কাঠের থিমে সাজুক অন্দরমহল

ঘর সাজানো বিষয়টা বরাবরের মতো প্রতিটি মানুষের একান্ত পছন্দের এবং শৌখিনতার ব্যাপার। কেননা, সাজানো-গোছানো সেই ঘরটি মানুষের ব্যক্তিত্বের বহিঃপ্রকাশ ঘটায়। সেখানে ব্যক্তির নিজস্ব চিন্তাচেতনা একটা স্থান বা রূপ পায়। নতুবা যেমন-তেমন ডিজাইনের, রঙের কিংবা থিমের কথা না ভেবেই সাজানো হয়ে যেত ভালোবাসার ছোট্ট সেই নীড়। কিন্তু আদতে তা করা হয় না। বরং, ঘরের প্রতিটি কোনায় একেকটা গল্প সাজিয়ে দেওয়াই হয় ঘর সাজানোর মূল উদ্দেশ্য। ব্যাপারটি যেন ঠিক এমন হয় যে খাবার ঘরের মাঝদেয়ালে রাখা কাঠের ওই আয়নাটারও যেন একটা গল্প আছে, অস্তিত্বের ব্যাখ্যা আছে।

ইট-কাঠের শহরে, বর্গকিলোমিটারের দালানগুলোতে আমাদের বসবাস। ছোট কিংবা বড়, বাড়ির আকৃতি যেমনই হোক না কেন, সাধারণত কোনো একটা নির্দিষ্ট থিমের কথা ভেবেই আমরা অন্দর সাজানোর কাজ শুরু করে থাকি। এক্ষেত্রে কিছুটা ভিন্ন ও ক্ল্যাসিক একটা ভাব আনতে আপনি বেছে নিতে পারেন কাঠ ও পৌরাণিক থিমের কম্বিনেশন। যেমন ধরুন, লিভিংরুম কিংবা ড্রয়িংরুমের কথা। সাধারণ ফিক্সড গদি বা রড আয়রনের ফার্নিচারের থেকে সেগুন কাঠে ডিজাইন করা সোফার চাহিদা নিঃসন্দেহে অনেক বেশি। কিন্তু এর সঙ্গে বাড়তি হিসেবে ড্রয়িংরুমের দেয়াল অনুযায়ী কাঠ দিয়ে ছোট ছোট দেয়াল শেলফ বানিয়ে নিয়ে তাতে বই, ফটোফ্রেম কিংবা ছোট গাছের টব দিয়ে ডেকোরেশন করলে দেখতে দারুণ দেখাবে। সঙ্গে ড্রয়িংরুমের ঠিক মাঝবরাবর কার্পেটের ওপর থাকবে কাঠের ডিজাইনে গ্লাস ফার্নিশড একটি টি-টেবিল আর ঘরের কোণে একটি ল্যাম্প। আরও সুন্দর দেখাবে যদি প্রতিটি ঘরের লাইট বা ল্যাম্পের চারপাশে কাঠের কোনো ফ্রেম বা বক্সের ডিজাইন করে দিলে।

কাঠের থিমের অবদান সময়কাল ভুলে সব সময়ই বিশেষ থাকে। আর এর সঙ্গে কিছু পৌরাণিক শো-পিস যদি রাখা হয়, তবে দেখতে দারুণ দেখাবে। আপনি যদি কোনো অ্যান্টিক শো-পিসের দোকানে যান, তবে সেখানে পুরোনো ডিজাইনের ছোট-বড় বিভিন্ন ধরনের দেয়ালঘড়ি দেখতে পারবেন, যা কাঠের ফার্নিচারের থিমের সঙ্গে বেশ ভালোভাবে মানিয়ে যায়। এমনকি মুখের অবয়বের মতো দেখতে অনেক শো-পিস পাওয়া যায়, যা ফুলদানি হিসেবে কিংবা ডেকোরেশন পিস হিসেবেও আপনি লিভিংরুমসহ বাসার বিভিন্ন জায়গায় রাখতে পারবেন।

