স্থপতি মো. আহসানুল হক খানের জন্ম ১৯৫৬ সালে শহরতলি বগুড়ার গণমঙ্গলে। বাবা মরহুম আশরাফ হোসেন খান। মা নূরজাহান খানম। বগুড়ার সেন্ট্রাল হাইস্কুল থেকে ম্যাট্রিকুলেশন শেষে এইচএসসি পাস করেন ঢাকা কলেজ থেকে। ১৯৮০ সালের শুরুতে স্থাপত্যে স্নাতক ডিগ্রি সম্পন্ন করে যোগ দেন সরকারের স্থাপত্য অধিদপ্তরে। Medical Architecture Research Unit (MARU), University of North London থেকে অর্জন করেন মাস্টার্স ডিগ্রি।
এ ছাড়া ডিপ্লোমা করেছেন Procurement Management in the Public Sector বিষয়ে ILO এর ITC, তুরিন, ইতালি থেকে। বহুমুখী বিষয়ে প্রশিক্ষণ নিয়েছেন মালয়েশিয়ার পুত্রজায়া, সুইডেনের স্টকহোমের গোটল্যান্ড, জাপানের টোকিওতে। বর্তমানে তিনি স্থাপত্য অধিদপ্তরের প্রধান স্থপতি হিসেবে কর্মরত।
গুণী এ স্থপতির ডিজাইনকৃত উল্লেখযোগ্য প্রকল্পের মধ্যে রয়েছে দিনাজপুর মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতাল; হার্ট ফাউন্ডেশন, দিনাজপুর; বগুড়া শহীদ জিয়াউর রহমান মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতাল; চক্ষু বিজ্ঞান ইনস্টিটিউট শেরেবাংলা নগর, ঢাকা; জাতীয় কিডনি ডিজিজেস ইনস্টিটিউট ও হাসপাতাল; জাতীয় মানসিক ইনস্টিটিউট ও হাসপাতাল; জাতীয় হৃদরোগ ইনস্টিটিউট ও হাসপাতাল সম্প্রসারণ; জাতীয় ক্যানসার হাসাপাতাল; সোহরাওয়ার্দী মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতাল; জাতীয় নিউরো সায়েন্সেস ইনস্টিটিউট ও হাসপাতাল; খুলনায় শেখ আবু নাসের হাসপাতাল; খুলনা, সিলেট, রাজশাহী, রংপুর, চট্টগ্রাম, ঢাকা মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতালসমূহ; ট্রমা সেন্টারসমূহ, বার্ন হাসপাতাল, বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, আবাসিক ভবনাদি, অফিস, আদালত, বিনোদন কেন্দ্রসমূহের ভৌত পরিকল্পনা ও নকশা প্রণয়ন করেছেন; ডায়াবেটিক হাসপাতালসমূহ, নতুন সরকারি ছয়টি মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতাল (পাবনা, নোয়াখালী, রাঙামাটি, কক্সবাজার, যশোর ও কুষ্টিয়া) নির্মাণ প্রকল্পসমূহ।
এ ছাড়া হলিফ্যামিলি মেডিকেল কলেজ, ইব্রাহীম মেডিকেল কলেজসহ বিভিন্ন বেসরকারি মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতালের ভৌত পরিকল্পনা ও নকশা প্রণয়ন করেছেন। এ ছাড়া দেশের বিভিন্ন নার্সিং কলেজ ও ইনস্টিটউটসমূহ এবং নানা আবাসিক ভবন; সরকারি কর্মচারী হাসপাতাল; ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল-২; সম্প্রতি তিনি গাজীপুরে বেগম ফজিলাতুননেসা মুজিব মেমোরিয়াল হাসপাতাল, গোপালগঞ্জে চক্ষু হাসপাতাল, নার্সিং কলেজ ও কমপ্লেক্সের সব ধরনের নকশা প্রণয়ন করেছেন। এ ছাড়া তিনি দেশের সরকারি বিভিন্ন প্রকল্পের সঙ্গে নানাভাবে জড়িত। কর্মজীবনে কাজের স্বীকৃতিস্বরূপ পেয়েছেন পুরস্কার ও সম্মাননা।
