অধুনা শৌখিন ও ভ্রমণবিলাসীদের কারণে পর্যটনকেন্দ্রের সংখ্যার সঙ্গে পাল্লা দিয়ে বাড়ছে এর জৌলুশ। পর্যটকদের চাহিদা মেটাতে পর্যটন শহরে গড়ে উঠছে অত্যাধুনিক, বিলাসবহুল বৃহৎ সব বিপণিবিতান, যা আয়তন, আধুনিক সুযোগ-সুবিধা আর নতুনত্বের চমকে নিজেকে নিচ্ছে ভিন্ন এক উচ্চতায়। এমনই এক বিপণিবিতান ‘দুবাই মল’। চোখ ধাঁধানো বৃহৎ এ শপিংমলটি আয়তনের বিশ্বে ষষ্ঠ।
নির্মাণকাহিনি
দুবাই মল নির্মিত হয়েছে Dutco Baltous Beatty, Al Ghandi এবং Emaar Properties-এর Turner Construction-এর যৌথ উদ্যোগে। স্থাপনাটির নকশাকার DP Architects Pvt Ltd. ২০০৬ সালের মধ্যে নির্মাণকাজ সম্পন্নের পরিকল্পনাধীন প্রকল্পটির আয়তন ৫০টি আন্তর্জাতিকমানের ফুটবল মাঠের সমান। এটির নির্মাণকাজে যুক্ত ছিল বাংলাদেশ, ভারত, পাকিস্তান ও শ্রীলঙ্কার শ্রমিকেরা। ইন্টেরিয়র ডিজাইন, অভ্যন্তরীষ বিভিন্ন ভেন্যু তৈরিতে কাজ করেছে স্ব স্ব ক্ষেত্রে প্রতিষ্ঠিত বিশ্বের খ্যাতনামা সব ডিজাইনার ও দক্ষ নির্মাণপ্রতিষ্ঠান।
দুবাই মল একটি পূর্ণাঙ্গ বিপণিবিতান। বিশ্বের বৃহৎ শপিংমল হিসেবে যা শুরু করেছিল সর্বাধিক ৬৩৫ জন রিটেইলার নিয়ে। রিটেইলার সংখ্যার দিক বিবেচনায় ইতিহাসে এ এক বিরল দৃষ্টান্ত। ২০০৮ সালের ৪ নভেম্বর চালু হওয়া দুবাই মলের অবস্থান সংযুক্ত আরব আমিরাতের রাজধানী দুবাইয়ের প্রাণকেন্দ্র দোহা স্ট্রিটে।
যা আছে দুবাই মলে
২০ বিলিয়ন ডলার ব্যয়ে নির্মিত সুপার এ মলটিতে কী আছে এই প্রশ্ন না করে কী নেই এটা বলাই ভালো। এখানে রয়েছে পৃথিবীর সর্ববৃহৎ অ্যাকুরিয়াম ‘দুবাই অ্যাকুরিয়াম’। যার দেখভাল ও নিয়ন্ত্রণ করছে ওসেয়ানিস অস্ট্রেলিয়ান গ্রুপ। দুবাই অ্যাকুরিয়াম ‘Lasgest Acrylic Panel’ হিসেবে গিনেস বুক অব ওয়ার্ল্ড রেকর্ডে স্থান করে নিয়েছে। ৫১ মিটার X ২০ মিটার X ১১ মিটার আয়তনের এই অ্যাকুরিয়ামে আছে বিশ্বের সবচেয়ে বড় পরিদর্শন প্যানেল (৩২.৮ মিটার দৈর্ঘ্য X ৮.৩ মিটার উঁচু), যা জাপানের ওকিনাওয়া চুরত্তমি অ্যাকুরিয়াম (Okinawa Churaumi Aquarium) (২২.৫ মিটার দৈর্ঘ্য X ৮.২ মিটার উঁচু) থেকেও বড়। এর পরিদর্শন প্যানেলটি ৭৫০ মিলিমিটার পুরু কাচে নির্মিত। এটি ১০ মিলিয়ন লিটার পানির চাপ সইতে সক্ষম। অ্যাকুরিয়ামটিতে ৮৫ প্রজাতির ৩৩ হাজার জীবিত প্রাণী আছে; যার মধ্যে রয়েছে ৪০০-র বেশি সামুদ্রিক শার্ক ও রে। এর ভেতরে ২৭০ ডিগ্রি বাঁকা স্বচ্ছ কাচ নির্মিত টানেল আছে, যার ভেতর দিয়ে হাঁটার সময় আপনার মনে হবে আপনি স্বপ্নময় এক ভুবনের বাসিন্দা।
দুবাই মলে আছে ৩৮ মিলিমিটার পুরু বরফের আস্তরণে নির্মিত আইস রিং-খ্যাত মাল্টিপারপাস ভেন্যু। একই সঙ্গে এখানে সেবা নিতে পারে প্রায় দুই হাজার দর্শনার্থী। ২০০৯ সালের ২১ আগস্ট এখানে চালু হয় ৭৬ হাজার বর্গফুটের সেগা রিপাবলিক (Sega Republic) থিমপার্ক, যেখানে খেলা যায় ১৫০ আকর্ষণীয়, উত্তেজনায় ভরপুর, ভীতিকর ও শিহরণ জাগানিয়া সব খেলা। পর্যটকদের বিনোদিত করতে এখানে আছে ২২টি বড় পর্দার ডিজিটাল সিনেমা হল, যার আসনসংখ্যা দুই হাজার ৮০০, যা চালু হয়েছিল ২০০৯ সালের ১৪ আগস্ট। চালুর প্রথম সপ্তাহেই ১০ হাজারেরও বেশি দর্শনার্থী এর আতিথ্য নেয়। এসব জেনে ছোটরা হয়তো ভাবছে ওদের জন্য বুঝি কিছুই নেই! হতাশ হওয়ার কিছু নেই। কারণ, দুবাই মলে শুধু বাচ্চাদের জন্য রয়েছে আস্ত একটা শহর, যে শহরে বড়দের প্রবেশাধিকার সংরক্ষিত অর্থাৎ একদম নিষেধ!
