নিষিদ্ধ এক নগর কাহিনী

সংরক্ষিত স্থান! সর্বসাধারণের প্রবেশ নিষেধ। জনগুরুত্বপূর্ণ স্থানগুলোতে এ ধরনের সতর্কবাণী হরহামেশা দেখা যায়। তাই বলে একটি পুরো নগরে সেখানকার নগরবাসীর প্রবেশ নিষেধ এটা কেমন কথা! অবাক করার বিষয় হলেও এটাই সত্য। অনেকটা যেন রূপকথার কল্পকাহিনীর মতন। আজব রাজ্যের রাজার খেয়ালখুশিও বেশ আজব। আর এই আজব নগরের অবস্থান চীনে। যে দেশ রাজ্যকে নিরাপদ রাখতে চারদিকে সুবিশাল প্রাচীর নির্মাণ করতে পারে, সে দেশ সম্র্রাটদের সুরক্ষায় একটি নগরীকে নিষিদ্ধ করবে এ আর এমন কী! চীনের এমনই এক শহরের নাম ফরবিডেন সিটি বা নিষিদ্ধ নগরী।

নিষিদ্ধ নগরীর চীনা নাম ‘গু গং’। বেইজিংয়ের ঠিক মাঝখানে উঁচু পাঁচিলে ঘেরা মিং ও জিং সম্র্রাটের প্রাসাদ। বিশাল এক নগর। প্রজারা কখনো কোনোদিনও এই নগরে প্রবেশ করতে পারবে না। এমনই কঠিন নিয়ম। এই নগর প্রজাদের জন্য নিষিদ্ধ বলেই নগরীর নাম ‘নিষিদ্ধ নগরী।’ বর্তমানে এটি ‘দ্য প্যালেস মিউজিয়াম’ নামেই সমধিক পরিচিত। ঐতিহাসিক গুরুত্ব, শিল্প কারুকাজ, ঐশ্বর্য ও সৌন্দর্যের বিচারে নিষিদ্ধ নগরী হলো পৃথিবীর বুকে মানব সৃষ্ট সবচেয়ে সুন্দর স্থাপনাগুলোর একটি। মনোমুগ্ধকর এ নগরীতে কোনো চীনা নাগরিক প্রবেশ করতে পারত না। এমনকি বের হতে গেলেও শাসকদের অনুমতি লাগত। তবে তা একান্তই বিশেষ প্রয়োজনে। এ কারণে ওই নগরীর নাম হয় ‘ফরবিডেন সিটি’ বা নিষিদ্ধ নগরী।

কিন্তু কীভাবে তৈরি হলো এই নিষিদ্ধ নগরী? প্রয়োজনটাই বা কী ছিল? এবার জানা যাক এর রহস্য। প্রাচীন চীনা রাজাদের মনে করা হতো ‘son of heaven’ অর্থাৎ স্বর্গপুত্র। স্বর্গের পর রাজাকেই এই বিশ্বের সর্বময় ক্ষমতার অধিকারী ভাবা হতো। আর তাই স্বর্গীয় রাজাদের বসবাসের জন্য প্রয়োজন ছিল স্বর্গের। যেহেতু মর্ত্যে কোনো স্বর্গের অস্তিত্ব ছিল না, তাই রাজা নিজে উদ্যোগী হয়েই তৈরি করলেন এই স্বর্গ নগরী। স্বর্গের আবার নিজস্ব রঙও ছিল। উজ্জ্বল হলুদ বা সোনালি রঙকেই স্বর্গের রঙ হিসেবে মনে করা হতো। রাজার পোশাকও ছিল একই রঙের। ভুলক্রমেও যদি কেউ এই রঙের পোশাক পরত তাহলে তার নিস্তার ছিল না। এই রঙের সাথেই মিল রেখে ফরবিডেন সিটি বা নিষিদ্ধ নগরীকে রাঙিয়ে তোলা হয়েছে। প্রায় ৫০০ বছর ধরে লোকচক্ষুর অন্তরালে ছিল রহস্যঘেরা এই সাম্রাজ্যটি। প্রাচীন ও মধ্যযুগীয় চীনা সভ্যতার শিল্পকীর্তির প্রতীক বহন করছে নগরীটি।