এ ছাড়া তিনি নিজেকে যুক্ত রেখেছেন নানা প্রতিষ্ঠান ও সংগঠনের সঙ্গে। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য- সাবেক সদস্য, বৃহদায়তন ও বিশেষ প্রকল্প, রাজউক হিসেবে বর্তমানে নগর উন্নয়ন কমিটির আহ্বয়ক; সদস্য, Heritage জাতীয় কমিটি; আহ্বয়ক, বাংলাদেশ ন্যাশনাল বিল্ডিং কোড প্রণয়ন কমিটি (বিএনবিসি); চেয়ারম্যান, টেকনিক্যাল কমিটি, বাংলাদেশ সার্ভিসেস লিমিটেড; পরিচালনা পর্ষদ সদস্য, বাংলাদেশ সার্ভিসেস লি., রূপসী বাংলা হোটেল (শেরাটন হোটেল)।
এ ছাড়া তিনি বুয়েট অ্যালমনাই অ্যাসোসিয়েশনের আজীবন সদস্য; বাংলাদেশ স্থপতি ইনস্টিটিউটের সদস্য; বগুড়া ও উত্তরবঙ্গ সমিতির সহসভাপতিসহ বিভিন্ন সামাজিক, সাংস্কৃতিক, অরাজনৈতিক, সেবামূলক প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে জড়িত। ঢাকার স্থাপত্যকলা নিয়ে একান্তে কথা বলেছেন বন্ধন-এর সঙ্গে।
স্থাপত্য অধিদপ্তর সম্পর্কে কিছু বলুন?
গৃহায়ণ ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয়ের অধীনস্থ স্থাপত্য অধিদপ্তর বিভিন্ন সরকারি উন্নয়ন প্রকল্পে স্থাপত্যবিষয়ক সেবা প্রদানের একমাত্র সরকারি প্রতিষ্ঠান। গৃহায়ণ ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমে বাস্তবায়িত বিভিন্ন মন্ত্রণালয় ও তদ-অধীনস্থ দপ্তরাদির স্থাপত্য ও পরিকল্পনাগত ডিজাইন ও নকশা প্রণয়নের দায়িত্ব স্থাপত্য অধিদপ্তরের ওপর ন্যস্ত। শুধু স্থাপত্য নকশা, নকশা মহাপরিকল্পনা, নকশাবিন্যাস, জরিপ, ভূমি ব্যবহার পরিকল্পনা প্রণয়নই নয় বরং সরকারি দপ্তর ও আবাসনসমূহের জন্য ‘স্পেস স্ট্যান্ডার্ডস (Space Standards)’ নির্ধারণ থেকে শুরু করে মানববসতি ও ভূমি ব্যবহার পরিকল্পনাসংক্রান্ত নীতিমালা সম্পর্কে পরামর্শ প্রদান এবং বিভিন্ন সরকারি ও বেসরকারি সংস্থাকে তাদের নির্মাণ প্রকল্পের জন্য ভূমির চাহিদা নিরূপণে স্থাপত্য অধিদপ্তর সহায়তা করে থাকে। অত্র অধিদপ্তর কর্তৃক ইমারত নির্মাণে বাংলাদেশের জন্য প্রযোজ্য সব আইন, বিধি, কোড, নীতিমালা ইত্যাদি যথাযথ অনুসরণপূর্বক প্রকল্পের স্থাপত্য নকশা প্রণয়ন করা হয়।
ব্রিটিশ শাসনামলে বাংলা প্রদেশ বিদ্যমান ‘অফিস অব দ্য গভর্নমেন্ট আর্কিটেক্ট’ এবং পাকিস্তান শাসনামলে বিদ্যমান ‘অফিস অব দ্য কনসালটিং/গভর্নমেন্ট/চিফ আর্কিটেক্ট’; অফিস অব দ্য সিনিয়র আর্কিটেক্ট, পিডব্লিউডি; আর্কিটেকচার ডিভিশন, হাউজিং অ্যান্ড সেটেলমেন্ট ডাইরেক্টরেট’-এর মতো বিভিন্ন নামে পরিচিত বিভিন্ন দায়িত্বে ন্যস্ত স্থাপত্য দপ্তরের উত্তরসূরি আজকের ‘স্থাপত্য অধিদপ্তর’।
১৯৮৩ সালে গৃহায়ণ ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয়ের স্মারক নং ১/২ই-১৪/৭৬/৭৮ তাং ২৯.০৬.৮৩; মোতাবেক তৎকালে বিদ্যমান বিভিন্ন স্থাপত্য সেবাবিষয়ক সরকারি, আধা সরকারি ও স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠানসমূহ একীভূত করে গঠিত হয় এ অধিদপ্তর।
ভবন নির্মাণে কিংবা ভবনের উৎকর্ষিক নান্দনিকতায় স্থপতিদের ভূমিকা কতটুকু?