ঘরের সৌন্দর্য বাড়াতে আয়নার ভূমিকা যেন অনেক বেশি। আর তাই প্রতিটি রুমেই থাকা চাই কাঠের কারুকাজ করা ফ্রেমের আয়না। এক্ষেত্রে আয়নাগুলো বিভিন্ন আকৃতির হলে সুন্দর দেখাবে। বিশেষ করে, ড্রেসিং টেবিলের আয়নার ওপরের দিকে ফোকাস লাইটের ব্যবস্থা করা যেতে পারে। আর ঠিক পাশে থাকা শেলফে চুড়ি থেকে শুরু করে প্রসাধনী রাখার জন্য থাকবে ভিন্ন ভিন্ন সাইজের বক্স। এ ছাড়া কাঠের দরজার দেয়াল আলমারি বা ক্লোজেটে জুতো থেকে শুরু করে টাই, প্রতিটি দরকারি জিনিসই রাখতে পারবেন টিপটপভাবে।

অন্যদিকে লিভিংরুমের জন্য কাঠের ইজি চেয়ার আর সঙ্গে লিভিংরুম ও বেডরুমের দেয়ালজুড়ে থাকবে কাঠের ফটোফ্রেম, দেয়ালঘড়ি, ম্যাগাজিন রাখার জন্য শেলফ। আপনি চাইলে ড্রয়িংরুমে ম্যাগাজিন রাখার জন্য কাঠ দিয়ে একটি ম্যাগাজিন হোল্ডার বানিয়ে নিতে পারেন, যার এক পাশে থাকবে কাউচ, ইচ্ছা হলেই যেন একটা ম্যাগাজিন হাতে আপনি খানিকটা সময় কাটিয়ে দিতে পারেন।

শুধু ঘরের আসবাবেই নয়, কাঠের থিমে সিলিং এবং ফ্লোরের ডিজাইনও যে ঘরের চেহারাই পাল্টে দেবে। আর এর জন্য যে খুব কষ্ট করতে হবে তা নয়। বরং, আপনি ফলস সিলিংয়ের জন্য যে কাজটুকু করতেন, সে কাজটাই আরও সুন্দর ডিজাইনে করা সম্ভব কাঠ দিয়ে। সাধারণত মেঝে থেকে ছাদের উচ্চতা ন্যূনতম সাড়ে নয় থেকে দশ ফুট বা তার বেশি হয়ে থাকে। এক্ষেত্রে পুরো বাড়ির পৌরাণিক ধাঁচের থিম যে সিলিংয়েও থাকা চাই, নতুবা বাসা দেখতে সাদামাটা দেখাবে।

আর তাই, ছাদ থেকে দেড় ফুট নিচে ফলস ছাদের নিচের অংশে কাঠ কেটে পছন্দমতো ডিজাইনে সিলিংয়ে বাক্স বা আড়াআড়ি আকারে কাঠের পাটাতন বসিয়ে নিতে পারেন। এ ছাড়া কাঠের এই ধাপগুলোর ভেতর বসিয়ে দিতে পারেন ছোট-বড় কিছু স্পট লাইট। অথবা কাঠের চারদিকে মরিচা বাতি দিয়েও ডেকোরেশন করতে পারেন। ঠিক একইভাবে ডাইনিংরুমের ছাদেও কাঠের একটা বাক্সের মতো ডিজাইন করে তার মধ্যে সিলিং থেকে ঝোলানো লাইট বসিয়ে দিন, যেন ফোকাস ডাইনিং টেবিলের ওপর পড়ে। একইভাবে বাচ্চাদের রুমেও সিলিংয়ের ব্যবস্থা করা যেতে পারে। লাইটের জায়গায় শুধু কাচের একটা গ্লাস বসবে কাঠের ফ্রেমের মধ্যে। আর সেই গ্লাসের মধ্যে থাকবে সৌরজগতের গ্রহ-উপগ্রহ, চাঁদ, তারার স্টিকার, যা রাতের আঁধারে আলো দেবে, দেখতে দারুণ দেখাবে।

এ ছাড়া বাথরুমের ওপরে থাকা স্টোরেজ ক্যাবিনেটগুলোও কিন্তু কাঠের করা যেতে পারে। আর এর সঙ্গে মিলিয়ে কাঠের মেঝের ডিজাইন ঘরে নান্দনিকতার প্রকাশ ঘটাবে। লিভিংরুমের কর্নারে কাঠের মেঝেতে হ্যান্ডপেইন্টের কয়েকটি কুশন রাখলে তা দেখতে দারুণ মানাবে। কাঠের মেঝের জন্য জার্মানির ওক কাঠ থেকে শুরু করে বাংলাদেশের সেগুন কিংবা মেহগনিগাছের কাঠ- যেকোনোটাই বেছে নিতে পারেন, যদিও কাঠের মেঝে কিছুটা ব্যয়সাপেক্ষ হবে। মূলত ড্রয়িং, ডাইনিং ও বেডরুমের জন্য কাঠের ফ্লোর বেছে নিতে পারেন। 

