বাংলাদেশের মহান মুক্তিযুদ্ধে মেহেরপুরের অবদান চিরভাস্বর। যুদ্ধের প্রাক্কালে মুজিবনগরের ঐতিহাসিক আম্রকাননে গঠিত হয় বাংলাদেশের প্রথম অস্থায়ী সরকার। স্বাধীন বাংলার অভ্যুদয়ের এমন গৌরবোজ্জ্বল ইতিহাস থাকলেও নীলচাষিদের ওপর ইংরেজ নীলকরদের অমানবিক নিপীড়নের গুমরে মরা স্মৃতিচিহ্নও রয়েছে দেশের দক্ষিণ-পশ্চিম সীমান্তের ছোট্ট এ জেলাটিতে। এমন সব ঐতিহাসিক শৌর্যবীর্য বুক আগলে ব্যবসা-বাণিজ্যে এগিয়ে চলেছে মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতিবিজড়িত লোকালয়টি। যাতে অবদান রয়েছে কতিপয় সফল ব্যবসায়ীর। মুজিবনগর উপজেলার কোমরপুরের এমনই একজন সফল নির্মাণপণ্য ব্যবসায়ী মো. আনিসুর রহমান টিপু। মেসার্স অনামিকা ট্রেডার্স-এর স্বত্বাধিকারী। আকিজ সিমেন্ট কোম্পানি লিমিটেডের আঞ্চলিক বিক্রয় কর্মকর্তা আমির হামজার সহযোগিতায় এবারের ‘সফল যাঁরা কেমন তাঁরা’ পর্বে থাকছে তাঁর ব্যবসায়িক সাফল্যের আদ্যোপান্ত।
ব্যবসায়ী টিপুর জন্ম ২২ জানুয়ারি ১৯৮৬, মেহেরপুরের কোমরপুরে। বাবা হাজি মো. আনারুল ইসলাম ও মা মোছা. নাসিমা খাতুন। তিন ভাই ও এক বোনের মধ্যে সবার বড়। কোমরপুর মাধ্যমিক বিদ্যালয় থেকে ২০০২ সালে মাধ্যমিক ও ঢাকা আইডিয়াল কলেজ থেকে ২০০৪ সালে উচ্চমাধ্যমিক পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হন। এরপর মোহাম্মদপুর কেন্দ্রীয় বিশ্ববিদ্যালয় কলেজে সমাজকর্মে স্নাতকে ভর্তি হন। তৃতীয় বর্ষে পড়াকালীন জড়িয়ে যান নির্মাণপণ্য ব্যবসায়। ভেবেছিলেন পাশাপাশি চালিয়ে যাবেন লেখাপড়াও। কিন্তু ব্যবসায়িক কর্মকান্ডে এতটাই ব্যস্ত হয়ে পড়েন যে তা থেকে আর ফেরা হয়ে ওঠেনি। রড, সিমেন্ট, বালু, ঢেউটিন, স্যানিটারিসামগ্রীসহ যাবতীয় নির্মাণপণ্যই এখন তাঁর ব্যবসাসম্ভারে।
বয়সে তরুণ হলেও টিপু একজন পুরোদস্তুর ব্যবসায়ী। আর হবেনই না কেন? এ ব্যাপারে সার্বিক সহযোগিতা করছেন তাঁর বাবা। যিনি নিজেও একজন সফল ব্যবসায়ী। ইটভাটা, চালকল, ভুসিমাল, ঠিকাদারিসহ নানা ব্যবসার সঙ্গে এলাকায় জড়িয়ে আছে যাঁর নাম। তাঁরই সুযোগ্য সন্তান আনিসুর রহমান টিপু। সংসারের বড় সন্তান হওয়ায় বাবার ব্যবসায় নানাভাবে সহযোগিতা করতে হতো তাঁকে। বলতে গেলে বাল্যকালেই ব্যবসায় হাতেখড়ি। বাবা চাইছিলেন তিনি যেন নিজের মতো করে ব্যবসা করেন। তবে তাতে যেন থাকে সম্মান, সঙ্গে মুনাফার সুযোগ। অনেক ভেবে বেছে নিলেন নির্মাণপণ্য ব্যবসাকেই। তিনি বুঝতে পেরেছিলেন ইটের ব্যবসার সঙ্গে রড-সিমেন্টের ব্যবসা যুক্ত করা গেলে নির্মাণপণ্যের ব্যবসাটি হবে স্বয়ংসম্পূর্ণ। ক্রেতাসাধারণকে আর পণ্যের জন্য নানা জায়গায় দৌড়াতে হবে না; এক ছাদের তলে মিলবে সব সেবা।