স্থপতিরা যেকোনো ভৌত অবকাঠামো উন্নয়ন পরিকল্পনার মুখ্য সমন্বয়কারী হিসেবে কাজ করেন। যেকোনো ভৌত অবকাঠামো সংস্থানের ক্ষেত্রে তার যৌক্তিকতা নির্ধারণ, পরিকল্পনা প্রণয়ন, ব্যবহারের উপযোগিতা নির্ধারণ, নান্দনিকতা ইত্যাদিতে স্থপতিদের ভূমিকা মুখ্য। একটি উন্নয়ন পরিকল্পনায় জড়িত স্টেক-হোল্ডাররা অর্থাৎ প্রত্যাশী সংস্থা, কাঠামো নকশাকার, প্রকৌশলী, বাস্তবায়নকারী কারিগরি জনবল এবং এলাকার জনগণ সবার সঙ্গে সমন্বয় সাধন করে পরিবেশের উপযোগী একটি নান্দনিক, টেকসই ও বাস্তবসম্মত ভৌত অবকাঠামোর চ‚ড়ান্ত রূপ দেন একজন স্থপতি। এ ক্ষেত্রে ব্যবহারের উপযোগিতা বৃদ্ধি, ব্যয় সাশ্রয়, লাগসই নির্মাণ পদ্ধতি ও উপযোগী নির্মাণ উপকরণ ব্যবহার করে স্থপতি একটি সাসটেইনেবল ও পরিবেশবান্ধব স্থাপনার নকশা প্রণয়ন করে। একটি ভবনের নকশা প্রণয়নের বিষয়ে ব্যবহার উপযোগিতা ও নান্দনিকতা দুটোই সমান গুরুত্বপূর্ণ বিধায় শুধু নান্দনিকতা বর্ধনই স্থপতিদের প্রধান কাজ নয়।
স্থাপত্যশিল্পে তথা একটি দেশের সামগ্রিক উন্নয়নে স্থপতি ও স্থাপত্য অধিদপ্তরের গুরুত্ব কতটুকু?
গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকারের গৃহায়ণ ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয়ের অধীনে স্থাপত্য অধিদপ্তর একমাত্র প্রতিষ্ঠান, যা দেশের বিভিন্ন উন্নয়ন প্রকল্পের স্থাপত্য নকশা প্রণয়ন ও স্থাপত্যবিষয়ক যাবতীয় পরিসেবা দিয়ে থাকে। শুধু স্থাপত্য নকশা, জরিপ নকশা, মাস্টার প্ল্যান, লেআউট প্ল্যান ইত্যাদি প্রণয়নই নয়, বরং সরকারি দপ্তর ও আবাসনসমূহের জন্য Space Standards নির্ধারণ থেকে শুরু করে মানববসতি ও ভূমি ব্যবহার পরিকল্পনাসংক্রান্ত নীতিমালা সম্পর্কে সরকারকে পরামর্শ প্রদান এবং বিভিন্ন সরকারি ও বেসরকারি সংস্থাকে তাদের নির্মাণ প্রকল্পের জন্য ভূমির চাহিদা নিরূপণে স্থাপত্য অধিদপ্তর সহায়তা করে থাকে।
স্বাধীনতা পূর্ববর্তী বাংলাদেশে সরকারি পর্যায়ে তিনটি ক্ষুদ্র পরিসরের দপ্তর মারফত স্থাপত্য চর্চা হতো। বর্তমানে এই তিনটি দপ্তর একত্র হয়ে স্থাপত্য অধিদপ্তরে পরিণত হয়েছে। বাংলাদেশ সরকারের রেভিনিউভুক্ত এবং অউচ ভুক্ত বাজেটের তথা দেশের সামগ্রিক উন্নয়ন বাজেট পরিকল্পনার ভৌত অবকাঠামোগত সকল নকশা স্থাপত্য অধিদপ্তর থেকে প্রণীত হয়। অর্থাৎ দেশের উন্নয়নের গতিশীলতা আনয়নে স্থাপত্য অধিদপ্তর সহায়ক শক্তি হিসেবে কাজ করছে।
বাংলাদেশে স্থাপত্য অধিদপ্তরের আওতাভুক্ত ক্ষেত্রগুলো কী কী?
