সোলার অ্যামব্রেলা ও সোলার আইস ক্যাপ স্কাইস্কাপার, যুক্তরাষ্ট্র
গত দশকের বৈশ্বিক উষ্ণতার পরিবর্তন হেতু সোলার আইস ক্যাপ ঘন ঘন তাপ বৃদ্ধির মুখে পড়ছে। ফলস্বরূপ উত্তর ও দক্ষিণ মেরুর বরফের চাদর ধীরে হলেও পাতলা হচ্ছে। এখানকার বিশাল বরফখণ্ডের বিভিন্ন স্থানে ফাটল সৃষ্টির ফলে তা ভেঙে টুকরো টুকরো হয়ে সমুদ্রের পানিতে মিশছে। যার ফলে সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বেড়ে প্লাবিত হচ্ছে উপক‚লীয় অঞ্চল। প্রকল্পটির প্রাথমিক উদ্দেশ্য বা প্রস্তাবনা হলো উত্তর মেরু বা সুমেরু অঞ্চলের ক্রমহ্রাসমান বরফের চাদরকে পুনর্নির্মাণ করা, যার দ্বারা পৃথিবীপৃষ্ঠকে শীতল রেখে পৃথিবীর তাপমাত্রা যত দূর সম্ভব কমিয়ে আনায় সচেষ্ট হওয়া।
সোলার আমব্রেলা বাউয়েন্টের সুপার স্ট্রাকচার আমাদের ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য কঠিন এক বাস্তবতা, যার সাহায্যে উত্তর মেরু বা সুমেরুকে রক্ষায় যথাযথ ব্যবস্থা গ্রহণ সম্ভব। যদিও শক্তির সঞ্চালন এবং সমুদ্রের লোনা পানি থেকে লবণ মুক্তকরণ পদ্ধতি উত্তর মেরু বা উত্তর অঞ্চলীয় স্কাইস্কাপারকে উত্তর মেরুর প্রধান ভাসমান নগরে রূপান্তর করবে। এই স্কাইস্কাপারটি ন্যাশনাল ওসেনিক অ্যান্ড অ্যাটমোসফেরিক অ্যাডমিনিসট্রেশন (NOAA)-এর সঙ্গে যুক্ত। এতে থাকবে গবেষণার জন্য ল্যাবরেটরি, পুনরায় ব্যবহারযোগ্য বিদ্যুৎ স্টেশন, বহু শয়নকক্ষবিশিষ্ট স্কুল কিংবা কলেজের মতো বিশেষভাবে নির্মিত বাড়ি। পর্যটকদের আকৃষ্ট করার জন্য জীববৈচিত্র্যের বিচিত্র সমাহারের পাশাপাশি জীবজগতের বৈচিত্র্যকে সংরক্ষণ করার জন্য প্রাণিজ আবাসস্থল। এ ধরনের এক বা একাধিক ভবন নির্মাণের পরিকল্পনা নেওয়া হচ্ছে উত্তর বা সুমেরু অঞ্চলের সবচেয়ে ক্ষতিগ্রস্ত এলাকায়।
লবণযুক্ত পানিকে ব্যবহার করা হবে পুনরায় ব্যবহারযোগ্য বিদ্যুৎ উৎপাদনের উৎস হিসেবে। লবণযুক্ত পানি থেকে অসমোটিক (Osmotic) পদ্ধতিতে করা হবে বিদ্যুৎ উৎপাদন। বিদ্যুৎ স্টেশন বা বিদ্যুৎ উৎপাদনকারী ঘরটির অবস্থান হবে মূল স্থাপনার ঠিক মাঝখানে। এই স্থাপনাটি সোলার পদ্ধতিতে শক্তি উৎপাদনের সময় উত্তর মেরুর পৃষ্ঠদেশ থেকে তাপ শোধন করে এর পৃষ্ঠদেশ রাখবে শীতল। ছাতার তাপ নিরোধক স্তর বা পর্দা কয়েক স্তরের পলিথিন পাইপ সিস্টেমে গঠিত। এই পাইপ সিস্টেমের সাহায্যে উত্তোলন করা হবে পানি। সর্বশেষে এই সামুদ্রিক পানিকে ছাতায় নির্মিত বিশেষ ধরনের শীতলীকরণ পদ্ধতির সাহায্যে বরফে পরিণত করা হবে, যাতে করে উত্তর বা সুমেরু অঞ্চলের শীতল পরিবেশ বজায় থাকায় কমবে বরফ গলার হারও।