কার্পেটের মতো কাঠের মেঝেতেও ময়লা কম ধরে। তবে বাথরুমে কাঠের ফ্লোর না রাখাই ভালো। কেননা, পানিতে এ ধরনের মেঝে নষ্ট হয়ে যায়। তাই টাইলস কিংবা মোজাইকের মেঝের চেয়েও কাঠের মেঝের যতœটাও একটু বেশি করতে হয়। কাঠের ফ্লোর ঝকঝকে রাখার জন্য হোয়াইট ভিনেগার ও ভেজিটেবল অয়েল একসঙ্গে মিশিয়ে ব্যবহার করলে তা কাঠের উজ্জ্বলতা ধরে রাখে। তবে কখনোই সরাসরি কাঠের ওপর এই মিশ্রণ ব্যবহার করা যাবে না। একটি স্পঞ্জ বা তোয়ালে এই মিশ্রণে ভিজিয়ে নিংড়ে নিয়ে তা মেঝে পরিষ্কারে ব্যবহার করতে পারেন। এরপর একটি শুকনো কাপড় দিয়ে ভালোভাবে তা মুছে নিতে হবে, ব্যস হয়ে গেল পরিষ্কার। 

আর এভাবেই কিচেনের শেলফ থেকে শুরু করে ক্যাবিনেট, কিচেন হুডেও আনতে পারেন কাঠের ছোঁয়া। এ ছাড়া বারান্দা বা ঘরের খালি কোণে কাঠের টবে কিছু ইনডোর প্লান্ট রাখতে পারেন। ঘর সাজানোর জন্য এ ধরনের শো-পিস পেতে ঘুরে আসতে পারেন ঢাকার গুলশান-১ ডিসিসি মার্কেটে, যা অভিজাত ও রুচিশীল ইন্টেরিয়র পিসের জন্য বেশ জনপ্রিয়। অন্যদিকে কম খরচে রুচিশীল আসবাব কিনতে যেতে পারেন ঢাকার পান্থপথ, প্রগতি সরণি, মিরপুর স্টেডিয়াম, বাড্ডাসহ আরও বেশ কিছু এলাকায়। এ ছাড়া জাহাজের পুরোনো ফার্নিচার পাবেন পান্থপথ ও গুলশান-২ ডিসিসি মার্কেটে, যেখানে বিভিন্ন ধরনের জাহাজের পুরোনো ও অ্যান্টিক ধাঁচের ফার্নিচার পাওয়া যায়, যার কোনো নির্দিষ্ট দাম নেই। এ ছাড়া কাঠের থিমে আসবাব কিনতে দেশজুড়ে রয়েছে বিভিন্ন ব্র্যান্ডের ফার্নিচারের শো-রুম, যেখান থেকে আপনি পছন্দসই ফার্নিচার কিনতে পারবেন। 

কাঠের থিম কিংবা পৌরাণিক থিম, যেভাবেই সাজানো হোক না কেন, হাতে একটু সময় নিয়ে শুরু থেকেই বাড়ির প্রতিটি কাজে প্ল্যান করে করা অত্যন্ত প্রয়োজন। এতে একদিকে যেমন আপনি আপনার পছন্দমতো ঘরটি সাজাতে পারবেন, অন্যদিকে ঘর সাজানোর থিমটাও হবে অদ্বিতীয়। কেননা আপনার অন্দরমহলের ডিজাইনার যে আপনি নিজেই। আর সেখানে নিত্যনতুন মডার্ন সব ডিজাইনের পাশাপাশি পৌরাণিক চিত্রটাও যে আভিজাত্যের রেশ ছড়াবে নিঃসন্দেহে। তো আপনার পছন্দ কোনটি, পৌরাণিক নাকি মডার্ন থিম?
প্রকাশকালঃ বন্ধন, ১২৮তম সংখ্যা, এপ্রিল ২০২১

তাসনিম জেরিন
+ posts

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Scroll to Top