গৃহায়ণ ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয়ের অধীনস্থ স্থাপত্য অধিদপ্তর বিভিন্ন সরকারি উন্নয়ন প্রকল্পে স্থাপত্যবিষয়ক সেবা প্রদানের জন্য বিদ্যমান একমাত্র সরকারি প্রতিষ্ঠান। গৃহায়ণ ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমে বাস্তবায়িত বিভিন্ন মন্ত্রণালয় ও তদ-অধীনস্থ দপ্তরাদির প্রকল্পসমূহের স্থাপত্য ও পরিকল্পনাগত ডিজাইন ও নকশা প্রণয়নের দায়িত্ব স্থাপত্য অধিদপ্তরের ওপর ন্যস্ত।
স্থাপত্য অধিদপ্তর সরাসরি জনসাধারণের কোনো সেবাসুবিধা প্রদান করে না। বিভিন্ন প্রত্যাশী সংস্থা যেমন- মন্ত্রণালয়, বিভাগ, অধিদপ্তর, পরিদপ্তর, কর্তৃপক্ষ, ব্যুরো এর আওতাধীন প্রকল্পসমূহের মহাপরিকল্পনা, অবকাঠামো পরিকল্পনা, প্রকল্প প্রণয়ন, অফিস-আদালত, হাসপাতাল, সংশোধনী প্রতিষ্ঠান, সেবামূলক প্রতিষ্ঠান, প্রশিক্ষণ প্রতিষ্ঠান, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, মিলনায়তন, শিল্পকলা কেন্দ্র, স্মৃতিসৌধ, আবাসন, চিত্তবিনোদনের সুবিধা, পার্ক, ঐতিহ্যমণ্ডিত ভবন সংরক্ষণ, সার্কিট হাউস, ঘূর্ণিঝড় আশ্রয়কেন্দ্র ইত্যাদি ডিজাইনের মাধ্যমে স্থাপত্যসেবা এ দেশের জনগণকে দিয়ে থাকে।
আপনাদের বিভাগ কর্তৃক গৃহীত কর্মকাণ্ডে দেশ কতটুকু উপকৃত হচ্ছে বা হয়েছে?
সরকারের গৃহীত ভৌত সব অবকাঠামোগত উন্নয়নের নকশা প্রণয়ন স্থাপত্য অধিদপ্তরের মাধ্যমে হয়। জেলা পর্যায়ের হাসপাতাল (১০০ শয্যা, ৫০০ শয্যা, ১০০০ শয্যা), মেডিকেল কলেজ, গার্মেন্টস শ্রমিক কলোনি, নিম্ন ও মধ্যবিত্তের আবাসন প্রকল্প, সংশোধনী কেন্দ্র, সেবা প্রতিষ্ঠান, নারী ও শিশুদের উন্নয়নে গৃহীত বিভিন্ন প্রকল্পের নকশা প্রণয়নে সহায়তার মাধ্যমে স্থাপত্য অধিদপ্তর কর্তৃক গৃহীত কর্মকাণ্ডে দেশের সব স্তরের মানুষ উপকৃত হচ্ছে।
বাংলাদেশে সরকারি পর্যায়ে স্থাপনা নির্মাণের ধারাবাহিকতা সম্পর্কে কিছু বলুন? সময়ের সঙ্গে সঙ্গে নির্মাণের রূপবদলের ধারা কীভাবে পরিবর্তিত হচ্ছে বলে আপনার ধারণা?