ফোরিয়া স্কাইস্কাপার রিভাইটিলাইজ, ফ্রান্স
ফোরিয়া স্কাইস্কাপার ফ্রান্সের প্যারিসের একটা একক আবাসিক উপনগর। এটা ‘Petite Ceinture’-এর ওপরে অবস্থিত। পুরো শহরটি অত্যন্ত সুন্দর ও মনোমুগ্ধকর, যা আধুনিক ও সুশৃঙ্খল যোগাযোগব্যবস্থায় পরিবেষ্টিত। এটি দুইটি প্রধান স্লাব এবং একটি খালি টাওয়ার কাঠামোয় নির্মিত, যা নির্মাণ করা হয়েছে কারখানার বাতিল দ্রব্যসামগ্রীকে পুনর্ব্যবহারের মাধ্যমে। টাওয়ারটি পানি সরবরাহকারী বিভিন্ন অংশকে একত্রে ধরে রাখায় পানি সরবরাহে সুবিধা হয়। পানি সরবরাহকারী বিভিন্ন অংশ মূল কাঠামোর বাইরে ফাঁকা সবুজ জায়গায় একত্র হবে। তা ছাড়া এই প্রকল্পটিতে থাকবে পানি সংগ্রহের জন্য বিশেষ যন্ত্রপাতি এবং সোলার পাওয়ার প্ল্যান্ট।
প্রকল্পটির কাঠামো কঠিন বা দৃঢ় হলেও ফোরিয়া স্কাইস্কাপার এবং এর সঙ্গে সম্পর্কিত বা সংযুক্ত কিছু একক ইউনিটকে এমনভাবে নকশা করা হয়েছে, যা নিজেকেই প্রতীয়মান করে। এই নির্মাণকাজে ব্যবহৃত সামগ্রী সবই উপজাত দ্রব্য, যা বাতিল বলে বিবেচিত সামগ্রীর পুনর্ব্যবহারের মাধ্যমে সংগৃহীত। এই সম্পূর্ণ প্রকল্প বা ভবনটিকে বাতিল বিবেচনায় পুনরায় এতে আবার নতুন প্রাণের সঞ্চার করা সম্ভব। যদিও এর সবকিছুই নির্ভর করছে এখানে বসবাসকারী ব্যক্তিদের ইচ্ছা ও প্রয়োজনের ওপর।
ভাসমান লাইট পার্ক, চীন
বিশ্বের বড় ও প্রধান শহরগুলোতে দ্রুতগতিতে জনসংখ্যা বাড়ার ফলে ওইসব শহরের উন্নয়নকাজ যেমন সঠিকভাবে ও গতিতে করা সম্ভব হচ্ছে না ঠিক তেমনি এই বিশাল জনসংখ্যার চাপ সঠিক ও সুন্দর নগর পরিকল্পনার জন্য বড় ধরনের বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে। যার ফলে আবাসিক এ শহরগুলোতে যথাযথ অবকাঠামোর পাশাপাশি আবাসন, চিকিৎসা ও বিনোদনের ব্যবস্থা করা সম্ভব হচ্ছে না। বেইজিংয়ের অনেক ঐতিহাসিক ও গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামো বা স্থাপনাকে ধ্বংস করা হয়েছে এভাবেই। শুধু বিপুল এ জনসংখ্যার যথাযথ সুযোগ-সুবিধা নিশ্চিত করতে।