ইতিহাস যা বলে

চীন সম্রাটদের বাসস্থান এবং সুদীর্ঘ পাঁচশ’ বছর ধরে চীনের প্রশাসনিক ক্ষমতার মূল কেন্দ্রবিন্দু ছিল এই নগরী। চীনের ইউয়ান রাজবংশের সময় নিষিদ্ধ নগরীর ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করা হয়। তবে এর মূল স্থাপনাগুলো গড়ে ওঠে মিং ও জিং রাজবংশের শাসনামলে। মঙ্গোলিয়ান রাজবংশের সময় এখানে প্রথম রাজকীয় নগরী গড়ে ওঠে। ইউয়ান রাজবংশের পর মিং বংশের সম্রাট হোংকু রাজধানী পেইচিং থেকে নানচিংয়ে নিয়ে যান এবং ইউয়ান প্রাসাদ পুড়িয়ে দেওয়ার আদেশ দেন। কিন্তু তার ছেলে ক্ষমতায় এসে আবারও পেইচিংয়ে রাজধানী স্থানান্তর করেন। আদেশ দেন এখানেই প্রাসাদ নির্মাণের জন্য। ১৪০৬ সালে ফরবিডেন সিটির মূল নির্মাণ কাজ শুরু হয়। পুরো কাজ শেষ হতে সময় লাগে প্রায় ১৫ বছর। দশ লাখেরও বেশি শ্রমিকের অক্লান্ত পরিশ্রম, আর মেধায় সম্পন্ন হয় নির্মাণ কাজ। এই নগরীর কঠিন পাঁচিল এমন করে বানানো হয় যেন কামানের গোলাও কিছুই করতে না পারে। সম্র্রাটরা ধরেই নিয়েছিলেন, তাদের কঠিন দেয়াল ভেঙে কেউ কোনোদিন ভেতরে ঢুকতে পারবে না। আর তাই এই সিটি থেকেই সম্রাটরা চালাতেন পুরো চীনের শাসন ব্যবস্থা।

নিষিদ্ধ নগরীর খোঁজে

রাজধানী বেইজিং থেকে প্রায় ৫০ কিলোমিটার দূরে পাহাড় ঘেরা ইয়ানশান প্রদেশ। সেখানে ছিল অসংখ্য ঢিবি। চীনের মহাপ্রাচীর ধরে উত্তর দিকে যাওয়ার পথেই যে কারো নজর আটকে যাবে জায়গাটিতে। এলাকাটি খননের কথা কেউ কখনো মাথায়ই আনেনি। স্থানীয়রা বিশ্বাস করত ঢিবিগুলোর সঙ্গে কোনো অতিপ্রাকৃতিক ব্যাপার জড়িত। এগুলো খুঁড়লে তাদের উপর অভিশাপ নেমে আসবে। কিন্তু চীনা প্রত্নতত্ত্ববিদরা এলাকাটিকে অনেক সম্ভাবনাময় হিসেবে চিহ্নিত করলেন। শুরু হলো খননকাজ। ক্রমেই উন্মোচিত হতে থাকে রহস্যময় এক প্রাচীন নগরীর। আবিষ্কৃত হলো প্রাচীন মিং রাজাদের সমাধিক্ষেত্র ও বাসস্থান। এই নগরীতেই শায়িত ১৩ জন মিং সম্রাট। সমাধির পূর্ব, পশ্চিম ও উত্তর দিকে পাহাড় এবং এর মধ্য দিয়ে চলে গেছে একটি আঁকাবাঁকা পথ। চীনা গবেষক লি মেই উল্লেখ করেছেন, ছাংলিং সমাধিতে সমাহিত রয়েছেন চু তি। তিনি ছিলেন মিং রাজবংশের সমাধি নির্মাণকারী প্রথম রাজা। রাজা চু তি ছিলেন একজন প্রতিভাবান ও দূরদর্শী মানুষ। তিনিই বেইজিংকে রাজধানী হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করতে চেয়েছিলেন। কারণ ছিল এর ভৌগোলিক অবস্থান। বহিঃআগ্রাসকদের হাত থেকে নিজেদের রক্ষা করা।