এ দেশে স্থাপত্যচর্চার শুরুতে বিদেশি স্থপতিরাই পথিকৃৎ হিসেবে কাজ করতেন। পরবর্তী সময়ে এ দেশে স্থাপত্য শিক্ষা কার্যক্রম চালু হলে এ দেশের বিশ্ববিদ্যালয় থেকে অর্জিত জ্ঞানলাভকারী স্থপতিবৃন্দ বিদেশি স্থপতিদের জায়গাগুলো পূরণ করেন। তারই ধারাবাহিকতায় নির্ধারিত বাজেট, নির্মাণ উপকরণ ও পদ্ধতির সহজলভ্যতা, দেশীয় উপকরণ প্রসার এগুলোর কথা মনে রেখে স্থাপত্য অধিদপ্তরে কর্মরত স্থপতিরা আন্তর্জাতিক মানের ভৌত অবকাঠামো নির্মাণের চ্যালেঞ্জ নিয়ে নিরলসভাবে কাজ করছেন।
আন্তর্জাতিক অঙ্গনে সময়ের সঙ্গে বিজ্ঞান চর্চা ও নির্মাণ পদ্ধতি পরিবর্তন, প্রি-ফেব্রিকেটেড নির্মাণ উপাদান ব্যবহার নির্মাণ সময়কে সংকুচিত করেছে এবং মানুষকে আকাশ ছুঁতে উৎসাহিত করছে। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে স্থাপত্য হয়ে উঠছে আরও বেশি পরিবেশমুখী।
স্থাপত্য অধিদপ্তরের মাধ্যমে বাংলাদেশে এ যাবৎ বাস্তবায়িত আদর্শ নগর পরিকল্পনার উল্লেখযোগ্য অর্জন সম্পর্কে কিছু বলুন?
স্থাপত্য অধিদপ্তর নগর পরিকল্পনার সঙ্গে জড়িত নয়। তবে নকশা প্রণয়নের সময় কমপ্লেক্স বা মাস্টারপ্ল্যান প্রণয়ন অর্থাৎ সমগ্র প্রকল্পের ব্যবহার পরিকল্পনা স্থাপত্য অধিদপ্তরকেই করতে হয়। এ ক্ষেত্রে বিভিন্ন হাউজিং কমপ্লেক্স, মিক্সড ইউজড কমপ্লেক্স, গার্মেন্টস কলোনি, Shelter for Coastal and Non-coastal Belt-এ নকশা প্রণয়নের ক্ষেত্রে স্থাপত্য অধিদপ্তর সকল নাগরিকের যাবতীয় সুবিধাসহ পরিকল্পনা প্রণয়ন করে থাকে এবং এ ক্ষেত্রে যাদের জন্য নকশা প্রণীত হয়, সেই গোষ্ঠী কিংবা গ্রুপের জনগণই ওই অবকাঠামোর সুবিধা ভোগ করে থাকে, যা স্থাপত্য অধিদপ্তরের টেকসই পরিকল্পনা প্রণয়নের মাধ্যমে অর্জিত।
বাংলাদেশের মতো ঘনবসতিপূর্ণ দেশে কমিউনিটি হাউজিংয়ের গুরুত্ব কতটুকু? এ ধরনের স্থাপনা ডিজাইনে ও নির্মাণে স্থাপত্য অধিদপ্তরের কোনো পরিকল্পনা আছে কি না?
কমিউনিটি হাউজিংয়ের মাধ্যমে Neighborhood Concept উন্নয়ন ও Transport System-কে Organize করা সম্ভব। এ ক্ষেত্রে এসব কেন্দ্রীভুক্ত সুবিধাদি কৃষিজমির ধ্বংস রোধ, জলাশয় সংরক্ষণ, Ecologically endangered area সংরক্ষণের ক্ষেত্রে মানববসতি স্থাপনে land encroachment উল্লেখযোগ্য মাত্রায় হ্রাস করবে।
স্থাপত্য অধিদপ্তর Scattered না করে Integrated Planning করে। স্থাপত্য অধিদপ্তর যেহেতু সরকারি পর্যায়ের বড় বড় স্থাপনা বা প্রকল্প ডিজাইনের কাজ করে, সেহেতু স্থাপত্য অধিদপ্তর এ বিষয়ে রাখছে অনেক গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা। বেসরকারি পর্যায়ে এ ধরনের কমিউনিটি হাউজিংয়ের ব্যাপ্তি বেশি নয়। কৃষিজমি নষ্ট না করে (যা বর্তমানে ব্যক্তিমালিকানাধীন প্রতিষ্ঠানগুলো Land Project হিসেবে কৃষিজমিগুলোকে আবাসন প্লট হিসেবে বিক্রি করেছে) কমিউনিটি হাউজিং Concept-কে যথাযথ পরিকল্পনার মাধ্যমে জোরদার করার ব্যাপারে স্থাপত্য অধিদপ্তরের ভূমিকা অপরিসীম।
ঐতিহ্যবাহী স্থাপনার আদলে এ দেশে কোনো স্থাপনা নির্মিত হচ্ছে না কেন? এ ক্ষেত্রে স্থাপত্য অধিদপ্তর কী ধরনের ভূমিকা নিতে পারে?
