শিল্পী-সাহিত্যিকদের মিলনস্থল বিউটি বোর্ডিং

পুরান ঢাকার অলিগলি পথ পেরিয়ে চোখে পড়বে প্রাচীরঘেরা ছোট্ট একটি দ্বিতল স্থাপনা। সামনে খোলা আঙিনা। আঙিনাজোড়া হরেক রকম ফুল-ফলের বাগান। রংবেরঙের গাছের ফাঁক গলে উঁকি দেয় হলুদরঙা পুরোনো এক বাড়ি। না! সাধারণ কোনো ভবন নয়, এরই সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে বাংলা শিল্প, সাহিত্য ও সংস্কৃতির গৌরবোজ্জ্বল ইতিহাস। এ দেশীয় সাহিত্য ও সংস্কৃতি অঙ্গনের রথী-মহারথীরা এখানেই মেতে উঠতেন দিন-রাত আড্ডায়। আড্ডার মধ্য থেকেই তাঁরা সৃষ্টি করতেন অমর সব উপাখ্যান। একে বাংলা শিল্প-সাহিত্যের আঁতুড়ঘর বললেও ভুল হবে না। এ যেন বাংলার বুকে আরেকটি কফি হাউস; আরেকটি মধুর ক্যানটিন। ইতিহাসের সোদা গন্ধমাখা ঐতিহাসিক বিখ্যাত এ স্থাপনাটির নাম বিউটি বোর্ডিং।

পুরান ঢাকার বাহাদুর শাহ্ পার্ক পেরিয়ে বাংলাবাজার প্রধান সড়ক ধরে এগিয়ে বাঁয়ে মোড় নিলেই প্যারিদাস রোড। এই রোডের ঠিক লাগোয়া শ্রীশদাস লেনের ১ নম্বর বাড়িটিই বিউটি বোর্ডিং। পুরান ঢাকার সংকীর্ণ গলি আর গায়ে গা লাগোয়া ভবনগুলো দেখে বাইরে থেকে মনেই হবে না এখানে কোনো সবুজেঘেরা বাড়ি থাকতে পারে। সাইনবোর্ড দেখেই চিনে নিতে হবে। মূল সড়কের সঙ্গেই লাগোয়া প্রধান ফটক দিয়ে ভেতরে ঢুকলেই ফুলবাগানঘেরা প্রশস্ত উঠোন। উঠোন থেকে একটি পথ চলে গেছে থাকার ঘরগুলো; অর্থাৎ বোর্ডিংয়ে এবং আরেকটি খাবারঘরে। ডান দিকে অফিস ঘর। একটু ভেতরেই বিশাল রসুই ঘর। ভবনের মাঝ বরাবর সিঁড়ি দিয়ে দোতলায় উঠতে হয়। সেখানে সারি সারি থাকার ঘর, সঙ্গে রেলিংঘেরা বারান্দা। আর দোতলার সিঁড়ি দিয়ে ওপরে উঠলেই বোর্ডিংয়ের এক চিলতে ছাদ। প্রায় নয় কাঠা জায়গার ওপর স্থাপিত বোর্ডিংয়ে রয়েছে ২৫টি কক্ষ। এক বিছানাওয়ালা ১২টি এবং বাকিগুলো দুই বিছানাওয়ালা কক্ষ। বোর্ডিংয়ে রাতযাপনের পাশাপাশি রয়েছে রসনাবিলাস আর চুটিয়ে আড্ডার ব্যবস্থা। বোর্ডিংয়ে থাকার পরিবেশটা বেশ রোমাঞ্চকর। কারণ, স্থাপনায় পুরান ঐতিহ্যের ছাপ স্পষ্ট। বারান্দার কলামগুলোর মধ্যে ও দরজার ওপরে নকশাখচিত আর্চ আকৃতির খিলান। দরজা-জানালার পাল্লাগুলো সব কাঠের তৈরি। দেয়ালে কিছু স্থানে রয়েছে কুপি রাখার ব্যবস্থা। কিছু স্থানের পলেস্তারা খসে গেছে, সেখানে নতুন করে সংস্কার করা হয়েছে।