এ ধরনের জনবহুল শহরে সবুজায়ন বা পুনরায় সবুজ ফিরিয়ে আনা এবং চিত্তবিনোদনের ব্যবস্থার একমাত্র উপায় এমন ধরনের স্কাইস্কাপার বা সুউচ্চ কাঠামো নির্মাণ, যার অবস্থান ভূমিতে না হয়ে বরং তা ভূমির ওপরে ভাসমান হবে। এর ফলে নতুন উন্নয়ন কর্মকাণ্ডগুলো ধীরে হলেও হবে আকাশমুখী। ভাসমান লাইট পার্কটি বিশাল মাশরুম আকৃতির ছাতার সাহায্যে ভাসমান অবস্থায় থাকবে। একে ভাসমান অবস্থায় ধরে রাখতে হিলিয়াম গ্যাসভর্তি মাশরুম আকৃতির ছাতাকে এর ওপরে সংযুক্ত করা হবে এবং সোলার শক্তিসমৃদ্ধ প্রপেলার (Propellers) সরাসরি এর নিচের দিকে যুক্ত থাকবে। পূর্বনির্ধারিত প্ল্যাটফর্মটি পার্ক, খেলার মাঠ, গ্রিন হাউস, রেস্টুরেন্ট এবং অন্যান্য সুযোগ-সুবিধা প্রদানকারী কাঠামোর ওপর থেকে স্টিলের কেব্ল দ্বারা যুক্ত হয়ে ধীরে ধীরে নিচের দিকে এগোবে। এর গোলাকার পাত্রের বিভিন্ন দিকে বড় বড় প্ল্যাটফর্ম ফ্যান লাগানো হবে, যাতে করে এরা এর সম্পূর্ণ ওজনের মধ্যে ভারসাম্য রক্ষা করতে পারে। তা ছাড়া এতে স্লাসগুলোকে এমনভাবে যুক্ত করা হবে, যাতে করে এটা পাবে সর্বাধিক সূর্যের আলো।
এতে সংযুক্ত গোলাকার পাত্রের উপরিভাগে যুক্ত থাকবে সোলার প্যানেল, যার দ্বারা নিচে প্রয়োজনীয় শক্তির সরবরাহ সুনিশ্চিত হবে। তা ছাড়া পানি সংগ্রহকারী ট্যাপগুলোর অবস্থান ওপরে। এতে বৃষ্টির পানিকে এমন এক জায়গায় সংরক্ষণ করা হবে, যা ফিল্টারের সঙ্গে যুক্ত। ফলে এখানে সংরক্ষিত পানি সব স্থানে পরিষ্কার পানি সরবরাহের নিশ্চয়তা দেবে।
যদিও বেইজিং শহরের মারাত্মক যানজট এবং জনসংখ্যার তীব্র চাপের মতো সমস্যার সমাধান এতে হবে না। তবুও এটা সাধারণ মানুষকে কিছুটা হলেও হারিয়ে যাওয়া সবুজে ফিরিয়ে নেবে। তা ছাড়া যারা ক্রমবর্ধমান জনসংখ্যার চাপের মধ্যে এ শহরে নতুনভাবে যুক্ত হচ্ছে, তাদের জন্য ভাসমান এই লাইট পার্ক পরিষ্কার ও নির্মল বাতাসের সাহায্যে স্বাস্থ্যসম্মত পরিবেশের সুব্যবস্থা করতে সমর্থ রাখবে। কেননা শহরের উপরি ভাগের বাতাস থাকে সব সময় নিচের চেয়ে পরিষ্কার ও নির্মল।
প্রকৌশলী সনজিত সাহা
sonjit7022@gmail.com
প্রকাশকাল: বন্ধন ৪৬ তম সংখ্যা, ফেবু্রুয়ারি ২০১৪