ঐতিহ্যবাহী স্থাপনার আদলে ভবন নির্মাণ বর্তমান যুগে ব্যয়বহুল, আধুনিক প্রযুক্তি প্রসারের সঙ্গে সঙ্গে এবং সমকালীন স্থাপত্যরীতি অনুসরণ করে বর্তমানে স্থাপত্য নকশাসমূহ প্রণয়ন করা হয়ে থাকে, যা অধিকতর সাশ্রয়ী ও কার্যোপযোগী। তবে বিশেষ প্রয়োজনে ও প্রকল্পে ভবনসমূহে ঐতিহ্য ধরে রাখার জন্য স্থাপত্য অধিদপ্তর কাজ করছে, যেমন-ধ্বংসপ্রায় আহসান মঞ্জিলকে পূর্বাবস্থায় আনার জন্য সংরক্ষণ ও পুনর্নির্মাণ, স্থাপত্য অধিদপ্তর কর্তৃক করা হয়েছে, যা পেয়েছে আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি ও পুরস্কার।
কার্জন হলের কথাই যদি ধরি, এর আশপাশে নতুন যেসব স্থাপনা নির্মাণ করা হয়েছে তা আগের ঐতিহ্যবাহী স্থাপনাটির আদলেই করা হয়েছে এবং এই পুরো প্রকল্পটির সঙ্গেই স্থাপত্য অধিদপ্তর জড়িত ছিল। আরেকটি মুখ্য বিষয় হলো যেকোনো স্থাপনা বা স্থাপত্যকর্ম আলাদা আলাদা সময়কে রিপ্রেজেন্ট করে। যেমন-মোগল আমলের স্থাপত্যকর্ম আর ব্রিটিশ Colonial স্থাপত্য এক নয়। আবার এখন যে সময় চলছে এখনকার স্থাপত্য তো এ সময়েরই কথা বলবে। প্রযুক্তি, নির্মাণ কৌশল, বিল্ডিং মেটেরিয়াল ইত্যাদি সময়ের সঙ্গে সঙ্গে পরিবর্তন হয় এবং এগুলো ওই সময়ের স্থাপনা বা স্থাপত্যকে অনেকটাই প্রভাবিত করে। তারপরও স্থাপত্য অধিদপ্তর ঐতিহ্য সংরক্ষণের ব্যাপারে সচেষ্টভাবে কাজ করছে। যেমন- আহসান মঞ্জিলের কথা আগেই বললাম। এ ছাড়া যশোর কালেক্টরেট ভবন, বর্তমানে চট্টগ্রাম কোর্ট বিল্ডিং, কার্জন হল ইত্যাদি ঐতিহ্যবাহী স্থাপনার সংরক্ষণ এবং এর আশপাশে একই আদলে স্থাপনা নির্মাণের কাজ স্থাপত্য অধিদপ্তর করে আসছে সরকারের নিজস্ব মুখ্য পরামর্শক হিসেবে।
পরিকল্পনার অভাবে শহর ছাড়িয়ে গ্রামেও আবাসন একটি বড় সমস্যা হিসেবে দেখা দিয়েছে। গ্রামীণ আবাসন সমস্যা সমাধানে ও পল্লী এলাকার অবকাঠামো উন্নয়নে বাংলাদেশ স্থাপত্য অধিদপ্তর কী ধরনের ভূমিকা রাখছে? তৃণমূল পর্যায়ের অবকাঠামোর উন্নয়নে সরকারের এ প্রতিষ্ঠানটির নতুন কোনো কর্মপরিকল্পনা আছে কি?