প্রবেশ পথ (ডানে), বোর্ডিংয়ে প্রবেশ পথ ও বিউটি বোর্ডিংয়ের বিভিন্ন অংশ (উপরে বা থেকে)

বিউটি বোর্ডিংয়ে আকর্ষণীয় বিষয়ই এখানকার চমৎকার স্বাদের খাবার। খাবার ঘরে সাজানো সারি সারি টেবিল-চেয়ার। খাবার পরিবেশনার ধরনটাও বেশ ভিন্ন। স্টিলের বড় থালা আর গ্লাসে পরিবেশন করা হয় খাবার-পানীয়। আগে পিঁড়িতে বসে মেঝেতে খাবার রেওয়াজ থাকলেও এখন চেয়ার-টেবিলের ব্যবস্থা। দেয়ালে টাঙানো রয়েছে বিশিষ্ট কবি-সাহিত্যিকদের আড্ডার কয়েকটি ছবি। তাঁরাও একসময় এই ঘরটিতেই বসে ভোজ সারতেন; ভাবতেই মনে জাগবে শিহরণ। বিউটি বোর্ডিংয়ের মুখর আড্ডা আগের মতো না থাকলেও খাবার ঘরে এখনো প্রতিদিন দুপুরে ভোজনরসিকদের ভিড় চোখে পড়ার মতো। এর একটা বিরাট অংশ পাশের বইয়ের বাজারের ক্রেতা-বিক্রেতারা। নগরের ভোজনরসিকেরা ছাড়াও অনেক বিদেশিরও দেখা মেলে। এখানকার খাবারের স্বাদ অতুলনীয়। বিশেষ করে সরষে ইলিশ। এ ছাড়া সকালের নাশতা, দুপুর ও রাতের খাবারে পাওয়া যায় খিচুড়ি, মুরগির মাংস, খাসির মাংস, নানা ধরনের মাছ, সবজি, ভর্তা, পানীয়সহ আরও কত কী! পঞ্চাশের দশকে এখানে থাকতে ভাড়া গুনতে হতো দুই-তিন টাকা আর এক টাকায় মিলত ঘরোয়া পরিবেশে খাওয়াদাওয়া। এখন হয়তো ওই দামে থাকা-খাওয়ার কথা চিন্তাই করা যাবে না, তবে অন্যান্য স্থানের তুলনায় এখনো সুলভই বলা চলে।

বিউটি বোর্ডিংয়ের ইতিহাস অনেকটাই সুখ-দুঃখের সংমিশ্রণ। বাড়িটি ছিল নিঃসন্তান জমিদার সুধীর চন্দ্র দাসের। দেশভাগের আগে সেখানে ছিল সোনার বাংলা পত্রিকার অফিস। কবি শামসুর রাহমানের প্রথম কবিতা মুদ্রিত হয়েছিল এ পত্রিকায়। দেশভাগের সময় পত্রিকার অফিসটি স্থানান্তরিত হয় কলকাতায়। এরপর পঞ্চাশের দশকে দুই ভাই প্রদাহ চন্দ্র সাহা ও নলিনী মোহন সাহা এই বাড়ি ভাড়া নিয়ে গড়ে তোলেন বিউটি বোর্ডিং। ১৯৭১ সালের ২৮ মার্চ বিউটি বোর্ডিংয়ে পাকিস্তানি হানাদারদের হাতে নিহত হন প্রহাদ চন্দ্র সাহাসহ ১৭ জন। সেই সময় প্রদাহ চন্দ্রের পরিবার জীবন বাঁচাতে চলে যান ভারতে। দেশ স্বাধীনের পর ১৯৭২ সালে প্রদাহ চন্দ্রের স্ত্রী শ্রমতী প্রতিভা সাহা দুই ছেলে সমর সাহা ও তারক সাহাকে নিয়ে বিউটি বোর্ডিং আবার চালু করেন।

