একজন টাইলস্ মিস্ত্রি

সোবহানবাগের ড্যাফোডিল ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটির পঞ্চম তলায় যেতেই চোখ আটকে গেল কজন নির্মাণ শ্রমিকের দিকে। এদের কেউ আপন মনে ফিতা দিয়ে মেঝেতে মাপজোক করছে। আবার কেউ কাটিং মেশিনে কাটছেন টাইলস্। আবার কেউবা মেঝেতে লাগাচ্ছে টাইলস্। কারোই যেন দম ফেলার এতটুকু ফুসরত নেই। এরই মাঝে একেক জনের কাছ থেকে আসছিল একেক রকমের আওয়াজ। ‘ওই, ফিতাটা দে তো’ ‘টাইলসডা কি ঠিকমত লাগানো হইছে ? ইত্যাদি ইত্যাদি। এরা আসলে টাইলস্ মিস্ত্রি, টাইলস্ নিয়েই এদের কাজ কারবার। মেঝেতে টাইলস বসিয়ে স্থাপনার সৌন্দর্য বাড়ানো এদের কাজ। তাই আপনি ইচ্ছে করলেই এদেরকে সৌন্দর্য শিল্পীও বলতে পারেন। 

অনেকক্ষণ ধরে চলছিল তাদের কর্মকান্ড। বেলা ১১টায় টাইলস্ মিস্ত্রিরা হালকা জল খাবারের জন্য বিরতি পাওয়ামাত্র কথা বলার সুযোগ হল। এই টাইলস্ মিস্ত্রিদের একজন মোঃ আব্দুল জলিলের কথা এবারের তাহার গল্পে। মোঃ আব্দুল জলিল মিয়ার জন্মসালটা ভোটার আইডি কার্ড অনুযায়ী ১৯৮১ সালের ১ জানুয়ারি। জলিল মিয়ার জন্ম উপকূলবর্তী জেলা চাঁদপুরের শাহরাস্তি এলাকায়। শৈশব-কৈশোর কেটেছে চাঁদপুরের শাহরাস্তিতেই। ফেলে আসা সেই দিনগুলো এখনো অনাবিল আনন্দ দেয় জলিল মিয়াকে। জলিলের ভাষায়, ছোটবেলায় খুব দুরন্ত ছিলাম। আমাদের গ্রামের পাশ দিয়ে বয়ে যাওয়া খালে আমি ও আমার বন্ধুরা প্রতিদিন ছিপ দিয়ে মাছ ধরতাম। কোন কোন দিন প্রচুর মাছ পেতাম। আবার কোন কোন দিন দু-একটি পুঁটি ছাড়া মিলত না কিছুই। তখন আর কি করা, সবাই মিলে খালের পানিতে দাপাদাপি করে বাড়ি ফিরতাম। গোসল করতে গিয়ে মাঝে মাঝে জেলেদের জালে ধরা পড়া মাছ চুরি করতাম। পরে জেলেরা এসে বাড়িতে নালিশ করত। কত আনন্দেরই না ছিল দিনগুলো। আজও মনে হয় আগের এ দিনগুলোতে ফিরতে পারলে কত মজাই না হত।’ বলতে বলতে চোখ ছলছল করে উঠে জলিল মিয়ার। দুষ্টুমি করলেও লেখাপড়ায় খুব একটা খারাপ ছিল না জলিল। ১৯৯৪ সালে চাঁদপুর হাইলচর পাইলট উচ্চ বিদ্যালয় থেকে মাধ্যমিক পাস করেন মানবিক বিভাগ থেকে। ফলটাও ছিল ভালো। তাই সবার ইচ্ছায় ও অনুরোধে ভর্তি হন চাঁদুর সরকারি কলেজে। জলিল ছোটবেলা থেকেই একটু বেখেয়ালী টাইপের। কখন কি করতেন আর কি করতে চাইতেন তা নিজেও বুঝতেন না। সবার ইচ্ছায় ভর্তি হলেও জলিল পড়াশোনায় মন বসাতে পার ছিল না। তবে পূঁজিগত বিদ্যার চাইতে জলিলের বাস্তবিক গুণ ছিল অনেকখানি। তাই জলিল পড়াশোনা করে চাকরি করবেন সে স্বপ্ন না দেখে দেখতেন, তিনি কারিগরি কাজ করবেন। যে কাজে মিলবে তার স্বীকৃতি। 

পড়াশোনায় মন না বসায় জলিলের বাবা-মা জলিলকে তার পরিচিত এক চাচার মাধ্যমে মোজাইকের কাজে লাগিয়ে দেন। সময়টা ১৯৯৭ সাল। তখন টাইলসের প্রচলন ও ব্যবহার ছিল না বরং ছিল মোজাইকের ব্যবহার। জলিল ১৯৯৭ সাল থেকে লেগে গেলেন মোজাইকের কাজে। আস্তে আস্তে কাজ শিখতে শিখতে এক পর্যায়ে হেলপার থেকে জলিল পরিণত হন দক্ষ মিস্ত্রিতে। মাঝখানে যখন মোজাইকের পরিবর্তে টাইলসের ব্যবহার ও প্রচলন বেড়ে যায় তখন জলিল মোজাইক ছেড়ে আসেন টাইলসের কাজে রাজধানী ঢাকায়। মোজাইক কাজের মত এখানেও মেলে তার ভাল কাজের স্বীকৃতি। টাইলসের কাজে রাখেন দক্ষতার ছাপ। এ পর্যন্ত বহু বড় বড় স্থাপনায় টাইলস বসানোর কাজ করছেন জলিল মিয়া। জলিল মিয়ার এখনকার স্বপ্ন টাইলসের কাজ নিয়ে প্রবাসে পাড়ি দেবার। যেখানকার দিনগুলো আরো রঙ্গিন ও বর্নিল হবে এখানকার চেয়ে। জলিল মিয়াদের এমন স্বপ্নই হয়তো একদিন এ দেশকে নিয়ে যাবে দূরে। আরো বহু দূরে। শক্ত হবে এ দেশের অর্থনীতি। আমরাও মাথা তুলে দাঁড়াতে পারবো বিশ্বের বুকে। জয় হোক স্বাপ্নিক জলিলদের স্বপ্নসাধনা।

জিয়াউর রহমান চৌধুরী

প্রকাশকাল: বন্ধন ২৩ তম সংখ্যা, মার্চ ২০১২

+ posts

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Scroll to Top