বাংলাদেশ গ্রামভিত্তিক সুতরাং উন্নয়ন কর্মকাণ্ড রুট লেভেল অর্থাৎ গ্রাম থেকে হওয়া উচিত বলে স্থাপত্য অধিদপ্তর মনে করে। এই দপ্তর সমগ্র দেশব্যাপী উন্নয়ন অবকাঠামোর নকশা কিংবা পরিকল্পনা প্রণয়ন করে। স্থাপত্য অধিদপ্তরের বর্তমান সাংগঠনিক কাঠামো অনুমোদনের সময়ে দেশে চারটি বিভাগের অধীন ১৭টি প্রশাসনিক জেলা বর্তমান ছিল, যা পুনঃ বিভাজিত হয়ে সম্প্রতি সাতটি বিভাগের অধীন ৬৪টি জেলায় উন্নীত হয়েছে। একই সঙ্গে বিভাগীয় সদর, জেলা সদর, উপজেলা সদরে প্রশাসনিক এবং সরকারি বিভিন্ন দপ্তরের বিভাগীয়, জেলা পর্যায়ের অফিসসমূহের সংস্থানের জন্য ভবন নির্মাণের চাহিদা বৃদ্ধি পেয়েছে বহুগুণ। ফলে অত্র দপ্তরের কাজের পরিমাণ প্রত্যক্ষভাবে বেড়েছে।
স্থাপত্য অধিদপ্তর কর্মকাণ্ড সম্প্রসারণের (মাঠ পর্যায়ে) জন্য তার প্রস্তাবিত অরগানোগ্রাম এ প্রস্তাব রেখেছে এবং তা অনুমোদনের জন্য মন্ত্রিসভায় জমা দিয়েছে, যার বাস্তবায়ন প্রক্রিয়াধীন। এটি বাস্তবায়িত হলে রাষ্ট্র লাভবান হবে তৃণমূল পর্যায়ে।
ইনস্টিটিউট অব আর্কিটেক্টসের সঙ্গে বাংলাদেশ স্থাপত্য অধিদপ্তরের সমন্বয় কতটুকু?
ইনস্টিটিউট অব আর্কিটেক্ট বাংলাদেশ একটি স্বায়ত্তশাসিত সংস্থা এবং স্থাপত্য অধিদপ্তর একটি সরকারি সংস্থা। বিধিমালা প্রণয়নের ক্ষেত্রে ও জাতীয় গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্তের ক্ষেত্রে উভয় সংগঠন একত্রে কাজ করে থাকে। স্থাপত্য অধিদপ্তর, জাতীয় গৃহায়ণ কর্তৃপক্ষ, নগর উন্নয়ন অধিদপ্তর ইত্যাদির সঙ্গে জাতীয় স্বার্থসংশ্লিষ্ট বিষয়েও এক হয়ে কাজ করে।
রাজউকের বিভিন্ন কমিটিতে স্থাপত্য অধিদপ্তর এবং বাংলাদেশ স্থপতি ইনস্টিটিউট একসঙ্গে কাজ করছে। এ ছাড়া বর্তমানে বাংলাদেশ ন্যাশনাল বিল্ডিং কোডের সংশোধনের কাজেও স্থাপত্য অধিদপ্তর আর ইনস্টিটিউট অব আর্কিটেক্টস বাংলাদেশ কাজ করছে একসঙ্গে। অধিদপ্তর আসলে ইনস্টিটিউটের বাইরের কিছু না, এখানকার স্থপতিরা ইনস্টিটিউটের সদস্য। তাই আমাদের মধ্যে রয়েছে চমৎকার সমন্বয়।
জাতীয় উন্নয়নে সরকারের কাছে আপনাদের প্রস্তাবিত সুপারিশ ও দাবিসমূহের বর্তমান অবস্থা কী?