একজন সুব্যবসায়িক হওয়ার কৌশল, মানুষের সঙ্গে কীভাবে ব্যবসায়িক আচার-ব্যবহার করতে হবে, তার সবই শিখেছেন বাবার কাছে। বাবাই তাঁর ব্যবসায়িক আদর্শ। তা ছাড়া বাবার সুদীর্ঘ জীবনের ব্যবসায়িক সুনাম ও পরিচিতি টিপুর ব্যবসা প্রসারে হয়েছে দারুণ সহায়ক। বাবার উপদেশ বরাবরই মেনে চলেন। কম মুনাফায় পণ্য বিক্রি, সঠিক ওজন, মানসম্মত পণ্য বিক্রি ও পণ্যের গুণাগুণ সম্পর্কে ক্রেতাকে অবহিত করেন নিজেই। আর এভাবেই ধরে রেখেছেন ব্যবসায়িক সুনাম। ফলে সাফল্যের দেখা পেয়েছেন স্বল্প সময়েই। ২০১৪ ও ২০১৫ সালে মেহেরপুরে আকিজ সিমেন্টের সর্বোচ্চ বিক্রেতা তিনি। এ ছাড়া সব ধরনের পণ্য বিক্রিতেও অনন্য। সাফল্যের এমন স্বীকৃতিস্বরূপ জিতেছেন দুটি এসি, সাতটি টেলিভিশন, দুটি ল্যাপটপ, নয়টি মোবাইল, স্বর্ণালংকার, নগদ টাকাসহ নানা উপহার। এ ছাড়া তিনি আকিজ সিমেন্ট কোম্পানির পক্ষ থেকে সুযোগ পেয়েছেন চীন, থাইল্যান্ড, নেপাল, ভুটান ভ্রমণের। পরিবেশকেরা প্রয়োজনমতো পণ্য দিতেও কার্পণ্য করেন না তরুণ এ ব্যবসায়ীকে। বর্তমানে কোমরপুর বাজারে রয়েছে তাঁর একটা শোরুম ও তিনটা গোডাউন। এ ছাড়া আয়ের অন্যান্য খাতের মধ্যে রয়েছে পরিবহন, গভীর নলকূপ, ট্রাক্টর, বাড়িভাড়া। পাশাপাশি চলছে একটি ফিলিং স্টেশনের নির্মাণকাজও। এসব ব্যবসায় কর্মসংস্থান হয়েছে প্রায় ৮০০ মানুষের।
ব্যবসায়ী টিপু বিয়ে করেন ২০১১ সালে। স্ত্রী নাহিদ সরবরী সূচিতা। তিন মাস আগে তাঁদের ঘর আলো করে এসেছে একটি মেয়ে। নাম রেখেছেন আনিসা রহমান। সারা দিনের ব্যবসায়িক ব্যস্ততার ফাঁকেও এলাকার বিভিন্ন সামাজিক সংগঠন ও খেলাধুলায় সম্পৃক্ত থাকার চেষ্টা করেন। কেএমজি প্রি-ক্যাডেট স্কুল ও স্থানীয় বাজার কমিটির সহসভাপতি তিনি। প্রতি ঈদেই তিনি ও তাঁর সহযোগীরা মিলে আয়োজন করেন ঈদ আনন্দ অনুষ্ঠান। এ ছাড়া বিভিন্ন খেলাধুলা, সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান ও ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানে সহযোগিতা করেন উদারহস্তে।
তরুণ ব্যবসায়ী টিপু সুনামের সঙ্গে ব্যবসা করলেও অন্যান্য আঞ্চলিক ব্যবসায়ীর মতো তিনিও জিম্মি চাঁদাবাজদের কবলে। জনপদটিতে রয়েছে কতিপয় উগ্রপন্থী সংগঠন, যাদের নিয়মিত চাঁদা দিতে হয়। এ সমস্যাটি না থাকলে হয়তো ব্যবসার আরও উন্নতি হতো। এসব অসংগতির মধ্যেও তিনি চান ব্যবসা এগিয়ে নিতে। একটি প্রাইভেট ক্লিনিক ও ডায়াগনস্টিক সেন্টার প্রতিষ্ঠাই এখন তাঁর আগামীর ইচ্ছে।
– মাহফুজ ফারুক
প্রকাশকাল: বন্ধন ৭০ তম সংখ্যা, ফেব্রুয়ারি ২০১৬