বিউটি বোর্ডিংয়ের জন্মলগ্ন থেকেই এখানে আড্ডা দিতেন প্রথিতযশা কবি, সাহিত্যিক, বুদ্ধিজীবী, শিল্পী, সাংবাদিক, চিত্রপরিচালক, গায়ক, অভিনেতাসহ বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ। বিকেল, সন্ধ্যা, রাতে বোর্ডিংয়ের সবুজ চত্বরে উঠত চায়ের কাপে ঝড়। এখানে যে শুধু আড্ডা হতো তা-ই নয়, পাশাপাশি চলত মতবিনিময়, বিতর্ক, সাহিত্যচর্চা। এখানে যাঁরা আড্ডার আসরে আসতেন, তাঁদের মধ্যে কবি শামসুর রাহমান, রণেশ দাসগুপ্ত, ফজলে লোহানী, আবু হেনা মোস্তফা কামাল, সমরজিৎ রায় চৌধুরী, ব্রজেন দাস, হামিদুর রহমান, বিপ্লব দাশ, মহাদেব সাহা, শিল্পী কাইয়ুম চৌধুরী, ভানু বন্দ্যোপাধ্যায়, আহমেদ ছফা, হায়াৎ মাহমুদ, সত্য সাহা, আল মাহমুদ, জহির রায়হান, খান আতা, সৈয়দ শামসুল হক, গোলাম মুস্তাফা, নির্মলেন্দু গুণ প্রমুখ। আবদুল জব্বার খান এখানেই লেখেন বাংলার প্রথম সবাক ছবি মুখ ও মুখোশ-এর পান্ডুলিপি। শামসুর রাহমান লিখেছেন ‘মনে পড়ে একদা যেতাম প্রত্যহ দুবেলা বাংলা বাজারের শীর্ণ গলির ভেতরে সেই বিউটি বোর্ডিং-এ পরস্পর মুখ দেখার আশায় আমরা কজন।’ এখান থেকেই সূত্রপাত আহমেদ ছফা সম্পাদিত পত্রিকা স্বদেশসহ আরও কয়েকটি সাহিত্য সাময়িকীর। এ ছাড়া অনেক কবি-সাহিত্যিক তাঁদের জীবনের সেরা লেখাটি লিখেছেন এ বোর্ডিংয়ে বসেই। তাই বিউটি বোর্ডিংকে বাংলা সাহিত্য অঙ্গনের আঁতুড়ঘর বললেও বাড়িয়ে বলা হবে না। শোনা যায়, দেশ ভাগের আগে এ ঐতিহাসিক ভবনে পা রেখেছিলেন নেতাজি সুভাষ চন্দ্র বোস ও পল্লীকবি জসীমউদদীন।

দোতালার লন, ছাদে ওঠার সিঁড়ি, বোর্ডিংয়ের রুম ও অফিস কক্ষ (উপরে বা থেকে)

বদলে গেছে সময়। পুরান ঢাকার হাঁকডাক আগের থেকেও অনেক গুণ বাড়লেও ক্রমেই বিবর্ণ হয়েছে বিউটি বোর্ডিয়ের সোনালি দিন। চায়ের কাপ-পিরিচের টুংটাং শব্দ, সুরেলা গান, দরাজ গলায় কবিতা, হাসি-তামাশা এখন আর আগের মতো শোনা যায় না। পদধূলি পড়ে না সংস্কৃতিমনাদের; বসে না আড্ডার আসর। তাই একবুক অভিমানের পাহাড় নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে বিউটি বোর্ডিং। ঐতিহ্য ধরে রাখতেই মাঝেমধ্যে আয়োজন করা হয় কিছু সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের। তবে তাতে সেই প্রাণোচ্ছল কলরবের অভাবটা ঠিকই স্পষ্ট। বিউটি বোর্ডিংয়ের যেন চিরকালীন অপেক্ষা সেই চির তরুণ সংস্কৃতিপ্রেমীদের। এখনো সে তার ফুলবাগানঘেরা আঙিনা সাজিয়ে রেখেছে তরুণ প্রজন্মের সংস্কৃতিসেবীদের প্রতিক্ষায়!

মারুফ আহমেদ

প্রকাশকাল: বন্ধন ৭৪ তম সংখ্যা, জুন ২০১৬

+ posts

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Scroll to Top