সম্প্রতি সরকারি পর্যায়ে স্থাপত্যসেবার চাহিদা ও কার্যক্রম অতিরিক্ত মাত্রায় বৃদ্ধি পেয়েছে। ব্যবহারিক ও আইনগত দিকেও স্থাপত্যসেবার বিস্তৃতি ঘটছে। এসব কারণে স্থপতি ও সংশ্লিষ্ট লোকবল বৃদ্ধি এবং দপ্তরের বিকেন্দ্রীকরণ অত্যাবশ্যকীয় বিবেচিত হচ্ছে। বাংলাদেশ ইমারত নির্মাণ কর্মকাণ্ডে দিন দিন কোড, বিধি ইত্যাদি রেগুলেটরি নিয়ন্ত্রণ বাড়ার পাশাপাশি এগুলোর প্রশাসনিক নিয়ন্ত্রণ কার্যকর করার জন্য মাঠ পর্যায়ে স্থপতিসহ কারিগরি লোকবলের উপস্থিতি আবশ্যিক। এ ছাড়া সরকারি পর্যায়ে স্থাপত্য অধিদপ্তর স্থপতিভিত্তিক একটি মাত্র সরকারি দপ্তর হওয়ার কারণে অন্যান্য প্রতিষ্ঠান স্থপতি ও কর্মকর্তাদের চাহিদা পূরণের জন্য অত্র দপ্তরের কাছ থেকে প্রেষণের চাহিদা প্রদান করছে। কিন্তু প্রয়োজনীয় লোকবল না থাকায় এসব ক্ষেত্রে প্রয়োজনীয় স্থপতি ও কর্মকর্তা ন্যস্ত করা সম্ভব হয় না। এসব সমস্যার সুরাহা স্থাপত্য অধিদপ্তরের দীর্ঘদিনের দাবি।
বাংলাদেশ স্থাপত্য অধিদপ্তরের বর্তমান কর্মকাণ্ড ও ভবিষ্যৎ কর্মপরিকল্পনা সম্পর্কে যদি বলেন।
স্থাপত্য অধিদপ্তরের বর্তমান কর্মকাণ্ড জনগণকে অবহিতকরণের মাধ্যমে এই অধিদপ্তরের জনকল্যাণমুখী কর্মকাণ্ড ও জাতীয় উন্নয়নে সংশ্লিষ্টতা প্রচার ও আন্তর্জাতিক অঙ্গনে বাংলাদেশের হয়ে সম্মান আনয়ন আমাদের বর্তমান ও ভবিষ্যৎ কর্মপরিকল্পনায় প্রাধিকারপ্রাপ্ত।
একজন স্থপতি হিসেবে আপনি নিজেকে কতটা সামাজিক দায়বদ্ধ বলে মনে করেন?
শুধু একজন স্থপতি হিসেবে নয়, একজন মানুষ হিসেবে আমি এ দেশে বেড়ে উঠেছি। এ মাটির সন্তান বলে দেশের এমন কেউ আছে কি, যে নিজের সামাজিক ও রাষ্ট্রীয় দায়বদ্ধতা অস্বীকার করতে পারে? জন্মগ্রহণের পর ছাত্রজীবনের শুরু থেকে স্থাপত্য বিষয়ে বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয় (বুয়েট) এবং বিদেশে উচ্চতর ডিগ্রি গ্রহণ সবই তো জনগণের অর্থে করা। জনগণের কাছে তথা রাষ্ট্রের কাছে নিজের দায়বদ্ধতা অপরিশোধ্য বলে আমি সব সময় মনে করি। দেশের সর্বস্তরের জনগণের জন্য সৃষ্টিধর্মী স্থাপনার নকশা প্রণয়ন, বাস্তবায়ন করে একটি মননশীল সৎ, সুন্দর চিন্তাধারার পেশা হিসেবে বর্তমান কর্মজীবন এ দায়বদ্ধতা পরিশোধের কিছুটা হলেও উপযুক্ত স্থান বলে মনে করি। সৎ ও নির্ভীক পেশা হিসেবে স্থাপত্য পেশায় নিয়োজিত হয়ে নিজের মেধা, বিশ্বস্ততা, যোগ্যতা ও স্বচ্ছতার মধ্যে দেশের কল্যাণে কাজ করতে পারার সুযোগটি আমাকে ভীষণভাবে আলোড়িত করে। সুন্দর, সার্থক বাংলাদেশ গড়ার প্রত্যয়ে সামান্য অবদান হলেও এ আমার গর্ব, এ আমার অহংকার।
বন্ধনকে সময় দেওয়ার জন্য আপনাকে ধন্যবাদ।
তোমাকেও অনেক ধন্যবাদ।
- প্রকাশকাল: বন্ধন ৪২ তম সংখ্যা, অক্টোবর ২০১৩