়েছে এখানে।
শান্তির পায়রা
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র-শিক্ষক কেন্দ্রের মূল ফটকের সামনেই অবস্থান শান্তির পায়রা ভাস্কর্যটির। ক্যাম্পাসে শান্তি প্রতিষ্ঠার মহান চেতনা, যাতে ছাত্র-শিক্ষকনির্বিশেষে সবার মনে রেখাপাত করে, এ বোধ থেকেই ভাস্কর্যটি নির্মিত।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় শুধু পাঠদানের জন্য বিখ্যাত নয়। এই বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্যাম্পাসে রয়েছে বাংলাদেশের ইতিহাস-ঐতিহ্য ও চেতনার অনেক স্মৃতিবাহী ও দর্শনীয় স্থাপনা ও ভাস্কর্য। এ জন্য ঢাকাকে যেমন রিকশার নগর, মসজিদের নগর বলে ডাকা হয়, তেমনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এলাকাকে স্বাধীনতা ভাস্কর্যের গ্যালারি বা ভাস্কর্যের জাদুঘর বললেও বাড়িয়ে বলা হবে না।
প্রকাশকাল: বন্ধন ৫৭তম সংখ্যা, জানুয়ারি ২০১৫