চোখ ধাঁধানো নগরী

প্রায় ৭ লাখ ২০ হাজার বর্গমিটার বা ৭৮ লাখ বর্গফুট এলাকাজুড়ে নির্মিত প্রাচীর ঘেরা বিশাল এক জগৎ এই নগরীটি। এর মধ্যে রয়েছে ৯৮০টি প্রাসাদ ভবন, বাগান, ভাস্কর্য, জলাশয় ও প্রাঙ্গণ। পেইচিংয়ের প্রাণকেন্দ্র থিয়েনমেন চত্বরের বিপরীত অংশই ফরবিডেন সিটিতে প্রবেশের প্রধান ফটক। এই ফটকটি এতই বিশাল যে একে একটি স্বতন্ত্র প্রাসাদ বলে মনে হয়। ফটকগুলোর মধ্যে রয়েছে উত্তর ও দক্ষিণ কোর্ট। উত্তর কোর্টের মধ্যে মেরিডিয়ান গেট, গেট অব ডিভাইন, ওয়েস্ট গ্লোরিয়াস গেট, কর্নার টাওয়ার্স, গেট অব সুপ্রিম হারমনি, হল অব সুপ্রিম হারমনি। দক্ষিণে- হল অব মিলিটারি অ্যামিন্যান্স, হল অব লিটারারি গ্লোরি, দক্ষিণের তিনটি প্রাসাদ, ইম্পেরিয়াল গার্ডেন, হল অব মেন্টাল কাল্টিভেশন, ট্রাঙ্কুইল লয়য়েভিটি প্রাসাদ। এর সীমানা প্রাচীরের উচ্চতা ৭.৯ মিটার (২৬ ফুট), গভীরতা ৬ মিটার (২০ ফুট) ও ভিতরের প্রশস্ততা ৮.৬২ মিটার (২৮.৩ ফুট) উপরাংশে ৬.৬৬ মিটার (২১.৯ ফুট)। সামনের প্রাসাদগুলো সম্মুখ দরবার ও ভেতরের দিকের প্রাসাদগুলো অন্দর দরবার নামে পরিচিত। সম্মুখ দরবার প্রধানত উৎসব অনুষ্ঠানের জন্য আর অন্দর দরবারের প্রাসাদগুলো রাজপরিবারের বাসস্থান ও সাধারণ প্রশাসনিক কাজে ব্যবহৃত হতো। সম্মুখ দরবারের প্রথম প্রাসাদটি সুপ্রিম হারমনি চত্বরে অবস্থিত। এই ভবনে রয়েছে তিনটি বিশাল হল বা দরবার কক্ষ। এই হলগুলোর মধ্যে রয়েছে সুপ্রিম হারমনি, সেন্ট্রাল হারমনি ও প্রিসারভিং হারমনি। এর মধ্যে সুপ্রিম হারমনি সবচেয়ে বড়। এখানে সম্রাটের অভিষেক অনুষ্ঠান হতো। মিং ও জিং রাজবংশের শাসনামলে এখানে শুধু বিশেষ অনুষ্ঠান যেমন- সম্রাটের অভিষেক, রাজপরিবারের বিয়ে ও বিশেষ দরবারের আয়োজন করা হতো। অন্য হলগুলোতে নিয়মিত দরবার বসত। যদিও তিনটি হলেই সিংহাসন ছিল, তবে সবচেয়ে জমকালো সিংহাসন। সম্মুখ দরবারের দক্ষিণ-পশ্চিম ও দক্ষিণ-পূর্বে রয়েছে মিলিটারি এমিনেন্স হল এবং লিটারারি গ্লোরি হল। দ্বিতীয়টিতে রাজ্যের গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিরা বক্তৃতা করতেন। অন্দর দরবার ছিল মিং ও জিং রাজবংশের সম্রাট ও তার পরিবারের সদস্যদের বাসস্থান। অন্দর দরবারের প্রাসাদগুলোর কারুকার্যে মুগ্ধ ও বিস্মিত দর্শকরা অনুভব করেন চীনের সম্রাটদের অতুল ঐশ্বর্য ও শিল্পীদের অসাধারণ শিল্প নৈপুণ্যকে।