দুবাই মলে দোকানসংখ্যা এক হাজার ২০০, যার মধ্যে রয়েছে বিশ্বের সবচেয়ে বড় মিষ্টির দোকান ‘Candylicions’। মিষ্টির দোকানটির আয়তন ১০ হাজার বর্গফুটেরও অধিক। পর্যটকদের থাকার সুব্যবস্থার্থে এখানে আছে ২৫০ কামরার বিলাসবহুল আবাসিক হোটেল। খাবারের জন্য রয়েছে ১৫০ রেস্টুরেন্ট; রসনা তৃপ্তিতে এখানকার খাবারের জুড়ি মেলা ভার।
গাড়ি পার্কিংয়ের জন্য মলটিতে আছে তিনটি পৃথক পার্কিং প্লেস, যেখানে একসঙ্গে ১৪ হাজার গাড়ি পার্ক করা যায়। এমনকি দুটি জাহাজ নোঙর করার ব্যবস্থা আছে এখানে।
পর্যটকপ্রিয় দুবাই মল
পর্যটন শহরগুলোর মধ্যে বিশ্বে দুবাইয়ের চাহিদা এখন শীর্ষে। আর পর্যটকদের যাবতীয় চাহিদা পূরণে সব সময় প্রস্তুত দুবাই মল। তাই তো পর্যটকদের অন্যতম প্রিয় ও পছন্দের স্থানে পরিণত হয়েছে এটি। ২০১০ সালের মার্চে অনুষ্ঠিত মাসব্যাপী ‘দুবাই শপিং ফেস্টিভাল’-এ শপিংমলটি পাঁচ মিলিয়ন অতিথিকে আপ্যায়ন করে ফেস্টিভাল ইতিহাসে গড়ে নতুন বিশ্বরেকর্ড। ২০১০ সালে বৈশ্বিক অর্থনৈতিক মন্দার মধ্যেও দুবাই মল ৪৭ মিলিয়ন অতিথি আপ্যায়নের রেকর্ড গড়ে, যা ২০০৯ সালের গড়া ৩৭ মিলিয়ন অতিথি আপ্যায়নের রেকর্ড থেকে ২৭ শতাংশ বেশি। ২০১১ সালে এটি পর্যটকপ্রিয় স্থানের শীর্ষে থেকে গড়ে নতুন বিশ্বরেকর্ড, কেননা এ সময় ৫৪ মিলিয়ন পর্যটক দুবাই মল পরিদর্শনে আসে, যা বিশ্বের নামকরা ও বিখ্যাত সব পর্যটনস্থান; যেমন- লন্ডনের টাইম স্কয়ার (৩৯.২ মিলিয়ন), সেন্ট্রাল পার্ক (৩৮ মিলিয়ন), কানাডার নায়াগ্রা জলপ্রপাত (২২.২ মিলিয়ন) এবং নিউইয়র্ক সিটি (৫০.২ মিলিয়ন) থেকে বেশি।
দুবাই মলের টুকিটাকি
অবস্থান : ডাউন টাউন দুবাই, সংযুক্ত আরব আমিরাত
উদ্বোধন : ৪ নভেম্বর, ২০০৮
মালিকানা : Emaar Properties
প্রস্তুতকারক : Emaar Properties
ব্যবস্থাপনা : Emaar Malls Group
স্থপতি : DP Architects Pte Ltd.
আয়তন : ১,১২৪,০০০ বর্গমিটার
দোকানের সংখ্যা : ১,২০০
গাড়ি পার্কিং ক্ষমতা : ১৪,০০০
আশিক মাহমুদ
প্রকাশকাল: বন্ধন ৪৬ তম সংখ্যা, ফেবু্রুয়ারি ২০১৪