স্থাপত্যশৈলীর নান্দনিকতা

নিষিদ্ধ নগরীর ভবনের দেয়াল তৈরিতে ব্যবহৃত হয়েছে লাল রঙের বিশেষ ধরনের ইট। ছাদ তৈরিতে হলুদ টালি। প্রতীকী অর্থে এসব করা হয়েছে স্বর্গীয় রঙ ও সম্রাট চু তির অপূর্ব মর্যাদার বহিঃপ্রকাশ হিসেবে। সমাধিক্ষেত্রের প্রধান স্থাপত্যের মধ্যে রয়েছে লিংয়ের প্রাসাদ। প্রাসাদ নির্মাণের উপকরণ হিসেবে ব্যবহার করা হয়েছে নানমু। প্রাসাদটিতে ৬০টি ১২ মিটার উঁচু ও এক মিটার ব্যাস সম্পন্ন নানমু রয়েছে। নানমু হচ্ছে এক ধরনের মূল্যবান কাঠের খুঁটি। ফোবে চেনান কাঠ দিয়ে এই খুঁটি তৈরি হতো। এই কাঠ খুব শক্ত ও সহজে নষ্ট হয় না। এতে এক ধরনের বিশেষ সুগন্ধিও রয়েছে। প্রাচীনকালে পরিবহনের কাজ খুব সহজ ছিল না। দক্ষিণ-পশ্চিম চীনের ইউনান ও সিচুয়ান প্রদেশের বন থেকে সংগ্রহ করা হয়। প্রথমে গাছ কেটে বনে রেখে দেওয়া হতো। যখন বন্যা হতো তখন বন্যার পানিতে ভাসিয়ে নেওয়া হতো এসব কাঠ। কাঠগুলোকে বেঁধে ভেলার মতো করে বয়ে আনা হতো বেইজিংয়ে। পরে শীতকালে যখন বরফ পড়ত তখন হাজার হাজার শ্রমিক সমতল বরফের উপর দিয়ে টেনে ধীরে ধীরে কাঠগুলো গন্তব্যে আনত। এসব কাঠ টেনে নিয়ে যেতে প্রায় ৩ থেকে ৪ বছর লাগত। এ কাজে নিয়োজিত ছিল প্রায় ২০ হাজার লোক। তাদেরকে দিন-রাত কাজ করতে হতো। মার্বেল পাথরের বিশাল সব খন্ড দিয়ে সাজানো হয় প্রাসাদের বিভিন্ন কক্ষ। তৈরি হয় অসাধারণ সব ভাস্কর্য। প্রাসাদকক্ষের মেঝে তৈরি হয় সোনালি ইট দিয়ে। লিং প্রাসাদের পর চারদিক ঘিরে আর একটি ঐতিহাসিক স্থাপত্য বিশিষ্ট একটি উঁচু মিং স্থাপত্য রয়েছে। এটি মিং রাজবংশের রাজপ্রাসাদের প্রতিনিধিত্বমূলক স্থাপত্য। 

এখনকার চালচিত্র

কিছুদিন আগেও নিষিদ্ধ এ নগরী ছিল অদেখা বিস্ময়। মানুষের কৌত‚হলে পরিপূর্ণ। ছিল না দেখার আফসোস। দিন বদলের পালায় বদলেছে দেশটির শাসন ব্যবস্থা। পুরো নিষিদ্ধ নগরী তথা ফরবিডেন সিটি এখন পর্যটকদের জন্য উন্মুুক্ত। এক সময়ের অদেখা বিস্ময় এখন এ সময়ের মানুষের কাছে এক অলঙ্কার স্বরূপ, যা পৃথিবীর অন্যতম সুন্দর স্থাপনা হিসেবে প্রতীয়মান হয়েছে। ১৯৮৭ সালে ইউনেস্কো একে বিশ্ব ঐতিহ্যবাহী স্থান হিসেবে ঘোষণা করেছে এবং বিশ্বে কাঠের কাজের সবচেয়ে বড় সংগ্রহশালার খেতাব দিয়েছে। ১৯২৫ সাল থেকে একে দেশটি জাদুঘর হিসেবে রূপদান করে। নামকরণ করা হয় দ্য প্যালেস মিউজিয়াম। এভাবেই নিষিদ্ধতার অভিশাপ থেকে মুক্তি পায় পৃথিবীর এই স্বর্গটি। মিং রাজবংশের সময় নির্মিত চীনা মাটির অপূর্ব সুন্দর শিল্প দ্রব্যাদি, সোনা, রুপা, ব্রোঞ্জ সামগ্রী, ঘড়ি, জেইদ (সবুজ পাথর) পাথরসহ বিভিন্ন মহামূল্যবান রত্নে তৈরি শিল্প সামগ্রী, চীনা রেশমের কারুকার্যময় পোশাক, দুর্লভ হস্তশিল্প রয়েছে এই মিউজিয়ামে। এ ছাড়া এখানে রয়েছে তাং ও সং রাজবংশের অসাধারণ সব মূল্যবান শিল্প সংগ্রহ। রয়েছে ৫০ হাজার পেইন্টিং। প্রতিদিন অসংখ্য পর্যটক পৃথিবীর নানা প্রান্ত থেকে দেখতে আসে নিষিদ্ধ এ নগরকে। মেঝে, দেয়াল ও সিলিংয়ের অপূর্ব কারুকার্য পর্যটকদের করে মুগ্ধ ও বিস্মিত। চীনা রাজবংশের অনিন্দ্য সুন্দর শৌর্যবীর্যের রূপ যেন লেগে আছে এই নগরীর পরতে পরতে।

মারুফ আহমেদ

প্রকাশকাল: বন্ধন ৩২ তম সংখ্যা, ডিসেম্বর ২০১২

+ posts

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Scroll to Top